Samokal Potrika

যমরাজও এখন অনলাইনে কাজ সারছে, আর একটার পর একটা কেলোর কীর্তি করছে। হোয়াটস অ্যাপে ভুল ভাল মেসেজ পাঠাচ্ছে তাঁর চেলাদের, আর তাঁর চেলারাও তেমন, হোয়াটস অ্যাপটা তেমন সড়গড় হয় নি। আর মর্ত্য থেকে  ভুলভাল লোক তুলছে আর যমালয়ে চালান করছে। তাঁর নবতম সংযোজন রজত।      

রজত তো যমলোকে পৌঁছেই দেখে রোল কল চলছে। সবার নাম, ছবি, বয়স সব  মোটামুটি ঠিকই ছিল। শেষে রজতের পালা- কিন্তু ছবি, বয়স তো কিছুই মিলছে না!

-   তুমি কে বৎস? এখানে কি করে এলে?  

-   আপনার চেলারা তুলে এনেছে।

-   কিন্তু তোমার তো এখন এখানে আসার কথা নয়।

-   হুম, যমলোকে অনলাইনে কবে থেকে কাজ শুরু হল শুনি ?

-   বেশী দিন নয়, সদ্য শুরু হয়েছে।

-   আপনার হোয়াটস অ্যাপ আছে?

-   না না, আমি এখনও খুলি নি, ওটা চিত্রগুপ্তই দেখছে এখন। তবে ভালো ভাবে সড়গড় হয় নি এখনও ওর।

-   বুড়োর তো বয়সের গাছ পাথর নেই, কয়েক লক্ষ বছর বয়স হল, চোখে নিশ্চয়ই ছানি পড়েছে। ওই বুড়োর হাতে আবার হোয়াটস অ্যাপ দিয়েছেন, সব উল্টোপাল্টা করছে আর তাঁর চ্যালারা মর্ত্য থেকে পটাপট ভুল ভাল লোক তুলছে। এই যেমন আমি। সবে ৩৫, সদ্য বিয়ে হয়েছে। নিশ্চয়ই কোনও এক বুড়োকে তুলতে গিয়ে ভুল করে আমাকে তুলে এনেছে।

-   এ তো ঘোর অন্যায়, একটু অপেক্ষা কর। আমি চিত্রগুপ্তকে ডেকে পাঠাচ্ছি।

(চিত্রগুপ্তের প্রবেশ)

-   আমাকে ডেকেছেন প্রভু?

-   হ্যাঁ, কি কেলো করেছো দেখো, একজন তরুণকে ভুল করে তোমার চ্যালারা তুলে এনেছে। বেচারা সদ্য বিবাহিত। লিস্টটা একবার চেক করে দেখো তো, রজত সেন বলে কেউ আছে নাকি।

-   আচ্ছা দেখছি... হ্যাঁ আছে তো, রজত সেন, গড়িয়া, বয়স ৭২, হার্ট অ্যাটাক কেস। হাসপাতালের বেড থেকে তুলে আনার কথা ছিল তো।

-   তুমি ছবি, ঠিকানা সব ঠিকঠাক  হোয়াটস অ্যাপ করেছিলে তো?

-   আচ্ছা আমি খাতার সাথে মিলিয়ে দেখে নিচ্ছি আর  হোয়াটস অ্যাপে ছবিটাও একবার দেখে নিচ্ছি।

-   এই যে প্রভু হোয়াটস অ্যাপ পিক-টা দেখুন।  

রজত আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। চিত্রগুপ্তের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে ছবিটা দেখেই তো চক্ষু চড়কগাছ। ব্যাটা উল্টো ছবি পাঠিয়েছে, মানে ঠ্যাং ওপরে আর মাথা নীচে।

-   এবার আমার কাছে সব জলের মত পরিস্কার প্রভু... আমি তখন যোগাসন  করছিলাম, ঠ্যাং দুটো ওপরে ছিল আর ব্যাটারা ঠ্যাং ওপরে দেখেই আমাকে খপ করে ধরল আর এখানে চালান করে দিল, মুখ, ঠিকানা কিছুই আর  আর দেখে নি। এই সব মালগুলোকে আপনি এখনও চাকরিতে রেখেছেন? আমি ওদের যত বলছি যে আমি জীবিত, আমাকে ছেড়ে দাও- কে কার কথা শোনে, জোর করে আমাকে এখানে ধরে নিয়ে এল।

-   উত্তেজিত হোয়ও না বৎস। তোমার রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক... চিতু, এবার   বুঝতে পারছো কি গণ্ডগোল পাকিয়েছো? এখন এই জীবিত মানুষকে আমি যমলোকে কোথায় রাখবো?

