Samokal Potrika

স্টেশনে এসে আজ ট্রেন মিস! এই রে কি করি ,হাতে যে অনেকটা সময়। পরের ট্রেনের অপেক্ষার আগে হটাতই ,আগন্তক হয়ে পৌঁছে গেছিলাম দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রতীক্ষালয়ে।হরেক কিসিমের মানুষের সমাবেশ থাকে এইখানে! প্রবেশ করলেই  অনেক ভিন্ন পেশার,সন্দেহ ভাজন ,ভবঘুরে ,হকার ,ভিখারি,চা, গুটকাবালা,অস্থায়ী সংসার পাতা দুর্বল অসহায় সকল মানুষের চোখে স্ক্যান হয়ে গেলে আপনি নিশ্চিন্ত অনেকটাই ।আর চলতি ফিরতি প্যাসেঞ্জাররা কে এলো আর কে গেলো সে বিষয়ে ওতো ভ্রুক্ষেপ করবে না ।

আগেও হয়েছে এমন বেশ কয়েক বার । চুপ করে চোখ দুটো খোলা রেখে দেখেছি  কত রকম মানুষের ভিড়ে  কিছু অভাবী,বিশেষ করে কিছু ঠাকুমা ,দিদিমা বয়সী ভিখারীর কার্য্যকলাপ।তাদের দেখে  অনেক না বলা কথা মনের মধ্যে শব্দের ভিড় জমিয়েছে ।
তাঁরা বৃদ্ধাশ্রমের মতো কেমন একটা সংসার এই অপরিচিত ,বিস্তৃত,গা ঘিনঘিনে হল ঘরে অস্থায়ী ভাবে গড়ে নেন। আরো পাচঁ জন সমবয়সী ভিখারীর সাথে মনের আদান প্রদানে ,ইশারায় তাদের সখ্যতা মনের মধ্যে সব হারানোর উপলব্দির মাঝেও একটা যেনো শক্তি যোগায় ।

আমারও মনের ব্যাক গ্রাউংড ও নানা  চলমান চিত্রের দৃশ্য রূপায়নে ভরে ওঠতে থাকে  ভাবনার রসদ হয়ে ।

সমাজতত্ত্ব বিভাগে পড়ার দৌলতে হয়তো চোখ আর অনুভবের পরিমাণ একটু হলেও বেশি হওয়ায় মহান শক্তিধর কে প্রণাম ।এই ভাবে রাস্তা ঘাটে চলার পথে অনেক তুচ্ছতর ঘটনা হটাত করেই মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়।
আজ প্রতীক্ষালয় ছিলো মোটামুটি ফাঁকা বললেই চলে । প্রাপ্ত বয়স্ক সকাল , সাড়ে দশটার দিকে ঝুঁকছে ঘড়ির কাঁটা । আসে পাশের মফস্বল থেকে পড়তে আসা কিছু মেয়ে টিফিন করছে দূরে সিমেন্টের চেয়ারে বসে।  কিছু বখাটে ছেলে মোবাইলের ভোল্যূমের তীব্রতায় অত্যন্ত খুশি হয়ে যেনো সমাজ কে বার্তা দিচ্ছে জিও র ফ্রী নেটের বিজ্ঞাপন আর অন্তরের খুশির বহিঃপ্রকাশে  "দেখ কেমন লাগে " মার্কা চটুল হাসি । দেখলাম সেই বিকট শব্দ ব্রম্ভর দাপটে দূর থেকে এক ভিখারী  ঠাকুমার রগরগে কাঁচা খিস্তি এক লহমায় দেওয়ালে  ধাক্কা দিলো বটে ,কিন্তু পরিবেশের খুব একটা উন্নতি তেমন হলো না !
চোখ তখন খানিক তফাতে মগ্ন । এক মোটা সোটা  ভারিক্কি চেহারার ষাটোর্ধ ভিখারী মাসিমা মেঝেতে বসে তার সবেধন এক ছেঁড়া ব্যাগ থেকে কি যেনো একটা বের করে কামড় দিলেন ,উহু মন যেনো ঠিক ভরলো না ! আবার পাঁচ আঙ্গুল চালান দিয়ে আমূল কুলের একটা পুরনো বোতল খুলে হাতে একটু গুঁড়ো মতো ঢাললেন । 

