Samokal Potrika

                                                   ৩

ভৃগু চলে যাওয়ার পর , নিজেকে অসহায় বলে মনে হচ্ছিল  । সারাদিন নিজের মতন থাকা , রাতে দেহের তৃষ্ণা নিয়ে রাতযাপন  ! খুব কষ্ট , দু ‘চোখ দিয়ে জল পড়ছে । বাবার কাছে থাকতেও , নিজেকে মানুষ বলে মনে হত না । একমাত্র সেই রাক্ষস যুবকের সাথে যখন প্রেম করতাম , নিজের গুরুত্ব বুঝতে পারতাম । মনে হত , ভালোবাসলেই  মানুষ দামী  হয়ে ওঠে । সমাজে নিজের গুরুত্ব বুঝতে পারে । সে জানে পৃথিবীতে সব কিছু মিথ্যা হয়ে যেতে পারে , একমাত্র তার ভালোবাসার মানুষের চোখে সে মৌলিক , সেখানে নিজের পরিচয় নিয়ে সজাগ । আমিও বুঝতে শুরু করলাম আমি নারী , আর আমার সৌন্দর্যে কোন কবিতা রচনা হতেই পারে । নিজের প্রতি এই সম্মান , আমাকে বাঁচতে শেখায় । এই সব কিছু আমাদের মতন নারীদের জীবনে অল্প সময়ের জন্য আসে । এক সমায় বাবা , আমার মতামতের বিরুদ্ধেই ভৃগুর হাতে  গোত্রান্তর করল !  নিজের গোপন প্রেমিকের স্মৃতি নিয়েই , স্বামীর কাছে এসেছি । সেই স্বামীও আমায় ছেড়ে চললেন ! মেয়েদের জ্বালা সবটাতেই । একটা দেহ আছে , সেই দেহে মন আছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে অনেক রাত কেঁদেছি । আমি ভেবেছি , ভৃগু আমায় ভাবছে ? সেও এতটাই যন্ত্রণা কাতর ? মনে হচ্ছে , আমার মত্ন সে এতটুকু কাতর নয় । আমার কাছে এমন একজন ছিল , যে আমায় ভালোবেসে ছিল , আমার জন্য বাবার সাথে লড়াই করতে পর্যন্ত পিছপা হয়নি। সত্যিই  রাক্ষস জাতিরা ভালবাসতে জানে , সেই ভালোবাসার জন্য লড়তেও ভয় পায়না । আমি আমার প্রাক্তন প্রেমিককে অতটাই ভালবাসতাম । বুঝে গিয়েছি ততদিনে , মন মতন না হলে পিতা দেবতাদের কাছে সহায়তা নিয়ে আমার প্রেমিকেকে মেরে ফেলবে । আমি নিজেই ওর কাছ থেকে সরে এলাম ।  ভৃগুকে বিয়ে করে , ওনার সাথে নিজের যন্ত্রণা ভাগ করে নেব ভেবেছিলাম । আমি তাঁকে সব কথা হয়ত বলতাম না । মেয়েরা যদি বিয়ের পর নিজের স্বামীকে ভালোবেসে ফেলে , তাহলে বিয়ের আগে আর বিয়ের পরের প্রেমের মধ্যে এক টানাপোড়েন  শুরু হয়ে যায় ।  এমনই ভাবে আমি মনে মনে জ্বলতে শুরু করেছি । ভৃগুর প্রেম , স্পর্শ , আমার প্রতি খেয়াল , এই  সব কিছুরই  অভাব বোধ করতে শুরু করলাম ।

ভিতরে –ভিতরে কাঁদছিলাম । একাকীত্বের আগুনে পুড়ছিলাম । এই আশ্রমে আমি একাই রয়েছি । নিজেই , ফল সংগ্রহ করা , খাবার তৈরি করা সব কাজ করেও – দুপুর , রাতে এত সময় , যে শেষ করে উঠেত পারতাম না ! মনে হচ্ছিল সময় আমার শত্রু হয়ে , প্রতিশোধ নিচ্ছে , যখনই ভাবছি এই বোধহয় ফুরিয়ে যাবে , দেখি সে অপেক্ষা করছে ! খুব যন্ত্রণা । ভৃগুর কথা সেই সময় মনে পড়ল ! বিপদ দেখলে , যেন দেবতাদের শরণাপন্ন হই , রাক্ষসের নয় ।

