Samokal Potrika

আজ অনেক দিন পর রাত এসে বসেছে আমার জানলায়। রাতকে বললাম -কেমন আছো, রাত? আজকাল তো আর আমাকে মনেই পড়ে না তোমার। -কে বলেছে, কোজাগরী? তুমি যে অসুস্থ... রোজ যে তুমি গোটা কয়েক ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো নিদ্রার কোলে... তারপর আমি এসে তোমার ঘুমন্ত মুখের থেকে চুল সরিয়ে দিই, তোমার মাথায় রাখি আলতো হাত, বিপজ্জনক ভাবে উঠে যাওয়া তোমার জামা নামিয়ে দিই বিপদসীমার নীচে, গায়ের ওপর টেনে দিই আমার অন্ধকারের চাদর... তারপর চুপটি করে বসে থাকি তোমার পায়ের কাছে... তোমায় আগলে... তুমি জানতে পারো না... -যেমন ভাবে মানুষ মৃতদেহ ছুঁয়ে বসে থাকে? -এসব কী বলছো, কোজাগরী! -জানো, রাত, সেদিন অনেক রাত্রে বাবা-মায়ের সাথে বাড়ি ফিরছি। দেখি এক বৃদ্ধা একাকিনী, কাচের গাড়ি করে চলেছেন মহাপ্রয়াণের পথে। দেখে যে কী লোভ হলো! মাকে বললাম- "মা, আমি এমনি করে যেতে চাই, একা একা, সঙ্গী-সাথীহীন... যেমন চিরকাল একা একা ঘুরে বেড়িয়েছি, একা একা থেকেছি"। শুনে মা খুব বকলেন... -অমন একা একা যেতে গেলে তোমাকে যে পক্ককেশী হতে হবে, কোজাগরী... এতো তাড়া কীসের তোমার? -নাহ্... তাড়া নেই আমার... সেদিন আকাশপ্রদীপ দেখেছি, জানো রাত, কোনো এক বাড়ির মাথায় টিমটিম করে জ্বলে আছে, এখন তো বিলুপ্তপ্রায়... ছোটবেলায় আকাশপ্রদীপ দেখলেই মনটা কেমন হু হু করে উঠতো। বাবা বলতেন, ওই আলো দেখে কারা নাকি পৃথিবীতে নেমে আসেন, দেখে যান তাঁদের পরিবার-পরিজনদের। সত্যি তাঁরা আসেন? -এসে এ ঘর ও ঘর ঘুরতে থাকেন। হয়তো দেখেন, ছেলের ঘর সাজানো-গোছানো, অথচ ছেলে নেই। ছেলে দূর বিদেশে... অন্য সদস্যদের ঘুম ভাঙিয়ে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করেন ছেলের নতুন ঠিকানা। উত্তর মেলে না... -রাত, আমার কাছেও কি কেউ আসে? -উত্তর দেবো না। কোজাগরী, এ প্রশ্নের উত্তর, তুমিও জানো, আমিও জানি... জানো কোজাগরী, এই মুহূর্তে ঠিক কতজন মানুষ হাতের শিরার থেকে ব্লেডের দূরত্ব মাপছেন? সিলিং থেকে নেমে আসা ফাঁসের থেকে একটু একটু করে গলার দূরত্ব কমে আসছে ঠিক কতজন মানুষের? কে কে স্লিপিং পিল গুনছেন বসে বসে? বাথরুমে রাখা অ্যাসিডের বোতল হাতে কারা কারা ভাবছেন- 'খাবো, কি খাবো না'? কে কে কেরোসিন তেল মাথায় ঢেলে একটার পর একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাচ্ছেন আর ফেলে দিচ্ছেন? সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে এইসব দেখে বেড়াই আমি... আমি অভিশপ্ত। কোজাগরী, লোকে বলে রাত নাকি মানুষখেকো, মানুষ গিলে খায়... শুধুই দেখি আর কষ্ট পাই... কিছু তো করতে পারিনা! সবাই তো আর তোমার