Samokal Potrika

চরিত্রঃ সাহানা, গরিমা, স্বস্তিকা, ডক্টর প্রলয় গুপ্ত।
************************************
[সুসজ্জিত বেডরুমে মোবাইলে কথা বলতে বলতে সাহানা-র পায়চারি]

সাহানাঃ না না, আমার বোঝার একটুও ভুল হচ্ছে না আণ্টি। সেই ছোট্টবেলা থেকে আমি আমার মিমিকে দেখছি। আমার মা-বাবা- বেস্ট ফ্রেণ্ড সবই তো মিমি। আমি মিমির বকুনির ভয়ে কিছু কিছু কথা লুকিয়েছি, কিন্তু আমার মিমি ইজ লাইক আ ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস। সেই মিমি-- আমার সেই পরিচিত মিমি লাস্ট একমাস ধরে আনন্যাচারাল বিহেভ করছে স্বস্তিকা আণ্টি। যে আমার খাওয়া, ঘুমোনো, স্নান, ড্রেস, মেকআপ এক্সেট্রা এক্সেট্রা সব কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের কেয়ার নেয়, সেই মানুষটা-- সেই মানুষটাই নাউ বিহেভিং লাইক অ্যান আননোন পার্সন ! কী বলছো ? আরেকবার বলো, শুনতে পাইনি। না না, আমার যত্নে কোনো ত্রুটি হচ্ছে না আণ্টি--- বাট--- মিমি কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে, ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। আই অ্যাম শিওর দ্যাট শি ইজ হাইডিং সামথিং সিরিয়াস ফ্রম মি। বাট হোয়াই আণ্টি-- হোয়াই, হোয়াই ?
(বাঁ হাতে খাটের সংলগ্ন টেবিলে সজোরে ঘুঁষি মেরে কেঁদে ফেলে, নেপথ্যে শোনা যায় গরিমার কণ্ঠস্বর)

গরিমাঃ সোনাই ---- সোনাই ---- কী রে ? কী করছিস এখনও ঘরে ? কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, ব্রেকফাস্ট টেবিলে পড়ে --- আজ অফিস যাবি না, নাকি ? অ্যাই সোনাই...

সাহানাঃ (চোখ মুছে ফিসফিসিয়ে) এখন রাখছি আন্টি, মিমি ডাকছে। হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার সাথে দেখা করেই অফিস যাবো। চলো, বাই।
             ( গরিমার প্রবেশ )

গরিমাঃ বাব্বা, ফিসফিস করে কথা ! আমি ডিসটার্ব করে ফেললাম, না ? আসলে ভুলেই যাই-- মিস সাহানা রায় এখন তার মিমির ছোট্ট সোনাই নেই। সব কথা এখন আর মিমির কাছে উগরে দেওয়া যায় না। মা হলে হয়তো যেতো-- মাসী কী আর মায়ের জায়গা নিতে পারে ? সরি রে, তুই কথা বল নিশ্চিন্তে--- আমি চলে যাচ্ছি।

সাহানাঃ ওয়েট--- ফর গড সেক মিমি, ডোন্ট টক রাবিশ ! আমি সেই আগের সোনাই-ই আছি, বাট তুমি সেই আগের মিমি নেই। লাস্ট একমাস ধরে এভরি ডে আমি একটু একটু করে আমার মিমিকে বদলে যেতে দেখছি-- সরে যেতে দেখছি আমার থেকে। অফিসে প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে এখন কেউ আমায় কল করে জিজ্ঞাসা করে না 'খেয়েছিস সোনাই ? কী খেলি আজ ?'--- বাড়ি ফিরতে দেরী হলে কেউ আমায় ধমক দেয় না--- এমনকি রাত জাগলে কেউ এসে জোর করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না। কী করে দেবে ? সে তো তখন কারো সাথে মোবাইলে কথা বলছে, হাসছে--- নয় মেসেজ লিখছে একমনে--- আর রাতজাগা সোনাই জানলা দিয়ে দেখছে সেগুলো। এবার বলো-- কে বদলেছে ? কই বলো ?(ফুঁপিয়ে কান্না)

গরিমাঃ(চমকে উঠে) তুই-- তুই ডাকিস নি কেন আমায় ?

