Samokal Potrika

পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে বেশ একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছে কিছু দিন ধরে।মুখোরোচক আলোচনা তাদের মধ্যে সর্বদাই যথেষ্ট উত্তেজনা ও ভালো লাগার বিষয়বস্তু।কিন্তু বাড়ির বৃদ্ধ শশুর-শাশুড়ি বেশ চিন্তিত তাদের বৌমাকে নিয়ে।লক্ষীমন্ত বৌটির যে কি হলো।পাগল হয়ে গেলো নাকি।সদ্য সন্তান হারা মাকে যেভাবে সবাই দেখতে অভস্থ ,এ যে তার থেকে একেবারেই আলাদা।দিব্যি সেজে-গুজে থাকছে,বাইরে ঘুরতেও যাচ্ছে।ভালোই হাঁসি-খুশি।এ কেমন মা?মা কি এমন হয় নাকি।মাত্র সাতদিন হলো যার একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়েছে সে কেমন করে এমন আছে।এও আবার হয়?কেউ যেন ভাবতেই পাচ্ছেনা।প্রতিবেশিরা বলছে "ও মা নয় ডাইনী।"আর শশুর-শাশুড়ি বলছে "ও বোধহয় পাগল হয়ে গেছে।"স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে গিয়ে কিছু ঘটলেই মানুষ তা মেনে নিতে পারেনা।মহিলাদের ক্ষেত্রে তো মোটেই না।পিতা কাঁদলে সকলে দুঃখ পায়,আর মায়ের কান্নাটাই স্বাভাবিক।সদ্য সন্তান হারা একজন মা স্নান, খাওয়া ছেড়ে থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।কেঁদে-কেঁদে চোখের নিচে কালী পরবে এটাই তো ঠিক।তা না সে কিনা সাজ-গোজ করছে।চোখে কাজল,ঠোঁটে লিপস্টিক, পরিপাটি করে চুল বাঁধা ,শাড়ি গুছিয়ে পরা।এ কেমন মা?না না এ আর যাইহোক মা হতে পারেনা।

এমন যখন সকলে ভাবছে তখন বৌটির মানে সুমিতার স্বামী ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করছে সুমিতার চিকিৎসার জন্য।তার বধ্যমূল ধারনা হয়েছে যে সুমিতা পাগল হয়ে যাচ্ছে।তা না হলে যে ছেলে ছাড়া কিছুই বুঝতো না,সে কিনা এমন করছে।ছেলের স্কুল, পড়া,আঁকা, সাঁতার, খেলা এই ছিল সুমিতার জগৎ  ।এমনকি তার কাছে দীপ মানে সুমিতার স্বামীর জন্য‌ও সময় ছিলোনা।সে মাত্র সাতদিন আগেই হারানো ছেলের কথা বেমালুম ভুলে গেলো।না না সে কেমন করে হয়।দীপ মনে মনে ভাবে "সুমিতা নিশ্চয় পাগল হয়ে যাচ্ছে"।

বছর পনেরোর সুদীপ যেমন "পড়া-শোনাতে ভালো ছিলো তেমনি অন্য সব বিষয়েও ভালো ছিল ।সত্যি ভালো ছেলে বলতে যা বোঝায় সুদীপ তেমনি ছিল।কিন্তু মাত্র ছয় মাস আগেই সে অসুস্থ হয়ে পরে।পেটের ব্যাথা তাকে কাবু করে দেয়।প্রথম প্রথম পেনকিলারতেই ব্যাথা ঠিক হয়ে যেতো।সময় যেতে থাকে সুদীপ অসুস্থ হতে থাকে।যথারীতি ডাক্তার দেখানো শুরু হয়।নানা টেস্ট হতে থাকে।ডাক্তার বদল হতে থাকে ।এক‌ই টেস্ট পুনরায় করতে হয় ডাক্তারদের নির্দেশে তাদের পছন্দের জায়গা থেকে।সে বিভিন্ন টেস্ট।ব্যাথাও বারতে থাকে।স্কুল যাওয়া আগেই বন্ধ হয়ে যায়।দীপ আর সুমিতা পাগলের মতো ছেলে নিয়ে ছুটতে থাকে এখানে ওখানে।তাদের আদরের সোনার এই কষ্ট তারা আর সহ্য করতে পারছিলনা।তিন মাস আগে তারা জানতে পারে সুদীপের লিভার ক্যান্সার।মা-বাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরে।ডাক্তার আর টেষ্টের কারনে সময় নষ্ট হ‌ওয়ায় সত্যিই সময় ফুরিয়ে গেছে ।ডাক্তার সময় বলে দিয়েছে।এই ক'মাসেই তাদের জগৎ শেষ।ছেলের শেষ কাজ সারার পর‌ও যেনো এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলোনা যে তাদের সোনা আর নেই।

