Samokal Potrika

এক এক করে সবার নাম ডাকছে আর সবাই যে যার নিজের মত করে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে। কেউ বলছে ধুমধাম করে নিজের জন্মদিন পালনের কথা, কেউ বলছে মা বাবার সঙ্গে দক্ষিণ ভারত  বেড়াতে যাওয়ার কথা, কেউ বলছে মা বাবার সঙ্গে হুল্লোড় করে কাটানো দুর্গাপুজো বা ক্রিসমাস ডের কথা। কিন্তু সে কি বলবে? তার জীবনে তো কোনো উৎসব নেই, আলো নেই, কোনো ভালো লাগা নেই! আজ পেরেন্টস ডেতে ক্লাসের সবাইকে বলা হয়েছে মা বাবার সঙ্গে কাটানো সেরা মুহূর্ত নিয়ে কিছু বলার জন্য। সে গম্ভীর মুখে বসে ছিল। তাই দেখে রিকিতা মিস বললেন, "হোয়াই লুকিং সো স্যাড, মাই বয়? ডোন্ট গেট নার্ভাস, ইউ আর এ ব্রেভ বয়, আর'নট ইউ? রিকল ইউর মেমোরিস।" সে রিকল করার চেষ্টা করল। সে মনে করতে পারে না মা বাবা কখনো হেসে, গল্প করে সময় কাটিয়েছে। মা'র অফিস থেকে ফিরতে দেরী হলে বাবা রেগে যেত। তারপর মা ফিরলে তুলকালাম। "আমার বাড়িতে এসব বেলেল্লাপনা চলবে না" বাবা গর্জন করত। মায়ের তীক্ষ্ণ জবাব, "তোমার এই নোংরা মন্তব্যগুলো এবার বন্ধ কর, মানুষের সহ্য ক্ষমতার একটা লিমিট আছে।"

– "কথা ঘুরিও না! চালাকি করে কথা এড়িয়ে যাচ্ছ? ভাবছ আমি কোনো খবর পাই না! আজকাল তো অফিসের কাজের নাম করে প্রতিদিন  সুমনের সঙ্গে ঘুরছো।" 

–"মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ! এই প্রজেক্ট টাতে টিম লিডার সুমন, আর ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য আমাদের বাইরে যেতেই হয়।" 

–"প্রজেক্ট দেখাচ্ছো? খুব আগ্রহ? ইংরেজিতে ছেলেটার নম্বর কমে যাচ্ছে, সেদিকে নজর আছে?" 

–"এই এসাইনমেন্টটা ভরসা করে আমাদের ওপর দেওয়া হয়েছে, এর ওপর কোম্পানির উন্নতি, আমাদের উন্নতি দুটোই নির্ভর করছে।"  –"তোমার উন্নতি? তাতে সংসারের কোন উন্নতি হবে শুনি? তুমি উন্নতি কর আর ছেলে গোল্লায় যাক!" "

–মনে রেখো ফ্ল্যাটের ই এম আই এর বেশীর ভাগটা কিন্তু আমিই দিই।তাছাড়া আমি যতটা সময় ছেলের পেছনে খরচ করি, তুমি কতটুকু কর? তোমার  তো ওকে সায়েন্স দেখানোর কথা, তাহলে কালকে ক্লাসটেস্টে ও এত কম পেল কেন?"

– "টিটো, সায়েন্স টেস্টের খাতা বের কর।" মায়ের প্রচন্ড ধমক আর বাবার রাগত দৃষ্টির সামনে নিজেকেই প্রধান অপরাধী বলে মনে হত। প্রতিদিনের ঝগড়া, বাকবিতন্ডা টিটোর মনটাকে তেতো করে দিত।স্কুলে তাকে মিস গুডবয় বলেছে, তার হাতের লেখার প্রশংসা করেছে এইসব গল্পগুলো আর করা হত না। একপ্রস্থ কথা কাটাকাটির পর মায়ের মুখ গম্ভীর। যখন তাকে পড়াতে বসত মনে হত স্কুলের রাগী কৃত্তিকা মিস পড়াতে বসেছে। পড়া শেষ হয়ে গেলে দেখতো বাবা বাইরের ঘরে বসে পেপার পড়ছে অথবা সুদোকু খেলছে। তাকে দেখতে পেয়ে বলতো, " এসো টিটো,গল্প করতে করতে একটা গেম খেলি, দেখবে তুমি কত নতুন শব্দ শিখবে।" বাবা  এমনভাবে ছোট ছোট নতুন গল্প বলতো যে, টিটো সত্যিই অনেক নতুন শব্দ শিখতো। কিন্তু  যখন তখন মেজাজের কারনে টিটো একটু একটু করে বাবাকে ভয় পেতে শুরু করেছিল।