মোবাইলে চার্জ বসিয়ে থাকায় অন্যমনস্কতার মাঝেই উপলব্ধি করলাম ওটা ছিলো একটা লাল পাকা টমাটো ,গুঁড়ো মতনটা জিভের স্বাদ বর্ধনকারী নুন ।শত দারিদ্র ,বঞ্চনার মাঝেও পায়ের ওপর পা তুলে এতো সৌখিন ভাবে আয়েশ করে উনি খাচ্ছিলেন বা  নিজের খিদে মেটানোর চেষ্টা বারবার যেনো এটাই বার্তা দিচ্ছিল ,যে ওনার অতীত সংসার ,রুচি সব কিছুর মধ্যে একটা পরিশীলিত ব্যাপার ,একটা বনেদি আনার ছাপ উঁকি মারছিল । ওই যাহোক করে দিন কেটে গেলেই  হলো এমন ভাবনার থাবা থেকে তিনি মুক্ত । 

কেনো জানি না আমি পরিষ্কার দেখতে পারছিলাম ,এক অদৃশ্য ,অন্য ব্যাক গ্রাউংড ওনার পেছনে ,যেনো উনি নাতি নাতনি ,ছেলে ,পুত্রবধূ ঘেরা এক সুখী সংসারে কোনো এক আয়েশের দুপুরে ঠিক এই  ভাবে পানের বটুয়া খুলে পরিপাটি করে পান সাজছেন । গা ভরা গয়না,ঠাকুমার ওপর নাতি নাতনির অগাধ আস্থা আর আভিজাত্য মনের আকাশে কল্পনার ডানা মেলার মাঝেই ট্রেনের ঘোষণা 
মস্তিষ্কে টোকা দিলো !ফিরে এলাম বাস্তবের কোলাহল মাটিতে ।ওই ঠাকুমা তখন এক টুকরো ছেঁড়া গামছা ততক্ষণে ব্যাগ টার ওপর সুন্দর ভাবে গুছিয়ে চাপা দিয়ে পাশের শুয়ে থাকা প্রতিবেশী  ভিখারী ঠাকুমার সাথে সুখ দুঃখের কথা বলতে ব্যস্ত ।

ট্রেন ধরতে উঠতে যাবো ,দেখি পাশে এক যুবক যুবতী টিফিন বক্স থেকে টিফিন করছে দেখে পাশে শুয়ে থাকা অন্য আর এক ভিখারী একনাগাড়ে  জল চেয়েই যাচ্ছে । হয়তো জল প্রয়োজন খুব একটা নেই  ,কিন্তু মিটি মিটি চোখের ঔজ্বলতা যেনো বলছে যদি জলের সঙ্গে একটুকরো লুচি ,পরোটা জুটে যায় ! ওমনি দেখি   আমার ভাবনার রসদ যোগানো ভিখারী মাসিমা এক ধমক দিয়ে বললো "আ মরণ ,বাছা দুটো দুটি খাচ্ছে ওমনি জল ,জল ! ও বাছারা তোমরা খাও ,ওর তেষ্টা পায় নি "বলে হেঁকে আর এক দূরের ভিখারীকে অভিযোগ করলো ।আমি হাসতে হাসতে যেনো অতীত দিনের ওনার  দাপটের ঝলক দেখতে পেয়ে গন্তব্যে পা বাড়ালাম।ট্রেনে উঠে মনটা এক শূন্যতায় ভরে গেলো ওই ভিখারী মাসিমার বর্তমান অস্থায়ী আস্তানা আর আমার কল্পনায় রঙ ছড়ানো ওনার অতীত,যেটা হয়তো আমার মিছে ভ্রমও হতে পারে ।