" />

Samokal Potrika

দত্তদাকে আপনারা হয়ত কেউই চিনবেন না। ছোটখাটো চেহারা এতটাই বৈশিষ্ট্যহীন, যে এই জনারণ্যে তাকে মনে রাখার কোনও কারণ নেই। আমার মতো বুড়ো হাবড়া, যারা এখনও রাজ্য সরকারের চাকরিতে টিঁকে আছি, তাদের কেউ কেউ হয়ত চিনে ফেলতেও পারেন।

যে সময়ে চাকরি তে যোগ দেই, তখনকার রাইটার্স বিল্ডিং-এ ঢুকলেই যে বৈশিষ্ট্যগুলি নজরে আসতো, তার মধ্যে বিরাট বিরাট ঘর, বার্মাটিকের জাম্বো টেবিল, চেয়ার, বড়ো বড়ো আলমারি, আর তার ফাঁক দিয়ে যাতায়াতের পথ অন্যতম। ঘরগুলির সিলিং যেন আকাশ ছোঁয়া। আজকের আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারে অভ্যস্ত প্রজন্ম অতো বড়ো আর অতো উঁচু ঘরের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবেনা। সব ঘরেই একাধিক দেওয়াল ঘড়ি। এংলো সুইস কোম্পানির তৈরি। সেসব ঘড়ির দিকে তাকালে সময় আপনাকে পিছিয়ে নিয়ে যাবেই লালমুখো সাহেবদের আমলে।

সব ঘড়িই দম দেওয়া। কোনটায় ঘন্টা বাজে (যদিও তার সংখ্যা খুবই কম) কোনটা নির্বাক সময় দেখায়। কিন্তু এতো দপ্তরের ঘড়িতে দম দেয় কে? নিজের দপ্তরের কাউকেই তো দেখিনা দম দিতে। তাহলে কি ঘড়িগুলি দম দেওয়া নয়! কিন্তু কোয়ার্টজ ঘড়ির কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলি তো অনুপস্থিত। তাহলে প্রশ্ন একটাই, ঘড়িগুলিতে দম দেয় কে? লাখ টাকার এই প্রশ্ন, কিন্তু কারোকে জিজ্ঞাসা করতে কেমন লজ্জা লজ্জা লাগতো। পাছে সবাই ঠাট্টা করে।

একদিন খুব সকাল সকাল অফিসে গেছি। দেখি ছোটখাটো চেহারার চশমা পড়া একজন লোক টেবিলের ওপরে দাঁড়িয়ে ঘড়ি ধরে কি যেন করছে। একবার দেখেই বুঝে গেলাম ব্যাটা পাক্কা চোর, আজ হাতেনাতে ধরেছি। এক ধমক দিয়ে বললাম, "ঘড়ি নামাচ্ছেন কার অর্ডারে? পুলিশ ডাকবো?" খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উনি বললেন,"এটা তো আমিই করি।" ভদ্রলোকের এক্সপ্রেশন দেখে আমি কেমন যেন ঘেঁটে ঘ হয়ে গেলাম। একেবারে নিপাট গোবেচারা লুকস্, অথচ কেমন বেমালুম বলছে, এটা তো আমিই করি। দেবো নাকি কান পেঁচিয়ে এক থাপ্পড়।

এমনি দোলাচলের মধ্যে যখন আমি, ততক্ষণে ওনার দম দেওয়া, পরিস্কার করার কাজ শেষ। হাতের ছোট্ট চামড়ার ব্যাগের চেন বন্ধ করে আমার কাছে এসে বললেন, "আমি বি বি দত্ত।" আমার তখন বেজায় মাথা গরম। "আরে মশাই, আপনি বিবি না সাহেব, তা জেনে আমি কি করবো?" স্মিত হেসে উনি বললেন,"আমার নাম বি বি দত্ত। আমি সরকারি দপ্তরে ঘড়িতে দম দেই, ঘড়ি সারাই। আমার সাথে অ্যানুয়াল মেইন্টেনেন্সের চুক্তি রয়েছে দপ্তরগুলির।" আরে, এই তো সেই লোক। এদ্দিনে সেই লুকিয়ে থাকা মানুষের খোঁজ পাওয়া গেলো তবে।

আমার মায়ের একটা রিস্টওয়াচ আছে। বাবা-মা একসাথে দক্ষিণ ভারত ঘুরতে গিয়েছিলো। সেই সময়ে সেকেন্দ্রাবাদের আর্মি ক্যান্টিন থেকে বাবা মাকে ঘড়িটা কিনে দেয়। অলউইন কোম্পানির তৈরি মেকানিকাল ওয়াচ। বাবা অকালে চলে যাওয়ার পরে ঘড়িটা মায়ের কাছে বাবার বলতে গেলে একমাত্র স্মৃতি। কারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে যৌথ পরিবারের বোঝা টানার পরে স্ত্রী কে উপহার কিনে দেবার মতো উদ্বৃত্ত অর্থের বড়োই অভাব ছিলো। তা সেই মান্ধাতা আমলের ঘড়ি হঠাৎ একদিন কোমায় চলে গেলো। দম দিলেও সে ঘড়ি আর চলেনা। কাঁচুমাচু মুখ করে ভদ্রমহিলা এসে আমায় তার ঘড়ির মৃত্যু সংবাদ শোনানোর পরে আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে খুব শিগগির একটি ঘড়ি কিনে দেবো। কিন্তু তবুও তিনি নট নড়নচড়ন। আর কিছু বলবে কি না জানতে চাওয়ায় তিনি একান্ত অনুরোধ করলেন ঘড়িটা সারানো যায় কি না সেটা দেখার জন্য।

