Samokal Potrika

শহরের বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে নদী। দুধারে বেড়ে উঠছে শহর আর সেজন্য নদীকে ক্রমশ সংকীর্ণ হতে হচ্ছে । এই নদীকে কেন্দ্র করেই জন্ম নিয়েছিল এই জনপদ, আর আজ তার বৃদ্ধির জন্যই নদীকে তার জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে। তার বুকের উপর দিয়ে গড়ে উঠেছে এক বিশাল সেতু, জুড়ে দিয়েছে তার দুই তীরকে। নিজের সন্তানের এহেন উন্নতি দেখে নদীর নিশ্চয় আনন্দে বুক ভরে যায়। কিন্তু নদীর বুকে তো আনন্দ নেই, তার বুকে শুধুই ঘন কালো জল বয়ে চলেছে অবিরত।

সেতুটির উপর দিয়ে এক হাতে একটি ব্যাগে কিছু মুদি পণ্য আর অন্য হাতে এক আঁটি শাক নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সুরেন বসু। তার পাশ দিয়ে মহাকলরোল তুলে ছুটে চলেছে অগণিত যান বাহন। এমনভাবে চলছে যেন এরা জীবনে কোনদিন থামবেনা। চলাটা স্বভাব হলেও থামাটাই সত্য। তা বোধহয় এসব গাড়ির চালকদের মাথায় একদম আসেনা। যাইহোক, সুরেন বাবুর এসবের দিকে একদম খেয়াল নেই। তিনি এগিয়েই চলেছেন।ছেলেটাকে সকাল বেলা অসুস্থ দেখেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। গত কয়েক দিন যাবৎ স্কুলে যেতে পারছে না অতীন। তার জন্য আজ ওষুধও কেনা হয়েছে। পকেট ভর্তি ওষুধ, শুধুই ওষুধ, কোন টাকা নেই। অফিসের বড়বাবুকে অনেক অনুরোধ করেছিলেন, কাজ হয়নি। বন্ধুর কাছ থেকে ধারে যে টাকাটা নিয়েছিলেন, তার পুরোটাই ওষুধে চলে গেছে। নিজের টিফিন খরচটাও এইখাতেই ব্যয় হয়ে গেছে। গত দুদিনও টিফিন করতে পারেননি। ছেলের পথ্যের পেছনে সেটা কাটাও গেছে। এখন বাড়ি গিয়ে ছেলেটার পেটে ওষুধ গুলো ফেলতে পারলেই হয়।

বাড়ি ফিরতেই দরজা খুলল অতীনের মা। নিম্নমধ্যবিত্তের বাড়িতে বসার ঘর, শোবার ঘর বলতে কিছু নেই, এখানে এক ঘরেই সব সারতে হয়। ঘরের একপাশে একটি চৌকি। তার উপর মলিন চাদরে ‍শুয়ে আছে অতীন। তার মুখে এক টুকরো হাসি খেলা করছে। পথ্যে কাজ হয়েছে, অতীন এখন কিছুটা ভাল। ছেলেকে হাসতে দেখে সুরেন বাবুও হাসছেন, তার চোখ হাসছে, মুখ হাসছে, গাল হাসছে, হৃদয় হাসছে।

তার চাকরি চলে যাওয়া, মাঝ পথে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া, বিশ্বস্তের বিশ্বাসঘাতকতা, তীব্র অপমান কিছুই এখন তার মনে নেই, তার মন এখন হাসছে। সত্যি সত্যি হাসছে।