Samokal Potrika

ভিকি ছোটবেলায় প্রচন্ড জিদ ধরত।যা মনে উঠত,সে তাই করত।তখন কারু কথা শুনতো না।
মা,ঠাম্মা হেরে যাওয়ার পর তার দাদুমনিও আদর করে বোঝানোর চেষ্টা করতেন।
ভিকি কিছুতেই বুঝত না।

একবার জিদ ধরল।স্কুলে যাবে না। সকলের তো মাথায় হাত!!
দুদিন গেলেও না।
স্কুল থেকে হেড মিসট্রেসের নোটিশ এসে হাজির।কেন ভিকি অ্যাবসেন্ট?
অগত্যা তার বাবাকেই হাল ধরতে হল।
তার অফিসেও কাজের প্রচুর চাপ।সমস্ত সরকারি দপ্তরে গা এলিয়ে হাওয়া খাওয়ার সুযোগ থাকে না।বিশেষ করে রাজস্ব আদায়কারি বিভাগে তো নয়ই।
তবু ছেলের কথা চিন্তা করে একটা দিন বসে গেলেন।

তার বাবা ভিকিকে বলে উঠলেন,চলো আজ চিড়িয়াখানা যাব ঘুরতে।
দিন দুই আগে শুনলাম আলিপুরে একটা নতুন ল্যাপার্ড নেমেছে।আগেরটাকে জঙ্গলে ছেড়ে এসেছে। বুড়িয়ে গেছিল তাই।
ভিকির চোখে,মুখে বাল্বটা ধীরে, ধীরে জ্বলে উঠল,ইউ লায়ার?
তার বাবা আদর করে বলে উঠলেন,ইটস নট এ জোক।আয়্যাম রিয়েলি গোয়িং টু জু।..য়ানা কাম বিদ মী?
---ইয়েস ড্যাড।আয়্যাম কামিং।

সেবার ভিকি তার বাবার সঙ্গে প্রায় তিন ঘন্টা ধরে চিড়িয়াখানায় চক্কর কাটল।
এর আগেও দুবার এসেছিল।
তবু তার চোখে সবকিছু নতুনের মতই মনে হল।
তারপর এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
ওর বাবা বলে উঠলেন, খেয়ে দেয়ে আমরা তারপর ঘোড়ার পিঠে চড়ব।
ভিকি আনন্দে এক পায়ে নেচে উঠল,
..ই..ও

ঘোড়ার পিঠে চড়ার পর তার বাবা একটা গাছের ছায়ায় বসে বললেন,বাদাম খাবে?
ভিকি বলে উঠল, নো..আইসক্রিম।
ওর বাবা উঠে গিয়ে একটা আইসক্রিম কিনে এনে দিলেন।
তারপর বলে উঠলেন,..খেলতে ইচ্ছে করছে বুঝি?
ভিকি ঘাড় ঝুঁকিয়ে বলে উঠল,ইয়েস।
তার বাবা ছোট্ট মাথাটায় বিলি কেটে বলে উঠলেন,নেক্সট ডে।আজ সন্ধ্যে হয়ে গেল।বাড়ির সবাই তোমাকে সারাদিন না দেখতে পেয়ে মন খারাপ করে বসে আছে।
কাল তো সাটার ডে।তোমাদের স্কুলেও তো স্পোর্টস হয়।পারটিশিপেট করো না?
ভিকি গোমরা মুখ করে বলে উঠল,নো ওরা সবাই আমার সাথে চিটিং করে?
---ওরা কারা?
---রানা,ববি অ্যান্ড করিম অলসো।
---আমি মিসট্রেসকে ইনফর্ম করে দেব।উনি ওদের পানিসমেন্ট দেবেন।
ভিকির চোখে,মুখে মিলিয়ে যাওয়া সেই জিদটা ধীরে, ধীরে পাখা মেলে তার ফর্সা মুখটাকে ঢেকে ফেলল।
একইভাবে চোখের নজরটা কড়া করে বলে উঠল,নো।আমি যাব না।
--বাট হয়াই?
--মিসট্রেট অলসো ক্রুয়েল।
তার বাবার মাথায় একটা তিড়িক করে বিদ্যুত খেলে গেল।
--কী বলছো কি ভিকি?..উনি তো তোমাদের ভাল চান।বকা,ঝকা করেন..সে তো তোমাদের ফিউচারের জন্য। না পড়লে গুড বয় হবে কী করে?
--মিসটেক করলে উনি এটা ধরে জোর করে নিজের কাছে টেনে আনেন।তারপর হোল বডিতে হাত ঘুরিয়ে আদর করে বুঝিয়ে বলেন...নো সন..ইট ইজ রং।ডোন্ট ডু ইট।ইউ আর এ গুড বয়।উনি বার,বার প্যান্টের আগেই হাতটা ঘষেন।..ইজ বোরিং।আই ডোন্ট লাইক ইট।আমি সেইজন্যই স্কুলে যাব না।

কথাটা শুনে ওর বাবা অনেকক্ষণ কথা হারিয়ে ফেললেন।
বুঝতে পারলেন ছেলে,মেয়েরা কেন জেদি হয়?
এরাও নিজেদের ছোট্ট মনে অনবরত সংঘর্ষ করে।নিজের অপছন্দের কথা অনেক সময় বড়দের মুখের উপর বলতে পারে না।
তখনি মনের ভিতর শুরু হয় যুদ্ধ!
আমরা জিদ ধরে নিয়ে সন্তানদেরকে আরো বেশি করে বকাঝকা করি।তাতে ওর মনের গরল আরো বেড়ে ওঠে।
অনেক সময় বড় কিছু ঘটে যায়।

আজ তার বাবা অনেকদিন পর কামরার আলোটা নিভিয়ে দিয়ে স্ত্রীকে বুকের কাছে টেনে বলে উঠলেন,ভাবছি ওর স্কুলটা জেন্ঞ্জ করে দেব।
মিস্ট্রেটকে বললেও ভিকির মনের অবস্থাটা ওখানে পাল্টাবে না।... এবার থেকে আমাদেরও সাবধানে থাকতে হবে। আলো জ্বেলে রাতের বেলা মুখ দেখা বন্ধ করতে হবে।
ভিকির বয়স বাড়ছে।পৃথিবীটাকে জানার কৌতুহল বাড়ছে।...কিছু, কিছু ঘটনার ব্যাখা না খুঁজে পেলে ওরা জিদ ধরে বসে থাকে।কাউকে বলতে পারে না।
ওকে জানতে হবে।অনবরত মনের প্রশ্নগুলো বের করার চেষ্টা করতে হবে।সেটা এই চার দেওয়ালের আবদ্ধতায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
প্রথমে ওদের মনটাকে খুলতে হয়।
এবার থেকে প্রতি সপ্তাহে আমরা কোথাও না কোথাও ঘুরতে বেরুব।
ভিকির আবদ্ধ প্রশ্নগুলো যাতে খোলা আকাশে ডানা মেলে উড়তে পারে।

সেই ভিকি আজ কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির একজন লেকচারার।।