Samokal Potrika

নেতাজীর লেখা The Indian Struggle বইটি আর একবার পড়া শুরু করেছি।[ উত্তরাধিকার সূত্রে দাদুর [পিতামহ] কাছ থেকে যত বই পেয়েছি তার মধ্যে এই বইটি এক অমূল্য সম্পদ। আর একটি বইও কম যায় না রমেশ চন্দ্র মজুমদারের বাংলার ইতিহাস। [প্রসঙ্গত জানাই দাদু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন এবং বেশ কয়েক বছর কারাবাসও করেছিলেন। কিন্তু ফ্রীডম ফাইটারস পেন্সন নামক বস্তুটিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। [অথচ তাঁর দুই ভাই [মেজ এবং ছোট দাদু] ভুয়ো কাগজপত্র তৈরি করে এই সুবিধা নিয়েছিলেন। ফলশ্রুতি হিসেবে তিনি তাঁদের মুখদর্শন করতেন না। দাদুর কাছেই আমি প্রথম নেতাজী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প শুনি। আর ঠাকুরমার কাছে রামায়ণ, মহাভারত। যাক সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।]
বইটির দুটি খণ্ড। 1920—42 এই বাইশ বছরে ঘটে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিবৃত্তই যে এখানে স্থান পেয়েছে তা নয়, লড়াইয়ের বিভিন্ন দিক, ভুল ত্রুটি, এমনকি মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে শুরু করে দেশ স্বাধীন হবার পর ঠিক কী ধরণের শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন হওয়া উচিত এই সমস্ত বিষয়গুলি যথাযথ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই এটিকে ভারতের মাটিতে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৪৮ সালে এই বইটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু তার প্রায় তের বছর আগে [১৯৩৫ সালে] নেতাজী কিভাবে এই বইটি ইটালির সর্বাধিনায়ক মুসোলিনিকে উপহার দিলেন ? হা হা হা বন্ধু ! এসব কথা বলার জন্যই তো এই পোষ্টটির অবতারণা। নিছক এই বইটি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মুসোলিনি, ফ্যাসিজম, জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নীতশে/ নীতজে [ Friedrich Nietzsche] এমনকি এডলফ হিটলারও এই আলোচনায় যখন তখন ঢুকে পড়তে পারেন। শুধু ধৈর্য ধরে কতটা পড়ে উঠতে পারেন সেটাই দ্যাখার। বইটির প্রথম খণ্ড [যেখানে ১৯২০---১৯৩৪ এই সময়কালের ইতিবৃত্ত আছে] ১৯৩৫ খৃস্টাব্দে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক Lawrence and Wishart. জানলে বিস্মিত হবেই নেতাজী ভিয়েনায় বসে এই বইটি লেখেন। তাই হাতের কাছে কোনো আনুষঙ্গিক তথ্যসূত্র অথবা নথী ছিল না। সম্পূর্ণ স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করেই ঐতিহাসিক এই গ্রন্থটির জন্ম হয়। দেখুন আবার প্রশ্ন করে বসবেন না ভিয়েনায় বসে লিখতে গেলেন কেন, কলকাতায় বসে লিখলে কী এমন ক্ষতি হোত ! হা হা হা ! সালটির দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন সেই সময় প্রিয় নেতার জীবনে ঠিক কোন ঝড়টি আছড়ে পড়েছিল। ভারতে থাকলে তবেই না কলকাতায় বসে লিখবেন ! বেনিটো মুসোলিনি নামক এক "ভয়ংকর" "হিংস্র" ফ্যাসিবাদী একনায়ককে বইটি উপহার দেওয়ার জন্যই ১৯৩৫ সালে রোম যাত্রা করেছিলেন, সেই অমূল্য আলোচনায় তো আসতেই হবে! তবে কিঞ্চিৎ পরে।
দ্বিতীয় খণ্ড (১৯৩৫ --১৯৪২) লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ইচ্ছে ছিল প্রথমে জার্মান ভাষাতেই বইটি প্রকাশ করবেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ তিনি ইউরোপেই ছিলেন। তবু তা করা যায়নি। অবশেষে ১৯৪৩ খৃষ্টাব্দে বইটির ইটালিয়ান সংস্করণ বের হয়। বলাই বাহুল্য বন্ধু এবং প্রেমিকা এমিলি শেংকল এ বিষয়ে তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেন।
প্রিয় বন্ধু আপনাদের মনে হতেই পারে আমি কেন হঠাত Indian Struggle নামের বইটি নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়লাম? সবাই যখন নেতাজীর মৃত্যুরহস্য নিয়েই অত্যন্ত আগ্রহী এবং ব্যস্ত, আমি কেন তাঁর এই বইটি নিয়ে এত দীর্ঘ আলোচনায় ব্যাপৃত হলাম? একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন আমিও আসলে নেতাজীর মৃত্যু নিয়েই আলোচনায় বসেছি। মৃত্যু দুরকম -- শারীরিক মৃত্যু এবং আত্মিক অর্থাৎ একটি মানুষের চিন্তাধারার মৃত্যু। কিন্তু আমি কি সত্যি-ই মৃত্যুর কথা বলছি? না, বন্ধু আমি হত্যার কথা বলছি। ঠাণ্ডা মাথায় খুন। হ্যাঁ আমার দাদুর মত আমিও বিশ্বাস করি নেতাজীকে পরিকল্পনা মাফিক হত্যা করা হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রে সামিল ছিলেন নেহেরু স্বয়ং। 'জাতির জনক' ও সব কিছু জানতেন। নিছক শারীরিক মৃত্যু নয়, তাঁর আদর্শ, পথ এবং চিন্তাধারারও যাতে সলিল সমাধি ঘটে তার জন্য যা যা করা দরকার সব কিছুই করেছিল এই ষড়যন্ত্রকারীর দল। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে নেহেরুর স্তাবক এবং সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলেরও অভাব হয়নি। বামৈশ্লামিক ( এই শব্দটির বিশদ ব্যাখ্যা এবং তাতপর্য নিয়ে আর একটি পোষ্ট করার ইচ্ছে আছে।) লবির নেতা এবং নেত্রীর দল হয় মুখে কুলুপ এঁটেছেন অথবা নেতাজী সত্যি সত্যি বিয়ে করেছিলেন কিনা, অনিতা আদৌ তাঁর মেয়ে কিনা এই সব অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কালক্ষেপ করেছেন। (ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা অশোক ঘোষের কথা মনে পড়লে হাসব না কাঁদব এখনও বুঝতে পারিনা)। আসুন এবার দেখে নেওয়া যাক তথাকথিত উদারবাদী ফেবিয়ান জহরলাল নেহেরু এবং ইসলাম তোষণকারী মহাত্মা গান্ধী নেতাজীকে এত ভয় পেয়েছিলেন কেন? বলব। আপনারাও কিছু কিছু জানেন। তবে আর একটু গভীরে যেতে হবে।

আসুন এবার দেখে নেওয়া যাক বিতর্কিত এই বইটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবিবরণী ছাড়া নেতাজী আর কী বলতে চেয়েছিলেন। তথাকথিত ইতিবৃত্ত নয়, এই বইটির সম্পদ হল গান্ধী (এবং তাঁর চামচে জহরলাল) সম্পর্কে তাঁর খোলামেলা মূল্যায়ন এবং স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষ ঠিক কোন পথে যাবে তার একটি দ্যর্থহীন রূপরেখা। কী সেই পথ ?
