Samokal Potrika

পলাশবাবু সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত মানুষ। স্ত্রী পূর্বাশা আর মেয়ে রিশিতাকে নিয়ে  সুখের সংসার। পলাশ পেশায় মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার। রিশিতা ক্লাস নাইনে পড়ে। বেশ সুখেই দিন কাটছিল। একদিন হঠাৎ তাদের বাড়ীর বাগানে একটি ছোট্ট ধুসর রঙের বেড়ালছানা খুব করুণভাবে ডাকতে থাকে। বেড়ালটিকে দেখে রিশিতার খুব মায়া হল। বৃষ্টিতে ভিজে বেড়ালটা কাঁপছিল। সে বেড়ালছানাটিকে কোলে করে বাড়ীর মধ্যে নিয়ে এল, ভালো করে তার গা পুঁছিয়ে দিয়ে তার ঘরে নিয়ে গেল।  

মা, একটু দুধ গরম করে দেবে?

কেন, কে খাবে?

আরে দেখো না আমাদের বাড়ীতে একটা ছোট্ট নতুন অতিথি এসেছে, এসে দেখে যাও।

ওমা, এই ছোট্ট বেড়াল ছানাটা কোথায় পেলি?

আরে দেখো না এই বৃষ্টির মধ্যে বাগানে বেচারা মিউ মিউ করে ডাকছিল, তাই ওকে ঘরে নিয়ে এলাম। কি মিষ্টি না?

হুম, খুব মিষ্টি। ভালই হল ওর সাথে খেলা করবি। আমি একটু দুধ গরম করে দিচ্ছি, ওকে খাইয়ে দে, বেচারা কাঁপছে।

হুম, তাই দাও।

এরপর বেড়ালছানাকে কোলে নিয়ে দুধ খাইয়ে রিশিতা খুব আদর করতে লাগলো। ওর একটা নামও ঠিক করে ফেললো- ‘গুলগুলি’

সে সারাদিন বাড়ীতে ছুটে বেড়ায়, রিশিতার সাথে খেলা করে, কোলে বসে আদর খায়। পূর্বাশাও গুলগুলিকে খুব ভালবাসে, সময় মত খেতে দেয়, গুলগুলিও পূর্বাশার পায়ে পায়ে ঘোরে।

এভাবে বেশ ভালই কাটছিল। গুলগুলিও বেশ বড় হয়ে গেছে। রিশিতা আর পূর্বাশার সাথে তার খুব ভাব। সারাদিন ওদের পায়ে পায়ে ঘোরে, এক মুহূর্তও ওদের ছেড়ে থাকতে পারে না। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস তারা লক্ষ্য করলো যে  গুলগুলি পলাশবাবুকে খুব একটা পছন্দ করে না। পলাশবাবু গুলগুলিকে আদর করে  কাছে ডাকলেও সে যায় না, পলাশবাবুর দিকে যখন সে তাকাতো তার চোখ  দুটো জ্বলজ্বল করে উঠত, কি রকম যেন একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ চাহনি। পলাশবাবু তাকে কোলে নিতে গেলেই আঁচড়ে দেয়, ঘরে সে যখন চলাফেরা করে   গুলগুলি তার পায়ের সামনে এমন ভাবে এসে পড়ে যে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়।    অফিসের দরকারি দু একটা কাগজপত্রও সে আঁচড়ে নষ্ট করে দিয়েছে। তাই পলাশবাবুর গুলগুলির ওপর খুব রাগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কিছু বলতে পারতো না কারণ গুলগুলি পূর্বাশা আর রিশিতার খুব ভালো বন্ধু ছিল। একটা সাধারণ বেড়াল যেরকম মাছ খেতে ভালবাসে, গুলগুলিও মাছ খেতে ভালবাসে। তবে মাছ  ছাড়াও গুলগুলির কিছু পছন্দের খাবার হল সন্দেশ, রসমালাই, সিঙ্গারার  ভাজা অংশটা, পরোটা, চানাচুর ইত্যাদি। আরও একটা অদ্ভুত স্বভাব হল- রিশিতা বা  পূর্বাশা যখন টিভি দেখে, গুলগুলিও তাদের পাশে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে।    

এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। অনেক রাত অব্দি রিশিতা পড়াশোনা করে আর   গুলগুলি রিশিতার পাশেই চুপটি করে বসে থাকে।রিশিতা মাঝে মধ্যে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পলাশবাবুর অভ্যাস হল রোজ রাতে শোবার পর কিছুক্ষণ বন্ধুদের সাথে চ্যাট সেরে ঘুমোতে যায়। এই নিয়ে পূর্বাশার অবশ্য তেমন কোনও অভিযোগ নেই। পলাশবাবুর ফেসবুকে অনেক বান্ধবী আছে। তাদের মধ্যে কেউ  কেউ আবার ‘বিশেষ বান্ধবী’। মাঝে মধ্যে তাদের সাথে দেখা করে, কিছুক্ষণ সময়ও কাটায়, ছোটখাটো উপহারও দেয় । ডিউটি আছে বলে কখনও রাতও কাটিয়ে আসে। তবে পূর্বাশার কাছে সে ছিল খুব সজ্জন স্বামী। পূর্বাশা এই সব কথা ঘুনাক্ষরেও জানতে পারে নি। একদিন ফেসবুক খুলেই একজন সুন্দরী বান্ধবীর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেখতে পেল পলাশ। ২৮-৩২ এর মধ্যে বয়স, বেশ সুন্দরী, জয়িতা সেন। জয়িতার সাথে বন্ধুত্ব হতে বেশী সময় লাগলো না। নিয়মিত চ্যাট চলতে লাগলো। ধীরে ধীরে সেও ‘বিশেষ বান্ধবী’ হয়ে উঠল। নিয়মিত মোবাইলেও কথা হয় তাদের। একদিন জয়িতার সাথে দেখা করবে ঠিক করলো।  

কাল তাহলে ৬ টায় ঢাকুরিয়া লেকে এসো।

ঠিক আছে, কোন ড্রেসে আমাকে প্রথম দিন দেখতে চাও?