মতো আমার ভাষা বোঝেনা, কোজাগরী... সবাই তো আর তোমার মতো রাতের ডাকে সাড়া দিতে পারেনা... -তুমি তো হ্যাপী প্রিন্সের মতো কথা বলছো, রাত! আচ্ছা রাত, ভালোবাসা আর ঘৃণার মধ্যে দূরত্ব ঠিক কতখানি? -ওই যে, যতখানি দূরত্ব ব্লেড আর হাতের শিরার... -আজ চারদিক কেমন থমথমে, তাই না, রাত? পুজো শেষ, কালীপুজো, ভাইফোঁটা, সব উৎসব শেষ। ছোটবেলার এই সময়টায় এক অদ্ভূত বিষন্নতা ছেয়ে থাকতো... ছুটি শেষ, এবারে শুধু পড়া, পড়া আর পড়া... সব আনন্দ শেষ, শুধু শেষ হয়নি হোমটাস্ক... আজও সেই মনখারাপটা একই রকম রয়ে গেছে... -ওই যে দেখছো, দূরে একটা ঘরে এখনও আলো জ্বলছে, সেই ঘরে এক বৃদ্ধা জেগে। তাঁর ঘুম আসছে না। কোনোদিনই আসে না। দুই ছেলে-মেয়ে গত হয়েছেন। বৃদ্ধা এখন সারা বিছানাময় ছেলে-মেয়ের ছবি সাজিয়ে বসেছেন। ছবির সাথে কথা বলছেন। বলছেন- "বাবা রে আমার, মা রে আমার, ভালো আছিস তো? তোদের আর কোনো কষ্ট নেই তো"? ছবিতে হাত বোলাচ্ছেন... কাঁদছেন... ওনার সব উৎসব, সব আনন্দ শব হয়ে গেছে কবেই... -আর ওনার ছেলে-মেয়েরা? ওদের দেখতে পাচ্ছো তুমি? -পাচ্ছি তো! ওরাও আছে। খাটের পাশে থমকে দাঁড়িয়ে। একে ওপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। দুই ভাই-বোন চেপে ধরছে একে অপরের হাত... -বলো না, রাত, ফাঁকা বাড়িতে কে আমার নাম ধরে ডাকে বারবার? অন্ধকার রাতে কে আমার জানলায় টোকা দিয়ে যায়? আয়নার ওপারের জগত থেকে কেন ঠক্ ঠক্ শুনতে পাই আমি? ঘুম ভেঙে জেগে উঠলে কাকে দেখি আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়তে? ভর সন্ধ্যায় কে সরে যায় বারবার আমার দরজা থেকে? -আগেই তো বলেছি, কোজাগরী, এসব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না। কারণ, উত্তর তুমি জানো। -আমি কি তবে হত্যা করেছি কাউকে? -করেছো তো। অজস্রবার খুন করেছো তুমি নিজেকে! -না হলে যে সত্যি সত্যি আমায় মরে যেতে হতো... এই দেখো... আরেকটু হলেই তোমায় ভুল নামে ডেকে ফেলছিলাম! -ঠিক নামেই তো ডাকতে গিয়েছিলে, কোজাগরী। আমার তো শুরু নেই, শেষও নেই! আমি ছিলাম, আছি, থাকবো। তোমার আগেও ছিলাম। তোমার পরেও থাকবো। থাকবো তোমার সেই কাঙ্খিত শেষযাত্রায়... সেদিন আমায় অন্তত সঙ্গে নিও, কোজাগরী! -রাত, তুমি খুব সুন্দর... বড় প্রিয় তুমি আমার... এ ভাবেই সাথে থেকো... ছেড়ে যেও না আমায়... একথা বলতেই দেখলাম ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেলো রাত। ফুটতে থাকা ঊষার নীল আলোয় যতদূর দেখা যায়, আমি দেখতে থাকলাম ডানা মেলে রাতের উড়ে যাওয়া... মনে মনে বললাম -আবার এসো বন্ধু, কোনোরাতে... কথা হবে আবার, সারারাত... অপেক্ষায় থাকবো...