একথা ভাবতেই পারছিলোনা সুমিতা।তাই তো প্রথমে একদম চুপ হয়ে যায়।সবাই যখন সুমিতার কান্নার অপেক্ষায় তখন সুমিতা চুপ করে বসে থাকে।সে কান্নার বদলে চুপচাপ ছেলের ঘরে গিয়ে ঢোকে আর দরজা বন্ধ করে দেয় ভিতর থেকে।এসে দাড়ায় ছেলের ছবির সামনে।অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে সুমিতা ।কেমন মিষ্টি হাঁসি।বড়ো বড়ো চোখে দুষ্টুমি ভরা।কি সুন্দর কালো চুলের বাহার।কি মিষ্টি মুখখানা।সুমিতা দাড়িয়ে দেখতে থাকে।দিন কেটে রাত হয়।আবার রাত কেটে দিন।সুমিতা তেমনি দাড়িয়ে থাকে।তারপর এগিয়ে যায় ছেলের খেলার জিনিসের দিকে।এক এক করে হাত দিয়ে ছুয়ে ছুয়ে দেখতে থাকে সব।বল,ক্রিকেট ব্যাট,ক্যারাম এসবে তার ছেলের হাতের ছোঁয়া আছে।সেসব বুকে জরিয়ে ধরে যেন ছেলের ছোঁয়া পায়।বুকের ভেতর হূ হূ করে ওঠে।ছেলের বলা কতো কথাই মনে পরে যায় সুমিতার।খুব খেতে ভালোবাসতো সুদীপ।শুধু ভালো খাবারের বায়না করতো।আর মায়ের আদর খাবার জন্য ইচ্ছে করে বিছানায় শুয়ে থাকতো।রাতেও মাকেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হবে তবে ছেলে ঘুমাবে।সেই ছেলেমানুষীর কথা মনে করে যেন নিজেকেই স্বান্তনা দেয় সুমিতা।তারপর এগিয়ে যায় পড়ার টেবিলের দিকে ।সুন্দর করে ব‌ই সাজিয়ে রাখার অভ্যাস ছিল সুদীপের।সেদিকে তাকিয়ে মন ভরে যায়।একটা একটা করে ব‌ই খাতা দেখতে থাকে।যেন ছেলেকে পড়া দেখিয়ে দেবার প্রস্তুতি।আদর করে ব‌ইতে হাত বোলাতে থাকে।বুকটা হূ হূ করে ওঠে ।চোখ দুটো জ্বালা করে।এ পযর্ন্ত সুমিতা একটুও কাঁদেনি।ছেলেটা পড়তে বড়ো ভালোবাসতো।ব‌ইয়ের সাথে একটা ডায়রী চোখে পরে।সেটাকে টেনে নিয়ে পাতা উলটাতে থাকে।কি সুন্দর হাতের লেখা,মনটা ভরে যায়।সুমিতা পড়তে শুরু করে ।সুদীপ তার বন্ধুদের নিয়ে ,দাদা-বুমমাকে নিয়ে, বাবা-মাকে নিয়ে কতো কথা লিখেছে।চোখ দুটো জ্বালা করতে থাকে।দু'গাল বেয়ে জল পরতে থাকে।মুছে নিয়ে আবার পড়তে থাকে ।এভাবেই পড়তে পড়তে সুমিতা দেখে সুদীপ তার অসুস্থতা নিয়ে লিখেছে।তার কষ্টের কথা লিখেছে।চোখ থেকে আবার জল পরতে থাকে।ডায়রীটা বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক ক্ষন কাঁদে।তারপর আবার পড়তে শুরু করে।চোখে জল যেন আর বাধ মানেনা।ডায়রীর একদম শেষে একটা চিঠি লেখা দেখতে পায় সুমিতা।তাতে সুদীপ সুমিতাকে লিখেছে-----

