Samokal Potrika

'ওরে কি দিয়েছিস ব্যাটারি,পুরো গৌড়কাকুর....(সাদা,লাল ক্যামবিস বলটা উড়ে গিয়ে ঝপাং করে পড়লো অ্যাসবেস্টার এর চালে আর শানুর আধখাপচা কথাটা দাঁতের ফাঁকেই আটকে থাকলো)

'এবার হবে!'(ফোঁড়ন কাটলো টিমটিম)

ইঁটের ফাঁকে ব্যাটটা রেখে দৌড় মাড়লো ব্যাটারি ওরফে সৌম্য।আশেপাশের ফাজিল হাসি বুঝতে বাকি রাখলোনা ঘটনার শুরু নেহাতই গলিক্রিকেট হলেও বেশ একটা গুরুগম্ভীর মহল তৈরি হয়েছে।

গৌড়কাকু কিংবা নামহীন কাকু-কাকিমার কাছে ব্যাপারটা জ্বালাতনের ঠেকলেও স্ক্রিনটাচের খসড়ায় ওটুকুই যে শৈশব।

ঠিক তাই,রুলটানা সিলেবাসে এভাবেই বেড়ে ওঠে শৈশব।একটা গোটা শৈশব।আমি,আমরা প্রত্যেকে হয়তো বড্ড বেশি দূরে চলে যাচ্ছি সেখানে যেখানে রয়েছে প্রতিযোগিতার দৌড়।রয়েছে এগিয়ে যাওয়ার দৌড়। পিছনে পরে থাকছে কিছু নিত্য সবুজ সতেজ।যেটুকু না থাকলে হয়তো বেড়ে ওঠার অক্সিজেনটুকু নষ্ট হয়ে যায়।বছর বছর বেড়ে যায় বোঝা।শিক্ষা আর দায়িত্বের বোঝা।একটু একটু করে ওজন বাড়তে থাকে স্কুলব্যাগের।সোজা,স্বচ্ছল শিরদাঁড়াটা আস্তে আস্তে নুয়ে পড়ে।তবু কমেনা বোঝা বাড়ানোর প্রয়াস!বরং অভিভাবকের চোখ রাঙানি কিংবা আরো সফল হবার উন্মাদনা বাড়ায় অভিলাষের চাহিদা।পরতে পরতে ঢাকা পরে যায় প্রাণোবন্ত একটা আদিম হাসি।যে হাসির রং সবুজ।স্বপ্নের গরনে যা এঁকে দেয় আলপনা।আমাদের শৈশব।প্রিয় শৈশব।হোক না অবুঝ, হোক না দুর্দম তবু তো স্বাধীন।তবু তো একরাশ সাদা কাগজে আঁকিবুঁকি কিছু এলোমেলো লাইন।

শৈশব যেন চলমান জীবনের স্বর্গ সুখ।যেটুকু স্পর্শ না করলে,যেটুকু অনুভব না করলে অধরাই থেকে যায় প্রতিটা গড়ে ওঠা মুহূর্ত।শৈশব স্মৃতির বড় দুর্বল এক আন্তরিক পাতা।যে পাতা জীবনের দিনান্তেও থেকে যায় অমলিন অথচ অগোছালোভাবে।যেন ডায়েরির পাতার দুরন্ত সমস্ত লাইন।তবে হিসেব নিকেশের পাতাটাকে যদি আরো একবার দেখে নি তবে কিছুটা কারণ,সেই বর্ণময় শৈশবকে তলানিতে এনে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।খানিক ফিরে দেখবো সে সবই-

(ক) কড়া নিয়ম

(খ) একলা থাকা

(গ) পারিবারিক সমস্যা

(ঘ) নৈতিকতার গন্ডী

(ক) কড়া নিয়ম/শাসন;  নিয়মের বেড়াজাল,আমাদের বেঁধে চলেছে অবিরত।সকাল থেকে উঠে প্রতিদিনের দিনাতিপাত একটি শিশু বা কিশোরের কাছে যেন হয়ে ওঠে মাকড়সার জালসম।স্কুল,স্কুল থেকে ফিরে টিউশন,এসে আবারও কোনো ক্লাস আবার পড়া এসব যেন হাঁফ ধরায় জীবনে।অযথা অহেতুক কিছু শাসন শৈশব জীবনে বয়ে আনে নানা দুর্ভাবনা,একাকিত্ব।বড় কিম্বা বড় হবার বাসনা অভিভাবকদের মাঝে আগ্রাসী মনোভাবের অনুরণন ঘটায়।তারই প্রভাব পড়ে শিশুমনে।দানা বাঁধে বিষণ্নতা।অপরাধ প্রবণতা ও নানাবিধ জেদ।শৈশবের হালকা ফুরফুরে মেজাজটাই যেন হারিয়ে যায় এক নিমেষে।একা হয়ে পড়ে ছোট দুটি নির্ভরশীল হাত।

