Samokal Potrika

ডা:সুজাউল্লাহ্ ডাক্তারখানায় ঢুকে চেয়ারে বসলেন আয়েস করে। আর্দালী যে কোথায়! হাঁক দিলেন , " দশরথ।" দশরথ কাছেই কোথাও ছিল। ছুটে এলো। " পাখাটা চালাও।" বৃটিশ আমলের জুটমিলের ডাক্তারখানা। কাঠের চার ব্লেডের মস্ত পাখা মাথার উপর। আর একটা বড় সাদা বাতির ডুম ঝুলছে উপর থেকে।
" কোনো কাগজ এসেছে?"
" না ডাক্তারবাবু। তবে ঐ চিট্টিখানি আইথিলা।" বলে টেবিলের উপরে একটা পোস্টকার্ড দেখায় ঊড়ে দশরথ।
ডাক্তার পোস্টকার্ডটি তূলে নেন । দেখেন, হলদিবাড়ি থেকে আগত। মনে মনে হিসেব করলেন। কার হতে পারে! যাই হোক পড়তে শুরু করলেন। সম্বোধন 'বেয়ান' । বুঝলেন এ তাঁর শাশুড়ির উদ্দেশ্যে। খুব ছোটোছোটো অক্ষরে ভরা পোস্টকার্ড। একাউকে না কাউকে পড়ে শোনানোর দায় পড়বে। হয়তো তাঁর ওপরেই বর্তাবে। তাঁর শাশুড়িমাতার নিজস্ব তেমন কোনো বাসস্থান না থাকায় তিনি বেশিরভাগ তাঁর বাড়িতেই অবস্থান করেন আর ছড়ি ঘোরান। তাঁর প্রতাপে সুজাউল্লার মা আর বোন এ বাড়িতে বড় একটা পা রাখেন না। এটা সুজা চুপচাপ কেন মেনে নিয়েছেন তা কারো জানা নেই। আসলে তিনি প্রথম ঘোরতর প্রেমের স্ত্রীকে হারানো ইস্তক কারো সাথে তেমন কথা বলেন না।
ডা: সুজা চিঠি পড়তে লাগলেন,
পাকজনাবেষু বেয়ান,
আস্সালামুআলায়কুম। পরসমাচার এই যে আশা করিতেছি আল্লার রহমতে আপনারা কুশলেই আছেন। ডাক্তার জামাতাগৃহে পরম কুশলেই আছেন আশা করা যায়। এতোই কি তাড়াহুড়া করিবার দরকার ছিল? আমার পুত্রের জীবনদীপ নিভিয়া যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে পারিলেন না? মা আসমার বিবাহে আমরা কোনোই বাধা হইতাম না। আমার হতভাগ্য পুত্রটি শেষ সময়ে একটু দেখিতে চাহিয়াছিল। আপনার জানিয়া স্বস্তি হইবে যে সে আর নাই। ভালো হইয়াছে মা আসমাকে যোগ্য পাত্রের হাতে তুলিয়া দিয়াছেন। সুখী হউক সে। দোয়া করি অন্তর হইতে সে এবং জামাতা সুখী হউক। তবে একবার জানাইলে আমরা এবং মৃত্যুর পূর্বে আমার পুত্রটি সুখ পাইত। একটিবার দেখার আকাঙ্খা লইয়া সে মরিয়াছে।
আর বিশেষ কি লিখিব। ইতি
হতভাগ্য বেয়াই মহিউদ্দিন।

সুজাউল্লা পাথর হয়ে রইলেন।
ঘরে আসমা সন্তানসম্ভবা। সাতমাসের গর্ভবতী। কচিবয়সের অন্তঃসত্বা।অত্যন্ত রুগ্ন।

