Samokal Potrika

রায়... তোমার ফোন।

হ্যালো।

হ্যালো, বুবুন?

হ্যাঁ বলছি। কে বলছেন? ...সৃঞ্জয়দা?

হ্যাঁ, রে। তুই তাড়াতাড়ি একবার ‘স্বস্তি’ নার্সিংহোমে চলে আয়।

কেনো? কী হয়েছে কী?

তুই চলে আয় না বুবুন।

কিন্তু, কী হয়েছে? বলো প্লিজ... প্লিজ দাদা।

তেমন কিছু না! ওই পাপড়ি স্কুল থেকে ফিরে ছাদে খেলছিল, হঠাৎ পড়ে গেছে কীভাবে... তুই চলে আয় বুবুন।

কানের কাছে যেন বোম ফাটল! তালা ধরে গেল বুবুনের। টোঁ টোঁ করে কেটে গেল লাইনটা। বুবুনের একমাত্র মেয়ে পাপড়ি। বছর চার বয়স। বড় আদরের। পাপড়ির মতোই স্নিগ্ধ। সৃঞ্জয়দা ওর নিকট-প্রতিবেশী, ট্যাক্সি চালায়। হয়তো দাদাই পৌঁছিয়ে দিয়েছে... পাপড়ি, এ কী হলো, খেপি মা আমার! কলিগদের কোনো কথা কানের পর্দা ছুঁয়ে যাচ্ছে না তখন বুবুনের। চোখে বাঁধ ভাঙা হড়পা বানের জল। লিফটে করে ও যেনো পাতালে নেমে চলেছে দ্রুত, হু হু করে...

-নমস্কার ডাক্তারবাবু। আমি পাপড়ির বাবা...

-কে পাপড়ি?

-পাপড়ি...পাপড়ি ডাক্তারবাবু, পাপড়ি আমার মেয়ে...

-“ডাক্তারবাবু, যে বাচ্চা মেয়েটাকে অল্পক্ষণ আগে ভর্তি করা হলো, বুবুন তারই বাবা” সৃঞ্জয় বলল পাশ থেকে।

-দেখুন, এখন ও অবজার্ভেশনে আছে। ড. দাসকে ইনফর্ম করা হয়েছে। উনি এসে দেখে যা বলার বলবেন।

ঘড়িতে সন্ধ্যা ৭টা। অঞ্জু পাপড়ির রক্ত দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ছিল বারবার। তাই ওকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

-বুবুন, আমি থাকতাম রে! কিন্তু, প্যাসেঞ্জার ধরা আছে আমার...

-না না দাদা! ঠিক আছে, তুমি যাও না। আমি তো আছি। আমি আমার পাপড়িকে ছেড়ে কোত্থাও যাব না... কোত্থাও না... শেষের শব্দগুলো অস্পষ্ট হয়ে পড়ছিল ক্রমশ। বুবুনের গলা তখন ধরে এসেছে। দিশাহারা লাগছে ওর। কী করবে? কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। ভগবানকে হাতড়াচ্ছে মনে মনে। বারবার পাপড়িকে দেখবার জন্য উঠে যাচ্ছে। কিন্তু, নার্স ঢুকতে দিচ্ছে না। বন্দুকের নলের সামনে মানুষ যেমন অসহায়, তেমনি করে শেষে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল এসে বেঞ্চিতে।

সৃঞ্জয় চলে গেছে ঘন্টা খানেক আগে। এখনো ড. দাস আসেন নি। রাত্রি ৯টা। ড. দাস এসে দেখলেন পাপড়িকে। বুবুনকে ডেকে বললেন, “ব্রেন আঘাত পেয়েছে ভীষণ। কাল সন্ধ্যা মানে ২৪ঘন্টার মধ্যে অপারেশন করতেই হবে। নইলে অবস্থা আরো ক্রিটিক্যাল হয়ে পড়বে মি. রয়… বুবুন আর শুনতে পায় নি। চোখের সামনে দুলে উঠেছিল সবকিছু... তারপর আর কিছু মনে নেই । নার্সের ছেটানো ঠাণ্ডা জলের ঝাপটায় আস্তে আস্তে উঠে বসেছিল বুবুন।