ভৃগুকে , বরুণের সন্তান বলে জানলেও , আমি এতটুকু বুঝেছি , অগ্নি দেবের বীর্যে সে আলোকিত । পিতৃত্ব  নিয়ে কেউ কোন দাবী  করেনি  । দেবতাদের অনুগ্রহ পেলেই তাকে সবাই মাথায় তুলে রাখত , তার মায়ের পরিচয় জানতে চাইত না । পিতার পরিচয়ের জায়গায় দেবতাদের মাহাত্ম্য প্রচার হত । আমি শুনেছি ,  ব্রক্ষ্মা ঋষির  কাছে  বরুণ আর অগ্নিদেব দু’জনেই বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলেন । তখনই এক  নারীর প্রতি তারা উভয়েই আকৃষ্ট হয়েছিলেন । নারী খুবই সহজলভ্য বস্তু । সেই মেয়েটির মনের কথা বলতে পারব না, তবে শুনেছি বরুণ দেবের সাথে সহবাসে ভৃগুর জন্ম হয়েছিল । অগ্নিদেব নিজেও সেই নারীকে ভোগ করেছিলেন । সংসার  বেদজ্ঞ   ভৃগুর , পিতার পরিচয় নিয়ে মন খুলে কিছু বলতে ভয় পেত । আসলে অগ্নির বিপক্ষে কেউ যেতে চাইত না, কেননা ইন্দ্রর খুব কাছের দেবতা ।

 

এমনই অবস্থায় আমি , অগ্নি দেবের শরণাপন্ন হলাম ।বেদজ্ঞ ভৃগু তাঁকে খুশি করবার  মন্ত্র আমায় শিখিয়ে দিয়েছিল । আমি  দেবতাদের অনুচরের কাছে , কানে সেই মন্ত্র বললাম । এই মন্ত্র আমার পবিত্রতার প্রমাণ । দেবতাদের গুহায় পবিত্র মানুষ ছাড়া প্রবেশ করতে পারত না । আমি শুনেছিলাম , দেবতারা মানুষকে সব সুখ দিতে পারে । আমি অসহায় , সেই সুখের  সন্ধানে  গুহামুখি হলাম ! 

তখন মধ্যরাত । দেবতারা এমন সময়ই তলব করে । দিনের আলোয় আমরা সাধারণ মানুষেরা তাদের মুখোমুখি হতে পারবনা । এত  জ্যোতিঃ , তেজ আর আলো থাকে , যে গুহা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবনা !

রাতে দরজায় , তিনবার কেউ টোকা দিল । আমি ভিতর থেকে উত্তর দিলাম । দেবতার অনুচরেরা  মন্ত্র পড়ল ।আমিও মন্ত্র বললাম , পাল্টা । সম্মতি পেতেই , আমি দরজা খুলেছি  । সামনে  জনা  সাতেক অনুচর দাঁড়িয়ে রয়েছে ! পশুর ছাল দিয়ে  তৈরী  পোশাক  পড়েছে ।  ভিতর থেকে একজন এসে আমার চোখ বেঁধে দিল আর বলল আমি যেন শুধুমাত্র আমার দেবতারই নাম স্মরণ করতে থাকি, তার কল্পিত ছবি চিন্তা করতে থাকি , তাকেই  উপলব্ধি করতে থাকি । আমি এতটাই কাতর হয়ে উঠেছিলাম যে তাই করলাম ।

আমি আমার  কাজে এতটাই মগ্ন ছিলাম যে , শুধু টের পাচ্ছি , আমার দুটো পা   কখনো সমতল ছুঁয়েছে , কখনোবা ভূমির ঢালু অংশ । আমি তখন একটু উষ্ণতা  উপলব্ধি করলাম । এইবার আগুনের মতন ।  আমার চোখ খুলে দিতেই , প্রথমে চোখ  ধাঁধিয়ে  গিয়েছিল ! এমনটা সকলেরই হয় , অন্ধকার থেকে চোখে আলো এলে  এমনই হবে ।

 

আমি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে , সামনে আগুনের যজ্ঞবেদী  , লেলিহান , রক্ত মুখর জিভ লক লক করছে , দাউ –দাউ করে মনে হচ্ছে সব কিছু গিলে নেবে ।  এই যজ্ঞ ভূমির  পিছন  দিকে কেউ একজন  খুব লম্বা মূর্তি দেখলাম ! তার গায়ের রন ছিল উজ্জ্বল ,  মাথার চুল বেশ লম্বা , আর আমার দিকে এক   দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে । আমি  গুহার ভিতরে দাঁড়িয়ে ,  ধোঁয়ায় ভরা , আমার খুব ঘুম  পাচ্ছিল । আমি ঘুমিয়ে পড়লাম ।

 