আসমার মনে তার আগের বিয়ের স্মৃতি জ্বল জ্বল করে এখনো। এইতো সেদিন। তার সেই সুন্দর ফর্সা ডাগর চোখের মানুষটা। সর্বক্ষণ তাকে চোখে চোখে রাখতো। শ্বশুর বাড়িতে তার অবাধ গতি । ছোট্ট ছোট্ট পায়ে উঠোনে ঘুরে বেড়ানো ডুরে শাড়ি আর নাকে ছোট্ট নোলক দুলিয়ে। রকিব তার সব আব্দার মানতো। উঠোনের পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা পেরে দাও, আখ খেতের ধারে দাড়িয়ে হুকুম আখ কেটে দাও, পুকুর পারে দাঁড়িয়ে হুকুম পদ্ম তুলে এনে দাও।সতের বছরের কিশোরটি যেন তার রাণীগিরিতে বড় সুখ পেতো। কিন্তু যেদিন রকিবের জ্বরের মধ্যে কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত উঠলো, দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আসমা দেখল , ডাক্তার এলেন। পরীক্ষা করে বললেন টিবি। রাজরোগ। আসমা বুঝলোনা কিছু। শুধু তাকিয়ে থাকলো। রকিব জ্বরের মধ্যেও ওকে বলল ," আসমা, তুই ওখানেই থাক ।ভিতরে আসিস না।" আসমার চোখ ফেটে পানি এলো। অভিমানে ঠোঁট ফুললো। সরে গেলো সেখান থেকে। কে ওর এতো খেয়াল সামলাবে? তার বেশ কিছুদিন পরে তার মা খবর পেয়ে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। যাবার আগে ছলছল চোখে রকিবের দরজার সামনে দাঁড়ালো একবার । দেখলো রকিব দেয়ালের দিকে মুখ করে আছে। তার মা তাকে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দিলোনা।
সেই চলে আসার পর থেকে সে যেন এক নিষ্প্রাণ পাথর হয়ে গেছে । তারদুবছর বাদে মামারা ঘটকালি করে এই ডাক্তারের সাথে বিয়ে দিল। সুজাউল্লার বাবা বেঁচে ছিলেন।
আসমার মা ডাক্তার দোজবর , একটু বয়স্ক জেনেও বিয়ে দিলেন সাততাড়াতাড়ি। ভয় ছিল মনে।
ডা:সুজাউল্লা আবার একটু সামলে চলা মানুষ। তের বছরের বালিকা কাঁচা বয়সের বউ। একবছর বাদে সহবাস হ'ল। আসমা এখন সাতমাসের পোয়াতি। এতোকিছু হ'ল এক নীরব জীবন্ত পুতুলের সাথে যেন। হলদিবাড়ি থেকে আসা ইস্তক তার চুপকথা আর সরলো না। দিন দিন এক দীঘল কাঠের দৃঢ় খুঁটি হয়ে উঠলো যেন। লম্বাটে সুন্দর মুখখানিতে চোখদুটো যেন বর্ষার দুই দিঘি। ঐটুকুই তার নরম জায়গা। বাকিটা জেদের নীরব প্রতিমূর্তি।
ডা: সুজা ঘরে ঢুকে ড্রয়ারে পোস্টকার্ডটি একটি ডায়েরীর ভিতরে গুঁজে রাখলেন। জানতেন এই চিঠি শাশুড়ির হাতে পড়লে কী সর্বনাশ ঘটতে পারে।

সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় দশবছর আগের কথা। গঙ্গার দুই তীরে সাহেবদের জুটমিলগুলো রমরমিয়ে চলছে। ডা: সুজা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা এল.এম .এফ ডাক্তার। এইসব ডাক্তার তখন সবকিছুই করতেন। স্পেশালাইজেশন ছিলনা এল এম এফ ডাক্তারিতে। ডাক্তার হিসেবে ভালই সুনাম ছিল ঐ জুটমিল অঞ্চলে। মিলের শ্রমিক ছাড়াও আশেপাশের গরীব মানুষদেরও চিকিৎসা করতেন। বেশিরভাগ বিহারী পশ্চিমা লোকজন। ওরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতো," আরে , ই ডাগ্দারবাবু অগর হাথ ধোকর পানি দে দি না, ওকরাকে পি কর সব বিমার ভাগ যা তা নি।"(এই ডাক্তার যদি হাত ধুয়ে জল দেয় তো তাই খেয়ে অসুখ সেরে যায়।) এ হ'ল চিরকালীন ইমেজের কথা। আসলে সুজা বিখ্যাত ছিলেন তাঁর দরদের জন্য।
মিলটা ঘেরা ছিল একটা পাঁচিল দিয়ে তিনদিকে। একদিকে গঙ্গার পাড়। মিলের ভেতর ছিল ধোপাখানা, আর্দালীদের থাকার কোয়ার্টার আর ডাক্তার আর করণীকদের কোয়ার্টার। সাহেবদের থাকার জন্য প্রাসাদোপম কুঠি।