-   আমি দুঃখিত প্রভু, এরকম ভুল আর হবে না। ওই জাবদা খাতাই ভালো ছিল, হোয়াটস অ্যাপে খুব সমস্যা হচ্ছে।

বুড়োর এই সব কথা শুনে রজতের মাথায় তো আগুন জ্বলছে। একে তো জীবিত  অবস্থায় এখানে নিয়ে এসেছে, আবার সদ্য বিবাহিত বউটাকেও ছেড়ে থাকতে হচ্ছে।

-   স্যার থুরি প্রভু, এবার আপনি একটা বিহিত করুন।

হ্যাঁ বৎস উত্তেজিত  হোয়ও না, দেখছি কি করা যায়

-   বলছি আপনাদের এখানে কোন নেটওয়ার্ক? আমাদের ওখানে তোমিও’ হেব্বি   চলছে।

-   আমাদের যমলোকের তো নিজস্ব নেটওয়ার্ক আছে। সেটা তো মর্ত্যে কাজ করবে না। শুধুমাত্র আমরা নিজেদের লোকেদের সাথেই যোগাযোগ করতে পারি। 

-   তাহলে এখন আমি বউকে কি করে মেসেজ করবো? পরোটা আলুর দম বানিয়ে রেখেছিল, আমি যোগাসন করে উঠে খাব বলে। সে তো এখন চিন্তা করছে, যোগাসন করতে করতে আমি কোথায় চলে গেলাম।

-   হুম, তার তো চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক। ঠিক আছে, তুমি একটি চিঠি লিখে দাও, আমি আমার এক চ্যালাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার বাড়ী। লেটার বক্স আছে তো? তাহলে ওখানেই ফেলে আসবে।

-   ঠিক আছে, যমলোকে যখন এসেই পড়েছি, স্বর্গটা ভালোভাবে ঘুরে যাবো কদিন, আপনি আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিন। বউকে বলে দেবো এক বন্ধুর সাথে কিছুদিন দার্জিলিং ট্যুরে আছি বলে ম্যানেজ করে নেবো। বলছি ভীষণ খিদে পেয়েছে, মাছের ঝোল ভাত পাওয়া যাবে?

-   না বৎস, এখানে তো মাছ পাবে না। যত খুশী ফলমূল মিষ্টান্ন খেতে পারো। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো।

-   এই যতদিন থাকবো ফলমূল খেয়ে থাকতে হবে নাকি? ওসব চলবে না, আপনার চ্যালা যখন চিঠি পোস্ট করতে যাবে আমি বাজারের ঠিকানা দিয়ে দেবো। ভালো ভালো মাছ, চিকেন, খাসি সব নিয়ে আসবে, আর চিত্রগুপ্ত দাদুকে  বলুন একজন  ভালো রাঁধুনিকে টপ করে মেরে ফেলতে। অপঘাতেই , মানে কোনও এক্সিডেন্টে মেরে দিন। আর আপনার চ্যালাকে বলে দিন আগে ওই রাঁধুনিকে তুলে নিয়ে তারপর যেন বাজার করে ফিরে আসে। তবে ওই বুড়ো চিত্রগুপ্তকে বলে দিন যেন ঠিক ঠাক লোক আনে। আবার রাঁধুনির জায়গায় কোনও নাপিতকে যেন না ধরে আনে।

-   কিন্তু বৎস, এখানে তো মাছ মাংস চলে না।

-   চলে না বললেই হল, এই যুবক বয়সে মাছ মাংস ছেড়ে ফলমূল খেয়ে থাকবো নাকি? আর আমি তো এখানে আসতে চাই নি, আপনার লোকেরাই আমাকে এখানে ধরে এনেছে। এবার যে কদিন আমি এখানে থাকবো আমার কথামতই সব হবে।

-   ঠিক আছে বৎস, ভুল যখন আমারই হয়েছে, তখন তোমার কথামতই সব হবে, এবার তুমি একটু বিশ্রাম কর।  

-    ঠিক আছে, আজ না হয় ফলমূল খেয়েই কাটিয়ে দেবো। কিন্তু আমার থাকার ব্যবস্থা কি হবে?