"মা আমার প্রিয় মা,

আমি বুঝতে পারছি আমার দিন ফুরিয়ে এসেছে।আমার বড়ো কষ্ট হচ্ছে মা।শরীরের কষ্টের থেকেও মনের কষ্ট বেশি।আমি তোমাদের ছেড়ে যেতে চাইনা।কিন্তু আমায় যেতে হবে।মা তুমি কি সুন্দর।তোমার কোলে মাথা রেখে কি সুখ।যখন তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও আর গুনগুন করে গান গাও আমার খুব ভালো লাগে।তোমার কপালের টিপ ,তোমার চোখের কাজল আর ঠোঁটের লিপস্টিক তোমাকে অপরূপা করে তোলে।কি মিষ্টি লাগে তোমায়।জানি তোমার কাটা দাগটা লুকানোর জন্য তুমি লিপস্টিক লাগাও।কিন্তু আমার তোমার ঐ সাজানো ঠোঁট দেখতে ভীষন ভালো লাগে।আর তোমার খোলা চুল ও আমার ভালো লাগে,তবে বাধলে বেশ লাগে।খোলা চুল থেকে কি সুন্দর গন্ধ বের হয়।তাও তুমি বেঁধে রাখবে।তোমার চুল দেখে আমার বন্ধুরা নজর দেয়।লম্বা, কালো চুল যে তোমার।দিদা যেবার মারা গেলো তুমি কেমন না সেজে কেমন করে ছিলে।আমার একটুও ভালো লাগতো না।আর খুব কেঁদে ছিলে ।আমার খুব কষ্ট হয়ে ছিল।আর কোনোদিন তুমি এমন করবেনা।তাহলে আমার খুব কষ্ট হবে।তুমিই তো বলো যারা মারা যায় তারা আকাশের তারা হয়ে যায়।আমি ও তো তাই হবো।সব থেকে উজ্বল তারা।আমি যে তোমার সোনা ছেলে তাইনা।ভুলে যেওনা যেনো।আমাকে তুমি কথা দাও।আমি কিন্তু সব দেখতে পাবো।তুমি আমার কথা না মানলে আমি খুব কষ্ট পাবো।খুব কাঁঁদবো।তুমি আমার কথা রাখবে তো মা?

ইতি তোমার সোনা।"

চিঠিটা পড়ে সুমিতা উঠে দাড়ায়।এলো চুল হাত খোঁপা করে।চোখের জল কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুছে নেয়।ব‌ই খাতাগুলো গুছিয়ে রাখে।এ দু'দিন সকলে বার বার দরজায় ধাক্বা দিয়ে ডেকে সারা না পেয়ে ফিরে গেছে।পুরো দুদিন বাদে সুমিতা দরজা খুলে বাইরে আসে।বাড়ি শুদ্ধ লোক সুমিতাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলো।একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে সে বুঝি কেঁদে-কেঁদে সারা হয়ে গেছে।সুমিতা বাথরুমে গিয়ে ঢোকে।সাবান, শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করে।বেরিয়ে এসে আলমারি থেকে ভালো শাড়ি বার করে পরে।তারপর ডেসিং আয়নার সামনে কাছে গিয়ে বসে।চোখে কাজল দিতে গিয়ে জল পরতে থাকে।।বার বার মুছে নিয়ে আবার লাগায়।লিপস্টিক লাগিয়ে নিয়ে চুল আচড়িয়ে ছেলের ছবির সামনে গিয়ে দাড়ায়।মনে মনে বলে "দেখ সোনা তুই যা বলেছিস আমি তাই করেছি।"আমি একটুও কাঁদছি না।চোখে আবার জল আসে ,আঁচল দিয়ে মুছে নেয়।আবার বলে"আমি আর কাঁদবো না আমি তোকে কথা দিলাম ।তোকে আমি কষ্ট দেবো না ।"আঁচল দিয়ে চোখ দুটো চেপে ধরে আর হাসতে থাকে।