Samokal Potrika

বাবা ছিলেন বিচিত্র প্রতিভাধর। বিচিত্র রুচি ও খামখেয়ালের অধীশ্বর এক স্বপ্নকল্পনার মানুষ বা অতিমানুষ।সঠিক নিরুপণ অসম্ভব। কখনো পাণ্ডিত্যের অতিমানিতায় অসুস্থ, কখনো সাধারণ্যের অতিনীচতায় মহীয়ান। বিদ্বান, শাস্ত্র ও শস্ত্রজ্ঞ, গায়ক, অভিনেতা, সুদর্শন, বাকপটু, বংশীবাদক, তান্ত্রিক ও বৈষ্ণব, নিষ্ঠুর ও সমবেদনায় গলে যাওয়া মানুষ । প্রেমিক --- কখনো একনিষ্ঠ কখনো বহুগামী। দুরন্ত সাহসী ও ভিরু । একাধারে ঈশ্বরে প্রবলবিশ্বাসী ও চূড়ান্ত নাস্তিক ( "কেউ কোথাও নেই --- সব ফক্কিকার") । চূড়ান্ত আমিষাশী আবার প্রয়োজনে দিনের পর দিন স্বপাক হবিষ্যান্নে তুষ্ট। নিজেকে নিয়ে যেন সারাজীবন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গেছেন। প্রকৃতি ও বিধাতার সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছেন। ফলে ফেঁসেছি আমরা। ‎কর্তা গিন্নি ( মায়ের ভাষায় " দ্যাবাদেবী ") অচঞ্চল। ‎আমরা সন্তানরা ভুগেছি। ‎চাকরি ছেড়েছেন ইচ্ছামত। ব্যবসা করেছেন এবং গণেশের মাথায় রক্ত তুলে ছেড়েছেন বেশ কয়েকবার। কারখানা বানিয়েছেন পার্টনার নিয়ে। মনসাতলা, হাওড়ায়। ‎তারপর নিজে মেতেছেন মৎস্যশিকারে। কারখানা চলেছে খু্ঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তারপর মুখ থুবড়ে পড়েছে মাটিতে। অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজ কলকাতার স্কটিশ চার্চে নেমে এল। চিরন্তন সংলাপ পিতৃদেবের, " ভেবো না বড় বউ , আবার কটিতে স্বর্ণমেখলা "। ‎আশ্বাসে হেসেছে বড়বউ আর অলক্ষ্য গৃহদেবতা এমনকি চির-চপলা লক্ষ্মী দেবীও। ‎কলেজে পড়ানোর চাকরি ছাড়তে লেগেছে কয়েকমাস। বাণিজ্যে যে লক্ষ্মীর বাস তা ধানচাল, কাঠকল ও নারকেল আমদানি করতে গিয়ে এমন নড়াচড়া খেল যে দেবী পালিয়ে বাঁচলেন। ‎তেরশো পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে গোডাউন ভরে উঠল অকেজো কাঁসাপিতলের বাসনপত্র ও হাতচিঠিতে। জমি বাড়ির দলিল বাঁধা রাখা স্বামীস্ত্রী দুজনেরই না-পসন্দ। ‎ তারচেয়ে একটা লঙ্গরখানা খুললে মন্দ হয় না, সৃষ্টিকর্তার কাছে একটা জোরালো শংসাপত্র হবে আর নিরন্ন লোকজনের শুভেচ্ছাও মিলবে । স্তুতি চিরকালই রুচিকর খাদ্য । ‎ তা জ্যাঠামশাইয়ের দরুন পাওয়া খিদিরপুরের বাড়ি বিক্রির টাকা খরচ হতে কত দিনই বা লাগে। ‎প্রি-ওয়ার মার্কেটে কিনে রাখা মালপত্র বিক্রি করে যুদ্ধশেষে কেউ কেউ যখন আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছেন, পিতৃদেব তার তাবদ বিদ্যা ও জ্ঞান নিয়ে প্রায় ফতুর অবস্থায় মায়ের টাকায় কেনা জমির চাষবাস ও ছোট্ট জমিদারিতে মন দিলেন। ‎ প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, আমার জন্মের সময় বাবা বাড়ি ছিলেন না । জমিদারি পরিদর্শনে গেছিলেন । " ‎লক্ষ্মণের শক্তিশেল " এর দূত যতটা সময়,বিশ্রাম ও বিরতি সহ, নিয়েছিল জরুরী খবর আনতে তার চেয়েও কম সময়ে সে পরিদর্শণ সম্ভব । সাঁইত্রিশ টাকা সাড়ে পাঁচ আনা আদায়ের খরচ মবলগ চল্লিশ টাকা আট আনা + মায়ের বুনে দেওয়া গায়ের সোয়েটার। সে যাক, আশুতোষ দে এবং বাবার যৌথ প্রযোজনা ও উদ্যোগে গড়ে উঠল বিঘে দশেক জমির ওপর কারখানা। হাওড়ার মনসাতলায়। বিশাল বিশাল গাছ ধরাশায়ী হল চোখের সামনে। সেই