Samokal Potrika

আমি তখন চট্টগাম । শরীলে ১০০ ডিগ্রীর মতো জ্বর নিয়ে বসে আছি । শুয়ে থেকেই সারাদিন কাটিয়ে ছিলাম । এখন আর শুযে থাকতে ভাল লাগেনা । তাই বসে আছি । সারাদিন রোজা রেখেছিলাম বলে কোন ঔষদ খেতে পারিনি । ইফতারীর পর এক ডোজ ঔষদ খেয়েছিলাম । তাতে কোন উন্নতিই হয়নি । মাথা ব্যাথার যন্ত্রণাটা রয়েই গেল । 

রাত পোহালেই ঈদ !  চারিদিকে আনন্দ হৈ চৈ ও ঈদের আমেজ শুরু হয়ে গেল । 
কিন্তু সেই আনন্দ আমার হৃদয় স্পর্শ করেনি ! ঈদের আনন্দর চেয়েও বেশী কিছু  আনন্দ আছে । যা মানুষের জীবনে একবারই আসে ।  আমার হৃদয়ে এক অন্যরকম আনন্দ জেগে উঠেলো সেটা হল  আগামীকাল আমি বাড়ি যাব ! আমার সবুজ শ্যামল গায়ে...। 
মনে পরছে আমার সবুজ শ্যামল সুজলা সফলা গায়ের কথা । কতদিন গায়ের নদীতে গোসল করিনা । মাঠের ঐ সবুজ ধান ক্ষেত গুলি দেখিনা । বিকেল বেলা গ্রামের আকা বাকা পথ ধরে হাঁটি না । আর আমার মায়ের চাঁদ মুখ খানি দেখিনা । শুনছি না মায়ের মুখের "বাজান" নামে মধুর ডাকটি । 
মায়ে কথা খুব মনে পরছে  । আমার মা জননী অধীর আগ্রহে আমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে..। সেই ছোট থেকে মায়ের কোলে বড় হয়েছি । একটি রাতের জন্যও মায়ের আঁচল ছেড়ে কোথাও যাইনি । মা ও আমায় ছেড়ে কোথাও একটি রাতও কাটায়নি । চাঁদনি রাত কিংবা ঈদ তো দূরের কথা । আমি মায়ের ছোট সন্তান বলেই হয়ত আমার জন্য মায়ের এত আদর এত ভালবাসা । আর আমিও মাকে ছাড়া কিছুই বুঝিনা ।  

আজ জীবনের প্রথম কোন  চাঁদনি রাত কাটাচ্ছি আমার মায়ের বুক ছেড়ে চট্টগ্রামের মাটিতে । অপেক্ষায় আনন্দ বাড়ায় , এই কথাটি যেন মহা সত্য !  দীর্ঘ এক মাস যে অপেক্ষা করেছি তারচেয়েও দ্বিগুণ আনন্দ আমার মনে ভাসছে !  সারারাত চোখে ঘুম নেই । এক দিকে বাড়ি যাওয়ার আনন্দ অন্য দিকে জ্বর ও মাথা ব্যাথার তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে কাটল রাত । মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি আসছে । 
আমি জামাআতের সাথে ফজরের নামায আদায় করে বাসায় ফিরলাম । 