ওই মারুন শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল, ওটা পরেই এসো।

ওকে ডিয়ার, কাল তাহলে ৬ টায় ডান, মুয়া।

ফেসবুক চ্যাট সেরে এবার শোবার পালা।

কি ব্যপার আজ বেশ মুডে দেখছি।

হুম, ডার্লিং, আজ মুডটা খুব ভালো আছে। চলো আজ এক দান লুডো  খেলি।

যাহ্‌, অসভ্য। মেয়ে এখনও জেগে আছে কিন্তু।

দূর, ও তো ওর ঘরে পড়াশুনো করছে, একটু পরেই শুয়ে পড়বে। তাই আমরাও এবার...

অসভ্য একটা... আহ ছাড়ো...

সকালে উঠতে একটু দেরী হয়ে গেছে। তাই কোনরকমে ব্রেকফাস্ট সেরেই অফিসের জন্য তাড়াহুড়ো।

এই শোন আজ আমার ফিরতে একটু রাত হবে, একটা জরুরী মিটিং আছে।

আচ্ছা ঠিক আছে, সাবধানে যেও।

অফিসের কাজ সেরে ঠিক সময়েই পলাশ ঢাকুরিয়া লেকে জয়িতার সাথে দেখা করলো। ঘণ্টা দুয়েক তারা একান্তে সময় কাটালো। বেশ কয়েকবার চুম্বন ও আলিঙ্গনও হল।

তাহলে আবার কবে দেখা হবে ডিয়ার?

তুমি যেদিন বলবে সেদিনই হবে সোনা।

ঠিক আছে, আজ এবার উঠতে হবে। তোমার জন্য ছোট্ট দুটো উপহার এনেছি, নাও।

কি আছে গো এর মধ্যে?

খুলেই দেখো।

ওয়াও, লিপস্টিক আর ফ্রেঞ্চ পারফিউম… কি মিষ্টি গন্ধ গো। লিপস্টিকের কালারটাও খুব সুন্দর। এই নাও আর একটা মিষ্টি চুমু…

থ্যাঙ্কস সোনা। চলো তোমাকে অটোতে তুলে দিয়ে আমি বাসে উঠবো।  

ঠিক আছে চলো।

জয়িতাকে অটোতে তুলে দিয়ে পলাশ বাস ধরল।

মা, গুলগুলি কোথায় গেল বল তো? সেই ৬ টা থেকে ওকে দেখতে পাচ্ছি না।

সত্যি তো, ও তো কখনও এতক্ষন বাইরে থাকে না… ওই তো গুলগুলি সোনা আসছে।

গুলগুলিকে এতক্ষণ পর দেখেই রিশিতা কোলে তুলে নিল, গুলগুলিও কোলে উঠে খুব আদর খেতে লাগলো। পলাশের ফিরতে ১০ টা বেজে গেছে। মুখ হাত ধুয়ে বসার ঘরে সোফার ওপর বসে টিভির রিমোটটা হাতে নিয়ে পলাশ চমকে উঠল। ‘আরে টেবিলের ওপর ওই লিপস্টিক আর ফ্রেঞ্চ পারফিউমটা কি করে এল। এই দুটো তো আজ আমি জয়িতাকে দিয়েছিলাম’- নিজের মনে মনেই বলতে লাগলো।  পূর্বাশা চা নিয়ে ঘরে ঢুকেই ওই লিপস্টিক আর পারফিউম দেখে একটু অবাক হয়ে গেল।

বাবা, কি ব্যাপার গো, হঠাৎ বউয়ের জন্য গিফট?

না মানে…( পলাশ মনে মনে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছিল না)

কতদিন পর তুমি আমার জন্য গিফট আনলে। লিপস্টিকের কালারটাও বেশ   সুন্দর তো। আহহ, পারফিউমের গন্ধটা কি মিষ্টি গন্ধ গো। আমি খুব খুশী হয়েছি আজ।

(নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে) ভাবলাম আজ তোমাকে একটু সারপ্রাইজ দেবো, তাই।

বাহ, এই তো আমার বরটা আবার আগের মতই রোম্যান্টিক হয়ে গেছে। এই কখন ডিনার করবে?

আর দশ মিনিট পর খেয়ে নেব।

রাতে শুয়ে শুয়ে পলাশ এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে লাগলো। হঠাৎ একটা গান তার কানে ভেসে এল। কে যেন গুনগুন করে গান গাইছে। কিন্তু এখন তো প্রায় একটা বাজে। মেয়েও ঘুমিয়ে পড়েছে। তাহলে এত রাতে কে গান গাইছে? হয়তো কেউ আশেপাশের বাড়ীতে গান শুনছে। এই সব ভাবতে ভাবতে পলাশ ঘুমিয়ে পড়লো। পরের দিন সকালে উঠে ব্রেক ফাস্ট টেবিলে বসে চা খেতে খেতে পলাশ পূর্বাশাকে সেই গানের কথা বলল। রিশিতাও পাশে বসে ছিল, কিন্তু তারা কেউ কিছু শোনে নি।

আরে এখন ছেলেমেয়েরা অনেক রাত অব্দি জেগে থাকে ফেসবুক করে, গান শোনে। হয়তো কেউ FM শুনছিল, পূর্বাশা বলল।

