Samokal Potrika

ল্যাটা আদপেই কোনো কুলীন মৎস নহে। মৎস অবতারের উদাহরণ হিসাবে অদ্যাবধি ইহার কোনোরূপ উল্লেখ দেখি নাই। আমার শৈশবের সহিত এই অকুলীন মৎসটি কিরূপে এমন সম্পৃক্ত হইয়া গেল ভাবিয়া কূল পাই না। উত্তরবঙ্গের পটভূমিকায় সাঁটি বলিয়া পরিচিত এই জলজ প্রাণিটি নাগরিককুলের সুখাদ্য নহে। পিতামহের অর্থে সমাজসেবা করা পিতা এবং কলহপরায়ণা মাতা -এই যুগল সহাবস্থানের অনিবার্য পরিণতি হিসাবে হরিপুর নামক গ্রামের একটি একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন ধরে। বিশালাকায় উঠানের এক ক্ষুদ্র অংশ খলপা দ্বারা পরিবৃত্ত করিয়া পিতা মাতা এবং চার ভ্রাতা ভগিনীর জন্য আর একটি ভিন্ন পরিবারের সৃজন ঘটানো হইল। সস্তা হইবার সুবাদে এই মৎসটিও এই খলপা ঘেরা দ্বীপে প্রবেশ করিয়া পাতে পাতে ছড়াইয়া পড়িল। কলিকাতার এক নামী কলেজে ইংরাজি সাহিত্যের স্নাতক এবং একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত হইলেও পিতা নামক এই "অপদার্থ" ব্যক্তিটি আদিবাসী তথা অন্ত্যজ শ্রেণির সান্নিধ্যই অধিক পছন্দ করিতেন। তাহাদের সহিতই তাঁহার নিত্য ওঠাবসা। ইহাতে আর যাহাই ঘটুক, উপার্জনের কোনো সম্ভাবনাই ঘটিত না। ইহারই অপরিহার্য ফলশ্রুতি স্বরূপ শালুক শাপলার সহিত একমাত্র আমিষ এই ল্যাটা মৎসের অনুপ্রবেশ। কুলীন না হইলেও কোনো এক অলৌকিক কারণে ইহা আমার নিকট অতীব উপাদেয় ছিল। দারিদ্রের সংসারে একটির বেশি পাতে পড়িত না। জেষ্ঠ্যপুত্র আমি। বয়স এবং কলেবরে কিঞ্চিৎ অধিক। বলাই বাহুল্য মন এবং উদর কোনটিই পরিতৃপ্ত হইত না। অবুঝ চক্ষুযুগল এদিক সেদিক বিচরণ করা আরম্ভ করিলেই পিতৃদেবের থালা হইতে আর একটি ল্যাটা আমার পাতে লাফাইয়া পড়িত। কী অবলীলায় আমি তাহা গলাধঃকরণ করিয়া ফেলিতাম। মধ্যচল্লিশ অতিক্রান্ত হইবার বহু পূর্বেই সেই শিশুটি ল্যাটা মাছ পরিহার করিয়াছে। সৌভাগ্যবশত ইহা কোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ অথবা নিমন্ত্রণের সুসজ্জিত পাতে স্থান করিয়া লয় না। কেবল বাজার করিবার সময় দৃষ্টিগোচর হয়। রহস্যময় এক শিহরণে রক্তস্রোতও কেমন অবাধ্য হইয়া ওঠে। হে ল্যাটা মৎস, তোমাকে প্রণাম করি। পুনর্জন্মের পুষ্করিণীতে সন্তরণ করিতে করিতে আমার নিমিত্ত তুমি আর একটিবার আত্মহত্যা করিও। মধ্যচল্লিশ অতিক্রান্ত শিশুটি তোমাকে পিতৃদেবের থালায় সমর্পণ করিবে।

Search Here..