“India needs a ruthless dictator for twenty years after liberation.” অর্থাৎ স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারতবর্ষ নামক দেশটির অন্তত কুড়ি বছর কঠোর একনায়কতন্ত্রের অধীনে থাকা দরকার। হ্যাঁ বন্ধু ভারত এবং ভারতবাসীর সার্বিক উন্নয়ন এবং অগ্রগতির লক্ষ্যে তিনি বার বার এই কথাটিই বলে গেছেন। কেবল মাত্র এই বইটি নয়, অনেক আগে থেকেই দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি এই বার্তাটি দিয়ে এসেছেন। আসুন একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক।
১৯৩০ খৃস্টাব্দে কলকাতার মেয়র হিসেবে তিনি যে অবিস্মরণীয় উদ্বোধনী বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি---
“… I would say we have here in policy and programme a synthesis what modern Europe call socialism and Fascism. We have here the justice, the equality, the love, which is the basis of Socialism, and combined with that we have the efficiency and the discipline of Fascism as it stands in Europe today.”
যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় –
“আমি যে কর্মসূচীর কথা বলতে চাই আধুনিক ইয়োরোপের ভাষায় সেটি হোল সমাজতন্ত্র এবং ফ্যাসিবাদের সার্থক সমন্বয় ! এভাবেই আমরা সমাজতন্ত্রের মূলগত ভিত্তি-- সুবিচার, সাম্য, সৌভাতৃত্ব এবং তার সঙ্গে ফ্যাসিবাদের গুণাবলি যেমন দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তীতার মিশ্রণ ঘটাতে সক্ষম হব।”
কী চমকে উঠলেন তো ? দেখে নিন পিলেটা ঠিক জায়গায় আছে কিনা ! বলে কী ! ফ্যাসিবাদের গুণাবলী ! পাগল নাকি ! ফ্যাসিবাদের গুণ কবে থেকে পয়দা হোল ! নাজিবাদ ফ্যাসিবাদ [Nazism and Fascism] এসব তো নরঘাতক এবং পৈশাচিক দর্শন ! না, বন্ধু এবার ঠিক হয়ে বসুন। চশমাটা ঠিকই আছে। নেতাজীরও মতিভ্রম হয়নি। আপনাকেও এক বিশেষ প্রজাতীর প্রগতিশীল গোষ্ঠী বার বার ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ডেকেছে। লেবেলও সেঁটে দিয়েছে ! অথচ একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন সাম্প্রদায়িক আপনি নন, ওরা ! ব্যাপারটা এখানেও অনেকটা এক রকম। মুসোলিনি যেহেতু হিটলারের অক্ষশক্তিতে [Axis power] যোগ দিয়েছিলেন তাই মিত্রশক্তির পাণ্ডা বিশেষ করে আমেরিকা আর রাশিয়ার কাছে মুড়ি মুড়কী এক হয়ে গিয়েছিল। নাজিবাদ আর ফ্যাসিবাদ মোটেই এক বস্তু নয়। তথাকথিত বামপন্থী, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, ফেবিয়ানিষ্টদের সুনিপুণ প্রোপ্যাগান্ডায় ফ্যাসিবাদ শব্দটি এখন গালিগালাজের সমার্থক হয়ে গেছে। বাস্তব কিন্তু অন্য কথা বলে। মুসোলিনির মত দক্ষ, শিক্ষিত এবং নিয়মানুবর্তী প্রশাসক পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। কতটা এবং কোন মাত্রার ব্যক্তিত্ব থাকলে নেতাজীর মত একজন মানুষের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করা যায়, শুধু সেটাই না হয় ভাবতে থাকুন। আর তাই এক কপি বই দেবার জন্য তিনি রোমে ছুটে গিয়েছিলেন। না, বেনিটো মুসোলিনি হিটলারের biological race supremacy বিশ্বাস করতেন না। একবারও মেনে নেন নি German blood is the purest blood of the world ! তাই ইহুদী হত্যা সমর্থনের প্রশ্নই আসে না। তাঁর একমাত্র ভুল [mistake নয়, blunder] হিটলারের সঙ্গে যোগ দেওয়া। প্রাথমিক বন্ধুত্বের সময় তিনি হিটলারকে ঠিক চিনতে পারেন নি। মুসোলিনির অবস্থা অনেকটা কর্ণের মত ! ঠিক হচ্ছে না জেনেও শেষ পর্যন্ত পাশে থাকা। বন্ধু যে ! বিপদে ফেলে যাওয়া যায় ! দুর্যোধনের সঙ্গেও কর্ণেরও এমন বন্ধুত্ব হয়েছিল ! মনে পড়ে ? ফিদেল কাস্ত্রো যখন আর্মি ফেটিগ পরেন, তিনি পরিত্রাতা হয়ে যানে, আর মুসোলিনি অথবা নেতাজী পরলে প্রথম জন শয়তান আর দ্বিতীয় জন তোজোর কুকুর ! এই জঘন্য ষড়যন্ত্র