আসমা খুব একটা বেরোতো না। এখানে আসার পর সে একটু পড়তে মন দিয়েছিল।সেদিন সে বেরোল শালুকে সঙ্গে নিয়ে। সাদা লেসের কাজকরা শেমিজের উপর শাড়ি পরলো। তার উপর পরলো বোরখা। সাদা বোরখার মাথার উপরটা একটা গোলটুপির মত। সেখান থেকে পা পর্যন্ত কুঁচি নেমেছে । চোখের কাছে ঠিক চোখের আকারে কাটা আর সুন্দর নক্শা করে সাজানো। মুখ দেখতে না পারো নকশা তো দেখ!
বিয়ের আগে বাড়িতে থাকতেই তার নমাজ আর কোরান পড়ার তালিম হয়েছিল। বাংলা পড়তে শিখিয়েছিল রকিব। মনে পড়ে তার সেই দিনগুলো। সন্ধে নামলেই তার চোখেও তখন ঝুপ করে ঘুমবুড়ি এসে বসতো। কিন্তু ফি মঙ্গলবারে তার অন্যরকম। সে শাশুড়ির কাছে অন্ধকার উঠোনে ধান জাল দেয়ার সময় কোলের কাছে বসে থাকতে থাকতে ঢুলতো। তবু রকিব আর মহিউদ্দিনের হাট থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতো। রুকু তার জন্য হয় কাঁচের চুড়ি নয়তো নিদেনপক্ষে জিলিপি নিয়ে আসতো।গাঁয়ের নির্জনতা ভেঙে যখন হাটফেরতা মানুষগুলোর পায়ের আওয়াজ আর কুকুরের ভুকভুক উঠতো , আসমার ঘুমের চটকা ভেঙ্গে যেত। চোখ কচলে দেখতো রকিব হাসিমুখে চুড়ি নইলে ফিতে নাহক একঠোঙা জিলিপি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার খুশি ঝলমল চোখ দুটো দেখার জন্য।

গঙ্গার ঘাটে বসে ওপাড়ের আলোর বিন্দুগুলির জলে দোলায়মান প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে রকিবের সজল চোখের চাউনি যেন ফুটে উঠলো মনের পর্দায়।
আজ নিজেকে এতো নিঃস্ব কেন মনে হয় তার কে জানে। এই শহরে তার কোনো অভাব নেই। তাও সেই গাঁয়ের আঁধার উঠোনে স্বল্প আলোয় ফুটে ওঠা আনন্দমূর্তিটি তার বুকে এমন গেঁথে গেছে যে তার বেদনা তাকে দিনকে দিন নীল করে ফুরিয়ে দিচ্ছে।
সে নানান গল্পে আরো কোনো আসমাকে খুঁজে ফেরে। শালুর ডাকে গঙ্গার দিক থেকে তার চোখ ফিরলো, ঘোর কাটলো। ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে এলো।

পরদিন সকালে ডা:সুজা বেরোনোর আগে হাঁকলেন, " ফুলচান, ফুলচান!" ফুলচান রান্নাঘরে কাজ করছিল। ছুটে এলো। " জী বাবু।" "আমার কলার বের করে দে। জুতো পালিশ করেছিস?"
ফুলচান তড়িৎগতিতে ঘর থেকে একটা চামড়ার পেটি আনে যার মধ্যে আলাদাকরে ধুয়ে আসা কলার গোছানো থাকে। একটা তুলে নিয়ে শার্টের গলায় বোতামের সাথে আটকে দেয়। পালিশকরা বুটজুতো পায়ের কাছে গুছিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে ছোটে। ব্রেকফাস্ট হাজির করে টেবিলে। মেটের স্যাণ্ডউইচ লেটুসে সাজানো। ন্যাপকিন কাঁটাচামচ সব ফিটফাট। নাস্তা খেয়ে ডাক্তার চলে যান নীচে ডাক্তারখানায়।