-   তুমি এখন আমার ঘরেই না হয় কয়েক দিন থাকো আমার সাথে।

-   না না, ওসব চলবে না। আমার পারসোনাল রুম চাই উইথ অ্যাটাচ বাথ। আর সেটা স্বর্গের কাছাকাছি হতে হবে। রুমটা যেন  তিনতলায় দক্ষিণমুখী হয়। স্বর্গের এত  কাছাকাছি যখন এসেই গেছি স্বর্গটা ভালোভাবে ঘুরে দেখব, ছবি তুলবো। সব দেবতাদের সাথে সেলফি নেব। মর্ত্যে গিয়ে ওগুলো ফেসবুকে আপলোড করবো।

-   বৎস, তুমি কত দিন এই দেবলোকে থাকতে চাও? আর এই সব ফেসবুক’, ‘সেলফি’ কি সব বলছো আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।  

-   মর্ত্যে এখন ওগুলোই চলছে। ওসব আপনাকে পরে বোঝাবো, এখানে হোয়াটস অ্যাপ যখন চালু হয়ে গেছে, ফেসবুকও চালু হয়ে যাবে কিছুদিন পর। এখন  আমার রুমে আমাকে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। আর কতদিন থাকবো সেটা এখনই বলতে পারছি না, দেখি স্বর্গটা ভালোভাবে ঘুরে দেখতে কতদিন লাগে।

স্বর্গের ঠিক পাশেই একটি সুন্দর ঘরে রজতের থাকবার ব্যবস্থা হয়ে গেল। ঘর দেখে  সে তো খুব খুশী, চারিদিকে ফুলের বাগান, সামনেই সরোবর, কত বিচিত্র পাখী গান গাইছে। তার মনটা আনন্দে ভরে গেল। তার দেখাশুনোর জন্য যমরাজ সারাদিনের জন্য একজন লোকও দিয়েছেন। ভালোভাবে স্নান সেরে ফলমূল পেট ভরে খেয়ে একটা সুখ নিদ্রা দিল।  

পরের দিন সে আবার যমরাজের সভায় গিয়ে হাজির হল।

-   কাল তোমার কোন কষ্ট হয় নি তো বৎস?

-   না না, আমি খুব আরামেই ঘুমিয়েছি, আর দেবলোকের ফলমূলের কি অপূর্ব স্বাদ, কি পরিপক্ক আর সুমিষ্ট, এখনও যেন মুখে লেগে আছে। মর্ত্যের ফল তো সব কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো, কোনও স্বাদ নেই। তা আপনাদের এখানেও নিশ্চয়ই প্রচুর আবাসন হচ্ছে?

-   আবাসন কি?

-   আরে লোকেদের থাকার জায়গা।

-   ও আচ্ছা, না না নতুন আবাসন তো কিছু হয় নি আগে যা ছিল তাই আছে।

-   মানে? পটাপট লোক মারছেন আর এখানে তুলে আনছেন, যমলোকেও তো এখন জন বিস্ফোরণ হবার কথা। এত লোক থাকছে কোথায়? এখন তো  মর্ত্যে মৃত্যুর ভ্যারাইটি কত বেড়ে গেছে, আগে বুড়ো হলে লোকে মরতো, আর কিছু মহামারী, দু একটা আত্মহত্যা, আর দু একটা অ্যাকসিডেন্ট। আর এখন অপঘাত প্রচুর বেড়ে গেছে। প্রেমে ব্যর্থ- আত্মহত্যা, পরীক্ষায় ফেল-আত্মহত্যা, শ্বশুর বাড়ীতে বউকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, হাইওয়েতে রোজ অ্যাকসিডেন্ট। আর যেটা এখন খুব হচ্ছে, আগে তেমন একটা হত না-পরকীয়া। বিবাহিত লোকেদের প্রেমের বাগান হল এখন ফেসবুক- ফেসবুকে আলাপ হচ্ছে, তারপর ফোনে যোগাযোগ, দেখা করা, তারপর প্রেম, আর তার সাংঘাতিক পরিণতি হল প্রেমিকের সাথে জোট বেঁধে স্বামীকে খুন বা প্রেমিকার জন্য বউকে খুন। এখন রোগে মৃত্যুর থেকে অপঘাতটা খুব বেড়ে গেছে। রোজ কত যুবক যুবতীকে টপাটপ তুলছেন মর্ত্য থেকে। একবার যখন আমি এখানে এসেই পড়েছি কিছু নিয়ম আমি পালটে দিয়ে যাবো। অপঘাতটা একদম বন্ধ করে দিতে হবে। কত বুড়ো মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, ফুটপাতে কত লোক দেখি কত কষ্ট পাচ্ছে তাদের তুলে নিলে তারা শান্তি পাবে। আর তাদের ছেড়ে আপনারা ভালো মানুষগুলোকে, যুবক যুবতীদের পটাপট তুলে নিচ্ছেন। আর চোর, বদমাইশ, খারাপ লোকগুলো মনের সুখে বেঁচে আছে, তাদের সংখ্যা কিছু কমলে মর্ত্যটা আরও সুন্দর হত। অনেক নিয়ম কানুন পাল্টাতে হবে দেখছি। আপনাকে আর চিতু দাদুকে নিয়ে  বসবো একদিন। 