সময় দেখেছিলাম পঙ্গপাল। মুহূর্তে আকাশ ছেয়ে গেল পঙ্গপালে। গাছে গাছে বসে পড়ল তারা। নিষ্পত্র হল মহীদ্রুমেরা । সামান্য ঝিঁঝিঁ পোকার আকৃতি নিয়ে পঙ্গপালের এতো ক্ষমতা, এতো খিদে জানা ছিল না। বছর কয়েকের মধ্যে আরেকবার হানা দিয়েছিল পঙ্গপাল । তখন বোধহয় মেমারীতে থাকি। ‎তারপর আর পঙ্গপাল আসেনি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা তাদের খতম করেছেন। ‎বদলে এসেছে নতুন নতুন মানুষ দলে দলে । সীমান্ত পারের দেশ থেকে এসেছেন তারা। তাদের ভাষা ভিন্নতর, আহার্য, পোশাক আসাক, জীবনযাত্রা সবই আলাদা। ‎ তারা বহুকালের পোড়ো জমিতে, নদীর চরে ফসল ফলাতে পারেন। চাকরির ব্যাপারে তাদের ছ্যুৎমার্গ নেই । দূরত্ব তাদের প্রতিবন্ধক নয়। ফলে ডানলপ কারখানায় তাদের টিবি হয় না, বাটা কারখানায় জুতো তৈরি ও বিক্রির কাজ করলে তাদের জাত যায় না, সরকারি বাসের ড্রাইভারি কণ্ডাক্টরি, ফেরিওয়ালা হয়ে রাস্তাঘাটে মাল বিক্রি করলে তাদের সম্ভ্রম যায় না । ‎পরন্তু তাদের প্রতি বাড়িতে লেখাপড়া শেখায় দারুণ আগ্রহ। ‎তাদের মেয়েরা কিছুদিনের মধ্য টেলিফোন বিভাগ, সরকারি দুধ সরবরাহ বিভাগ ও সরকারি অফিসে স্টেনো ও টাইপিস্টের চাকরিগুলো নিয়ে নিলেন। মার্চেন্ট অফিসে হানা দিয়ে দূরে হটিয়ে দিলেন এ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের। ‎রাজ্যময় মেয়েদের জন্য স্কুল গড়ে উঠতে লাগল। শিক্ষয়িত্রী হলেন এই নবাগত পরিবারের মেয়েরা। ‎বিচিত্র এই মেয়েরা বৃদ্ধ বাবা মা, ছোটো ভাইবোনদের স্বার্থে নিজেদের ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য যৌবন বলি দিলেন। ‎"মেঘে ঢাকা তারা " একটি বিচ্ছিন্ন মেয়ের গল্প নয়। ‎মা এদের বলত, " মেয়ে ভীষ্ম"। ‎ ‎কতদূর চলে এলাম পিতৃদেবকে ছেড়ে।

আমাদের কলকাতা থেকে এনে অগ্রদ্বীপে রেখে একদিন বাবা আর আশুবাবু গেলেন দিল্লী। তখন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চলছে। জগদ্ধাত্রী আয়রন এ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কস্ সফল টেন্ডারদাতা হিসাবে প্রচুর লোহার পাইপ সরবরাহের বরাত পেল। সপ্তাহে দু দিনের জায়গায় চারদিন ফার্নেস জ্বলল। পাইপ সাপ্লাই হল এবং ঘুষ না দেওয়ায় তা সাব স্ট্যান্ডার্ড বলে বাতিলও হল। স্বাধীন ভারতে ঘুষ কিসের! অতএব সরাসরি নেহেরুজীর দরবারে। ফিরলেন ওরা তিন মাস পরে। কেদার -বদরী এবং উত্তর ভারত বেড়িয়ে। মনে আছে একদিন একগাল দাড়ি, ধূলিধূসর পোশাক, গায়ে কম্বল জড়ানো দুটো লোক বাঁশবাগান পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকছে। ‎ভয়ে গলা কাঠ। ‎মা দেখি বেশ চিনতে পারল। বাবা আর আশুবাবু। নেহেরুজীর আশ্বাস নিয়ে ফিরেছেন। ‎ভোরবেলা দিল্লী এক্সপ্রেসে হাওড়া, তারপর সেখান থেকে কাটোয়া লোকালে অগ্রদ্বীপ। তারপর! ধুস্ বাবা তো সরকারি চাকরি করেন নি। ঘাঁতঘোঁত জানবেন কি করে! আগে গণদেবতাদের পুজো চড়িয়ে বড় বড় দেবদেবীর দুয়োরে মানসিক জমাতে হয়। নেহেরু! ফু:! লোকাল অফিসের বড়বাবুকে চটিয়ে কাজ হাসিল করবে! এতো হিম্মত! চিঠি এলো দিল্লী থেকে। এরা বললেন, ডিফেক্টিভ পাইপ। সব porous । জরিমানা হিসাবে সব মাল কনফিসকেটেড। আম ছালা দুই গেল। কারখানা সে আমলের পাঁচলাখ টাকার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারল না। চলল, চলতে থাকল টুকটুক করে। বাবার আদর্শবাদের আদর্শ বাদ গেল। তারপর এক আশ্চর্য উপকথার প্রাত্যহিক জন্মমৃত্যু চলতে লাগল যা আমার মতো কিশোরের অধিগম্যতার অনেক ঊর্ধ্বে। কারখানা ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চললেও বন্ধ হয়নি কখনো। প্রতিমাসে আশ্বাসিত অর্থাগম বন্ধ না হওয়ায় সংসার নামক চতুষ্পদের গতিতে শ্লথতা এলেও তার চলমানতা বাধা পায়নি। অশ্বগতি অশ্বতরগতিতে রূপান্তরিত হয়ে থমকি থমকি চলতে লাগল। অভাব নেই। তবে আগের দিনের উদ্দাম উচ্ছলতা লোপ পেয়েছে। এই পর্যায়ে জীবন যে সব রসিকতা করতে লাগল রক্তমাংসের কতগুলি মানবকের সঙ্গে তার বিবরণ দিতে গেলে একটি মহাভারত হয়ে যাবে। ব্যাসদেবের কৃতিত্বে ভাগ বসানোর বাসনা না থাকায় এবং কোনো বাসুদেবের প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ যোগ না থাকায় সে চেষ্টা করলাম না। ‎জ্ঞাতিশত্রু বলে কিছু ছিল না। কোনো দ্রৌপদীও ছিল না। রাজ্যপাটও তেমন কিছু ছিল না। কাজেই যুদ্ধটা একপেশে হয়ে রইল। ‎সবাই ধনঞ্জয়, সবাই পার্থসারথী। ‎আর বিপক্ষে মহারথীদের সংখ্যা ও সামর্থ্য সত্যিই আক্ষরিক অর্থে কুরু। পিতাশ্রী নিজেই প্রবলপরাক্রান্ত পক্ষ ও বিপক্ষ হয়ে উঠলেন। কখনো ঈশ্বরকে ট্যাঁকস্থ করে পাঁঠা বলি দিয়ে আশুবাবু ও অন্যান্যদের তার ইড়া পিঙ্গলা সুষুম্নাকাণ্ড এবং মূলাধার বোঝান ---- নেহাত পাঁঠার মা মা ধ্বনিতে অনাহতচক্রের হৃৎকমলে ধূম ওঠে না এবং মুণ্ডটি অমানবিক হওয়ায় আজ্ঞাচক্র ও সহস্রারের স্থিতি অবোধগম্য থাকে, কখনো বা এমন জম্পেশ কালী পূজা হয় শনিবার বা মঙ্গলবারের মধ্যরাত্রে যে বাবার মন্দ্রগম্ভীর মন্ত্র ও স্তোত্রপাঠের তাড়নায় কাছাকাছি এলাকার ভূতপ্রেতমামদো এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মদৈত্যও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। কচি বয়সে আমাদের গায়ের রোমগুলি ঊর্ধ্বমুখ হয়ে থাকত। নেহাত গাঙুরের নির্জন নদীগর্ভে অনুষ্ঠান, নাহলে অজ্ঞান হয়ে যেতাম নিশ্চয়। সামান্য চেতনা থাকত মাংসের ঝোলভাত খাওয়ার জৈবিক ইচ্ছা ও লোভে। পলাণ্ডুবর্জিত সে মাংস রান্নার গুণে দেবভোগ্য হয়ে উঠত। অবশ্য দেবদর্শন অধরা থেকে যেত। সেই সব শনি মঙ্গলের অমারাত্রে যারা উপস্থিত হতেন গ্রামগ্রামান্তর এবং বর্ধমান ও কলকাতা শহর থেকে, তাদের চোখ রক্তবর্ণ থাকত প্রায় সারারাত, কপালে দীর্ঘ তেলসিঁদুরের টিকা, মুখে আসবের কটুগন্ধ এবং মুখে "মা""মা" ধ্বনি। শুনেছি নরকরোটিও থাকত কারণবারি পানের সময়। ডানহাতের তিনটি আঙুলের ওপর স্থিতপাত্র থেকে অকাতরে চালান যেত মুখ গহ্বরে। প্রায় সকলেই ব্রাহ্মণপরিবারের এবং কৌল বলে পরিচিত। এই সব তান্ত্রিক আচারে বাদ থাকত শুধু নারী।আর বাদ পড়ত শূকরস্য শুষ্ক মাংস। "বামে রামা রমণীকুশলা দক্ষিণে পানপাত্রম্। অগ্রে ন্যস্তং মরীচসহিতং শূকরস্য শুষ্কমাংসম্।। " শ্লোকটির অঙ্গহানি কিভাবে পূর্ণ হত বলতে পারব না। তবে অংশগ্রহণকারীরা প্রায় সকলে, পিতাশ্রী বাদে, পীত্বা পীত্বা পুন: পীত্বা পতিত্বা চ মহীতলে ‎উত্থিত্বা চ পুন: পীত্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে। ‎এমত বিশ্বাসে " ‎পুনর্জন্মদু:খাত পরিত্রাহি মাত:" বলে বালকের মতো রোদন করতে করতে ভূমিতলে আশ্রয় ।