হ্যাঁ তাই হবে।

হঠাৎ পলাশ লক্ষ্য করলো গুলগুলি তার দিকে চেয়ে আছে আর মুচকি হাসছে তার দিকে চেয়ে।

এই দেখো গুলগুলি আমার দিকে তাকিয়ে কেমন মুচকি হাসছে।

হা হা হা… মা, বাবার কথা শোনো। গুলগুলি নাকি বাবার দিকে চেয়ে  মুচকি হাসছে।

হা হা, তোর বাবার এবার একটা চশমা লাগবে।

সবাই মিলে হেসে উঠল। পলাশও ভাবল সত্যি তার এবার একটা চশমা লাগবে।  বেড়াল আবার হাসতে পারে নাকি, সে নিজের মনে মনেই বলল আর হাসতে লাগলো।

এক রোববার পূর্বাশা মেয়েকে নিয়ে একটু বাপের বাড়ী যাবে ঠিক করলো।

এই শোনো, বাবার শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে, তাই ভাবছি মেয়েকে নিয়ে একটু বাবাকে দেখে আসি। ফ্রিজে সব রান্না করা থাকবে, তুমি একটু নিয়ে খেয়ে নিও। আর গুলগুলিকে খেতে দিতে ভুলো না কিন্তু। ওর মাছ, দুধ সব রাখা আছে, একটু ভাত দিয়ে মেখে দিয়ে দিও। আমরা কাল বিকেলে ফিরে আসবো।

হ্যাঁ হ্যাঁ, চিন্তা করো না। একটা দিনের তো ব্যাপার। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। তোমরা সাবধানে যেও আর পৌঁছে আমাকে একটা ফোন করে দিও।

দুপুরে জম্পেস লাঞ্চ করে একটা দিবা নিদ্রা দিয়ে নিল পলাশ। একা একা আর কি করবে একটু ফেসবুকে চ্যাট সেরে নিল। এদিকে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাইরেও বৃষ্টি নেমেছে, এক কাপ চা হলে বেশ ভালই হয়। দেখতে দেখতে সাতটা বেজে গেল। চায়ের কাপ নিয়ে পলাশ টিভিটা চালিয়ে দিল। একটা চ্যানেলে ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ হচ্ছিল, সেটাই দেখতে বসে গেল। ঘণ্টা খানেক পর হঠাৎ কারেন্ট অফ হয়ে গেল। পলাশ জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল সবার বাড়ীতেই আলো জ্বলছে, তাহলে কি শর্ট সার্কিট হল! কিন্তু বাইরে তো বৃষ্টিও বেশ জোরে নেমেছে।  পুলকদাকে ডাকলেও তো এখন আসতে পারবে না। তাহলে কিছুক্ষণ দেখা যাক, আপন মনে বলতে বলতেই পলাশ মোমবাতিটা খুঁজতে গেল। মোমবাতিটা জ্বালিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় জানলাগুলো দুম দাম করে পড়তে লাগলো।  কিন্তু বাইরে তো এখন ঝড় হচ্ছে না, তাহলে এই দমকা হাওয়া কোথা থেকে এল। মোমবাতিটাও দুম করে নিভে গেল। ঘরটা অন্ধকারে ঢেকে গেল। হঠাৎ তার কানে নুপুরের শব্দ ভেসে এল। মনে হচ্ছে যেন কোনও একজন মহিলা এঘর ওঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রান্না ঘরে থালা বাসন পড়ার শব্দ আসছে। পলাশ হঠাৎ দেখল সোফার ওপরে দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে, চোখের চাহনি বেশ হিংস্র। ঘরের মধ্যে কেমন যেন একটা গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বেলে পলাশ দেখল গুলগুলি সোফার ওপরে বসে আছে আর তার দিকে তাকিয়ে একটা কেমন যেন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে। আবার সেই বেড়ালের হাসি! বেড়াল কি কখনও হাসতে পারে?- এই সব ভাবতে লাগলো। হঠাৎ দেখল গুলগুলির লোমগুলো কেমন খাঁড়া হয়ে গেছে, বীভৎসভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে, আর চোখ দুটো ফসফরাসের মত জ্বলছে। সে কি বীভৎস চাহনি, পলাশ ভয়ে বেড়ালটার দিকে আর তাকাতে পারল না। কেমন যেন একটা ভয় ভয় করছে। তখন গুলগুলিকে সোফা থেকে তাড়ানোর জন্য পলাশ একটা ছোট লাঠি নিয়ে এল। যেই লাঠি দিয়ে গুলগুলিকে মারতে গেল, গুলগুলি এক লাফে তার গায়ের ওপর উঠে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর দুটো থাবা দিয়ে হালকা করে আঁচড়ে দিয়ে একটা চুমু খেল আর হাসতে হাসতে বিছানা থেকে নেমে চলে গেল। অন্ধকারে এই সব অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা দেখে পলাশ সত্যি খুব ভয় পেয়ে গেল। খুব ভয় পেয়ে সে মুখে একটা সিগারেট ধরিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। হাত পা কেমন অসাড় হয়ে এল, মুখ থেকে সিগারেটটাও পরে গেল। ঘরের আলোগুলো আবার জ্বলে উঠল। পলাশ যেন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, রুমাল দিয়ে সেটা মুছে ফেললো। হঠাৎ গুলগুলি কি করছে দেখার জন্য একবার ভেতর ঘরে গিয়ে দেখল গুলগুলি ঘুমিয়ে আছে। এবার নিশ্চিন্তে টিভিটা খুলে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসল। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ও প্রায় শেষের দিকে। দেখতে দেখতে দশটা বেজে গেল, তাই এবার ডিনারটা সেরে নেবে ভাবল।   

হঠাৎ জয়িতার ফোন-

কি করছ ডিয়ার?

এই তো একটু টিভি দেখছি, আজ বউ মেয়ে নেই তাই একা একা ভালো লাগছে না।

তাই, আমি যাব নাকি তোমার কাছে?