-   এসব কি বলছ তুমি? মর্ত্যে এখন বিবাহিত নরনারীও প্রেম করছে?

-   হ্যাঁ, তবে আর বলছি কি, সব বিচিত্র ঘটনা ঘটছে মর্ত্যে এখন।

-   আচ্ছা শোন, তোমার বউ এর কাছে চিঠি পৌঁছে গেছে। আর তুমি বাজার থেকে যা যা আনতে বলেছিলে সব আনা হয়ে গেছে। আর একজন রাঁধুনিকেও তুলে এনেছে। এক উড়িয়া রাঁধুনি, তবে বাঙালি বাড়ীতে অনেক দিন রান্নাবান্না করেছে, বাংলা ভালই বলতে পারে। রান্নার হাতও ভালো। কিন্তু বৎস তুমি একটা সমস্যায় ফেলে দিলে।

-   কেন কি সমস্যা হল আবার?

-   আরে এখানে মাছ, মাংস চলে না। দেবরাজ ইন্দ্র জানতে পারলে আমার ওপর খুব চেঁচামেচি করবে।

-   আরে ওসব নিয়ে ভাববেন না। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। আচ্ছা আমার রুমটা তো বললেন স্বর্গের কাছেই। স্বর্গ কত দূর আমার রুম থেকে?

-   আরে বেশী দূর নয়। ওই সরোবরের ওপারেই স্বর্গ। দেখি আজ দেবরাজ ইন্দ্রকে একটা হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ পাঠিয়ে দেবো। আশা করি তিনি তোমাকে স্বর্গে যাবার অনুমতি দিয়ে দেবেন।

-   ঠিক আছে, আর চিতু দাদুকে একটু বলবেন আমি ওঁকে নিয়ে একদিন একটু  বসবো। যমালয়ের অনেক নিয়ম কানুন পাল্টাতে হবে। আমি নতুন নিয়মগুলো বলবো, আর উনি খাতায় সেগুলো টুকে নেবেন। একটা নতুন খাতা করতে বলবেন। আমি মর্ত্যে চলে যাবার পর ওই নতুন খাতার নিয়ম কানুন মেনেই যেন সব কাজকর্ম হয়।

-   হ্যাঁ বৎস, ঠিক আছে। তুমি তো ঠিকই বলেছো। চিতু বুড়ো হয়েছে, এভাবে  যদি মর্ত্য থেকে ভুল করে যুবক যুবতীদের তুলে আনে তাহলে তো খুব মুশকিল হয়ে যাবে।

-   বলছি এখানে আশেপাশে পানের দোকান আছে? আমার আবার একটু পানের নেশা, ওই একটু জর্দা পান।  

-   না বৎস, এখানে জর্দা পান তো পাবে না, তবে স্বর্গে একটি মুখশুদ্ধি পাওয়া যায়। সেটা না হয় তোমাকে দেবো।

-   ঠিক আছে, তাতেই চলবে। স্বর্গের মুখশুদ্ধি খারাপ হবে না। আচ্ছা আর একটা কথা। রম্ভা, উর্বশীদের নাম খুব শুনেছি, দেবরাজের সভায় নাকি নাচ টাচ করে। ওই শো-টা কখন হয়?