কিভাবে রূপায়িত হয়েছিল একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উদ্ভুত পরিস্থিতিও এই ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠেছিল। মিত্র শক্তির জয়লাভ অর্থাৎ একদিকে সমাজতন্ত্রের প্রতিভূ জোসেফ স্তালিন আর অন্যদিকে ধনতন্ত্রের প্রতিভূ আমেরিকা। মুসোলিনি এবং তাঁর ফ্যাসিবাদ তো পরাজিত পক্ষ। অতএব বিশ্বজুড়ে বামপন্থা তথা স্তালিনীয় সমাজতন্ত্রের উত্থান ঘটল। জার্মানীকে দু ভাগ করা হোল। পূর্ব জার্মানী স্তালিন গিলে খেলেন আর পশ্চিম জার্মানী আমেরিকা। শুধু তাই নয় সমগ্র পূর্ব ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল স্তালিনের চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম সমাজতন্ত্র। রোমানিয়া, হাঙ্গেরী থেকে চেকোশ্লোভাকিয়া সর্বত্র তখন স্তালিনীয় সমাজতন্ত্রের ‘জয়জয়কার’। একদিকে ধনতান্ত্রিক যুদ্ধজোট নেটো [NATO] আর একদিকে সমাজতান্ত্রিক লবি ওয়ারশ [WARSAW] . ঠাণ্ডা লড়াই তুঙ্গে।তাই বিজয়ী পক্ষের দর্শনই বিশ্ববাসীর উপর চেপে বসল। হিটলারের ইহুদী হত্যা যে কত অমানবিক আর বর্বোরোচিত ছিল মানুষ জানল। জানল ‘ফ্যাসিবাদ’ একটা পূতিগন্ধময় এবং জান্তব দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু রেড ইণ্ডিয়ান তথা আমেরিকার আদিম অধিবাসী আপাচেদের উপর ‘আধুনিক’ সাদা মানুষ যে পৈশাচিক গনহত্যা চালিয়েছিল এবং তার ফলশ্রুতি হিসেবে কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল সেই মর্মান্তিক ইতিহাস চাপা পড়ে গেল। চাপা পড়ে গেল ভারতে ঘটে যাওয়া আর এক ভয়াবহ গণহত্যা। মহম্মদ ঘোরীর ভারত বিজয়ের পর প্রায় দুই শত বছর ধরে চলা এই গণহত্যার চরিত্র যদিও কিঞ্চিৎ ভিন্ন ছিল, তবু হত্যা হত্যাই। সে জাতিবাদের নামে হোক আর ধর্মের নামে হোক। ইহুদী হবার অপরাধে যেমন ষাট লক্ষ মানুষকে মরতে হয়েছিল, হিন্দু হওয়ার অপরাধেও মরতে হয়েছিল কয়েক কোটি মানুষকে। কিন্তু আমাদের ‘মহান’ ঐতিহাসিককুল এই সব হত্যালীলার উপর ফুলের গালিচা বিছিয়ে দিয়েছেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার এই বিকৃত ইতিহাস লিখতে রাজি হন নি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন মহম্মদ ঘোরির হাতে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয় অর্থাৎ ১১৯২ সালটিকেই পরাধীনতার সূত্রপাত হিসেবে ধরতে হবে। পলাশীর যুদ্ধ নয়। আর্যরাও বহিরাগত নয়। আর্য আসলে একটি ভাষাগোষ্ঠীর নাম। ফল যা হবার তাই হোল।এছাড়াও সিপাহী বিদ্রোহের চরিত্র এবং বিশ্লেষণ নিয়েও তীব্র মতান্তর তৈরি হয়। ভারতের ইতিহাস লেখার জন্য ১৯৫২ সালে [প্রস্তাবটি এই মহান ঐতিহাসিকই দিয়েছিলেন] যে সরকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ডাইরেকটর হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেই বোর্ড থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। ১৯৫৫ সালে এই বোর্ড তুলে নেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারী আমলা, শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কলাম আজাদ থেকে শুরু করে তথাকথিত মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিকদের ন্যক্কারজনক ভূমিকা এই সব আর একটি পোষ্ট লেখার ইচ্ছে আছে।
এবার আবার তাঁর বইতে ফিরে আসি। হ্যাঁ Indian Struggle ! দেখুন এই একই কথা লেখা আছে। বাংলা তর্জমা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
“Considering everything, one is inclined to hold that the next phase in world-history will produce a synthesis between Communism and Fascism and will it be a surprise if that synthesis is produced in India?”--- Indian Struggle
হ্যাঁ বন্ধু এই মহান দেশেই তিনি এক মহান আদর্শের জন্ম দিতে চেয়েছিলেন। আপনার আমার প্রিয় নেতা—আমাদের অনন্য এবং একমাত্র নেতাজী !
