ছেলের মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ছেলের বাবা তাকে আটকে বললো, "দেখুন, আমি বুঝছি আপনি আপনার মেয়েকে খুব আগলে রেখেছেন। আমাদের কিছু কথা আছে। সম্পর্ক আগানোর আগে বলে নেওয়া ভালো।" />

Samokal Potrika

"আমার পেটে হাত দিয়ে দেখো তুমি আমাদের বাচ্চার স্পর্শ অনুভব করতে পারবে।" রিমি বিছানায় বসে সদ্য অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে বসা রক্তিমকে বললো।

রক্তিম সাথে সাথে রিমির পেটে হাত রেখে ওদের বাচ্চার লাথ অনুভব করতে পেরে বললো, "আমার মেয়ে।"

"তুমি কিভাবে জানো মেয়েই হবে?"

"আমি সব জানি।"

"তোমার বাড়ির লোক কিন্তু ছেলেই চায়।"

"তুমি কি চাও??"

"আমার সুস্থ হলেই হল।"

"কে কি চায় তা আমি জানিনা। কিন্তু আমি জানি আমার মেয়েই হবে।"

৩ মাস পর রিমি একটা ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দেয়। জীবনের সবথেকে বড় খুশি আজ পেয়েছে রক্তিম। রিমি নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফেরার আগেই রক্তিম একগাদা  খেলনা আর নতুন জামা কিনে আনে ওর মেয়ের জন্য।

রক্তিম ওর মেয়ের নাম রাখে "রাণী"। ওর মেয়ে সত্যি ওর কাছে রাণীর থেকে কম কিছুই না। 

 

২৭ বছর পর,

রাণীর এবার বিয়ে দিতে চায় রক্তিম। অনেক ছেলের মধ্যে একজন ডাক্তার ছেলেকে পছন্দ করে বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ দেয় ছেলে ও তার বাড়ির লোককে।

ছেলে ও তার বাড়ির লোক আসতেই তাদের আদর আপ্পায়ন করে বসায়।

"আপনাদের আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো দাদা?" রক্তিম জিজ্ঞেস করে ছেলের বাবাকে।

"না, না আপনি ঠিকানাটা খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছিলেন।"

রক্তিম হাসলো।

"আপনার মেয়ে কোথায়?" ছেলের মা জিজ্ঞেস করলো।

"এই তো ঘরেই আছে। আসছে।"

রিমি এরমধ্যে চা,বিস্কুট, শিঙাড়া, মিস্টি নিয়ে এসে টেবিলে রাখে।

"ও আমার স্ত্রী।" রক্তিম রিমিকে দেখিয়ে বলে।

রিমি সবাইকে নমস্কার জানায়।

"রাণী কোথায়?" রক্তিম জিজ্ঞেস করে রিমিকে।

"আসছে।"

"আমি নিয়ে আসছি।" বলে রক্তিম রাণীকে আনতে ভেতরে যায়।

"মা রেডি হলি?"

"হ্যাঁ বাবা রেডি।" রাণী রক্তিমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে।

"একি শাড়ি পড়েছিস কেনো?"

"মা বললো।"

"কিসের জন্য?"

"জানিনা আমি।"

"চুড়িদারে তুই বেশি কমফোর্টেবল। ওটাই পড়ে আয়।"

"সত্যি বাবা?"

"হ্যাঁ রে মা। এসব দরকার নেই।"

"আমারও পোষাচ্ছে না।"

"জানি আমি। চেঞ্জ করে তাড়াতাড়ি আয়।"

"হ্যাঁ বাবা আসছি।"

রক্তিম বাইরের ঘরে এসে বলে, "ও আসছে এখনি।"

১০ মিনিটে রাণী শাড়ি বদলে চুড়িদার পড়ে বাইরে আসে। ওকে চুড়িদারে দেখে রিমি তো থ।

ছেলের বাবা-মাও হয়তো এটাই আশা করছিল যে রাণী শাড়ি পড়ে আসবে। কিন্তু সেটা বুঝতে না দিয়ে রাণীকে বসতে বললো।

"কি করছো তুমি এখন?" ছেলের মা জিজ্ঞেস করলো রাণীকে।

"প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করি।"

"বাহঃ ভালো! কতদিন হলো ঢুকেছো?"

"বেশি না। দেড় বছর হলো।"

"আচ্ছা। পড়াশোনা কত দূর?"

"মাস্টার্স শেষ করেছি।"

"কিসে অনার্স ছিল?"

"ভূগোলে।"

"পড়াশোনা বাদে আর কি করো?"

"মডেলিং করি টুকটাক।"

"মডেলিং?"