-   ওটা তো সন্ধ্যের দিকে রোজই হয়। দেবরাজ অনুমতি দিলেই তুমি স্বর্গে যেতে পারবে, তখন তাদের নাচ দেখতে পাবে।

-   আর একটা প্রশ্ন, এটা একটু কানে কানে বলতে হবে... বলছি রিসেন্ট অপঘাতে মৃত্যু নিশ্চয়ই হয়েছে?

-   হ্যাঁ, প্রচুর।

-   মানে ২৫-২৮ এর যুবতী নিশ্চয়ই আছে তাদের মধ্যে?

-   হুম, আছে তো, তবে যুবতী মহিলার খোঁজ কেন বৎস?

-   দূর, আপনার কয়েক লক্ষ বছর বয়স হল, ওসব আপনি বুঝবেন না। আরে কদিন থাকবো, তাই দু এক জন গার্ল ফ্রেন্ড হলে ভালো লাগবে। কটা দিন তাদের সাথে একটু সুখ দুঃখের গল্প করবো, এই আর কি।  

-   আচ্ছা ঠিক আছে বৎস, ওরা স্বর্গেই থাকে, দেবলোকের ঠিক পাশেই। 

-   ও ভালো কথা, আমি আমার কয়েকজন নিকট আত্মীয়ের সাথে দেখা করে যেতে চাই। অনেকদিন হল তাঁরা মারা গেছেন। তাঁরা আমার খুব কাছের লোক ছিলেন, তাই এখানে যখন এসেই পড়েছি তাদের সাথে দেখা না করে যাচ্ছি না। একটু ভেবে লিস্টটা পরে দিয়ে দেব আপনাকে। আচ্ছা ঠিক আছে, এবার আমি আমায় ঘরে যাই। রাঁধুনিকে ডাকুন। আজ একটু ভালো মন্দ খেতে ইচ্ছে করছে। মাছ মাংস আমার কিচেনেই রেখে এসেছে তো?

-   হ্যাঁ, সব তোমার কিচেনেই রাখা আছে, আমি রাঁধুনিকে ডেকে পাঠাচ্ছি।

রাঁধুনিকে নিয়ে রজত বাড়ী চলে গেল। আজ গরম ভাত, মুগের ডাল, আলু  ভাজা, চিংড়ির মালাইকারি আর চিকেন কষা। আহ, দুপুরের খাওয়াটা বেশ জমিয়েই হবে। রান্না প্রায় শেষের পথে, হঠাৎ দরজায় টোকা- ঠক ঠক… 

-   দরজা খুলেই চিনতে ভুল হল না, আরে প্রভু নারদ যে!

-   হ্যাঁ বৎস, ঠিকই চিনেছো, শুনলাম তোমাকে নাকি জীবন্ত এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দারুন গন্ধ নাকে এল, আর এই ঘরটি তো আগে কখনও দেখি নি। তাই ভাবলাম তোমার থাকার জন্যই  হয়তো এটা বানানো হয়েছে। তাই একবার দেখা করতে এলাম।

-   হ্যাঁ, হ্যাঁ ভেতরে আসুন। কি সৌভাগ্য আমার, দেবতা আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন!  

-   বৎস, কিসের সুবাস পাচ্ছি?

-   একটু চিংড়ির মালাইকারি আর চিকেন কষা হচ্ছে।

-   সেগুলো কি?

-   আজ দুপুরের মেনু।

-   আহা, বেশ সুবাস তো! আজ সকাল থেকে তেমন কিছু খাই নি, অনেকটা  পথ হেঁটেছি, বেশ খিদেও পেয়েছে।

-   কিন্তু আপনারা তো আবার মাছ, মাংস খান না।

-   না, আমরা তো ওইসব খাই না। তবে আজ এই গন্ধে কেমন যেন খিদে পেয়ে গেল।

-   তা আমার সাথে লাঞ্চ করবেন নাকি?

-   মানে, ইচ্ছে তো করছে, কিন্তু আমি এসব খেয়েছি, যদি পাঁচ কান হয়, তাহলে আর রক্ষে নেই।

-   আরে দূর, কেউ জানবে না। হাত মুখ ধুয়ে বসে যান আমার সাথে।

-   বলছো? তাহলে হাত মুখটা ধুয়ে আসি, তবে দেখো বাপু কথাটা যেন পাঁচ কান না হয়।

উড়িয়া বামুন বেশ ভালই রেঁধেছে। দুজনে মনের সুখে লাঞ্চ সেরে নিল। প্রভু নারদ তো চিংড়ির মালাইকারি আর চিকেন লেগ খেয়ে আপ্লুত।

-   সত্যি এরকম খাবার কখনও খাই নি। আজ বড় তৃপ্তি পেলাম। তুমি এখন কিছুদিন আছো তো?

