তারপরের ইতিহাস তো ঠিক সেই ক্রীতদাস তৈরীর ইতিহাস। লোভী মানুষের হাত গিয়ে পড়ল সেখানে। মায়ের কোল  থেকে নির্মম ভাবে ছিনিয়ে এনে তাকে নিজেদের উপযুক্ত করে তৈরী করার , তাকে নিজেদের মত সভ্য তৈরী করার , এবং তার সমস্ত পুরানো অভ্যাস ছেঁটে কেটে ফ" />

Samokal Potrika

মাঝে মাঝেই চোখ যায় ঘরের কোনে মাথা নীচু করে বেশ একটু শোকে মুহ্যমান হয়ে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে থাকেন। কারোর কাছে কোন অভিযোগ বা অনুযোগ নেই , চাহিদা বা দাবীও নেই। অবশ্য বিশেষ কিছু দাবী ছিলও না কোনদিনই, কেবল চাহিদার মধ্যে ছিল একটু মালিকের সাথে হাঁটতে বা বেড়াতে যাবার নেশা। এককালে  প্রিয়সাথীর সঙ্গে ঘোরা -বেড়ানোর সময় যে একটা সক্রিয় ভাব এবং আভিজাত্য দেখা যেত , আজ যেন তা কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে ।  সেই পোড়ো জমিদার বাড়ির মত; যেমন  এককালে যা জমিদারদের আভিজাত্যে জমকালো ছিল , যা ধরাকে সরা জ্ঞান করত, তা কালের প্রভাবে মালিকের অভাবে যেমন বিবর্ণ ম্লান হতশ্রী হয়ে যায়,  তেমনই অবস্থা। দেহটি আজও ঋজু বলিষ্ঠ কিন্তু শরীরে রঙের চাকচিক্য জৌলুষ যেন যত্নের বা পরিচর্যার অভাবে অনেকখানিই ম্লান হয়ে এসেছে।

 

বাবার সুদীর্ঘ চাকুরী জীবনের শেষে বহু বিশ্বস্তভাবে কাজের স্বীকৃতি হিসাবে বহু সহকর্মীর শুভেচ্ছা ও ভালবাসার সাক্ষী হিসাবে নতুন সঙ্গী উপহার পেলেন বাবা। সঙ্গে আরও কিছু অন্যান্য জিনিষও ছিল। কিন্তু বাবার বেশী পছন্দ হল এই নতুন সঙ্গীকে। এর অনেক কারণ আছে বলে আমার ধারণা হল। প্রথমতঃ ইনিই একমাত্র সঙ্গী যিনি বাবার সমস্ত ভার বহন করে বাবাকে সদর্পে সমস্ত জায়গায় সচল থাকতে সাহায্য করবেন। বাবার দুরন্ত অপ্রতিহত গতিকে , যখন অনেকেই সাহায্য করতে পারবে না , তখনও ইনি সাহায্যে পিছপা হবেন না। দ্বিতীয়তঃ , বাবা চিরকালই ছিলেন বেশ তেজঃদীপ্ত আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন এবং সিনেমার কমল মিত্র বা ছবি বিশ্বাস জাতীয় চরিত্রের গ্রাম্ভারী মানুষ। সেই তেজ কে ধারণ করার ক্ষমতা তো সকলের থাকেনা। তাই এই নতুন সঙ্গীই সেটা সঠিক বুঝবে এবং তা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারবে বলে বাবার ধারণা হল । অবশ্য দেখেওছিলাম যে রিটায়ারের পর বাবার এই তেজ যেন আরও বেড়ে গেল বা বেশী মাত্রায় প্রকাশ পেল।বুঝলাম বিজ্ঞানের সুত্র অনুযায়ী যে শক্তি কাজে পরিবর্তিত হচ্ছে না, তা তো নষ্ট হতে পারে না। তাই তা বাবার তেজে পরিবর্তিত হয়ে সর্বত্র প্রকাশিত হতে লাগল, এবং এই পরিবর্তনে এই নতুন সঙ্গীর কাছ থেকে বাবা বেশ সাহচর্য লাভ করেছিলেন। আমরাও এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী । কাজেই এমত একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর উদার সাহচর্যে বাবা যে তাঁর উপর আমাদের চেয়ে বেশী নির্ভর করবেন তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে। আরও একটি ব্যাপার আছে, এনার ঘাড়টি সব সময়ই বশংবদ ভৃত্যের মত ‘হাঁ বাচক ‘ভঙ্গীতে নিম্নাভিমুখী বলে বাবার পক্ষে সেই ঘাড়টি ধরে তাকে চালনা করার সুবিধাটাও মস্ত সুবিধা। এবং সর্বোপরি  রংটিও তাঁর বেশ পছন্দসই , ভদ্রসমাজের উপযুক্ত বলে তাঁর ধারণা ছিল। তাই যখনই কোথাও বাবার যাবার দরকার পড়ত,  ফিটফিটে সাদা ধুতি , সাদা ধবধবে গিলে করা পাঞ্জাবীর উপরে সেই বন্ধুদের দেওয়া কাশ্মীরি শাল পাট করে কাঁধে ফেলে, পায়ে চকচকে পালিশ করা কালো চামড়ার পাম্প-শু পরে খোঁজ করতেন তাঁর সেই বিশ্বস্ত সঙ্গীর । তবেই তাঁর  কোথাও যাত্রার আয়োজন সম্পূর্ণ হত।আর সঙ্গীটি তো বাবার সাহায্যের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক পায়ে খাড়া সর্বসময়েই।   তখন কেউ সঙ্গে থাক আর না-ই থাক , কোন অসুবিধা নেই।বাবা স্বয়ংসম্পূর্ণ।আবার কোন আসরে গেলে তা গানের আসরই হোক আর অন্যান্য সভা সমিতিই হোক , বাবা সঙ্গীটিকে হাতছাড়া করতেন না, যাতে যখনই দরকার হোক তাকে এক কথায় আবার পেয়ে যেতে পারেন। 