    রাতে খেতে বসে আরেক প্রস্থ অশান্তি, বাবা বলতো, " এত বাজে রান্না মুখে দেওয়া যায় না, কাজের লোকের হাতে সব দায়িত্ব দিলে এভাবেই না খেয়ে থাকতে হবে।" মা বলতো, " ভাঙা রেকর্ডের মত প্রতিদিন এক কথা বলে কিছু শান্তি পাও? সকাল আটটায় বের হওয়া, তার আগে ব্রেকফাস্ট তৈরি, টিটোকে রেডি করা, স্কুলের টিফিন করা সব তো আমার ওপর, শান্তি দেবী তো ঢোকেন ঠিক আটটার মুখে। আর টিটোকেও বলি, এবার নিজের কাজ নিজে করতে শেখ। তা হবে কেন? মা'র অসুবিধা হলে তো ওর কিছু যায় আসে না, তাই না টিটো?"  আবার সেই টিটোই অপরাধী। বাবার মন্তব্য, "এভাবে চললে বাইরের থেকে খেয়ে আসতে হবে।" মায়ের সংক্ষিপ্ত জবাব, "তাই এসো।" অতঃপর বাবার না খেয়ে উঠে যাওয়া, মায়ের থম ধরে বসে থাকা, আর টিটোর কিছুটা খেয়ে, কিছুটা না খেয়ে উঠে বিছানার দিকে গুটি গুটি পায়ে যাত্রা।  মা তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়ানোর সময় বলতো, "এবার নিজের কাজ নিজে করতে শেখো টিটো, এখন বড় হচ্ছ, স্কুলের ব্যাগ গোছানো, স্কুলড্রেস পড়া এগুলো একাই করতে শেখো। মায়ের ওপর এত নির্ভর করে না টিটো!" 

  ছুটির দিনটা স্বাভাবিক ভাবে শুরু হলেও ক্খন যে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে টিটো সেই ভয়ে ভয়েই থাকতো। দরকার ছাড়া মা বাবা কখনো নিজেদের মধ্যে কথা বলতো না।  কোনো কোনো ছুটির দিনে বাবা তাকে বেড়াতে নিয়ে যেত, কখনো তাকে হ্যারি পটার দেখাতে নিয়ে যেত। কিন্তু মা সঙ্গে থাকতো না। সে যেন দুজনের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। বাইরে বেরোলে হয় মা নয়তো বাবা, কখনো একসঙ্গে দুজনের সঙ্গে বাইরে যায়নি কোথাও। তাই তার আনন্দ যেন আকাশের ঐ আধফালি চাঁদটার মত অর্ধেক হয়েই থেমে থাকতো।  কোনো ছুটির দিনে মা আদর করে টিটোকে বলতো,"তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করো তো সোনাবাবা, আজ বিকেলে আমরা পার্কে বেড়াতে যাবো, সেখানে কত খেলাধুলা করবো।" বাবা হয়তো বাজার থেকে জ্যান্ত ট্যাংরা মাছ নিয়ে ফিরলো। শান্তি পিসিকে ডেকে বলতো, "ঝটপট করে এগুলো কূটে দাও তো শান্তি, বেশ ঝাল ঝাল করে চচ্চড়ি হবে।" মা ঝাঁঝিয়ে উঠে বলতো, "বেলা সাড়ে এগারোটার সময় বাজার করে তারপর সেই বাজার দিয়ে রান্না হবার অপেক্ষায় কেউ এখানে বসে নেই। রান্না এখন শেষের পথে। শান্তির এখন প্রচুর কাজ। ট্যাংরা চচ্চড়ি খেলে সেটা অন্যদিন।" বাবাও একধাপ গলা চড়িয়ে বলতো"কারো দয়ার ওপর নির্ভর করে আমার খাওয়া পড়া চলে না। অন্তত তোমার ওপর তো নয়ই, আমি কবে কি খাব সেটা আমি ঠিক করবো।"  বাড়ির ভেতর ছড়িয়ে পড়া সকালের হালকা বাতাস এভাবেই কখন আস্তে আস্তে ভারী হয়ে উঠতো। 