হা হা কি যে বল...

আমাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে না?

সে তো করেই সোনা, কিন্তু বিবাহিত পুরুষদের অনেক চাপ...হা হা হা।

একটা short trip এ যাবে নাকি? দিঘা বা মন্দারমনি?

গেলে মন্দ হয় না সোনা। এই শনিবার যাবে নাকি? কিন্তু রোববার বিকেলেই ফিরে আসতে হবে।

ঠিক আছে ডান। মুয়া…

মুয়া সোনা, take care.

জয়িতার সাথে কথা শেষ করে পলাশ ডিনার সেরে নিল। এরপর ফেসবুকে গল্প করতে করতে কখন যে বারোটা বেজে গেছে খেয়ালই নেই। না এবার শুতে হবে।  ফেসবুক অফ করে পলাশ ঘুমিয়ে পড়লো। আবার সেই নুপুরের শব্দে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। কে যেন নুপুর পায়ে সারা বাড়ী হেঁটে বেড়াচ্ছে। আর মনে হচ্ছে কেউ যেন একটা গানও গাইছে। হ্যাঁ, সেদিন রাতে এই গানটাই তো পলাশ শুনতে পেয়েছিল। খুব ভালো করে গানটা শোনার চেষ্টা করলো পলাশ। আজ পরিস্কার গানটা শোনা যাচ্ছে- ‘আমারও পরান যাহা চায়…’। গলাটাও বেশ চেনা চেনা  লাগছে, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না গানটা সে কোথায় শুনেছে। মোবাইলে দেখল তখন রাত দুটো চল্লিশ। না এবার ঘুমোতেই হবে, কাল সকালে আবার অফিস যেতে হবে। হঠাৎ দেখল গুলগুলি তার পাশে শুয়ে আছে আর নিস্পলক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে আর মাঝে মাঝে তার গায়ে মাথাটা ঘষছে। পলাশও হাল্কা করে তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলো গুলগুলির গা থেকে ওই ফরাসী পারফিউমের গন্ধ বেরোচ্ছে। পলাশ মনে মনে ভাবল আজ পূর্বাশা হয়তো ওই পারফিউমটা মেখে বেরিয়েছে তখন হয়ত গুলগুলির গায়ে একটু লেগে গেছে। গুলগুলি অনেকক্ষণ পলাশের বুকের ওপর শুয়ে রইল। পলাশও কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পরেই পলাশ ঘুমিয়ে পড়লো।  তাহলে কি পলাশ আর গুলগুলির বন্ধুত্ব হয়ে গেল?

এদিকে পূর্বাশা আর রিশিতাও ফিরে এসেছে। পলাশেরও অফিসের চাপ একটু বেড়েছে। তাই এখন ১১ টার মধ্যেই কদিন শুয়ে পড়তে হচ্ছে। একদিন রাতে শোবার পর পূর্বাশা হঠাৎ পলাশের বুকে ওই আঁচড়ের দাগ গুলো লক্ষ্য করলো।

এই, তোমার বুকে আঁচড়গুলো কি করে হল?

আর বোলো না, রোববার যেদিন তুমি বাবাকে দেখতে গিয়েছিলে সেদিন কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে- সারা বাড়ীতে কে যেন নুপুর পরে হেঁটে  বেড়াচ্ছিল। আমি বিছানায় বসে ছিলাম। গুলগুলি কিরকম রেগে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, আমি  বিছানায় শুয়ে পড়তেই আমার বুকের ওপর উঠে আমাকে আঁচড়াতে লাগলো।

বাবা কি সাংঘাতিক! কি সব বলছো গো। হঠাৎ তোমাকে আঁচড়াল কেন?  তোমার লাগে নি?

একটু লেগেছিল, কিন্তু আঁচড়টা ঠিক বেড়ালের আঁচড়ের মত নয়। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরলে তুমি মাঝে মাঝে যেভাবে আঁচড়ে দাও অনেকটা সেই রকম, হা হা হা…

যাহ্‌, কি যে বল… অসভ্য একটা। কাল সকালে উঠতে হবে এবার শুয়ে পড়ো।

দেখতে দেখতে শনিবার এসে গেল। পলাশ অফিসে যাবার জন্য পায়ে জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে পূর্বাশাকে বলল-  

এই শোন, তোমাকে তো বলাই হয় নি। আজ একটা জরুরী মিটিং আছে, কলকাতার বাইরে। আজ অফিসে গেলে স্পটটা জানতে পারবো। অফিস থেকে বিকেলে বেরবো। তাই আজ রাতে হোটেলেই থাকতে হবে। কাল সন্ধ্যেবেলা ফিরবো হয়তো।

ঠিক আছে সাবধানে যেও। ওখানে পৌঁছে আমাকে একটা ফোন করে দিও কিন্তু। না হলে আমি চিন্তা করব।

হ্যাঁ ফোন করব, তোমরা সাবধানে থেকো। আমি বেরোলাম।

আচ্ছা ঠিক আছে, দুগগা দুগগা।

অফিস থেকে দুটোর মধ্যে পলাশ বেরিয়ে পড়লো। সাড়ে তিনটেয় জয়িতা   ধর্মতলা বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করবে পলাশের জন্য। পলাশ ৩ টে ১৫-র মধ্যে স্ট্যান্ডে পৌঁছে গিয়ে টিকিট দুটো কেটে ফেললো। জয়িতাও সময় মত হাজির।  বিকেল চারটেয় বাস। দুজনে একটু চা খেয়ে বাসে উঠে পড়লো। বাস ছাড়ল।

মনে হয় আটটার মধ্যে পৌঁছে যাব। 

ওহ, দারুন মজা হচ্ছে আমার, গিয়েই হোটেলে ব্যাগ রেখে সমদ্রের ধারে চলে যাব। সি বিচে বসে তোমার বুকে মাথা রেখে গান গাইবো।

ওহ, so romantic সোনা, I love you.