(খ) একলা থাকা; 'আমি আমার মত একলা হতে চাই' একলা থাকার এই একটা নিরন্তর চেষ্টা আমাদের একাকিত্বের গন্ডীটাকে বাড়িয়ে তুলেছে অনেকটাই।'যৌথ' শব্দ টুকরো টুকরো হয়ে স্বাধীনচেতা ইচ্ছেরা ডানা মেলেছে।আর তাইতো বাবা-মা সন্তানের পরিবারটা কোথায় যেন হয়ে উঠেছে অনেকটা স্বার্থ ঘেঁষা।যোগ নয়,যেন বিয়োগটাই জীবনের মূলধন হয়ে উঠেছে।শিশুমনে দাগ কাটে সেসবও।তারা মিশতে নয় বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপছন্দ করতে থাকে চারপাশের ব্যক্তিবর্গকে।

(গ) কলহ; শৈশব হারানোর এও এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।পিতা মাতার কলহ,পারিবারিক বিবাদ শিশুকে করে তোলে কিছুটা সংশয়ী।ঠিক ভুলের তফাৎটা যেন তাদের কাছে হয়ে ওঠে ঘোলাটে।বন্ধু,পরিজন এমনকি মানুষ চেনার ক্ষমতা হারিয়ে এক অসহায়তা ঘিরে ধরে।উত্যক্ত মন কখনো তাকে বিরূপ হতে শেখায়।জন্ম নেয় অপরাধ।

(ঘ) নৈতিকতার গন্ডী; শিশুর মধ্যে নৈতিক বোধ গড়ে ওঠে একটি ভিত্তিকে কেন্দ্র করে আর সেই ভিত্তিটি হলো অবধারিতভাবেই পরিবার।যে পরিমণ্ডলে নবপত্রিকা অঙ্কুরিত হয় ধীরে ধীরে।কিন্তু ব্যস্ততা আর ওয়েবের ভিড়ে হারায় পারিবারিক বোধ।শিশু হারায় তার শৈশব তথা নৈতিকতাবুদ্ধি।

তবে সর্বাংশে একথা বলতে পারি,কোনো এক বা একাধিক কারণ জীবনের এই অতি প্রয়োজনীয় অধ্যায়কে বিষময় করে তুলতে পারেনা।পারেনা মলিন করতে।তাই আরো বিবেকবোধ আর একটু সচেতনতা আনন্দময় করে তুলতে পারে শৈশব। গলি ক্রিকেটের যেকোনো বাউন্সার কোনো উৎপাত নয়।বরং সস্নেহে আদর দিতে পারে শৈশবকে।সবুজ ডিঙিয়ে গড়ে উঠছে কংক্রিট,বহুতল।আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে কিছু সর্পিল চরিতার্থতা।কিছুতেই ঢাকতে পারছিনা আমরা আগ্রাসনের হাত।ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারছি কৈ! 'আমরা চঞ্চল,আমরা অদ্ভুত-এর দল'(কবির ভাষায়) ভবিষ্যতের যুবশক্তি।শৈশব বেয়েই মাথা তুলে দাঁড়ায় তা।আর তাইতো প্রাণখোলা হতে হবে ছেলেবেলাকে।সবুজের চাদর জড়াতে হবে পাড়ার কচি-কাঁচাদের মন জুড়ে।তাই পিছন ফিরে হারিয়ে যাওয়া সেই সমস্ত অক্সিজেনকে নিত্যকালের রুটিনে যুক্ত করতে হবে।যা নিমেষেই গোটা একটা স্বচ্ছলতা বয়ে আনতে পারে।শৈশবের দুর্দমনীয়তা,অফুরান অনাবিলতাই যে দেশ ও দশের আগামী।এটুকু মানতে ক্ষতি কি! বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হয়তো পথের সুগমতা আনতে পারে অনেকটা তবুও শিক্ষণীয় সাবলীলতা লুকিয়ে আছে পাড়ার অলি-গলিতে।সেটা হারানো কাম্য নয়।তা হারালে যে হত্যা হবে।হত্যা হবে শৈশবের।এক জীবনব্যাপী প্রাণময়তার।।