-   হ্যাঁ তা আছি, স্বর্গটা ভালো করে দেখে তবেই যাবো।

-   তাহলে ভালই হল। মাঝে মাঝে এখানে চলে আসবো, সত্যি কথা বলতে কি  রোজ ওই ফলমূল খেয়ে মুখটা পচে গেল। আজ বেশ অন্যরকম স্বাদ পেয়ে ভালই লাগলো। ঠিক আছে, আজ আর বেশীক্ষন এখানে থাকলে চলবে না, ওদিকে সবাই খোঁজাখুঁজি করবে। তুমি স্বর্গে এলে আবার দেখা হবে। আজ তাহলে চলি।

-   আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনার সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগলো প্রভু।

-   ঠিক আছে, চললাম তাহলে, দেখো কথাটা যেন পাঁচ কান না হয়।

-   না না, আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আপনি নিশ্চিন্তে যান।

এদিকে রজত যমরাজের সভায় গিয়ে জানতে পারলো যে তার দেবলোক মানে স্বর্গে যাবার অনুমতি মিলেছে। আগামীকাল তার স্বর্গে ঘুরতে যাবার দিন নির্ধারিত  হয়েছে। শুনেই তো সে খুব খুশী। যমরাজকে ধন্যবাদ জানিয়ে রজত বলল-

-   কাল তাহলে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো প্রভু।

-   হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তবে স্বর্গের দেবতারা একটু উদ্বিগ্নে আছেন।

-   কেন প্রভু? কি হয়েছে?

-   নারদ একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, বারংবার উদর মুক্তি করতে যাচ্ছে আর  গায়ে কি  সব বেরিয়েছে আর খুব চুলকাচ্ছে। স্বর্গের বৈদ্যের ওষুধও কোনও কাজ করছে না।

-   ও তাই ? তাহলে তো সত্যিই দুশ্চিন্তার কারণ। তবে কিছু ভাববেন না, আমি গিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করব।

 

(রজতের স্বর্গে প্রবেশ)

দেবরাজ ইন্দ্র তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন।

-   এসো বৎস, যমরাজের মুখে তোমার সব কথা শুনেছি। তাঁর কাছেই শুনলাম তুমি নাকি স্বর্গটা ঘুরে দেখতে চেয়েছো। আমার কোনও আপত্তি নেই। তোমার সাথে আমি লোক দিয়ে দেবো, সে তোমাকে ভালো করে স্বর্গলোক ঘুরে দেখিয়ে দেবে। নারুকে নিয়ে আমরা কিঞ্চিত উদ্বিগ্ন।

-   নারু কে প্রভু?

-   আরে নারদ, ওর সারা গায়ে কেমন চাকা চাকা হয়ে ফুলে উঠেছে আর বার বার বাথরুম ছুটছে।

-   তাঁর সাথে একবার দেখা করা যাবে?

-   হ্যাঁ নিশ্চয়ই, এই কে আছিস, বৎসকে একবার নারুর ঘরে নিয়ে যা তো, বেচারা খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে।

 নারদকে দেখেই তো তার বুঝতে অসুবিধে হল না রোগটা কি। নারদকে আশ্বস্ত করে বলল- ‘একদম চিন্তা করবেন না, এটা চিংড়ির সাইড এফেক্ট, মানে অ্যালার্জি। ঠিক হয়ে যাবে, আমি একটু আসছি। বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে হাজির-

-   বলছি, এখানকার লোকেদের মর্ত্যে যাতায়াত আছে তো?

-   না মানে দেবলোকের লোকজন খুব একটা মর্ত্যে যায় না ওই পূজো পাব্বন ছাড়া। তবে যমলোকের লোকজন তো ডেলি প্যসেঞ্জারি করে, ওই রোজ লোক মারছে আর এখানে তুলে আনছে, তাই ওদের মোটামুটি রোজই যেতে হয়। 

-   আচ্ছা ঠিক আছে। একদম চিন্তা করবেন না। প্রভু নারদের রোগ আমি ঠিক করে দেবো। স্বর্গের রাস্তাটা চিনে গেছি। কাল একাই চলে আসবো।

-   ঠিক আছে বৎস, সাবধানে যেও।

এবারে রজত যমলোকে গিয়ে যমরাজের সাথে দেখা করলো।

-   বলছি কাল মর্ত্যে কটা কেস আছে?