 Love you too, ডিয়ার।

জয়িতা পলাশের বুকে মাথা রেখে চোখটা বুজে আর পলাশ ওর হাত দুটো ধরে আছে। বাস বেশ দ্রুত বেগেই ছুটতে লাগলো। যাবার পথে দুজনে অনেক গল্প করলো। দিঘা পৌঁছানোর একটু আগেই বাসটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো মিনিট দুয়েক। হঠাৎ কি হল? জানা গেল রাস্তা দিয়ে একটা বেড়াল পার হচ্ছিল। তাই ড্রাইভার বাসটাকে একটু দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

দূর, এখনও এইসব কুসংস্কার কেউ মানে?

আরে দাদা, ড্রাইভাররা রোজ প্রাণ হাতে নিয়ে হাইওয়ে দিয়ে যায়। তাই তারা এখনও এগুলো মেনে চলে।

যত্তসব।

এবার যেন সমদ্রের গর্জন কানে ভেসে আসতে লাগলো।

এই জয়িতা, সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছো?

হ্যাঁ ডিয়ার, পাচ্ছি তো। কি গুরুগম্ভীর গর্জন, তাই না?

হ্যাঁ ঠিক বলেছ, এই গাম্ভীর্যের মধ্যেও একটা সুপ্ত রোম্যানটিজম আছে।

হুম, ওই তো সমুদ্র দেখা যাচ্ছে, দেখো।

হ্যাঁ, তাহলে তোমাকে নিয়ে দিঘা পৌঁছে গেলাম, কি বল। এবার শুধু দুষ্টুমি।

হা হা, দুষ্টু একটা।

হোটেল ব্লু ভিউ, রুম নাম্বার ৩০৭। দুজনেরই খুব পছন্দ হল। ঘরের লাগোয়া ছোট্ট বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। দুজনেই আজ খুব খুশী। বারান্দায় দাঁড়িয়েই একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। একটা দীর্ঘ চুম্বন করলো। পলাশ পূর্বাশাকে একটা ফোনও করে নিল সেই ফাঁকে।  

এই চলো এবার একটু সি বিচ থেকে ঘুরে আসি। বাইরে কি সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে।

হুম, একটু হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নি। প্রায় ৮ টা বাজতে চলল। তাহলে  কিছুক্ষণ বিচে ঘুরে ডিনার করেই ফিরবো।

আচ্ছা, ঠিক আছে। এই শোন আমি একটু চেঞ্জ করবো, তুমি একটু বাইরে যাবে, প্লিজ।

কেন আমার সামনেই করো।

দূর, দুষ্টু একটা, আমার লজ্জা লাগে না বুঝি।

আচ্ছা বাবা যাচ্ছি, তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও, তারপর বেরোবো।

দুজনে সি বিচে হাত ধরাধরি করে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালো, সমুদ্রের জলে পা ভেজালো, সমুদ্রের ধারে বসে জয়িতা পলাশকে কত সুন্দর সুন্দর গান শোনালো, আর সাথে চিকেন পকোরা, পমফ্রেট ফ্রাই- দারুন জমে গেছে। দুজনেই আজ খুব খুশী, মুক্ত বিহঙ্গ।

এরপর রাতের ডিনার সেরে তারা হোটেলে ফিরে এল। দুজনে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিল। নীল রঙের রাত পোশাকে জয়িতাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। পলাশ তো মুখ ফেরাতেই পারছিল না।

এই দুষ্টু, কি দেখছ ওইরকম করে?

তোমাকে।

কেন আগে দেখো নি আমায়?

দেখেছি, তবে এমন মায়াবী আর কখনও লাগে নি, মনে হচ্ছে কোনও এক অপ্সরা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

তাই? তাহলে তো কিছু ছবি তুলে রাখতেই হয়। তাহলে আমিও দেখতে চাই আমাকে কোন অপ্সরার মত লাগছে। চল, let’s have a photo shoot. দেখি তুমি ফটোগ্রাফিটা কেমন পারো।

ওকে ডার্লিং, তুমি মডেলের মত পোজ দাও, আমি ক্লিক করছি।

জয়িতাও বিভিন্ন ভাবে পোজ দিয়ে দাঁড়ালো, পলাশ ছবি তুলতে লাগলো।

ওয়াউ… কি দারুন ছবি উঠেছে তোমার, দেখো দেখো

কই দেখি… ওয়াউ… সত্যিই তো ছবি গুলো বেশ ভালই হয়েছে। আমি তো নিজেই নিজেকে চিনতে পারছি না। I must say you are a brilliant photographer dear.

Thanks darling.

এবারে আমরা আমাদের দুজনের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ধরে রাখতে চাই।

কিন্তু এই সব ছবি আমার মোবাইলে কি করে রাখবো সোনা, বউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি।

উফফ, তোমার দ্বারা কিছু হবে না। ওকে, ছবিগুলো তুলে ব্লু টুথে আমাকে পাঠিয়ে দেবে। আমি সযত্নে আমাদের এই মুহূর্ত গুলো ধরে রাখবো।

