Samokal Potrika

হোমনা চৌরাস্তা থেকে সি. এন.  জি চেপে হোমনা-রামকৃষ্ণপুর রুট ধরে ছুটছি ওয়াই সেতুর উদ্দশ্যে ।

দুলালপুর বাজার পার হতে'ই  হাতের বাম পাশে রাস্তার পাশ ঘেঁষেই ( মরা নদীর) সূচনা হয়ে দৌলতপুর হয়ে তিতাস নদীর সাথে মিশে গেছে ।
মরা নদী যেন  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই ছোট নদী !

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে
পাড় হয়ে যায় গরু পাড় হয় গাড়ী  "

যদিও মরা নদীর উপর দিয়ে কোন গাড়ী পার হয়না । কিন্তু গরু ঠিক'ই পার হয়ে যায় ।
আমারা এই পথে যেতেই দেখি রাখালের গরু কোমর পানি দিয়ে নদী পার হচ্ছে । এবং সাথে কৃষকও । নদীর মাঝে কোথাও কোথাও নদী পার হবার জন্য বাঁশের সাঁকো দেয়া আছে ।
পৌষ মাঘ মাসেই মরা নদীতে কোমর পানি । আর চৈত্র বৈশাখ মাসে এই নদী শুকিয়ে যায় বলেই হয়ত এই নদীর নাম  "মরা নদী " ।
নদীর উপারে সবুজ মাঠ । কখনো কখনো মাঠের কয়েকটা ফসলী জমির পরে'ই হোমনা বাঞ্ছারামপুরের বুক চিরে বয়ে চলে যাওয়া এঁকে বেঁকে তিতাস নদী । তিতাস নদীর কোল ঘেঁষেই পিচ ঢালা পথ । বাঞ্ছারামপুর- ভূরভূরিয়া রোড । এই রোড দিয়েই বাঞ্ছারামপুর থেকে খুব শহজেই ওয়াই সেতু আসা যায় ।

মরা নদীর অপরুপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা পৌছে যাই রামকৃষ্ণপুর বাজারে ।

ওয়াই সেতু ,  মূলত একটি ত্রিমুখী সেতু । হোমনা-বাঞ্ছারামপুরকে বিভক্ত করে বয়ে যাওয়া তিতাস নদী ও হোমনা-চলোনিয়া বাজারকে বিভক্ত করে যাওয়া "আরসি খাল। এই আরসি খাল ও তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় অবস্থিত একটি ত্রিমুখী সেতু । ইংরেজী বর্ণমালা " Y " আকৃতির হওয়ায় এই সেতুর নাম মূলত ওয়াই সেতু ।

সেতুর একটি বাহু (শাখা) হোমনার রামকৃষ্ণপুর বাজার থেকে উৎপত্তি হয়ে  বাকী দুটি বাহু (শাখা) যথারীতি চলোনিয়া বাজার ও বাঞ্ছারামপুরের ভূরভূরিয়া বাজারে গিয়ে শেষ হয়েছে ।
আমরা পায়ে হেঁটে সেতুর উপর উঠে সামনে এগুচ্ছি । এবং শুরুতেই চোখে পড়ল হাতের বাম পাশের রামকৃষ্ণাপুর বাজারের দো'চালা টিনের  ঘর গুলি । সারি সারি শতাধিক টিনের দো'চালা ঘর গুলি দেখতে অসাধারণ লাগছে । এই যেন রং তুলি দিয়ে আঁকা শিল্পীর কোন ছবি !
আমরা ব্রীজের উপর থেকে মুগ্ধ হয়ে রামকৃষ্ণাপুর বাজার দেখতে দেখতে সামনে এগুতেই বিলবোর্ড  চোখে পড়ল "সামনে জংশন  , বামে থাকুন , ডানে থাকুন , বিপদজনক , গতিসীমা ৩০ কি. মি. এরকম অনেক তথ্য'ই বিলবোর্ডে লেখা রয়েছে ।
এবং ব্রীজের উপরেই' ভ্রাম্যমাণ কিছু দোকান রয়েছে । যে দোকান গুলিতে ঠান্ডা পানীয় , জুস , থেকে শুরু করে , জ্বাল মুড়ি , ফুচকা , আইসক্রিম বাচ্চাদের খেলনা সহ প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান রয়েছে ।

শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী পর্যটকদের'ই এখানে আনাগোনা দেখা যায় । ছুটির দিন সহ বিশেষ দিন গুলিতে পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত থাকে ওয়াই সেতু । 
পরন্ত বিকেলে প্রিয় মানুষটির হাত ধরে কোলাহল মুক্ত নির্জন শান্ত প্রকিতির মাঝে হারিয়ে যেতে কিছুটা সময় ছুটে আসেন কিশোর কিশোরীরা ।
পাশাপাশি শিশুরাও অভিভাবকদের নিয়ে ঘুরতে আসে জ্বাল মুড়ি , আর ফুচকা খেতে ।  তিতাস নদীর শান্ত হিমেল হাওয়া গায়ে দোলা দিতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে অনেক পর্যটক । এবং বিকেল গড়াতেই এখানে পর্যটক ও হকারদের মিলন মেলা বসে ।