 

মাঝে মাঝে দেখতাম কোন অলস মুহূর্তে বাবা হয়ত ইজি চেয়ারে বসে আছেন আর আপন মনে তাঁর সঙ্গীর ঘাড়ে মাথায় আরাম করে হাত বুলোচ্ছেন, আর তিনিও যেন পোষা কুকুরের মত ঘাড়টি নীচু করে বাবার এই আদরের প্রলেপ উপভোগ করছেন।

 

একদিন কি হয়েছে, বাবা হয়ত কোথাও থেকে এসে ভুল করে তাঁকে নির্দিষ্ট জায়গার বদলে  অন্য কোথাও ছেড়ে এসেছেন। পরদিন ঠিক জায়গায় সঙ্গীকে না পেয়ে বাড়ী মাথায় করে তুললেন । গোটা বাড়ী একেবারে তটস্থ। মাকে বা আমাদের কাউকে ডেকে খুঁজে সঙ্গে সঙ্গে না পেলেও হয়ত এত ব্যতিব্যস্ত হতেন না ।আমরা আবার অনেক খোঁজাখুঁজি করে সঙ্গীকে বাবার সংলগ্ন করে দেওয়াতে তবে শান্তি হল।    এতটাই ভালবাসা ছিল তাঁর।

 

সেই এতদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী, বাবা যখন চিরদিনের জন্য আমাদের সকলের মায়া কাটিয়ে বহুদূরের যাত্রী হলেন তখন, জানিনা, কেমন করে তাকে ছেড়ে একলাই গটগট করে চলে গেলেন। একবারের জন্যেও আমদের দিকে তো নয়ই, তাঁর হাঁটা চলার সবসময়ের সঙ্গীর দিকেও ফিরে তাকালেন না। হয়ত বুঝলেন, এমন জায়গায় যাচ্ছেন যেখানে আর কারোর কোন সাহায্যেরই আর দরকার হবে না। যে হাত তিনি ধরেছেন তার পর আর কারোর হাতই তাঁর ধরার দরকার নেই।  আর ঠিক বুঝিনি , হয়তো সেই দুঃখেই ,  আমাদের মনে হল ,(মনের ভুলও হতে পারে} সঙ্গীর ঝোঁকা মাথাটা যেন আরও বেশী ঝুঁকে গেল।

 