-   কাল ১৭ টা আছে মনে হয়, একজন হাসপাতালে খাবি খাচ্ছে, ভাবছি ওকে কাল আর তুলবো না, পরশু তুলে নেব।  

-   দু তিন জন যাবে নিশ্চয়ই ওদের তুলে আনতে?

-   হ্যাঁ তা তো যেতেই হবে। কিন্তু তুমি এই প্রশ্ন করছ কেন বৎস?

-   ওই নারু দাদুর জন্য একটু ওষুধ আনতে হবে। বলছি প্রয়োজন পড়লে আপনার লোকেরা মানুষের রূপ ধরতে পারে?

-   হ্যাঁ তা পারে।

-   তাহলে ঠিক আছে। আমি একটা ওষুধের নাম লিখে দেবো। যে কোনও একটা ওষুধের দোকান থেকে সেগুলো নিয়ে আসতে হবে।

ওষুধও এসে গেল, যমরাজ তার লোককে দিয়ে সেই ওষুধগুলো নারদের জন্য পাঠিয়ে দিল। ব্যস, ওষুধ দারুন কাজ করলো। প্রভু নারদ একদিনেই সুস্থ। দেবরাজ ইন্দ্রও তার ওপর খুব প্রসন্ন হল।                           

এবার স্বর্গলোক ভালো করে ঘুরে দেখার পালা। স্বর্গের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে তো রজতের মন যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এত সুন্দর প্রাকৃতিক শোভা সেটা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। চারিদিকে ফুলের বাগান, কত রংবেরঙের ফুল ফুটে আছে, নানান বর্ণের পাখী গান গেয়ে বেড়াচ্ছে। চারিদিকে সুন্দর ঝর্নার জল বয়ে যাচ্ছে, মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। ফুলের বাগানে দেবতারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কোনও কোলাহল নেই, চারিদিকে শুধু বসন্তের সমারোহ। সত্যিই এই স্বর্গ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। রজত দেবরাজ ইন্দ্রকে বলল-

-   আচ্ছা সরস্বতী দি-কে তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। আসলে আমাদের বাড়ীতে সবাই তো পড়াশুনো খুব ভালোবাসে, তাই সবাই সরস্বতী দির খুব ফ্যান, সবাই পূজো করে ভক্তিভরে। ওঁর সাথে একটু দেখা করতে পারি? 

-   হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, ওই ঈশান কোণে একটি ছোট সরোবর আছে, ওখানে ওঁর হাঁস চড়ে বেড়ায় আর ও বই নিয়ে বসে থাকে, মাঝে মাঝে বীণা বাজায়।

সরস্বতী দি-কে দেখেই তো রজত খুব খুশী, একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো। 

-   সরস্বতী দি আপনার সাথে দেখা করে কি যে ভালো লাগছে বোঝাতে পারবো না। প্রাণ ভরে একটু আশীর্বাদ করুন।

-   ওঠো বৎস, তোমাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলাম, তা স্বর্গ কেমন লাগছে?

-   উফ, দারুন, মর্ত্যে আর ফিরতেই ইচ্ছে করছে না, আপনার হাঁসটাও খুব সুন্দর। ঠিক আছে এখন চলি, স্বর্গটা ভালোভাবে দেখতে হবে তো। 

এরপর দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে গিয়ে রজত প্রশ্ন করলো-

-   আচ্ছা আজ নাচের শো-টা কখন শুরু হবে?

-   ও আমার সান্ধ্য নাচের আসর? সে তো সন্ধ্যা বেলায় শুরু হবে- রম্ভা, উর্বশী… কত বড় বড় নৃত্য শিল্পী আছে এখানে। তুমি নাচ দেখতে বুঝি খুব ভালোবাসো?