অনেকক্ষণ , সে কতক্ষণ হবে  , বা খুব অল্প সময় কিছুই জানিনা । হুঁশ ফিরেছে । দেখলাম আমার শরীরটা নগ্ন হয়ে আছে । গায়ে বস্ত্র নেই ! অথচ এমনটা  হওয়ার কথা ছিলনা , আমার মনে আছে , আমি বস্ত্রা পড়েই এসেছিলাম । এইবার উপলব্ধি করলাম আমার যোনিদ্বারে অসহ্য  যন্ত্রণা! আর আঁৎকে  উঠলাম , সেখান দিয়ে রক্তের স্রোত বইতে দেখে । চিৎকার করব সেই সাহস নেই । 

 

আচমকাই দেখলাম এক  ষাটোর্দ্ধ  মানুষ পাশে বসে আছেন ! আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন

-আমার কাছে এমন ভাবেই আসবে । আমি দেবতা , মানুষের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেব ।

-আপনি ?

-পুলোমা  , আমি ভৃগুর জন্মদাতা ।

-মানে !

- এই যে আজ তোমাকে যেমন ভাবে কৃপা করলাম ,তেমন ভাবেই আমার কৃপাতেই ভৃগুর জন্ম হয়েছিল ।

- কৃপা ! স্বামীর অবর্তমানে , এক নারীকে  গুহার ভিতরে , ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গম করলেন ! আপনি  আমার শ্বশুর হবেন ! আপনি এই জঘন্য  কাজ করলেন পিতার সমতুল্য হয়ে ! একে যে ধর্ষণ বলে ! আপনারা দেবতারা এই জঘন্য অপরাধকেই বুঝি কৃপা বলে এসেছেন !

-দেখো , দেবতারা সারা জীবনে  অনেক নারীকেই কৃপা করেছে । তাদের সন্তানের জন্মদাতা হয়েছে । তাই বলে দেবতারা তাদের পিতা নন । পিতা আর জন্মদাতার মধ্যে ফারাক রয়েছে । তোমার গর্ভে যে সন্তান আসবে তার জন্মদাতা আমি আর পিতা হবে ভৃগু । সেই পরিচয় দেবে আর নিজের আশ্রমের উত্তরাধিকারী করবেন । তবে অবশ্যই  পুত্র সন্তান  হতে  হবে ।

আমার দিকে তাকিয়ে অগ্নিদেব বললেন – কাঁদছ কেন ? এক সপ্তাহ আমার কাছেই থাকো । তারপর আমার অনুচর তোমাকে   আশ্রমে দিয়ে আসবে , যেখানে ছিলে , সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হবে , সেইদিন আমার অনুচররা যাবে । পুত্র সন্তান হলে , তাকে আমরা তোমার কাছে রেখে দিয়ে , দেবতাভুক্ত  করব । কন্যা সন্তান হলে আমরা নিয়ে আসব । আমাদের কাজে ব্যবহৃত  হবে ।    তার উপর তোমার দাবী  থাকবেনা ।

-ভৃগুকে আমি কী বলব ?তিনি এইসব জানতে পারলে !

-কিচ্ছু হবেনা  । সে রাক্ষস জাতির বিরোধীতাকেই  নিজের জীবনের ব্রত করেছে । দেবভূমির সহায়তা চাইলে , দেবতাদের কথা শুনতেই হবে । তাই তাকে নিয়ে ভাবছ কেন ?

 

                                                      ৪

ভোরের দিকে ঘুম এসেছিল । ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে , পুলোমা  চলে গেল । পুলোমার  মুখে ভৃগু , অগ্নিদেবের  গল্প শুনে , বরাহবাহনের মন খারাপ হয়ে গিয়েছে । মেয়েটার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল ।  আগের রাতে অগ্নিদেবের বর্বরতার কথা শুনতে –শুনতে  বরাহের নতুন কিছু মনে হয়নি , দেবতারা এমনই হয় ; নারী তাদের কাছে সম্পদ , বস্তু , আর অন্যান্য বস্তুর মতনই এর প্রতিও তাদের বিন্দু মাত্র সহানুভূতি  থাকবার কথা নয় ।

এত কিছু শুনেও বরাহের মনে হচ্ছিল , পুলোমা নিজের কর্তব্য করতে চায় । সে ছয় মাসের গর্ভবতী , আপাতত  নিজের সন্তানের জন্ম দান , এই সন্তান যদি মেয়ে হয় , তাহলেও কোনরকম ভাবেই যেন দেবতাদের হাতে বন্দী না হয়ে  যায় !