দুপুরে খেতে আসেন রোজ । খেয়ে আবার নিজের কাজে বেরিয়ে যান। সেদিনও বেরিয়ে গেছেন।

আসমা শরীরটা ভালো লাগছিলনা। শুয়েই ছিল। বিছানায় একটা পাথরচাপা বেরং ঘাসজমি যেন বিছিয়ে আছ।
আসমার মা ঘর গোছাতে এসে কি যেন খোঁজে রোজ। আসলে তাঁর নিজের উচ্ছন্নে যাওয়া জীবনটার জন্য বড় সুরক্ষার অভাব তাঁকে তাড়না করে। কারো উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন না। সারাজীবন শুধু এই লড়াইএই কেটে গেল ভবঘুরে স্বামীর দৌলতে।
আজ এক জামাই পেয়েছেন যে সবকিছু যেন ভবিতব্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। এখন এমন মানুষকে তাঁর বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সেদিন তাঁর চোখে পড়ে গিয়েছিল সুজা কিছু একটা গুঁজে রাখছেন ডায়রীতে। সন্তর্পনে ড্রয়ারটা খুললেন। একবার আসমার দিকে ঘুরে দেখলেন। আসমা তো কোনোসময়েই ইহজগতে থাকে না। অথচ কিছু বলেও না। বরং কি এক বিজাতীয় বিতৃষ্ণা নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলে যেকটা বলে।
তিনি জানার চেষ্টাও করেন না। তিনি সদা তৎপর নিজের জগৎটাকে সুরক্ষিত রাখায়।
ড্রয়ার খুলে ডায়েরী। ডায়রীর মাথার দিকে বেরিয়ে আছে একটা পোস্টকার্ড না? টেনে বের করেন। দেখেন এক চিঠি। ভরা অক্ষরে। সন্দেহে চোখ কুঁচকে উঠলো। আবার জামাই এর মা বোন নিশ্চই টাকাপয়সা চেয়েছে। পোস্টকার্ডটা এখন পড়ার মতো আছে একমাত্র আসমা।
" অই আসমা, উঠ। উঠি বইস তো। দেখেক তো এখান কার চিটি! উঠ!উটেক কেনে।" আসমা এলিয়ে পড়ে ছিল। অতি কষ্টে উঠে বসলো। " কি হইচে? চিল্লান কেনে? কি হইলেক?"
তার হাতে চিঠিটি দিয়ে ওর মা ওকে সটান বলেন," পড়েক কেনে। পড়ি শুনাও। কি ন্যাকা আচে এইখানোত।"
আসমা পোস্টকার্ডটা হাতে নিয়ে দেখে। কিছু না ভেবেই মায়ের দাবী পুরণ করতে বসে।
" পাকজনাবেষু বেয়ান,
পর সমাচার এই যে ..........কিছুদূর পড়ার পর এ কী.........এ কী লেখা.........মা মা মাআআআআআআআআআ.........আসমার আর ক্ষমতা নেই।লুটিয়ে পড়লো। বিছানা ভেসে গেল ........গর্ভভাঙ্গা জলে। আসমার মা চিৎকার করে উঠলো " ফুলচাআআআআন"
নীচতলা থেকে ডা: সুজা ছুটে আসেন। ঘরে ঢুকে প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান।দেখেন আসমার হাতে ধরা পোস্টকার্ড। নিমেষে বুঝে যান শাশুড়ির কীর্তি।
কিন্তু বসে যান পরীক্ষা করতে। ফুলচানকে বলেন " গরম জল।" নিজের ডাক্তারি ব্যাগটা বের করেন। বের হয় গ্লাভস, ফরসেপ ডেলিভারির সরঞ্জাম।
যখন সব কাজ শেষ হ'ল তখন সুজার হাতে এক কন্যাসন্তান । তার ডানপায়ের পুরো পাতাটা কাটা। হাতও পায়ের আঙুলগুলো ছিন্নভিন্ন । গর্ভের সব জল পড়ে গিয়ে সূক্ষ্ম নার্ভের চাপের ধারে তার শিশুর ঐ অবস্থা। অসহায় পিতা তাকিয়ে থাকেন শিশুটির দিকে। মন অভিজ্ঞতা সব অসাড় হয়ে গেছে। বোধও কাজ করছেনা। ভাবলেন শিশুটি মৃত। ঠিক সেই সময় হাজির হলেন সুজার বাবা যিনি নিজেও ডাক্তার। শিশুকে কোলে নিয়ে বললেন" কোথায় যাচ্ছিলে? বাচ্চাতো বেঁচে আছে। যত্ন কর। এ তোমার মুখ উজ্জ্বল করবে একদিন।"

তারপর .......... অন্য কিছু।