বাবার এই সঙ্গীর জন্ম কোথায় ঠিক জানিনা । হয়তো আসামের কোন গহন জঙ্গলে , যেখানে উনি বেড়ে উঠেছিলেন প্রকৃতিমায়ের কোলে এক নিস্তব্ধ স্বচ্ছন্দ পরিবেশে। সেখানে হয়ত ছিল  চারিদিকে পাতার সাথে হাওয়ার লুকোচুরি খেলার শিরশিরানি শব্দ , সাথে একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাকের একটানা তানপুরার আওয়াজ আর পাশে ছোট্ট নদীর ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলার নুপুরের ঝিনিঝিনি , সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সঙ্গীতের মূর্ছনা। তারই মাঝে আপন মনে হাওয়ার সাথে খেলা করে, সঙ্গী সাথীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বেশ নিশ্চিন্তমনে প্রকৃতির আলো হাওয়ায় স্বচ্ছন্দে বেড়ে ওঠা।

 

তারপরের ইতিহাস তো ঠিক সেই ক্রীতদাস তৈরীর ইতিহাস। লোভী মানুষের হাত গিয়ে পড়ল সেখানে। মায়ের কোল  থেকে নির্মম ভাবে ছিনিয়ে এনে তাকে নিজেদের উপযুক্ত করে তৈরী করার , তাকে নিজেদের মত সভ্য তৈরী করার , এবং তার সমস্ত পুরানো অভ্যাস ছেঁটে কেটে ফেলে সাজিয়ে গুজিয়ে রং পালিশ করে সকলের সামনে দর্শনধারী করার ইতিহাস, যেমনটি সমস্ত গৃহপালিতদের করা হয় আর কি।

 

যাই হোক। তারপর সেও একসময় হাত ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ল বাবার হাতে। হয়ত এই নতুন মনিবটিকে তার পছন্দ হয়েছিল, অবশ্য কেউ তো আমরা আর তার মনের গহনে ঢুকে সত্যিকার মনের খবর নিই নি।

 

আমরা বহিরঙ্গ দেখেই নিশ্চিন্ত ছিলাম। তবে বাবার যে তাকে খুব পছন্দ হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। আর হবে না-ই বা কেন? খায় না, দায় না, চাহিদা নেই, রাগ নেই, মুখ তুলে কোন কথা বা প্রতিবাদ নেই একেবারে বশংবদ ভৃত্যের মত সবসময় ‘জো হুজুর’ বা ‘জী হুজুর’ অবস্থায় সেবা করার অপেক্ষায় একপায়ে খাড়া। দিন নেই, রাত্রি নেই, গ্রীষ্ম নেই, বর্ষা নেই, এমন কি কোন দিন কোন রোগ অসুখও নেই, পায়ে জুতোটি পড়ে এক্কেবারে রেডি, যাতে এতটুকু সময় নষ্ট না হয়। আমরা তো কোনদিন শুনিনি যে কখনও তার কোন সেবার ত্রুটি হয়েছে এমন রাশভারী মনিবের কাছেও।

কিন্তু  মনিবের জন্য  সারাজীবন এত নিরলস, বিশ্বস্ত  সেবা দিয়ে কি ফল হল! স্বার্থপরের মত বাবা, যাবার সময় কারোর দিকে না তাকিয়ে কেবল নিজের আরো ভাল সঙ্গী পাওয়ার জন্য, আরো ভাল নির্ভরযোগ্য জায়গা বা চির আনন্দে থাকার নিশ্চিন্ততায় বাবা সবায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলে গেলেন। পিছন ফিরে একবার দেখলেনও না যে, আমাদের কথা  নাহয় বাদই দিলাম, তাঁর চির বিশ্বস্ত সঙ্গীর মনের কি অবস্থা সে কথাও ভাবলেন না । তার চোখের কোনে যে দু -এক ফোঁটা জল সবার অলক্ষ্যে জমেছিল সেদিকে বাবার ভ্রুক্ষেপও ছিল না। এমন কি যাদের হাতে রেখে গেলেন তাদেরও বলে যাননি যে বাকী জীবনটা তাকে দেখা শোনা করতে।

আজ তাই, কখনও যদি ঘরের কোণে একা নিঃসঙ্গ , ধূলিমলিন, বিবর্ণ, দুঃখভারাক্রান্ত , কর্মহীন , বাবার পুরানো বন্ধু বা বিশ্বস্ত সঙ্গী লাঠিটির দিকে চোখ পড়ে , অতীত দিনের কথা মনে পড়ে আর বর্তমানের সাথে তুলনা করে মনটা ধূসর হয়ে ওঠে।

Search Here..