ঘরে খড়ের   আর শুকনো পাতার নরম বিছানার উপর দুটো হাতের তালুর উপর মাথা পেতে শুয়ে আছে , বরাহবাহন ; চোখ  সামনের দেওয়ালে । বাইরে ভোর থেকে সকাল হয়েছে । পাখিদের ডাক আগের থেকে ঘন হয়েছে । জানালা থেকে হাল্কা –হাল্কা হাওয়া আসছে । সেই হাওয়ায়  মাথার চুল উড়ছে ।

বরাহবাহন  ভাবছিল , অগ্নিদেবের এই বর্বরতার প্রতিশোধ নিতেই হবে । দেবতারা পশুর মাংস খেলেও শুয়োরের  মাংসের  স্বাদ এখনো পায়নি । পুলোমাকে শেষ রাতে , সে একটা প্রস্তাব দিয়েছে । প্রস্তাবে প্রথমে রাজি হতে চায়নি , কেননা সে  মেনে নিতে পারবেনা যদি নিজের সন্তানের  রক্ষার জন্য , রাক্ষস জাতির উপর দেবতাদের অভিশাপের অত্যাচার , বর্বরতা , হিংস্রতা , নিষ্ঠুরতা নেমে আসে । শেষে বরাহ কথা দেয় , সে নিজে অগ্নি দেবের সাথে গিয়ে কথা বলবে । জানাবে , সে পুলোমাকে কয়েকদিনের জন্য নিজের কাছে রাখবে , তাকে ভালোলাগে বলে । পুলোমা তার প্রাক্তন প্রেমিকা । শুধু তাই নয় পুলোমাকে  নিজের কাছে রাখবার জন্য রাক্ষস জাতি দেবতাদের  দ্বিগুণ শুল্ক দেবে , যজ্ঞের সামগ্রীর  সাথে বিশেষ এক  ধরণের পশুর মাংস । শুয়োরের  মাংসের চল এখনো দেবতাদের মধ্যে প্রচলিত হয়নি ।  লোভী অগ্নি  নিজের স্বার্থেই  এই চুক্তিতে  সম্মতি দেবে ।

 

ভৃগুকে অবশ্য অগ্নি নিজের মতন করে বুঝিয়ে দেবে । বরাহবাহন , পুলোমাকে হরণ করেছে , নিজের প্রেমিকা হিসেবে , তেমন গল্প শুনিয়ে দিলেই হবে । এমনিতেই দেবতারা নিজেদের ইচ্ছা মতন রাক্ষস জাতির সম্পর্কে অনেক কথা প্রচার করেছে , আরও করবে ।  মেয়েটার সন্তান বাঁচবে । যে ভাবেই হোক পুলোমার  সন্তান পৃথিবীর আলো দেখা না পর্যন্ত , তাকে বরাহ নিজের দায়িত্বে , নিজের কাছে রাখবে । মেয়ে হলে নিজের পরিচয়ে বড় করবে ।  কোন ভাবেই দেবতাদের যৌন ভৃত্যা  হতে দেবে না ।

 

 বরাহবাহনের মাথায় , কিছুটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলল , সে ভাবল তার কাছে  বেশ কিছু অসুস্থ , রোগগ্রস্থ   শুয়োর  রয়েছে । দেবতারা লোভী আর বোকা । অগ্নিকে সেই পশু চালান করে দেওয়া  যায় । অসুস্থ পশুর মাংস খেয়ে , সে পেটের রোগ বাঁধালে  , ভৃগুর কাছে যাবে  চিকিৎসার সহায়তার জন্য । তখন অগ্নিকে নিজের কুকীর্তির কথা  ,নিজের মুখেই জানাতে হবে!

 

 

 

বরাহবাহন হাসছিল । এর জন্যই , দেবতারা  মনে করে , রাক্ষস জাতি খুব কপট । তারা যুদ্ধে ছলনার আশ্রয় নেয় । সে নিজেও মনে করে ,  বুদ্ধিও আসলে শক্তি । দেবতাদের ভণ্ডামির জবাব তাদের সাথে ভণ্ড হয়েই দিতে হবে । পুলোমার গর্ভস্থ সন্তানকে রক্ষা করবার  জন্য   যুদ্ধ  ঠেকাতে এই রকম ছলনা ছাড়া  ,  আর অন্য বিকল্প পথ নেই । 

বরাহবাহন জানে , দেবতাদের থেকে ফরমায়েশি সাহিত্যে রাক্ষস জাতির নেতার এই বীরত্ব , কাপুরুষতার ইতিহাস হয়ে লিপিবদ্ধ থাকবে । আর্যাবর্তের পাঠক আসল সত্যের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারবেনা ! তারা কখনই পুলোমার  দুঃখের উৎস  খুঁজে পাবেনা ! সে সত্য  লুকিয়েছে, মিথ্যা কাহিনীর  চতুর পরিবেশনায় ।