রাত ১২.৩০। অঞ্জু পাগলের মতো প্রলাপ বকছে ফোনে। বুবুন নিতে পারছে না আর! দিশাহারা নাবিকের মতো বেঞ্চিতে বসে পড়েছে চুপচাপ। ঝিঁ ঝিঁ থেকে আরো, আরো ক্ষুদ্র বীজাণুর চিৎকার ও শুনছে স্পষ্ট। সামনে দেওয়ালের দিকে চেয়ে আছে স্থির। যেন, দেওয়াল ভেদ করে ওপাশের বাগানে জোৎস্নায় ফুলের পাপড়ি দেখতে চাইছে ও। কিন্তু, কিছুতেই পেড়ে উঠছে না।

রাত ৩.০০টে। বিধস্ত বুবুন বুঝে উঠতে পারছে না, কীভাবে এতো সত্বর দু লক্ষ টাকা ও জোগাড় করবে। তারপর, অপারেশনের পরও তো খরচ আছে। ১৬,০০০ টাকা মাইনে থেকে জমিয়ে জমিয়ে, বেশ কিছুটা লোন নিয়ে মাস সাতেক হলো জায়গা কিনে বাড়ি বানিয়েছে। কখনো বেঞ্চিতে বসছে, কখনো টানা বারান্দা ধরে হেঁটে ফিরছে অস্থির। পাপড়ির হাসি, বায়না, জেদ, অভিমান, ঠোঁট ফোলানো কান্নার আধো আধো স্বর মনে আসছে কেবল। আর মনে আসছে, একবার জ্যান্ত পোনা মাছ কোটার সময় তাজা রক্ত দেখে পাপড়ি কী ভয়ানকভাবে আঁতকে উঠেছিল! উফ! বুকটা নিঙড়ে দিচ্ছে যেন কেউ!

রয়...রক্ত...কান্না...দু লাখ টাকা...‘বাবা’! চমকে উঠে বসেছিল বুবুন বেঞ্চিতে। কখন চোখ লেগে গেছিল! ভোর ৫টা। আবার হিসাব করতে বসল বুবুন- অঞ্জুর গয়না, কলিগদের থেকে ধার চেয়ে আর আগাম মাইনে তুলে... নাহ! কত? কত জোগাড় করতে পারে সে? ৮০ হাজারের বেশি কিছুতেই না! কলিগদের অবস্থা আর প্রবৃত্তি সে ভালো ভাবে জানে। নতুন এসেছে, তাই ক্লাব থেকে কিছু হবে না। তার উপর এবার দোলে অঞ্জুকে রঙ মাখানোর ব্যাপারে... নাহ! কিচ্ছু ভাবতে পারছে না আর ও।

সকাল ৭টা। নার্সের থেকে পারমিশন নিয়ে দরজার বাইরে থেকে পাপড়িকে দেখে এসেছে বুবুন। কী ফ্যাকাসে লাগছে মেয়েটাকে! ছোট্ট শরীরটার সমস্ত রক্ত যেন পাপড়ির চির শত্রু ভ্যাম্পায়ার শুঁষে নিয়েছে। দেখতে পারে নি বুবুন। টলতে টলতে বেঞ্চিতে এসে বসে পড়েছে দু হাতে মাথা চেপে ধরে। ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল। ম্যাসেজ।  ম্যাসেজটা ওপেন করল ও-

“Dear, Mr. Roy, 500.00 withdrawn from your A/C *********123456. For, “CHILDREN HELP PROGRAM” by Gov of INDIA. Thanks for your magnanimity.”

মহানুভবতা?

ওর মনে পড়ল, আজ পয়লা এপ্রিল। গরীব, দুঃস্থ, অনাথ, অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর ৫০০টাকা অনুদান সাহায্য চেয়ে ভারত সরকার প্রত্যেক ভারতবাসীর কাছে অনুরোধ রেখেছিল। একটা টোল ফ্রি নম্বরে মিস কল করে, ওদের পাঠানো মেসেজের রিপ্লায়ের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ডিটেলস সেন্ড করলেই হবে।

বুবুন স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মোবাইল স্কিনের দিকে... তার চোখ শীতল। বরফ দেওয়া মাছের চোখের মতো ফ্যাকাসে, স্থির। রেটিনা থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে কান্নার এক তীব্র ঝাঁঝালো বেগ আসছিল কিনা, আমরা জানি না। স্বার্থপর পৃথিবীতে বুবুন কি তবে হেরে গেল গো-হারান? সোজাসাপ্টা ঠকে গেল? হয়তো, তীব্র আক্ষেপে ফোন ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সে! অথবা, পিতৃস্নেহে পাপড়ির কপাল ভেবে ছোট্ট একটা চুমু খেয়েছিল মোবাইল স্কিনে... জানি না।