রাতে ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম । কাক ডাকা ভোরে, আমি ও আমার এক ভাই বাড়ির উদ্দশ্যে রওনা হলাম । অবশ্য চট্টগ্রাম শহরে আজ কোন কাকের ডাক শুনিনি । 
ভোরের মিষ্টি আলো এখনো চারিদিকে ফুটেনি । আশপাশ অন্ধকার । আকাশের রং সাদা । 
রাস্তা ঘাট অলি-গলি সব ফাঁকা কোথাও কোন রিক্সা নেই বলে আমরা বড় রাস্তা পর্যন্ত হেঁটেই গেলাম । সেখান থেকে লোকাল বাসে চট্টগাম শহরে এলাম । 
এরই মধ্যে সূর্যিমামা পূর্ব আকাশে উদয় হয়েছে । আকাশ পরিষ্কার কোথাও কোন মেঘের চিহ্ন নেই ।  চারিদিকে ঝকঝকে রোদ । সেই রোদে ঝলমল করছে চট্টগ্রাম শহরের সব উচু নিচু পাহার ! 
ইতি মধ্যে কয়েকজন কিশোর নতুন জামা কাপর পরিধান করে রাস্তায় নেমে ঈদের আনন্দ  ভাগাভাগি করছে । আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের আনন্দ দেখার চেষ্টা করলাম । 
আলম ভাই কারো কাছ থেকে যেন শুনল আজ কোন  দুরপাল্লার বাস চলাচল করবেনা । তাই তিনি এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ছুটছে বাসের জন্য । 
আমার হাঁটতে  ভাল লাগছেনা পা ধরে আসছে । গায়ের জ্বর আরো বেড়েছে । বাড়ি যাওয়ার আনন্দে এতক্ষণ একটু কম ছিল । যখন শোনলাম বাস নেই তারপর থেকে আবার বেড়ে গেল । মাথার যন্ত্রণাও বেড়ে গেল । চারিদিক দিয়ে যেন ভোঁ ভোঁ 
শব্দ আসছে । আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে 
। আমি রাস্তার এক পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছি । 
বাড়ি থেকে আমার মোবাইলে কল আসলো আমার খালু মারা গেছে । ঈদের দিনে  এই রকম একটা শোকের সংবাদ শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না । আমার খুব অসস্তি হচ্ছে ।  এখন আমার আর কোন কিছুই ভাল লাগছেনা । শুধু বাড়ি যাওয়ার জন্য মনটা অস্থির হয়ে আছে । এখন আর দাঁড়িয়ে থাকতেও ভাল লাগছেনা । কোথাও একটু বসতে পারলে ভাল হত । 

অনেক্ষণ পর আলম ভাই খোঁজ নিয়ে এসেছে আজ বেলা বারোটার আগে কোন দুরপাল্লার বাস ছাড়বে না । তবে  শ্যামলি পরিবণের ফাস্ট টিপ ছাড়বে সকাল "ন'টায় । তাও আবার ডাবল ভাড়া । তবুও ভাল বলতে হবে । আমরা যে অপেক্ষার সাগলে ভাসছি ।   এতক্ষণে মনে হয় সেই সাগরের কোন কিনারা খুঁজে পেয়েছি ,  বলে মনে মনে সান্ত্বনা  খুঁজছি । যদি বারোটা আগে কোন বাস না ছাড়ত তাহলে কেমন হত ? 

আমরা শ্যামলি পরিবহণের কাউন্টারে বসে আছি । 
কি আর করা ? এছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প উপায় অথবা পথ খোলা নেই । 
। গাড়ি ছাড়ার আরো দুই ঘন্টা বাকি  । এখন অপেক্ষাই হলো আমাদের এক মাত্র লক্ষ ! 
আমি বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম । এক গভীর আগ্রহের অধীর অপেক্ষা !  এই অধীর অপেক্ষায় আমার মনের ব্যাকুলতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে । 

এক ঘন্টা যেন আমার জন্য এক যুগ হয়ে দাঁড়িয়েছে ! অলস মস্তিস্ক দুশ্চিন্তার প্রাধান কারন ! আমার মাথায় অনেক উদ্ভট প্রশ্ন ঘুরপাক করছে । মনে অনেক অনেক দুশ্চিন্তা হচ্ছে । দীর্ঘ ৬ ঘন্টর বাস জার্নি তার উপর আমার শরীলের অবস্থা ভাল না । আমি ঠিক মতো বাড়ি যেতে পারব তো ? পথে কোন অসুবিধা হবে না তো ? 
আমার অসুখ আরো বাড়ে যাবে না তো ? 
আমরা সুস্থ ভাবে আমদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব তো । 