আসুন আরও একবার পড়ে ফেলি কংগ্রেস দল এবং সংশ্লিষ্ট নেতৃবর্গ নিয়ে তাঁর কেমন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।
“The Congress Socialists appear at the moment to be under the influence of Fabian Socialism and some of their ideas and shibboleths were the fashion several decades ago.” — Indian Struggle.
যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়---
“কংগ্রেস দলটিতে সমাজতান্ত্রিক হিসেবে পরিচিত যারা আছেন তাঁদের সবাই ফেবিয়ান [যারা বিপ্লবের পরিবর্তে ক্রমিক পরিবর্তনে বিশ্বাস রাখেন। অর্থাৎ ক্রমান্বয় সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে সাম্যবাদে উত্তরণ। এঁরাই মডারেট বাম বলে পরিচিত।] এঁদের অনেক ধ্যান ধারণা এবং বিশ্বাস কয়েক দশক পিছিয়ে আছে।“
কী ভাবছেন? এই বইটি লেখার আগে নেতাজীর মনোভাব নেহেরু অথবা গান্ধী জানতেন না ? আলবৎ জানতেন। তার প্রমাণ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। নেতাজী কখনই তাঁর চিন্তাভাবনা গোপন করেন নি। তাঁর জীবনে কোনও ভণ্ডামী ছিল না। যা বিশ্বাস করতেন, তাই বলতেন, এবং বলাই বাহুল্য তাই করতেন। এহেন নেতাজীকে ক্ষমতালিপ্সু এবং বামৈশ্লামিক নেহেরুরা ভয় পাবেন না ?
প্রশ্ন জাগে তাঁর স্বল্প জীবনকালে [যা আমাদের সামনে আছে] তিনি এত কিছু জানলেন কি করে ! নিরন্তর অধ্যয়ন ! হ্যাঁ বন্ধু। এমন জ্ঞানপিপাসু মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশ কেন, সমগ্র পৃথিবীতেই বিরল। মান্দালয় এবং আলিপুর জেলে বন্দী থাকাকালীন তিনি বেশ কিছু রাজনৈতিক তত্ত্বের বই পড়ে ফেলেন। যেমন ফ্রানসিসকো নিত্তির ‘বলশিভিজম’, ফ্যাসিজম এণ্ড ডেমোক্র্যাসি, আইভ্যানহো বোনোমির ‘ফ্রম সোশ্যালিজম টু ফ্যাসিজম’। বলাই বাহুল্য এই নিবিড় অধ্যয়ন তাঁর দীর্ঘ সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার রদবদল ঘটায়। তিনি পরিণত হন। নেতা থেকে নেতাজী। হ্যাঁ তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন ফ্যাসিজম আর কমিউনিজম বিপরীত মেরুর চিন্তাভাবনা নয়। এই দুই শিবিরের সার্থক মেলবন্ধন সম্ভব। ফ্যাসিজম অর্থ যদি নিছক একনায়কতন্ত্রের অত্যাচার এবং নির্মম শাসনই বোঝায় তবে সবচেয়ে বড় ফ্যাসিষ্ট জোসেফ স্তালিন, মুসোলিনি নয়। কোন একটি মতবাদের সফল রূপায়ন কেবল মাত্র ইজমটির উপর নির্ভর করে না। অনেকাংশে সেই ব্যক্তিটির উপরও নির্ভর করে। নইলে যে মতবাদ পোল পটের জন্ম দিয়েছে, স্তালিনের জন্ম দিয়েছে, সে-ই আবার কিভাবে হো চি মিন এবং কাস্ত্রোর জন্ম দেয়।


ইংলণ্ডে থাকাকালীন তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির গণ্যমান্য নেতা এবং প্রখ্যাত চিন্তাবিদ মিলিয়ে তাঁর সাক্ষাৎ তালিকাটি বেশ দীর্ঘই ছিল-- লর্ড হ্যালিফেজ, জর্জ ল্যান্সবেরি, ক্লিমেন্ট এটলি, আর্থার গ্রিনউড, হ্যারল্ড ল্যাস্কি, জে বি এস হ্যাল্ডেন, আইভর জেনিংস, গিলবার্ট মুরে এবং স্যার স্ট্যাফর্ড ক্রিপস। এই সব মূল্যবান মত বিনিময় এবং অধ্যয়নের মাধ্যমেই তিনি উপলব্ধি করেন আধুনিক তুরস্কের জন্মদাতা কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে এমন একজন একনায়কই ভারতের পক্ষে আদর্শ হতে পারে। স্বাধীনতার পর অন্তত কুড়ি বছর। তারপরই অশিক্ষা এবং অজ্ঞতার পাঁকে ডুবে থাকা ভারতবর্ষ হয়ত পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির যোগ্য হয়ে উঠবে। অশিক্ষিত, অজ্ঞ, বহু ধর্ম আর ভাষায় বিভক্ত দেশবাসীর হাতে গণতন্ত্র ধরিয়ে দেওয়ার অর্থ নাবালকের হাতে আগুন তুলে দেওয়া।
১৯২৮ খৃষ্টাব্দে Bengal Branch of the Independence for India League এর সামনে তিনি প্রথম এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। লিগের ম্যানিফেস্টোতে তিনি নিম্নলিখিত প্রস্তাব তথা দিকনির্দেশ লিপিবদ্ধ করেন—
১] সমস্ত মূল এবং ভারি শিল্পের জাতীয়করণ। অর্থাৎ কমিউনিস্ট আদর্শের অনুসরণে রাষ্ট্রই সব উৎপাদনের মালিকানা গ্রহণ করবে [state ownership of the means of production]
২] রেল, জাহাজ এবং বিমান –এই সবও রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে। \
৩] একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কত টাকার মালিক হবেন অথবা কত সম্পত্তি থাকবে তার একটি সিলিং নির্ধারিত হবে।

কী বুঝলেন বন্ধু ? ফ্যাসিবাদী [হ্যাঁ আপনার চেনা বামপন্থীরা তাঁকে এই নামেই ডাকেন] নেতাজীকে খুব অত্যাচারী মনে হচ্ছে ? প্রথম দুটি কাজ কিন্তু জহরলাল নেহেরু কিন্তু কম বেশি করেছিলেন। কিন্তু আসল কাজটি করতে গেলে তো মুসোলিনি বা আতাতুর্ক হতে হয়। তাই ব্যক্তিগত সম্পত্তির সিলিং তিনি বেঁধে দিতে পারেন নি। স্বাভাবিক ! নিজের সম্পত্তি নিয়েই যে টানাটানি পড়ে যেত। আদ্যন্ত ভোগী একটি মানুষ এমন ত্যাগ করবেন কি করে ! তাই সত্যিকারের কাজটাই করা হয়ে উঠল না।বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে গেলে যে নেতাজী হতে হয়। ফলে যা হবার তাই হোল। ধনী দরিদ্রের বিভাজন এবং বৈষম্য বেড়েই চলল। মুকেশ আম্বানীর সাতাশ তলা প্রাসাদে ঢিল ছুঁড়ে লাভ নেই বন্ধু। ঢিল ছুঁড়ুন গান্ধী-নেহেরুর পূতিগন্ধময় আঁতাতকে। তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং বামৈশ্লামিক লবিকে। মূলটা অনেক গভীরে।