সেই ভদ্রমহিলার কথায় বাধ্য হয়েই ঘড়িওয়ালার সন্ধানে বের হলাম। কিন্তু হা হতোশ্মি! যাকেই দেখাই সেই বলে সারানো যাবেনা। দুই তিন দোকান ঘুরে এসে ওনাকে জানালাম এই ঘড়ি আর সারানো যাবেনা। দেখলাম ভদ্রমহিলা খুব আহত হলেন আমার রিপোর্ট পেয়ে। অফিসে একদিন দত্তদার সাথে কথায় কথায় বললাম মায়ের ঘড়ির কথা। উনি বললেন পরদিন নিয়ে আসার জন্য।

পরদিন ঘড়িটা নিয়ে গেলাম। উনি আমার টেবিলে বসেই চোখে ঠুলি লাগিয়ে ঘড়িটা খুলে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। খানিক পরে আবার জোড়া দিয়ে বললেন, "দিন দশেক টাইম দিন, হয়ে যাবে।" আরে লোকটা বলে কি! এতগুলি মেকানিক সকলেই বললো সারানো যাবেনা। আর এই লোকটা কিনা বলে হয়ে যাবে! সমস্যাটা কি জানতে চাওয়ায় দত্তদা কেমন অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসলে মানুষের শরীরে যেমন হার্ট, ঘড়ির শরীরে তেমনই ব্যালেন্স হুইল। একটু এদিক ওদিক হলেই সমস্যা। চেয়ে দেখুন ব্যালেন্স হুইল কেমন আটকে আটকে যাচ্ছে। তাই ঘড়িটাও চলছে না।" দত্তদা কে কেমন দার্শনিক বলে মনে হচ্ছিল।

চাকরির বয়স বেড়েছে, সাথে সাথে বিপ্লব এসেছে ঘড়ির দুনিয়াতেও। দম দেওয়া ঘড়ি ফিনিক্স পাখির মতোই বিরল হয়ে গেছে। তার জায়গায় এসে গেছে কোয়ার্টজ ঘড়ি। দম দিতে লাগে না, ব্যাটারি পাল্টালেই ঘড়ি ফের চালু। ধীরে ধীরে দত্তদার আসা যাওয়াও কমতে লাগলো। তারপর একদিন একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। মাঝে মধ্যে রাস্তায় দেখা হতো। দেখা হলেই একমুখ হাসি নিয়ে প্রশ্ন করতেন, "ভালো আছেন? আপনার মায়ের ঘড়ি ঠিকমত চলছে তো?" মাথা নেড়ে সায় দিয়ে যে যার পথে এগিয়ে যেতাম।

মায়ের ঘড়িটা আবার ঝামেলা করছে। সেই একই সমস্যা। কিন্তু দত্তদা কে কোথায় পাই! স্মার্ট ফোন আসার পরে বারে বারে ফোন বদলানোর চক্করে কখন যে দত্তদার নাম্বার টা হারিয়ে গেছে, টেরও পাইনি। নবান্নর এগারো তলায় হঠাৎ করেই দেখা হলো দত্তদার সাথে। খুব বুড়ো হয়ে গেছেন। জামাকাপড় আগের মতো চকচকে নেই। হাতের চামড়ার ব্যাগটার সর্বাঙ্গে বয়সের ছাপ। দত্তদার হাসিটা সেই একই রকম অমলিন আছে। এগিয়ে যেতেই চিনতে পারলেন। সেই একই প্রশ্ন, "ভালো আছেন? আপনার মায়ের ঘড়ি ঠিকমত চলছে তো?" "আপনার এখনও মনে আছে মায়ের ঘড়ির কথা? ঘড়িটা আবার গোলমাল করছে। কাল নিয়ে আসি?" দত্তদা খুব করুণ মুখ করে বললেন, "আজকাল আমি তো আর রোজ আসিনা। মাসে এক আধ দিন আসা হয়। আপনি আগামী মঙ্গলবার ঘড়িটা নিয়ে আসুন।"

হাসিমুখে ক্লান্ত পা টেনে টেনে মিলিয়ে গেলেন দত্তদা। বাইরের চলমান জীবনের ভীড় মানুষটাকে যেন গিলে নিল। চারদিকে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন চলছে। নিখুঁত টাইমিং মেনে কাল নতুন বছর কে স্বাগত জানানো হবে। কোথাও সামান্যতম ত্রুটি নেই। স্মুদ অয়েলিং করা নাগরিক জীবনে একমাত্র বেমানান "অযান্ত্রিক" এর বিমল একটু আগে আমার সঙ্গে দেখা করে গেলেন। হয়ত শেষবারের মতোই। জীবনের দৌড়ে একজন হেরে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ, যার জীবনের ব্যালেন্স হুইলটা এখনও কোনোমতে নড়ে চলেছে ধীর লয়ে। হয়ত অচিরেই আটকে যাবে কোনও এক খাঁজে!