রাস্তা ঘাটে কোন এক্সিডেন্ট হবে না তো ? 
এই সমস্ত অসংখ্য চিন্তা ভাবনা আমার মাথায় চেপে বসেছে । 
এসব ভেবে ভেবে আমি কনফিউজ হয়ে যাই । আবার ভাবি আমাকে বাড়ি যেতেই হবে , যে ভাবেই হোক , যে করেই হোক ,  আমাকে সুস্থ থাকতে হবে । আমাকে বাড়ি যেতে হবে ।  আমার নিজের জন্য না । মায়ের জন্য  বাড়ি যাব । আমাকে যেতেই হবে ।  আমি সুস্থ ও নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য মহান  আল্লাহর দরবারে প্রার্থণা করতে থাকি । 

আমার শরীলের এই অবস্থা দেখে আলম ভাই আমাকে নিয়ে চিন্তায় করকে লাগলেন । এবং আমার নানান সুবিধা অসুবিধার কথা জানতে চাচ্ছে । 
এখন কেমন লাগছে ? ঔষদ পত্র আছে কি না ? বেশী খারাপ লাগছে ? মাথায় বেশী যন্ত্রণা হচ্ছে ? দাঁড়াও আমি করা করে এক কাপ রং চা নিয়ে আসছি । রং চা মাথা ব্যাথার জন্য খুব উপকারের । দু কাপ রং চা খেলে অটোমেটিক্যালি মাথা ব্যাথা চলে যাবে  । তুমি এখানে বসো আমি চা নিয়ে আসছি.. 

আমি সোফা চেয়ারে পা ছেরে মাথা হেলিয়ে শোয়া অবস্থায় বসে আছি । 
একটু পর পর দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছি । বসে থাকলে মনে হয় সময় ফুরায় না । আশে পাশে একটু  ঘুরে আসতে পারলে সময়টা ফুরিয়ে যেত । কিন্তু শরীলে জ্বর বাসা বেঁধেছে বলে সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না ।  তাই কাউন্টারেই বসে আছি । এখানে আরো অনেক যাত্রী বসে আছে । যারা সবাই তাদের নিজ নিজ গ্রামে যাবে পরিবারের সাথে ঈদ করতে । ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে । কিন্তু গাড়ি ছাড়তে বিলম্ব হবে বলে অনেকেই নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে । 

আলম ভাই নাস্তা ও রং চা নিয়ে হাজির হয়েছে । নাস্তা করতে আমার ভাল লাগছেনা । তবুও মনের বিরুদ্ধে জোর করে খেলাম । পর পর দু কাপ রং চা খেলাম । মাথার কোন উন্নতি হয়েছে কি না ঠিক বুঝতে পারছি না । 
নাস্তার পর্ব শেষ করে মাথা হেলিয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম । কিন্তু ঘুম যেন চোখের পাতা ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে গেল । তাই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ন'টা বাজার জন্য অপেক্ষায় রইলাম... 

এক সময় আমাদের অপেক্ষার অবসান ঘটল । সকাল ন'টা দশ মিনিটে আমাদের বাস ছাড়ল । আলম ভাই গাড়ির চেয়ার হেলিয়ে বলল- এবার শুয়ে একটা ঘুম দাও  । গৌরিপুর আসলে 
হেল্পার আমাদের ডেকে নামিয়ে দেবে বলে উনি মাথা হেলিয়ে ঘুমিয়ে পরল । 
কিন্তু আমার চোখে আসছে না । 
গত দু-দিন যাবত আমার চোখে ঘুম নেই এখনো ঘুম আসছে না  । গত দুদিনের ঘটে যাওয়া সব ঘটনা আমার চোখে ভাসছে । আমার খালু মারা যাবার শোক ,  জ্বর ও মাথা ব্যাথার যন্ত্রণা এবং বাড়ি যাওয়ার আনন্দ ও ঈদের আনন্দ । সব মিলিয়ে আমার মনে এক অন্য রকম অনুভুতি তৈরী হল । যা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবনা ।  আমি হতভম্ব ও বিস্মিত ! 
হাসি আনন্দ দুঃখ কষ্ট ব্যাথা বেদনা কোন কিছুই যেন আমমায় স্পর্শ করছেনা !  সব মিলিয়ে আমি সাম্য অবস্থায় আছি । 