এবার আসুন নেতাজীর টোকিও বক্তৃতার একটি অংশ তুলে নিয়ে আসি। দেখুন কী গভীর প্রজ্ঞা ! কী অবিস্মরণীয় দূরদৃষ্টি ! মাতৃভূমির জন্য কী ভালবাসা !

“When we see National Socialism in Europe today, what do we find? National Socialism has been able to create national unity and solidarity and to improve the condition of the masses.But it has not been able to radically reform the prevailing economic system which was built up on a capitalistic basis. On the other side, let us examine the Soviet experiment based on Communism. You will find one great achievement and that is planned economy. Where communism is deficient is that it does not appreciate the value of national sentiment. What we in India would like to have is a progressive system which will fulfil the social needs of the whole people and will be based on national sentiment. In other words, it will be a synthesis of Nationalism and Socialism. This is something which has not been achieved by the National Socialists in Germany to-day.” — Tokyo speech
বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় ----
ইয়োরোপের জাতীয় সমাজতন্ত্র আমাদের আমাদের কি শিক্ষা দিচ্ছে ? এই ব্যবস্থা যে জাতীয় সংহতি এবং সৌভ্রাতৃত্ব সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও বেশ খানিকটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ধনতন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া অর্থনীতির আমূল সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে যদি সোভিয়েত কমিউনিজম এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষার উপর আলোকপাত করি তবে নিঃসন্দেহে একটি সুপরিকল্পিত অর্থনীতির সম্মুখীন হব। কিন্তু এই কমিউনিজমেরও একটি বড় ত্রুটি বা ঘাটতি আছে। সে জাতীয় আবেগ কিম্বা দেশপ্রেমকে কোনো গুরুত্ব দেয় না। [স্বাভাবিক, কারণ মার্ক্স লেনিনের কমিউনিজম আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী।সমগ্র পৃথিবীর দিকেই তার নজর। কী বন্ধু আর কিছুর সঙ্গে মিল পাচ্ছেন না ? পাবেন। ভাবতে থাকুন।] কিন্তু ভারতে আমরা এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োগ করতে চাই যা জনগণের আর্থ-সামাজিক প্রয়োজন যেমন মেটাবে, তেমনই দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত করবে। এক কথায় জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রের একটি সুষম মিশ্রণ চাই আমাদের। এটি এমন এক লক্ষ্য যা জার্মানীর ন্যাশনাল সোশালিষ্টদের পক্ষেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।”
এবার আসুন দু একটি পলিটিকাল টার্ম তথা রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিই। নইলে উপরিউক্ত উদ্ধৃতিটি বুঝতে অসুবিধা হবে। জাতীয় সমাজতন্ত্র অথবা জাতীয় সমাজবাদ বলতে নেতাজী ঠিক কি বোঝাতে চেয়েছেন, জানা খুব জরুরী। তবে আগেই বলে রাখছি অবাক হবেন না। আচ্ছা বলুন তো নাজি [ NAZI] বা নাৎসি শব্দটির অর্থ কি? এটা নিশ্চয় বলে দিতে হবে না হিটলার এই দলটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাক শুনে রাখুন নাজি হোল National Socialist party ! অর্থাৎ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ! হ্যাঁ ভাষাটা শুধু জার্মান। বুঝুন কাণ্ড ! এখানেও সমাজতন্ত্র ! হ্যাঁ বন্ধু মহান নেতাজী তাঁর বক্তৃতায় এই সমাজতন্ত্রের কথাই বলতে চেয়েছেন।ইয়োরোপের জাতীয় সমাজতন্ত্র বলতে তিনি ইটালি এবং জার্মানীকেই বোঝাতে চেয়েছেন। এই দেশ দুটিই দেশপ্রেমকে [যা ক্রমশ উগ্র জাতীয়তাবাদ বা jingoism এ পরিণত হয়] নির্ভর করে শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। তা সত্ত্বেও নেতাজী এদের ত্রুটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। ভাবা যায় ! তিনি যখন কমিউনিজমের ত্রুটি নিয়ে লিখছেন, বলশেভিক বিপ্লবের পর সদ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হচ্ছে। ১৯১৭ সালে নভেম্বর বিপ্লব সংঘটিত হয়। আর ১৯২৮-৩০ খৃষ্টাব্দেই তিনি এই ব্যবস্থার ভুল ত্রুটি ধরে ফেলেছেন। কতটা প্রজ্ঞা এবং গভীরতা থাকলে এটা সম্ভব।

কিন্তু মার্ক্স লেনিনও সমাজতন্ত্র ! মুসোলিনিও সমাজতন্ত্র ! আবার হিটলারও সমাজতন্ত্র ! ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে লাগছে না ? লেনিন, স্তালিন, মাও এরা কত মহান ! আর হিটলার, মুসোলিনি এরা তো নর্দমার কীট ! তবে সমাজতন্ত্র হোল কি করে ? সত্যি-ই তো ! আসুন তবে সমাজতন্ত্র বস্তুটা কী সেটা আগে বুঝে নেওয়া যাক। দীর্ঘ আলোচনার পরিসর এখানে নেই। তাই সংক্ষেপেই সারতে হবে।
Socialism is a range of economic and social systems characterised by social ownership and democratic control of the means of production; as well as the political ideologies, theories, and movements that aim to establish them.