ঠিক আছে সোনা, তুমি যা বলবে তাই হবে।

জয়িতা সাথে সাথে পলাশকে জড়িয়ে ধরেই গভীর চুম্বন করলো আর পলাশ ও সেই চুম্বন দৃশ্য মোবাইলে তুলে নিল। এভাবেই পেক থেকে গভীর চুম্বন, আলিঙ্গন থেকে ফরাসী চুম্বন, আরও অনেক অন্তরঙ্গ মুহূর্তও মোবাইল বন্দী হল। প্রায় সারা রাত প্রেমের বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে শেষ রাতে তারা দুজনে একটু ঘুমালো। যথারীতি সকাল  ৯ টায় ঘুম ভাঙল তাদের। একটু চা খেয়েই তারা সমুদ্রে চলে গেল, দীর্ঘক্ষন   সমুদ্রে স্নান করলো। বেশ ভালই কাটল দুজনের। পলাশ খুব খুশী। এবার লাঞ্চ সেরে বাসে ওঠার পালা। সন্ধ্যের মধ্যে বাড়ী ফেরার কথা। তাই আর দেরী না করেই তারা লাঞ্চ সেরে ২টো৩০-এর বাসে উঠে পড়লো। বাসে বসে বসেই পলাশ সব ছবি জয়িতার মোবাইলে পাঠিয়ে দিল। বাড়ী পৌঁছুতে প্রায় সাড়ে ৬ টা বেজে গেল। আজ পলাশের মুড খুব ভালো। স্নান করে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে চায়ের কাপ নিয়ে পূর্বাশার সাথে গল্প করতে লাগলো।

তোমাদের মিটিং কেমন হল?

খুব ভালো হয়েছে গো। কোম্পানি খুব বড় একটা কন্ট্রাক্ট পাবে এবার, সেটা অবশ্যই আমার ক্রেডিট, হা হা। তাই আজ মনটা খুব ভালো আছে, তাই আজ তোমাকে খুব আদর করবো।

যাহ্‌, কি যে বল না, মেয়ে এখন বড় হচ্ছে কিন্তু।

রিশিতা কি ইংলিশ স্যারের বাড়ী গেছে?

হ্যাঁ গো, আজ ফিরতে সাড়ে নটা বাজবে বলে গেছে।

ও আচ্ছা।  

তখন ঘড়িতে ঠিক সাড়ে ৮ টা বেজেছে। হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। পূর্বাশা মোমবাতিটা জ্বালাল। মোমবাতির ওই সামান্য আলোটুকু ছাড়া চারিদিক অন্ধকার, কেমন যেন একটা গা ছমছমে নিস্তব্ধতা নেমে এল। দুজনের গল্পও থেমে গেল। হঠাৎ পূর্বাশার মোবাইলটা বেজে উঠল…

হ্যালো

আমি জয়িতা বলছি।

জয়িতা? আমি তো ঠিক আপনাকে চিনতে পারছি না।

তুমি আমাকে চিনবে না। তোমার মোবাইলে কিছু ছবি আর ভয়েস রেকর্ডিং পাঠিয়েছি। সেগুলো দেখো আর শোন… বলেই ফোনটা কেটে গেল।

পূর্বাশা কিছুটা হতচকিত হয়ে গেল। মোবাইলে পূর্বাশার কথোপকথন শুনে পলাশ  একটু নার্ভাস হয়ে গেল। তাহলে জয়িতা কি ওইসব ছবি পূর্বাশাকে পাঠিয়ে দিল? কিন্তু পূর্বাশার নম্বর তো জয়িতার জানার কথা নয়… এই সব ভাবতে থাকলো। পূর্বাশাও জয়িতার কথামত মোবাইলে ওই অন্তরঙ্গ ছবিগুলো দেখল, তাদের কথোপকথনের রেকর্ডিং শুনেই রাগত ভাবে পলাশের দিকে চেয়ে রইল আর মুখ দিয়ে একটা কথাই বেরিয়ে এল- ছি।

আমি ভাবতেও পারছি না তুমি কি করে এরকম কাজ করলে। তোমাকে আমি অন্ধের মত বিশ্বাস করতাম। আজ আমার সব বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, বলেই পূর্বাশা কাঁদতে লাগল।

পলাশ কি করবে ভেবে উঠতে পারছিল না। হঠাৎ সেই নুপুরের শব্দটা আবার কানে ভেসে এল। কেউ যেন নুপুর পরে সারা বাড়ী ঘুরে বেড়াচ্ছে আর একটা গান গাইছে-‘ আমারও পরাণ যাহা চায়...’। নুপুরের শব্দটা যেন এই ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে। দুজনেই হতচকিত হয়ে গেল। আমাদের বাড়ীতে নুপুর পরে হাঁটতে হাঁটতে কে গান গাইছে?- দুজনের মনেই এক প্রশ্ন। ধীরে ধীরে গানটা গাইতে গাইতে গুলগুলি ঘরে ঢুকল। গুলগুলিকে গান গাইতে দেখে তারা চমকে উঠল। গানের গলাটা খুব চেনা লাগলো পলাশের। এরপরেই গুলগুলি হাসতে শুরু করলো। দুজনে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মোমবাতিটা নিভে গেল। দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে আর পলাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনেই ভয়ে বাকরুদ্ধ।

আমাকে চিনতে পারছো পলাশ?

গলাটা খুব চেনা লাগলো পলাশের, ভয়ে পলাশের গলা শুকিয়ে গেল।

এখনও চিনতে পারলে না আমাকে? বলেই গুলগুলি ধীরে ধীরে একটি মহিলা আত্মার রূপ ধারণ করলো। ভৌতিক আলো আধারিতে মুখটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও কিছুটা বোঝা যাচ্ছে।

কি এবার চেনা যাচ্ছে?