সাহানাঃ যেটা লুকোতে চাইছ আমার কাছে, সেটা জানতে চাইনা বলে--আর কিছু ? ওঃ, হ্যাঁ, ওয়ান মোর ইনফরমেশন-- এই নাও আমার মোবাইল, কল হিস্ট্রি ডিলিট করিনি-- লাস্ট আউটগোয়িং কল তোমার বেস্ট ফ্রেণ্ড স্বস্তিকা চ্যাটার্জীকে। দেখো-- কী হলো ?

গরিমাঃ(মাথা নীচু করে অস্ফুটস্বরে) তুই স্নান সেরে রেডি হয়ে নে, আমি তোর খাবার গরম করে ঘরে দিয়ে যাচ্ছি।
      ( দ্রুত গতিতে গরিমার প্রস্থান)

[দৃশ্যান্তর/নামী বেসরকারী হাসপাতালে সাইকিয়াট্রিস্ট স্বস্তিকা চ্যাটার্জীর ঘরে]

স্বস্তিকাঃ খুলে বল তো এগজ্যাক্টলি কী হয়েছে তোর ? কাঁদছিস কেন একনাগাড়ে ? তুই ভুলে যাচ্ছিস এখানে আমি তোর বন্ধু নই, একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। বাইরে এখনও আমার পেশেন্টরা ওয়েট করছে। তাই তাড়াতাড়ি বল। কী এমন ঘটলো তোর জীবনে যা আমাকে, এমনকি সাহানাকেও বলতে পারছিস না ! জীবনের অনেক কঠিন সময়েও তোকে হাসতে দেখেছি, তাই আমরা তোর কাছের বন্ধুরা তোকে দেখে ইনসপায়ার্ড হয়েছি। অ্যাক্সিডেন্টে দিদি-জামাইবাবুর ডেথ-এর পর সাড়ে পাঁচ বছরের বোনঝিকে একা মানুষ করেছিস, বিয়ে করিস নি। তোর জন্য আজ সাহানা এক সফল ক্রাইম রিপোর্টার। তবে ? আজ তোর এই দশা কেন ? (গলার স্বর নরম করে গরিমার হাতে হাত রেখে) বল না রিমা প্লিজ ? তুইতো আমার আর সাহানার কাছে কিচ্ছু লুকোস না ! বেচারী মেয়েটা আমার বুকে মাথা রেখে হাউহাউ করে কাঁদছিলো আর বলছিলো, 'আমার আগের মিমিকে ফিরিয়ে দাও না আন্টি, তোমার পায়ে পড়ি।'-- এই নে, জল খা-- তারপর খুলে বল সব।

গরিমাঃ তুই আমায় খারাপ ভাববি না তো ? আগে বল ?

স্বস্তিকাঃ খারাপ ভাববো তোকে ? তোর মতো মানুষকে যে খারাপ ভাববে, তার মানুষ হবার কোনো যোগ্যতা নেই। কিন্তু আমি খাঁটি মানুষ, ট্রাস্ট মি রিমা।

গরিমাঃ আমি-- আমি বোধহয় প্রেমে পড়েছি। জানি, এই চল্লিশ বছর বয়েসে আমায় এটা শোভা পায় না। বুঝতে পারছি-- কিন্তু কী করে যেন মনের সংযম হারিয়ে ফেলছি একটু একটু করে।(গলা ধরে আসে আবার)

স্বস্তিকাঃ(অট্টহাসি হেসে) হোয়াট আ গুড নিউজ রিমা। এই সুন্দর কথাটা বলতে এত হেজিটেশন ! বেশ করেছিস প্রেমে পড়েছিস। আর প্রেমে পড়ার কোনো নির্দিষ্ট বয়েস হয় নাকি ? আমাদের অত্যাধুনিকা রিমার চিন্তাভাবনার শেষে এই দশা ? অ্যাই, তুই রিসেপশনে একটু কষ্ট করে আধঘণ্টা ওয়েট কর লক্ষ্মীটি। আর দু'টো পেশেন্ট দেখলেই আমার ছুটি। তারপর একটা নামী হোটেলে গিয়ে আমরা সেলিব্রেট করবো আজ, সাহানাকেও ডেকে নেবো। সব ভুল বোঝাবুঝির আজই দি এণ্ড।