ইংরেজী অভিধানে আমরা এই সংজ্ঞাটিই পাচ্ছি। অর্থাৎ সোশ্যালিজম বা সমাজতন্ত্র হোল এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদন যন্ত্রের উপর সামাজিক তথা গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সমস্ত দর্শন, আদর্শ তথা কর্মকাণ্ড এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্যই অনুসৃত হয়। তবে এই নিয়ন্ত্রণ কেমন, কতটা এবং কিভাবে হবে তার উপর নির্ভর করেই এত সব ভিন্ন ভিন্ন নাম এবং আদর্শের জন্ম। ফেবিয়ান সোশ্যালিস্ট জহরলাল নেহেরুও উৎপাদন ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক, রেল ইত্যাদির উপর রাষ্ট্রের মালিকানা স্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর লক্ষ্য যে Socialistic pattern of society একথা স্পষ্টই বলেছিলেন।সমসাময়িক যে কোনো জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রেই এই পদক্ষেপগুলি নেওয়া হোত। একথা অস্বীকার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না যে বলেশিভিক বিপ্লবের চমকপ্রদ সাফল্য আপামর মানুষকে অনিন্দ্যসুন্দর একটি স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সবার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ইত্যাদি। কোনও দেশের পক্ষেই তার প্রভাব এড়ানো সম্ভব ছিল না। আর কিছু হোক বা না হোক ‘সমাজতন্ত্র’ নামক মোহময়ী শব্দটি যেন তেন প্রকারেণ সংবিধান কিম্বা দেশচালনার মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেই হোত।১৯৪৭ সালের GATT যখন ১৯৯৫-এর W.T.O হোল, বিশ্বায়নের আবির্ভাব একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেল। উৎপাদন যন্ত্রের উপর রাষ্ট্রের মালিকানা শিথিল হতে শুরু করল। কিন্তু তার আগের ইতিহাস যদি খেয়াল করেন দেখবেন পৃথিবীর সব দেশই এই সমাজতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়ে চলেছিল। তার চরম পরিণতি-ই হোল বলশেভিক বিপ্লব।আংশিক রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে সামুহিক রাষ্ট্রীয় মালিকানার দিকে প্রথম পদক্ষেপ। যেখানে ব্যক্তি মালিকানার আর কোনও জায়গা-ই থাকল না। ব্যাকরনগত ভাবে কমিউনিজম বলতে যা বোঝায় [commune শব্দটি থেকে যার উৎপত্তি] সোভিয়েত ইউনিয়নে সেটি-ই প্রতিষ্ঠিত হোল। যদিও কেউ কেউ বলেন সমগ্র পৃথিবীতে এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোলে তবেই তা সোশ্যালিজম থেকে প্রকৃত কমিউনিজমে রূপান্তরিত হবে।
কিন্তু হিটলার কিম্বা মুসোলিনির সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিমালিকানা পুরো মাত্রাতেই ছিল।কারণ সেখানে কমিউনিজম ছিল না, সামাজিক সম্পদের উপর রাষ্ট্রের আংশিক মালিকানা ছিল মাত্র। নেতাজী একেই বলেছেন National socialism. ন্যাশনাল সোশ্যালিজম বলতে তখন ইয়োরোপে ফ্যাসিবাদ [Fascism] এবং নাজিবাদকেই [Nazism] বোঝানো হোত।
এবার দেখে নিই হিটলার ঠিক কি চেয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য নাজিবাদ হোল চরম দক্ষিণপন্থী একটি আদর্শ যার সঙ্গে ফ্যাসিবাদের বেশ সাদৃশ্য আছে। অনেকে বলেন নাজিবাদ আসলে ফ্যাসিবাদেরই একটি শাখা। কারণ দুটি দর্শনই scientific racism এবং antisemitism এর উপর প্রতিষ্ঠিত। আসুন এবার বোঝার চেষ্টা করি scientific racism অর্থাৎ বিজ্ঞানসম্মত জাতিবাদ ব্যাপারটা কি। মোটেই কোনো জটিল ব্যাপার নয়। আমরা সবাই race শব্দটার সঙ্গে কম বেশি পরিচিত এবং জানি যে মূলত শারীরিক বৈশিষ্ট যেমন উচ্চতা, গায়ের রঙ, চোখ, মুখ এবং চোয়ালের আকৃতি ইত্যাদি অনুসারে মানবজাতিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, নিগ্রয়েড, অষ্ট্রলয়েড, প্রোটো অষ্ট্রলয়েড, ককেশিয়ান ইত্যাদি। এনথ্রোপোলজি বা নৃতত্ব শাস্ত্র এই জাতীয় জ্ঞান ও তথ্য নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু যদি এই race এর উপর নির্ভর করে মানবজাতিকে উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট অথবা কম উৎকৃষ্ট, কম নিকৃষ্ট ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করা হয় অর্থাৎ শারীরিক বৈশিষ্টের উপর ভিত্তি করে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়, কেবল তাই নয় বিজ্ঞানকে শিখণ্ডী করে তাকে সঠিক প্রমাণ করার প্রয়াস করা হয়, তখনই scientific racism এর সূত্রপাত হয়।