এবার রাণী কিছু বলার আগে রক্তিম বললো হাসতে হাসতে, "দিদি কিছু মনে করবেন না। আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার মেয়ের ইন্টার্ভিউ নিচ্ছেন।"

"না আমাদের তো জানতে হবে সব।"

"সে তো সবই জানেন। আমি তো মোটামুটি বলেইছি।"

"না তাও ওর মুখ থেকে শুনতে চাইলাম।"

"না দিদি আমার ঠিক ভালোলাগছে না যে আমার মেয়ে এরকম একের পর এক উত্তর দিয়ে যাচ্ছে।"

ছেলের মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ছেলের বাবা তাকে আটকে বললো, "দেখুন, আমি বুঝছি আপনি আপনার মেয়েকে খুব আগলে রেখেছেন। আমাদের কিছু কথা আছে। সম্পর্ক আগানোর আগে বলে নেওয়া ভালো।"

"বলুন।"

"দেখুন আমাদের বাড়ির একটা কালচার আছে। আমাদের বাড়ির বউরা শাড়িই পড়ে সবসময়। আপনার মেয়েকে দেখে মনে হচ্ছে ও চুড়িদারই বেশি পড়ে। এটা বদলাতে হবে ওকে। তারপর আমাদের বাড়ির বউরা চাকরি করেনা। জানি আমি রাণী সরকারি চাকরি করে। কিন্তু তাও ওকে সেটা ছাড়তে হবে। মডেলিং তো চলবেই না। বেশি বাপের বাড়ি আসতে পারবেনা। বন্ধুবান্ধবীর সাথে ঘুরতে পারবেনা। খুব দরকার নাহলে বাড়ি থেকে একা বেরোবেনা। কারণ জানেনই,আজকাল কত কিছু ঘটে। শারীরিক ওর কোনো সমস্যা থাকলে আগে জানিয়ে দিন। আর এমনি কিছু লাগবেনা আমাদের। শুধু মেয়েকে সোনা দিয়ে এতটা সাজিয়ে দিন যাতে আমাদের বাড়ির স্টেটাসটা বজায় থাকে।"

রক্তিম সব শুনে হেসে বললো, "প্রথমত ওর পোশাক। আমি ছোট থেকে কোনোদিন ওকে কোনো ড্রেসেই বাধা দিয়নি। আমি এতটুকু জানতাম এবং জানি যে ও এমন কোনো ড্রেস পড়বেনা যাতে আমার সম্মান নষ্ট হয়। ওকে জানেন, আমার জিন্সে সবথেকে ভালোলাগে। ওর মা আজ ওকে শাড়িই পড়িয়ে ছিল। আমিই চুড়িদার পড়িয়ে এনেছি।"

রিমি রক্তিমের দিকে তাকালো অবাক হয়ে।

তারপর রক্তিম আবার বললো, "এবার হলো চাকরি। মেয়েকে ছোট থেকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বড় করেছিলাম। আমার স্বপ্ন ছিল ওর স্বপ্ন পূরণ করা। সরকারি চাকরি ওর স্বপ্ন ছিল। ও নিজে খেটে সেটাকে বাস্তবায়িত করেছে। আমি সাথ দিয়েছি ওর। ও জীবনেও চাকরি ছাড়বেনা। মডেলিং ও সখে করে। আমি কোনোদিন বাঁধা দিয়নি। দেবোও না। বাপের বাড়ি বিয়ের পর বেশি না আসা, বন্ধুদের সাথে না মেশা, একা বাইরে না বেরোনো, এসবে কারো হস্তক্ষেপ করা চলবেনা। ও আমার স্বাধীন মেয়ে। ওর যা ইচ্ছে তাই করবে। আর শারীরিক সমস্যা? এখন নেই। আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে ভগবান না করুক পরে হলে আপনারা ওকে আমার কাছে দিয়ে যাবেন। আর সোনা? আমার মেয়ে নিজেই সোনার থেকে দামী। আপনাদের স্টেটাসের জন্য যদি আমাকে আমার মেয়েকে সং সাজাতে হয় তাহলে আপনারা আসতে পারেন। আর এমনিও আপনার ছেলের সাথে বিয়েটা সম্ভবই না। আমার মেয়েকে যদি সারাজীবন আমার কাছেই রাখতে হয় তাই রাখবো। কিন্তু আপনাদের মত ছোট চিন্তাধারার মানুষদের ঘরে ওকে পাঠাবো না। আপনারা আসতে পারেন।"

"এত অপমান?" ছেলের বাবা সব শুনে রেগে জিজ্ঞেস করে।

"আপনার স্ত্রী আর আপনি আমার মেয়ে আর আমাকে এর থেকে বেশি অপমান করেছেন।"

"চলো তো চলো।" বলে ছেলের বাবা বেরিয়ে যায়। পেছন পেছন ছেলের মা আর ছেলেও বেরিয়ে যায়।

ওরা বেরোনোর পর রিমি রেগে বলে, "তোমার বেশি বেশি। এরকম করলে সারাজীবন তোমার মেয়ে আইবুড়ো থেকে যাবে।"

"থাক। আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার মেয়ে আমার উপর বোঝা না। ও আমার মাথার তাজ। ওদের চোদ্দ পুরুষের ভাগ্যি যে ওদের ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়ে ছিলাম। আসলে কুকুরের পেটে ঘি সহ্য হয়না।"

রাণী এটা শুনে খুশিতে চোখ ভারি করে রক্তিমকে জড়িয়ে ধরে বললো, "আই লাভ ইউ বাবা।"

"আই লাভ ইউ টু মাই কুইন।"