   মা কবে থেকে তাকে নিয়ে আলাদা ঘরে থাকা শুরু করলো তা টিটোর মনে নেই।  একদিন মা বাবার  ঝগড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালো। পরদিন তাকে নিয়ে মা দিদুনের বাড়িতে চলে এলো। তাদের ক্লাসের অভ্র একদিন বললো, "কিরে, তোর মা বাবার বলে ডিভোর্স হয়ে যাবে? তুই তাহলে কার কাছে থাকবি?" সে তো তখন জানতো না, ডিভোর্স মানে একটা উঁচু দেয়াল, যে দেয়ালকে কখনো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া যায় না, চুপিচুপি পালিয়ে দেয়ালের ওপারে চলে যাওয়া যায় না। জীবনের সব আনন্দটুকু ঐ দেয়ালের তলায় চাপা পড়ে থাকে। দিদুনের বাড়িতে মা যেন তার সব ভার দিদুনের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হল। অফিসের কাজে ট্যুরে যাওয়া শুরু করলো মা। আর মায়ের ওপর অভিমানে সে একাই নিজের কাজ নিজে করা শুরু করল। তাই দেখে মা একদিন হেসে দিদুনকে বলেছিল, "দেখেছ তো মা, টিটো কেমন মায়ের কষ্ট বুঝতে শিখেছে, এখন একাই সবকিছু করতে পারে।" চাই না, টিটোর কাউকে চাই না। বাবা হঠাৎ হঠাৎ এসে তাকে বাইরে নিয়ে যায়, অনেক খেলনা, চকোলেট কিনে দেয়। মা ট্যুরে গেলেই তার জন্য নতুন কোনো খেলনা আনবে। কিন্তু সে তো এসব চায়নি! তাই বাবা এলে এখন আর সে বাবার সঙ্গে দেখা করে না, মা নতুন ভিডিওগেম নিয়ে এলে সেটা ছুঁয়ে দেখে না। সে আর কারো কাছে কোনো বায়না করে না, অনুযোগ করে না,তীব্র অভিমানে সে শক্ত হাতে সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। রাত্রি গভীর হলে বন্ধ দরজার এপারে সে শুধু হাউ হাউ করে কাঁদে।রাত্রি তার সাক্ষী থাকে শুধু, সকালের আলো তাকে চিনতে পারে না। তাই সে যখন চুপচাপ রেডি হয়ে সময়মতো স্কুলে যায়, স্কুল থেকে ফিরে চুপচাপ পড়তে বসে তখন মা গর্ব করে বলে "আমার টিটো খুব লক্ষী ছেলে হয়েছে।" 

   এনাউন্সমেন্ট হচ্ছে, "ঊর্বিষ মিত্র, নেক্সট উইল বি ইওর টার্ন, কিপ ইওর স্পিচ রেডি।" বহু দিন আগের একদিনের একটা অতি তুচ্ছ ঘটনা শুধু এখনো তার মনে উষ্ণতার প্রলেপ দিয়ে যায়। তখন টিটোর চার কি পাঁচ হবে। ছোটকারা ক'দিনের জন্য বেড়াতে এসেছিল বাড়িতে। বাড়ির ভারী আবহাওয়ায় যেন ফুরফুরে দখিনা বাতাসের প্রবেশ। সকলে মিলে একসঙ্গে গল্প, খাওয়া। কাকিমা ভালো হাতের কাজ জানতো, আর কাকিমার সঙ্গে হাত লাগিয়ে টিটো বানিয়ে ফেলল কাগজ দিয়ে আস্ত একখানা গোলাপফুলের গাছ। তাই দেখে মা বাবা দুজনই খুব খুশী। টিটো বায়না ধরলো তার এবার সত্যিকারের গোলাপের চারা চাই, সে নিজের হাতে গাছ লাগাবে। বাবা সত্যিই নিয়ে এলো। পাঁচ পাঁচটা গোলাপের চারা, সঙ্গে টব। পরদিন মহাউৎসাহে বাবার সঙ্গে টিটো লেগে গেল গাছ লাগাতে। পাঁচখানা টবে পাঁচখানা গোলাপের চারা ছাদের উজ্জ্বল রোদে যেন হেসে উঠলো। কাজের ফাঁকে দেখতে এলে বাবা হেসে বলল, "বুঝলে, ছেলে আমাদের মনে হয় বড় হয়ে এগ্রিকালচার নিয়ে পড়বে।" মায়ের সহাস্য উত্তর, "বেশ তো, শুধু চাষাভুষা না হলেই হল।" বিকেলে বাবা নিয়ে এলো টিটোর প্রিয় বাহারি একখানা চকলেট কেক। ছোটকা বলল, "আরে, সবই হচ্ছে, তাহলে একখানা ছবি হয়ে যাক!"  ছাদের গোলাপগাছগুলোর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হয়ে গেল মা, বাবা,টিটো, চকলেট কেক আর কাগজের গোলাপফুলের গাছটা। টিটোর পড়ার টেবিলের কাছে ঠিক মাথার ওপরে টাঙানো ছিল ছবিটা। চলে আসার সময়ে চুপিচুপি টিটো সরিয়ে নিয়েছে । সে কাউকে আর দেখাতে চায় না ঐ ছবি। তার নাম ডাকছে, 'ঊর্বিষ মিত্র, প্লিস কাম এন্ড শেয়ার ইওর প্রেশাস মোমেন্টস।"  এত আড়ম্বরহীন ঘটনা কি বলা যায়? সে হেঁটে গেল মাইক্রোফোনের সামনে, তারপর বলা শুরু করলো।