গরিমাঃ না রে, আজ থাক--- অন্য কোনো দিন করিস। সোনাইটা আজ প্রায় না খেয়ে অফিস গেছে। আমি বাড়ি ফিরে ওর জন্য কাশ্মীরি বিরিয়ানি বানাবো ভাবছি-- মেয়েটা খেতে খুব ভালোবাসে।

স্বস্তিকাঃ ওকে সুইটি, তাই হবে। কিন্তু যাবার আগে ঝটপট বলে ফেল সেই সৌভাগ্যবানের নামটা। এতগুলো বছর ধরে ডাকসাইটে সুন্দরী তথা প্রফেসর গরিমা মিত্র কতজনের প্রোপোজাল ইগনোর করে আজ কার ওপর সদয় হলেন, হুঁ ?

গরিমাঃ এই, এখন আমি মোটেই প্রফেসর নই। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের পরই তো চাকরী ছাড়লাম। আর সুন্দরীও নই, যত্ত বাজে কথা তোর।(সলজ্জ হাসি)

স্বস্তিকাঃ তুই থাম। তুই সুন্দরী আছিস কী নেই, সেটা বিচারের ভার আমাদের। তুই নামটা বল, নইলে এই পেপারওয়েট ছুঁড়ে মারবো তোর মাথায়।

গরিমাঃ তিনি হলেন-- না, মানে-- তার নাম প্রলয় গুপ্ত। ওই তো যে কার্ডিওলজিস্টের কেরামতিতে আমার প্রাণ বাঁচলো-- আর আজও যে যত্ন নিয়ে আমার চিকিৎসা করে চলেছে---

স্বস্তিকাঃ(চমকে উঠে) প্রলয় ? ওকে তো আমি খুব ভালো চিনি। আচ্ছা, বেশ। তুই বাড়ি যা, রান্না কর মেয়ের জন্য। আমি পরে এ বিষয়ে কথা বলবো তোর সাথে। বাই ডার্লিং।

[দৃশ্যান্তর/ডঃ প্রবাল গুপ্ত-র চেম্বার]

প্রবালঃ তারপর বলুন সাইকিয়াট্রিস্ট ম্যাডাম, আপনার হৃদয়ের কোন দশা নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছেন ?

স্বস্তিকাঃ প্রবাল, আমি কিন্তু একটা সিরিয়াস ম্যাটার নিয়ে তোর সাথে কথা বলতে এসেছি। তাই একদম ছ্যাবলামো নয়।

প্রবালঃ এই মুখে আঙুল দিলাম। বলো তোমার সিরিয়াস ম্যাটার।

স্বস্তিকাঃ তোর পেশেন্ট গরিমা মিত্র-র সাথে কবে থেকে তোর প্রেমপর্ব চলছে ? আমি তোর চেয়ে পাঁচ বছরের বড় বলে তুই আমায় 'দিদি,তুমি' বলে ডাকিস-- আর আমারই সমবয়সী বন্ধুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস ? এই হিপোক্রেসি কেন ভাই ?

প্রবালঃ গরিমা মিত্র-র সাথে আমার প্রেম !  কী বলছ তুমি এসব---(বেদম কাশি)

স্বস্তিকাঃ জল খা-- নে। আমি ভুল কিছু বলছি না। প্রমাণ আছে, গরিমাকে পাঠানো তোর বহু মেসেজ-- তাই মিথ্যে বলে লাভ নেই-- আর আমি মানুষের কথা থেকে তার মন পড়তে পারি। নে দেখ মেসেজগুলো। বলিস না এগুলো তোর পাঠানোই নয়। গরিমা মিথ্যে বলে না। তোর এই হঠকারিতায় গরিমা আর সাহানার সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়েছে প্রলয়, তাই সত্যিটা জানা খুব দরকার।