এবার বুঝতে পারছেন তো হিটলার কেন ইহুদীদের পছন্দ করতেন না। anti-semitism শব্দটির অর্থই হোল চরম ইহুদী বিদ্বেষ। বলাই বাহুল্য এর ভিত্তিও সেই scientific racism . হিটলার বিশ্বাস করতেন জার্মান জনগোষ্ঠীই হোল সবচেয়ে খাঁটি [purest] এবং উৎকৃষ্ট প্রজাতির মানুষ---Nordic master race. এই ‘বিশুদ্ধতম’ জার্মানরাই সমগ্র পৃথিবী শাসন করার অধিকার এবং হিম্মত রাখে এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তিনি প্রথমের জার্মান দেশটিকে কেবল মাত্র উৎকৃষ্ট মানুষের বাসভূমিতে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়ে ফেলেন। শুরু হয়ে যায় ইহুদী নিধন। মিত্র শক্তির পরিসংখ্যান বলে হিটলার তাঁর অধিকৃত ভূখণ্ডের অন্তর্গত প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করেন। scientific racism কে মজবুত করার উদ্দেশ্যে social Darwinism তত্ত্বের আমদানি করা হয়। অর্থাৎ সামাজিক ক্ষেত্রে natural selection [প্রাকৃতিক নির্বাচন] এবং survivival of the fittest এই দুটি মতবাদের প্রয়োগ ।যোগ্যতম প্রজাতি [race] টিকে থাকবে, অযোগ্যরা নিশ্চিহ্ন হবে। বলাই বাহুল্য হিটলারের পতনের অন্যতম বড় কারণ এটাই। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এই উন্মাদ বিজ্ঞানকে সমর্থন করবে না। কারণ সব race থেকেই আমরা অসাধারণ মেধা সম্পন্ন প্রতিভাধর মানুষ পেয়েছি। আর ইহুদী ? এত বড় প্রতিভার তালিকা বোধহয় অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে নেই। আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে সিগমণ্ড ফ্রয়েড, নীলস বোহর, দার্শনিক স্পিনোজা, মোজেস, আব্রাহাম এমনকি যীশু খৃষ্টও ইহুদী ছিলেন। এখনও পর্যন্ত যত জন নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন তাঁদের একটি বড় অংশই ইহুদী। অর্থনীতির ৪১%, মেডিসিনের ২৮%, পদার্থবিদ্যার ১৬%, রসায়নের ১৩% এবং শান্তির ৯% পুরষ্কার তো এঁরাই নিয়েছেন। অথচ ইহুদীদের জনসংখ্যা সাকুল্যে কত জানেন ? সমগ্র পৃথিবীতে খুব বেশি করে ধরলেও মাত্র ১৫ মিলিয়ন অর্থাৎ এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ ইহুদী আছে। তার ষাট লক্ষই বাস করে ইজারায়েলে। এবার নিশ্চয় এঁদের প্রতিভা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ অনুমান করতে পারছেন। হিটলারের বিতাড়িত ইহুদী বিজ্ঞানীরাই কিন্তু পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমাদুটি [লিটল বয়, ফ্যাট ম্যান] নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁদের অনুরোধেই কিন্তু জার্মানীর উপর না ফেলে বোমা দুটি জাপানের উপর ফেলা হয়েছিল।
বলাই বাহুল্য নাজিবাদের বেশ কিছু গুণাবলী [যেমন নিয়মানুবর্তিতা, দক্ষ প্রশাসন, দেশপ্রম ইত্যাদি] সত্ত্বেও এই বিধ্বংসী scientific racism একে একটি ঘৃণ্য মতবাদে পর্যবসিত করেছে। প্রিয় নেতাজী জানতেন যে জার্মানীর পতন আসন্ন। হিটলারের তথাকথিত সমাজতন্ত্র যে ভারতের জন্য নয়, সে কথা তিনি বার বার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। উপরিউক্ত বক্তৃতাতেই তার উল্লেখ আছে।

এবার ফ্যাসিবাদটা ঠিক কি একটু বুঝে নেওয়া যাক। মুসোলিনি যদি হিটলারের সঙ্গে হাত না মেলাতেন তবে ফ্যাসিজমই হয়ত পৃথিবীর অনেক দেশের [বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশ] উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কারণ হতে পারত। একটা পচা আমের সঙ্গে যদি দশটা ভাল আমও রাখা হয়, তাদের পরিণতি এবং পরিচিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আগেই বলেছি ফ্যাসিবাদ আর নাজিবাদ এক বস্তু নয়। আসুন দেখে নেওয়া যাক।
Fascists believe that liberal democracy is obsolete, and they regard the complete mobilization of society under a totalitarian one-party state as necessary to prepare a nation for armed conflict and to respond effectively to economic difficulties.Such a state is led by a strong leader—such as a dictator and a martial government composed of the members of the governing fascist party—to forge national unity and maintain a stable and orderly society. Fascism rejects assertions that violence is automatically negative in nature, and views political violence, war, and imperialism as means that can achieve national rejuvenation.Fascists advocate a mixed economy, with the principal goal of achieving autarky through protectionist and interventionist economic policies.