-   হ্যাঁ খু..উ..ব। আজ আপনাদের এখানে কেমন নাচ হয় দেখবো।

এদিকে সন্ধ্যার নাচের আসর বসে গেছে, সবাই মনোযোগ সহকারে নাচ দেখছে। রজতের মাথায় অন্য কিছু খেলছে তখন। মাঝে দশ মিনিটের বিরতি।

-   দেবরাজ, এদের নাচ বেশ ভালো, তবে কিছু আধুনিক নাচ শিখে নিলে আরও জমে যাবে। মাঝে ‘লুঙ্গি ড্যান্সটা’ খুব হিট হয়েছিল মর্ত্যে। রোজ তো   আপনারা রম্ভা, উর্বশীদের একই রকম নাচ দেখেন। এবার আমি লুঙ্গি ডান্স টা শেখাবো। নাচলে শরীর ফিট থাকে। আপনারাও শিখতে চাইলে শেখাতে পারি।

-   সে কি কথা, আমরা নাচবো? বৎস তুমি হাসালে, আমরা নাচ জানি না। তবে বেশ নতুন ধরনের নাচের নাম শুনলাম। নাচটি সত্যি দেখতে ইচ্ছে করছে।

-   চিন্তা নেই, আমি ট্রেনিং দিয়ে দেবো, রোজ এক ঘণ্টা করে প্র্যাকটিস। তবে  সাথে জনা পঞ্চাশ মত সহকারী ডান্সার লাগবে।

-   হা হা হা… তুমি সত্যি  খুব ছেলেমানুষ, ঠিক আছে তোমার যখন ইচ্ছে, তাই হবে।

-   হুম, দু একদিনের মধ্যেই প্র্যাকটিস শুরু হবে। এবার একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছিল প্রভু।

-   হ্যাঁ, বল না।

-   বলছি, মর্ত্যে যে সব কম বয়সী মহিলারা অপঘাতে মরছে, তারা নাকি স্বর্গের আশেপাশেই থাকে শুনলাম। আমি একটু সেখানে যেতে চাই।  

-   ওরা স্বর্গপুরীর ঠিক পাশেই ‘স্বপ্নিল আলয়ে’ থাকে। কিন্তু বৎস, ওখানে পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ওখানে তো তুমি যেতে পারবে না।  

-   নিষিদ্ধ বললেই হল! আপনি রোজ রম্ভা দি, উর্বশী দি...ওদের নাচ দেখছেন না? সেবেলা বুঝি কিছু না? অবিবাহিত মহিলারা তো স্বর্গের পাশেই থাকে,   সেবেলা তো নিষিদ্ধ হল না।

-   শুধু তাই নয়। মাসে একবার করে তাদের স্বর্গের বাগানেও আসার অনুমতি আছে।

-   বা বা, নিজের বেলায় সব ঠিক আছে, আর আমি ‘স্বপ্নিল আলয়ে’ গেলেই ওটা পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেল! ও সব চলবে না, হয় অনুমতি দিন, না হলে মর্ত্যে গিয়ে সব ফাঁস করে দেবো- প্রেস, মিডিয়া সব জায়গায় আপনাদের খবর লিক করে দেবো, ছবি তুলে ফেসবুকে বড় বড় পোস্ট দিয়ে দেবো, আর সেগুলো ভাইরাল হয়ে যাবে, তখন বুঝবেন ঠেলা।  

-   আহা বৎস, চটছো কেন, ঠিক আছে তোমার যখন সখ হয়েছে একবার ঘুরে দেখবার, বেশ তো, তোমাকে অনুমতি দিলাম, ঘুরে দেখে এসো।

-   ধন্যবাদ প্রভু। আপনি সত্যি মহান। একবার উঠে দাঁড়াবেন প্লিজ?

-   বল বৎস, এই উঠে দাঁড়ালাম।

-   এবার স্মাইল প্লিজ, একটা সেলফি নেব।

-   ক্লিক... বাহ, দারুন সুন্দর হয়েছে ছবিটা আপনার সাথে, দেখুন, দেখুন।

-   বাহ, সত্যি, খুব সুন্দর হয়েছে তো ছবিটা!

রোজ স্বর্গের বাগানে রজত বিকেলে ঘুরতে যায়। সত্যি এমন বাগান সে জীবনে দেখেনি, ফুলে ফলে পরিপূর্ণ। মনের সুখে বেদানা, আঙুর, আপেল, পেয়ারা, আতা ছিঁড়ছে আর খাচ্ছে। মনের আনন্দে স্বর্গের বাগানে দেবদেবীদের সাথে সেলফি তুলছে।

এরপর রজত একদিন ‘স্বপ্নিল আলয়ে’ ঘুরতে গেল... 

 

(ক্রমশ)