Samokal Potrika

আমার তখন দশ এগারো বছর বয়স বডো়জোর। প্রতিদিন সময় পেলেই মাঠে খেলা করতাম। হাজার রকম খেলা। তার মধ্যে ফুটবল আর ক্রিকেট-ই বেশি খেলতাম।আমরা পাড়ার কয়েক জন মিলে দু-আনা চার-আনা করে চাঁদা দিয়ে একটা ফুটবল কিনেছিলাম।ফুটবলটা এখনকার মতো নয়। সব কিছু আলাদা আলাদা পাওয়া যেত।ব্লাডার ছিল মোটা রবারের লম্বা মুখ-ওয়ালা।ঠিক এখনকার বড় মুখ-ওয়ালা বেলুনের মতো। ফুটবলের চামরার খোলের মধ্যে ব্লাডার ঢুকিয়ে পাম্প দিয়ে মুখটা ভালোকরে বাঁধতে হতো। ভেসলিন লাগিয়ে বুড়ো আঙুলের চাপে জোর করে মুখটা ঢুকিয়ে দিতে হতো। এই কাজটি আমাদের দ্বারা হতো না। বড়োদের কাছে যেতে হতো। তাছাড়া লেজ টানার একটা কল ছিল--তাই দিয়ে লেজ টেনে টেনে বেঁধে দিতে হতো। এই ভাবে কষ্ট করেই খেলা শুরু করতাম। বলটা পুরনো হয়ে গেলে প্রায়শই যেত ফেটে। মুচির কাছ থেকে সেলাই করে আনা হতো। মুচি নানারঙের এলোমেলো বিশৃঙ্খল তালি মেরে দিত। তালি মারতে মারতে ফুটবলটা দেখতে অদ্ভুত এক আকৃতি নিয়েছিল। যদিও প্রকৃতিটা ছিল প্রায় একই - কেবল একটু পায়ে বেশি লাগতো।

 

         একদিন আমাদের বাডিতে এক ফকির বাউল আসে। তার হাতে ছিল একতারা। কাঁধে একটা রঙবেরঙের ঝোলা। আর গায়ের জামাটা ছিল অদ্ভুত - বেশ মজার। নানান রঙের তালি মারা পা পর্যন্ত - ঠিক যেন আলখাল্লা। দেখে আমার ফুটবলের কথা মনে পরে গেল। দেখি একই রকম। সেই ফকির একটা গান গেয়েছিল।এখনও মনে আছে - 

 

         " খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।

           আমি ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।।"

 

      গানটা খুবই ভালো। আর ফকিরের গানের গলা এতটাই ভালো যে, শুনতে শুনতে মনটা কোথায় যেন পাখির মতো উড়ে যায়। উদাস হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।পৃথিবীর বাইরে, অন্য কোনো গ্রহে। ভারী অদ্ভুত উদাস করা গান। তাছাড়া নানা রঙের তালি মারা ফকিরও আমার মন জয় করে নিয়েছিল - বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিলাম ফকিরকে। ঠিক ফুটবলের মতো একই রকম। ফুটবল খেলার সময় মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। কোনো কিছুর খেয়াল থাকে না। সময়ের জ্ঞান থাকে না -

 শুধু খেলা আর খেলা। অন্য কিছু মনে ধরে না - ভারী অদ্ভুত।

 

        এখন ভাবি নানান রঙের অদ্ভুত তালিই কি উদাস করে মনটাকে !