পলাশের হৃদকম্পন বাড়তে লাগলো, হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো, গলা শুকিয়ে এল। আলো আঁধারিতেও তাকে চিনতে কোনও অসুবিধা হল না। এ তো পারমিতা। পূর্বাশাও ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো।   

সেই দিনগুলো মনে পড়ে পলাশ? তুমি আর আমি একসাথে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতাম। কত স্বপ্ন দেখাতে আমাকে। ‘আমার পরাণ যাহা চায়...’ এই গানটা তুমি খুব ভালবাসতে, মাঝে মাঝেই আমার কাছে শুনতে চাইতে। আমাকে নিয়েও বেশ কয়েকবার বাইরে রাত কাটিয়েছো। কিন্তু যখন আমি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ি, তুমি তখন সেই সন্তানকে অস্বীকার করো এবং আমাকে ছেড়ে চলে যাও। কিন্তু তারপর আমার কি হল কোনও খোঁজ নাও নি।

আমাকে ক্ষমা করে দাও পারমিতা, পলাশের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন বরফ জল নামতে লাগলো।

তাহলে তার পরের ঘটনাটা শোনো। তারপর আমি বহরমপুর চলে যাই। আমার এক বান্ধবী আমাকে ওখানে একটা আশ্রমের ঠিকানা দেয়। আমি সেখানে যাই, সেখানে গিয়ে আশ্রমের ‘মা’ এর সাথে দেখা করি ও সব ঘটনা খুলে বলি। আশ্রমের সবাই তাকে মা বলেই ডাকে, তাঁর আসল নাম সংযুক্তা রায়, বয়স ৬৫। এমন কোমল স্নেহশীলা মহিলা আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি। তিনি সত্যি মায়ের মতই আমার যত্ন নেন। তিনিই আমাকে আশ্রমে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন, সাথে সেখানকার বাচ্চাদের পড়ানোর দায়িত্বও দেন। এরপর আমার একটি ছেলে হয় জানো, তাতান। ভারি মিষ্টি দেখতে, ঠিক তোমার মতই দেখতে হয়েছে। 

এই সব শুনে পলাশের মনে বেশ আত্মগ্লানি হল।

তারপর কি হল?

যদিও তোমাকে কখনও ভুলতে পারি নি। তবে আশ্রমে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছিলাম। আশ্রমের সবার সাথে দিব্যি দিন কাটছিল। তাতানও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল আমার হাত ধরে। কিন্তু আবার ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস।

তারপর কি হল?

তাতান ওর বাবাকে কখনও দেখে নি, মা-ই ছিল ওর সব।

তারপর?

তাতানের যখন ৬ বছর বয়স একটা পথ দুর্ঘটনায় আমার মৃত্যু হল।

শুনেই পলাশ আর পূর্বাশা চমকে উঠল, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, নড়াচড়া করার  মত শক্তি ছিল না তাদের। কাঁপা কাঁপা গলায় পলাশ বলল-

তুমি কি চাও এখানে? দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার কোনও অনিষ্ট করো না। আমার বউ মেয়েকে দেখার আর কেউ নেই।

পারমিতা আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।

কি হল ভয় পেয়ে গেলে? পূর্বাশাকে তুমি সত্যি ভালোবাসো?

হ্যাঁ, ভালবাসি।

তাহলে আবার জয়িতার সাথে সম্পর্কে জড়ালে কেন?

আমার খুব ভুল হয়ে গেছে, আর কখনও এরকম হবে না, আমাকে ক্ষমা করে দাও। দয়া করে আমার কোনও ক্ষতি করো না।

আমিই জয়িতার রূপ ধরে তোমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য। আর ওই ছবিগুলো তোমাকে দিয়ে তুলিয়েছিলাম পূর্বাশার কাছে তোমার এই রূপটা তুলে ধরার জন্য।  

পূর্বাশা রাগে, ভয়ে কোনও কথা বলার মত অবস্থায় ছিল না। কিন্তু পলাশের সম্বন্ধে এই সব কথা শুনে বেশ আহত হয়েছিল।

পারমিতা, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দাও, এই ভুল আমি আর কখনও করব না।

তোমার কোনও ক্ষতি করতে আমি এখানে আসি নি। তোমাকে শোধরানোর জন্যই এই বেড়ালের রূপ ধরে আমি তোমাদের বাড়ীতে এসেছি। আশা  করবো এই ভুল তুমি আর কখনও করবে না। মেয়েদেরও একটা মন  আছে এটা কখনও ভুলো না। মেয়েরা বার বার ছেলেদের ক্ষমা করে, আমিও তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, কারণ আমি এখনও তোমাকে ভালবাসি। পূর্বাশাকে আর কখনও কষ্ট দিও না। একটা সম্পর্কের মূলধন হল সততা, এটা কখনও নষ্ট করো না।

এই সব কথা শোনার পরেই পলাশ আত্মগ্লানিতে ডুবে গেল, সে প্রতিজ্ঞা করলো আর কোনও মহিলার সাথে আর কোনও দিন কোনও রকম সম্পর্কে জড়াবে না। পূর্বাশার হাত ধরে পলাশ ক্ষমা চেয়ে নিল।

তবে হ্যাঁ, আর একটা কথা বলার আছে তোমাকে। ওই ‘আনন্দ নিকেতন’  আশ্রমে এখনও তাতান আছে, দেখতে দেখতে ওর ২১ বছর বয়স হয়ে  গেল। ওর দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে। জানি ওকে হঠাৎ করে তোমার বাড়ীতে নিয়ে এসে ছেলের পরিচয় দেওয়াটা এখন সম্ভব নয়, সামাজিক কারণেই। কিন্তু ওর সাথে আশ্রমে গিয়ে দেখা করা, ওকে প্রয়োজন মত টাকা পয়সা পাঠানো আর সর্বোপরি বাবার স্নেহ ভালোবাসা ওকে দিও, দূর থেকেই ওর মাথায় হাতটা রেখো। সংযুক্তা ‘মা’-এর ফোন নম্বর তোমার মোবাইলে আমি সেভ করে রেখেছি।  

তুমি চিন্তা করো না। যে অন্যায় আমি করেছি জানি তার কোনও ক্ষমা নেই। তবে তাতানের সব দায়িত্ব আমি নেব, আর বাবার স্নেহ ভালোবাসা  আমি ওকে দেবো।