প্রলয়ঃ(মেসেজগুলোয় চোখ বুলিয়ে) হ্যাঁ, এগুলো হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট আমার পাঠানো। কিন্তু এগুলোর কোথায় প্রেম প্রস্তাব আছে একটু দেখিয়ে দেবে প্লিজ ? কী আশ্চর্য ! ভদ্রমহিলাকে আমি শ্রদ্ধা করি ওনার স্যাক্রিফাইসের জন্য। তাই যখনই উনি আমার সাথে কথা বলতে চান, বলি। এটা প্রেম ? বরং আমি---

স্বস্তিকাঃ থেমে গেলি কেন ? কথা শেষ কর।

প্রলয়ঃ আমি সাহানাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। ওকে বলতে পারছি না কিছুতেই। তাই গরিমা ম্যাডামের সাথে বেশী কথা বলছি যাতে আমার প্রস্তাবটা ওনার কাছেই রাখতে পারি।

স্বস্তিকাঃ নো-- নেভার। তুই সাহানাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবি না।

প্রবালঃ মানে ? তোমার সব কথা আমায় মানতে হবে ? জানি, আমি ডিভোর্সি, সাহানার চেয়ে বারো বছরের বড়। কিন্তু আমার কী কোনো চাওয়া পাওয়া থাকতে নেই ? আমার প্রথম প্রেম ভেঙে গেলো তুচ্ছ কারণে। বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করলাম, সেও পুরোনো প্রেমিকের জন্য আমায় ছাড়লো আর মোটা খোরপোষ নিলো। এখন আমার মরুভূমি জীবনে মরূদ্যান হয়ে এসেছে সাহানা, কেন তাকে আমি পেতে চাইবো না ?

স্বস্তিকাঃ ঠাণ্ডা মাথায় একবার ভেবে দেখ ভাই। ভুল বুঝে গরিমা তোর প্রতি আসক্ত। এরপর যখন তুই সাহানার কথা বলবি, লজ্জায়-ঘেন্নায় ও নিজেকে শেষ করে দেবে। তারপর সাহানার ভালোবাসা কী তুই পাবি বলে মনে করিস। ওর মন জুড়ে এখনও শুধুই ওর মিমি গরিমা।

প্রলয়ঃ (চোখ বন্ধ করে ভাবে কিছুক্ষণ) তাহলে বলো কী করবো আমি ?

স্বস্তিকাঃ ওদের দু'জনেরই ভালো বন্ধু হয়ে থাক। তুই হ্যাণ্ডসাম, ফেমাস ডক্টর--- খুব তাড়াতাড়ি তোর জীবনে আবার প্রেম আসবে-- চিরস্থায়ী হবে। আমার মন বলছে ভাই। জানি, এখন তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তোর এই স্যাক্রিফাইসের জন্য আমি তোকে আমৃত্যু শ্রদ্ধা করবো। আজ উঠি রে, হসপিটাল যেতে হবে। নতুন প্রেম এলে আমাকে জানাতে ভুলিস না ব্রো। বাই।

[শেষ দৃশ্য/ঘুমন্ত সাহানার মাথা কোলে নিয়ে গরিমা মোবাইলে কথা বলছে]

গরিমাঃ তুই আমায় চরম কেলেঙ্কারি থেকে বাঁচালি রে স্বস্তি। তোর কাছে চির ঋণী হয়ে হয়ে রইলাম। ছি ছি-- ভুল বুঝে হারাতে চলেছিলাম ডাক্তারবাবুর মতো একজন বন্ধুকে আর আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় সোনাইকে। তোর জন্য ভরাডুবি থেকে বেঁচে ফিরলাম রে। এই প্রত্যাবর্তন সেলিব্রেট করবো তোদের সবার সাথে। খুব ভালো থাকিস আমার প্রিয়তমা সখী। এখন রাখছি রে, গুডনাইট।
(মোবাইল রেখে ঘুমন্ত সাহানার কপালে-গালে অজস্র চুমু খায় গরিমা)
         --------সমাপ্ত-------