গাড়ি ছুটছে তার আপন গতিতে । 
রাস্তায়  কয়েকটা ঈদের জামাআত চোখে পরল । সেই আমাআত দেখে আমার ছেলেবেলার ঈদের দিনের কথা গুলি মনে পরে গেল । ছোটবেলায় দেখতাম ঈদ হত শীতের দিনে । সকাল সকাল শীতের মধ্যে ঘুম থেকে উঠে গোসল করতে ভাল  
লাগতনা । তবুও ঈদের আনন্দে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সবার আগে গোসল করে নতুন জামা কাপর পরে বাবার সাথে ঈদ গায়ে যেতাম । 
বাবার কথা মনে করে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল । আজ যদি বাবা বেঁচে থাকত ? তাহলে মায়ের মতো বাবাও আমার জন্য পথ চেয়ে বসে  থাকত । বাবার ব্যাথায় চোখে অশ্রু এসে গেল । আমি কিছুতেই অশ্রু চেপে রাখতে পারলাম না । 
মনে পরে সেই সব ঈদের দিন গুলির কথা ,  ঈদে নতুন জামা কিনে দেইনি বলে বাবার সাথে রাগ করে অবিমান করে ঈদ গায়ে যাইনি । ঈদের নামাজও পরিনি । সারা দিন ঘরে শুয়ে থেকেই কাটিয়ে দিয়েছি । 
আজ সেই সব দিন গুলির কথা বেশী মনে পরছে । 
আজ ঈদের দিনে ঈদের নামাজ পরতে পারছি না বলে মনাটা ভীষন খারাপ লাগছে । 
কত ঈদের নামাজ'ই তো অভিমান করে পরিনি । আজকের ঈদের নামাজটা না হয় বিপদে পরে পরতে পারব না । আজকে ঈদটা না হয় একটু ব্যতিক্রমি'ই হবে ! সারা দিন গাড়ি দৌড়াব । এসব বলে বলে আমার অবচেনত মন আমায় 
সান্তনা দিয়ে যাচ্ছে.. 

রাস্তা একেবারে ফাঁকা কোথাও কোন যানজট নেই । গাড়ি ছুটছে ১২০ কিলোমিটার গতিতে । 
চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৩ ঘন্টায় আমরা কুমিল্লার গৌরিপুরে এসে পৌঁছালাম । তারপর সি.এন.জি নিয়ে চলে যাই আমার জন্মভুমি জগন্নাথকান্দি গ্রামে । 
গ্রামের মাটিতে পা রাখতেই যেন আমার প্রাণ ফিরে এল ! আমি চোখ বড় বড় করে গ্রামের চারপাশ দেখতে শুরু করলাম । 
গ্রাম দেখতে দেখতে বাড়িতে এসে দেখি আমার মা জননী আমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে । 
মা আমাকে দেখা মাত্রই ঝরিয়ে ধরে আদর করতে করতে বলল- কতদিন ধরে আমার মানিকের মুখটা দেখিনা বলে কেঁদে দিল । 
মায়ের সেই আদর স্নেহ ও ভালবাসায় আমার চোখে অশ্রু এসে গেল । আমি সেই অশ্রু লুকাবার চেষ্টা করলাম । কিন্তু কিছুতেই লুকাতে পারলাম না । টপ টপ করে ঝরতে শুরু করল ।