সাথে সাথেই পারমিতার আত্মা অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘরের আলোগুলোও জ্বলে উঠল। দেখল গুলগুলি বসে আছে আর করুণ ভাবে পলাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আর গুলগুলি বলল- ‘আমি চলে যাচ্ছি, আর হয়তো তোমাকে দেখা দেবো না, কিন্তু আমি তোমার আশেপাশেই থাকবো।’

এই বলেই গুলগুলি সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। পলাশ আর পূর্বাশা ভয়ে পাথরের মত বসে রইল।

রিশিতার ফিরতে আজ প্রায় দশটা বেজে গেছে। বাড়ীর পরিবেশ দেখে রিশিতা একটু অবাক হয়ে গেল। টিভি বন্ধ, বাবা মা দুজনে দু দিকে মুখ করে বসে আছে, মুখ গুলো কেমন যেন থমথমে লাগছে। এঘর ওঘর সব জায়গায় খুঁজল, কিন্তু গুলগুলিকে দেখতে পেল না।

মা, গুলগুলি কোথায়?

গুলগুলি আর নেই সোনা, ও চলে গেছে।

মানে? চলে গেছে মানে?

তুমি এখন মুখ হাত ধুয়ে এসো, অনেক রাত হয়ে গেছে। এবার আমরা ডিনার করবো।

বাড়ীর পরিস্থিতি দেখে পূর্বাশা আর কথা বাড়াল না।

সবাই ডিনার টেবিলে বসে পড়লো। পূর্বাশার গলা দিয়ে যেন খাবার কিছুতেই নামছে না। মোবাইলের সেই অন্তরঙ্গ ছবিগুলো বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। যাই হোক সবাই কোনও রকমে ডিনার সেরে শুতে চলে গেল। রিশিতার আজ খুব মন খারাপ, পড়াতে কিছুতেই মন বসছে না, রোজ পড়ার সময় গুলগুলি ওর পাশে বসে থাকতো, আজ খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। রিশিতাও আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো। ওদিকে পলাশ আর পূর্বাশা কারুর চোখেই ঘুম নেই। দুজনে দু পাশ ঘুরে শুয়ে আছে। পূর্বাশা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, পলাশ পূর্বাশার মাথার ওপর হাতটা রাখতেই পূর্বাশা কান্নায় ভেঙে পড়লো।

তুমি এটা কি করে করলে? আজ আমার সব বিশ্বাস ভেঙে চুরে তছনছ  করে দিলে, এটা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। আমি তোমায় বিশ্বাস করেছিলাম।

সত্যি আমি খুব বড় অন্যায় করেছি, জানি এর কোনও ক্ষমা হয় না, তবুও তোমার কাছে আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি। এই ভুল আর কখনও  হবে না, আমি খুব লজ্জিত।

তুমি অফিসের মিটিং আছে এই অজুহাত দেখিয়ে দিঘায় রাত কাটিয়ে এলে,  আগেও হয়তো অনেকবার আমাকে এরকম মিথ্যে কথা বলেছো।

সরি, আর কখনও হবে না।

বিয়ের আগে তোমার সাথে পারমিতার সম্পর্ক ছিল, সে কথা আমাকে তো কখনও বল নি। ওর সাথে ইন্দ্রিয় সুখ মিটিয়েছো, অথচ নিজের সন্তানকে অস্বীকার করে ওকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছো, এটা ভাবতেও আমার গা ঘিন ঘিন করছে। আজ সত্যি আমি নিজের কাছে হেরে গেলাম।

আসলে মানুষ কম বয়সে মোহের বশে অনেক ভুল করে ফেলে, কিন্তু বয়স বাড়ার পর সেটা সে বুঝতে পারে সেটা ভুল ছিল না, সেটা একটা পাপ ছিল। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না, তখন শুধুই আত্মগ্লানি তাকে কুরে কুরে খায়। আমি জানি আমি যে পাপ করেছি তার কোনও ক্ষমা হয় না, তবুও আমি চেষ্টা করবো কিছুটা হলেও যদি এর প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ আমাকে আর একবার বিশ্বাস করে দেখো, তোমার বিশ্বাসের আর কোনও অমর্যাদা আমি করবো না।

তুমি যত সহজে বিশ্বাস করার কথাটা আমাকে বলছো, সেই বিশ্বাসটা আবার ফিরিয়ে আনা খুব শক্ত। জানো তো এই বিশ্বাসটা হল অনেকটা  বেলজিয়াম গ্লাসের মত, খুব সৌখিন একটা আবেগ। এটা মনের আধারে খুব যত্ন করে রাখতে হয়, একটু আঘাত লাগলেই এটা নিঃশব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এটা আবার বিশ্বাসের আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো খুব শক্ত কাজ।

আমি বুঝতে পারছি আমাকে বিশ্বাস করাটা তোমার কাছে কত কঠিন।  তবুও তোমাকে শেষ বারের জন্য একবার অনুরোধ করছি আর একবার বিশ্বাস করে দেখো।       

কিছুদিন পলাশ আর পূর্বাশার সম্পর্কে শিথিলতা থাকলেও ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। রিশিতাকেও সব কথা তারা জানায়। তারা ‘আনন্দ নিকেতনে’ গিয়ে তাতানের সাথে দেখাও করে আসে। পলাশ সম্পূর্ণ নতুন মানুষে পরিণত হয়ে  যায়। আর কখনও কোনও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে সে জড়িয়ে পড়ে নি। তাতানকে পেয়ে তাদের সংসার পূর্ণতা পায়।

 

আপনাদের বাড়ীতেও কি বেড়াল আছে? সে সত্যি বেড়াল তো? না কি অন্য কেউ?