Samokal Potrika

আজ এইখানটা খুঁড়বি নাকি? হাতের লণ্ঠন নামিয়ে রেখে বলল কালো হুড পরা একজন। কাল
জল পড়েছে এখানে, সারাদিন ধরে আবছা অবহেলার বৃষ্টি, কুয়াশা। এইখানে গাছগুলোও কেমন যেন, অস্বাভাবিক, মহীরুহ, অতিকায় মহাদ্রুম। অনেক ওপরে তাদের শাখাপ্রশাখা থেকে ঝরছে টিপটিপ করে মসের গন্ধমাখা জল, খানিক সোঁদা, খানিক ম্লান। গাছেদের গায়ে সাদা খয়েরি লাইকেনের চাদর, ফার্নের সরু সবুজ কুণ্ডলী। নীচে, তারা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানটা ঝরাপাতার উঠোন। হলুদ, কালো, ফ্যাকাশে আর অনাবশ্যক লাল; মৃত পাতার এই স্তূপ কেউ ঘরে নিয়ে যায় না, সাজায় না রুপোলি ফুলদানীতে।

অন্যজন পাতা সরাচ্ছিল বেলচা করে। সে বলল, দেখ, পলছাতু উঠেছে কেমন; এইগুলো বিষ কিন্তু। একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে।

ওদের কালো টুপিতে ঢাকা লণ্ঠন থেকে কীরকম তীব্র আলো ঠিকরে এসে পড়ছিল নক্ষত্রহীন, বিজন সেই উপলভূমিতে।

চল, তাহলে শুরু করা যাক। হেই, হেই জোয়ান। হে, সাবধান।

মাটি নরম। মাটি নরম। নরম মাটিতে গাঁইতি ঢুকে যায় গভীরে। গভীরের আছে কিন্তু নিজের জোর, নিজের মতো করে আঁকড়ে ধরা। সে দেবে না, দেবে না আঘাতকে বহির্মুখী হতে; সে আঁচড়ায়, দু'হাত বাড়িয়ে জাপটায়, সে কামড়িয়ে ধরে।

হেই, হেই, সাবধান, সামাল, সামাল। এইখানটায় এক বিতস্তি চোরাবালি। সামাল। ধরে নাও গাছের ঝুরি, দৃঢ় বুনোট লতা, কোমরে বেঁধে রাখো নির্মোহ রশি। চালাও শাবল। গলন্ত, বহতা বালির নীচে চাপা পড়া সভ্যতার অপভ্রংশ ঝিকিয়ে উঠছে কি? হেইও, সামাল, ওই সামনে ভাঙা ভাঙা কাচের চুড়ি, কাককে ছুঁড়ে দেওয়া বিস্কুটের টুকরো। তার পাশেই ওগুলো কী; কতোগুলো ছেঁড়া ঘুড়ি আর শাড়ির পাড় মনে হচ্ছে না? এই যে এখানে, তেলসিঁদুরে আঁকা হাতের ছাপ, বসুধারা গড়ানো দেয়াল। ভাঙো, ভাঙ, চালাও শাবল এখানে।

হেই ও। হে ভাই, জল। হেএএ ভাই, দু'বাঁও মেলেএএ না, চার বাঁও মেলেএএ না। হেই সামাল, দশ বাঁও মেলেএএ না।

কালো জল উপচে উপচে পড়ে। আদিম মহাদ্রুমগুলির শিকড় প্লাবিত করে বন্যার মতো, অন্ধকারে রক্তের মতো, তামাপাথরের আঁশটে গন্ধওয়ালা কালো জল উপচিয়ে চলে যায় নদী হতে, ধারাবাহিকায়। সে নদীর পাশে পাশে দুলে ওঠে ধানক্ষেত, বারোয়ারি চণ্ডীতলা, গাঁওবুড়ার থান। শাঁখে ফুঁ পড়ে কোন প্রত্ননাগরিক যাপনের আবীর সন্ধ্যায়। কানাগলি হাতড়ে হাতড়ে দেয়াল খুঁজে খুঁজে অতিকষ্টে বড়ো রাস্তায় এসে পড়ে কাদের ডার্ক ল্যান্টার্নের ক্ষীণ ক্ষুরধারা।

পেলি? পেলি ভাই? সরে গেছে জল? এইও, হেই দোস্ত, এই পড়েছে পলির ওপর পলি। চালাও দেখি। চালাও জোয়ান। হেই সাবধান। ঠং করে এ কীসের শব্দ হয়?

পাওয়া গেছে কি রত্নপেটিকা? জীবন্ত পাথরের ওপর আঁকাবাঁকা লতাপাতার নকশা, এই রয়েছে বাঘ ভালুক সাপ সিংহ এই দুরন্ত ঈগল এই যে উটপাখি। পাতা পাতা সপ্তপর্ণী গাছ, পালংপাতা আশা লতা কালকে আশা বে'। কঠিন, নশ্বর। কালো হুডের তলা থেকে ওরা ফিসফিস করে, চাবি এনেছিস তো?

এই প্রশ্ন রোজ। রোজ রোজ। চাবি নাই।

হেইও জোয়ান! হে সাবধান। ওরা তুলে নেয় শাবল, গাঁইতি; ওরা ভেঙে ফেলে পাথরের ফুল। খানখান হয়ে ছিটিয়ে পড়ে কাচ ভাঙার সুতীব্র ঝংকার। ওই, ওই তো, নীল রঙ, আজকে নীল রঙ, দেখেছিস, কেমন ঘন নীল? আহা, যেন ময়ূরপঙ্খী, এখনো টুপটাপ পড়ছে জমাট বাঁধা ঘন আকাঙ্ক্ষিত গাঢ় নীল। কী সুন্দর, কী মধুর, নির্জন, কী একা। ওরা আস্তেধীরে তুলে নেয় তাকে, কালো হুডের ভিতর থেকে বার করে আনে চকমকি পাথর, শুকনো ঘাস। ধীরে, সন্তর্পণে, আগুন দেয় পলতেয়। চুপিচুপি বলে, তাহলে আজ আসি, নাকি?

আশপাশ থেকে বাতাসে ভেসে ভেসে কারা যেন বলে, হ্যাঁ, আবার কাল। কাল কিন্তু এই অরণ্যভূমি নাও থাকতে পারি, কাল হয়তো মরুবর্ত্ম, হয়তো উষ্ণ প্রস্রবণধারা, তুন্দ্রার পাহাড়, ছোট, ছায়ানিবিড় কোনো জলসত্র, বিপর্যস্ত মালভূমি ঢেউ। এসো কিন্তু, পথিক, পথ হারাইওনা, ভুলিও না, এই দিশা ভুলিও না, এসো, এসো ফিরে।

তারা বলে, আসবো। আসবো। আসবো গো আসবো। এই আসি আসি আসি বলতে বলতে তারা চলে যায়, গহন বনানী ছেড়ে, ঘাস জমি পার হয়ে। তাদের মাথার ওপর পুড়তে থাকে কার্তিকের হিম চাঁদ। সমস্ত কুয়াশার ফুলগুলি কুড়িয়ে নিয়ে হাল্কা শীতের চাদরে মুখ ঢাকে বীজডাকা মাঠ আর সব নক্ষত্রের চোখের পাতা ঘুমে ভারি হয়ে আসে।

ওরা চলে যায়। ওদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় আগুনধরা, ঘন নীল ময়ূরপঙ্খী রঙ ব্যথার ফানুস।