কি পেলাম ? ফ্যাসিবাদ মনে করে উদারপন্থী গণতন্ত্র [ পড়ুন পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি] এখন অচল। সমগ্র সমাজ তথা জনগোষ্ঠীকে একটি সার্বভৌম একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে এনে একটি শক্তিশালী জাতি গঠন যা নিজেকে বাঁচানোর প্রয়োজনে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং আর্থিক সমস্যা মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একজন শক্তিশালী নেতা বা সর্বাধিনায়ক [dictator] অথবা যুদ্ধ করতে পিছপা হবে না এমন একটি সরকার [যা ফ্যাসিষ্ট পার্টির সদস্য দিয়েই গঠিত] এই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। লক্ষ্য হবে জাতীয় সংহতির প্রতিষ্ঠিত একটি স্থায়ী এবং সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থা। ফ্যাসিজম হিংসাকে সবসময় নেতিবাচক বলে মনে করে না। বরং বিশ্বাস করে রাজনৈতিক হিংসা, যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ হতে পারে। ফ্যাসিবাদ মিশ্র অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং রুদ্ধ অর্থনীতির [বিশ্বায়নের একেবারে বিপরীত] মাধ্যমে একটি শক্তিশালী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই হোল ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য।

কী ? চমকে উঠলেন তো ? কমিউনিজম কমিউনিজম গন্ধ পাচ্ছেন না ? একদলীয় ব্যবস্থা, ডিক্টেটর, শৃঙ্খলা, রুদ্ধ অর্থনীতি ! ঠিক ধরেছেন। ফ্যাসিজম আর কমিউনিজম ঠিক কোথায় কোথায় এক আর কোথায় কোথায় আলাদা অনেক সময়ই গুলিয়ে যায়। আলোচনা করব। তার আগে দেখে নিই Lachlan Montagne নামক এক প্রখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান লেখক যিনি দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদ নিয়ে গবেষণা করেছেন, তিনি কি বলেন।
“Fascism is definitely revolutionary and dynamic.” আর একজন গবেষক Zeev Sternhell বলেন ‘Fascism is a form of extreme nationalism –neither right, nor left” . ফ্যাসিবাদকে ব্যাখ্যা করা কঠিন মেনে নিয়েও সমস্ত গবেষক কিন্তু এই দিকগুলি এক বাক্যে মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদকে দক্ষিণপন্থী কিম্বা বামপন্থী কোনটাই বলা যাবে না। এটি হোল দুইয়ের মিশ্রণ। বিশদে জানতে হলে রবার্ট প্যাক্সটনের লেখা Five Stages of Fascism লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন।

যাক এবার একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি এত সাদৃশ্য সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের উপর গণতন্ত্রী বিশেষ করে বাম এবং অতিবামদের এত ক্ষোভ আর ঘৃণা কেন ? সমাজতান্ত্রিক অথবা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর এই কমিউনিস্টরাই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার জন্ম দিয়ে থাকে। একটা গালভরা নামও আছে – Dictatorship of the proletariat ---অর্থাৎ সর্বহারার একনায়কতন্ত্র ! নির্বাচন তো দূরের কথা , গণতন্ত্রের গন্ধ পর্যন্ত নেই। তাই ফিদেল কাস্ত্রোরা মরার আগের দিন পর্যন্ত রাজত্ব করে যান। আরে বাবা একটাই তো দল ! নির্বাচন হবে কি করে ! অথচ এঁরাই আবার ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে দিন রাত গণতন্ত্র বিপন্ন ! গণতন্ত্র বিপন্ন বলে চিৎকার করে ! পান থেকে চুন খসলেই মানবাধিকার ভঙ্গের জিগীর তোলে ! ভণ্ডামো আর কাকে বলে ! তবু দেখাই যাক আপত্তিটা ঠিক কোথায় !
১] ফ্যাসিবাদ নাকি নাজিবাদের মতোই সমষ্টির চাইতে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেয়। সমষ্টি নয় ব্যষ্টি ! অর্থাৎ সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়াকে পদদলিত করে এঁরা নাকি জঘন্য ব্যক্তি পূজায় মেতে ওঠেন। কার পূজা করেন ? অবশ্যই সেই একনায়কের ! ইটালিতে মুসোলিনি, জার্মানীতে হিটলার ! হ্যাঁ বন্ধু ফ্যাসিজম বলুন আর নাজিজম বলুন এক নায়ককে সর্বশ্রষ্ঠ আসনটিই দেওয়া হয়। বাড়াবাড়িও হয়। এই যেমন ধরুন হিটলারকে সম্বোধন করে বলা হোত –Heil, mein Fuhrer [ Hail, my leader !] , Fuhrer is supreme ! হিটলার কখনও ভুল করেন না ইত্যাদি । বলাই বাহুল্য মুসোলিনিও ইটালিতে একই রকম বীরপূজা পেতেন। কিন্তু এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা কোথায় ? তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশেও যখন কোন দুর্নীতিপরায়ণ নেতা জেল থেকে বেরিয়ে আসেন, তাকেও ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয় ! কমিউনিসজমই হোক, আর ফ্যাসিজমই হোক ব্যক্তির মাহাত্মকে কখনও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। অথচ কী আশ্চর্য এই সহজ সত্যটিকে অবিচল কণ্ঠে বলে ফেলেছিলেন বলে প্রখ্যাত দার্শিনিক ফ্রিডরিক নীতজে-কেও ওরা ছাড়েনি। কোনো রকম ভাবনা চিন্তা না করেই বলে দেওয়া হোল তাঁর দর্শন থেকেই নাকি ফ্যাসিবাদ এবং নাজিবাদের জন্ম ! ভাবুন কাণ্ড ! এটা ঠিক যে মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সেই তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে চিন্তাভাবনাগুলোকে কোন নির্দিষ্ট অভিমুখ দিতে পারেন নি। তাই নীতজেই যে সবচেয়ে বেশি misquoted, misunderst