গোধূলী বিকেলে পশ্চিমা আকাশে তিতাস নদীর বুকে বিলুপ্ত হয়ে যায় সূর্য !  ব্রীজের উপর থেকে পূর্ব আকাশে সূর্য উদয় , কিংবা পশ্চিমা আকাশে সূর্যঅস্ত আর তিতাস নদীর অপরুপ সৌন্দর্য রুপ বৈচিত্র্য দেখতে দেশের দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে ভ্রমণপিপাসুরা ।

ওয়াই সেতু ঘুরতে এসে আরো যা যা দেখবেন-

রামচন্দ্রপুর জমিদার বাড়ি । আজ থেকে প্রায় দুই'শত পঞ্চাশ বছর পূর্বে জমিদার ( রাম কানাই রায় ) মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে গড়ে তুলেন দৃষ্টি নন্দন কারুকার্যময় সুবিশাল জমিদার বাড়ি । 
২৫০ বছরের  পুরনো জমিদার বাড়িটি , কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে রামচন্দ্রপুর গ্রামে ।
যে ভাবে যাবেন- ওয়াই সেতু থেকে রামচন্দ্রপুরের ভাড়া মাত্র ২০ টাকা ।

এছাড়াও আরো দেখতে পারেন-
জোরালী মাজার । বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ঝুনারচর গ্রামে রয়েছে জোরালী মুন্সির স্মৃতিবিজড়িত মাজার ।
জোরালী মুন্সি হোমনা উপজেলার পাথালিয়াকান্দী  গ্রামে জন্মগ্রহন করেন । কিশোর জীবন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিনটও এখানেই ছিলেন ।
জোরালী মুন্সির  মৃত্যুর পর পাথালিয়াকান্দীবাসী তার নিজ গ্রামে নিয়ে সমাহিত করেন ।
কিন্তু ঝুনারচরবাসী জোরালী মুন্সির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিতে একটি মাজার তৈরী করেন । বর্তমানে এটি "জোরালী মাজার" নামেই পরিচিত ।
মাজারের পূর্ব দিকে রয়েছে ছোট একটি গোলাপ ফুলের বাগান । এবং উত্তর দিকে রয়েছে বিস্তীর্ণ মাঠ ।
প্রতি বছর ৭ ই নভেম্বর ও ১৭ই ডিসেম্বর এখানে অনুষ্ঠিত হয় বাৎসরিক ওরস মোবারক ।
এবং ওরসকে ঘিরেই এখানে বসে ঝমঝমাট মেলা ।
যে ভাবে যাবেন- ওয়াই সেতু থেকে , ঝুনারচর ,  জোরালী মাজার পর্যন্ত রিক্সা ভাড়া মাত্র মাত্র ২০ টাকা ।

যেভাবে যাবেনঃ- বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে খুব সহজেই আসতে পারেন হোমনা বাঞ্ছারামপুর ব্রীজ  তথা (ওয়াই সেতু ) ওয়াই সেতু যেতে পারেন তিন দিক থেকে । সেই পথ গুলি হল কুমিল্লার হোমনা উপজেলা, মুরাদনগর উপজেলা , ও ব্রাহ্মমণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা থেকে ।

তবে সবচেয়ে সহজ পথ হলঃ- হোমনা থেকে ।
ঢাকা সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর  ছেড়ে আসে , "ঢাকা হোমনা সুপার সার্ভিস" ভাড়া ১০০-থেকে ১২০ টাকা । তারপর হোমনা  বাসস্ট্যান্ড অথবা ( হোমনা চৌরাস্তা থেকে)  সি. এন. জি করে যেতে পারেন ( রামকৃষ্ণাপুর বাজার ) অথবা ওয়াই সেতু ।
তাছাড়া বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে ঢাকা চট্টগ্রামগামী যে কোন বাসে চরে ঢাকা-চট্টগ্রাম-মহাসড়কের ( দাউদকান্দির " গৌরিপুর ) নেমে যাবেন ।  তারপর গৌরিপুর থেকে হোমনার দূরত্ত ১৮ কিঃ মিঃ ,  সি. এন. জি ভাড়া ৪০-৫০ টাকা ।
হোমনা থেকে ওয়াই সেতুর দূরত্ত ১৭ কিঃ মিঃ , সি. এন. জি ভাড়া ৫০ টাকা ।

দ্বিতীয় পথটি হলঃ-  চট্টগ্রাম সিলেট মহাসড়কের মুরাদনগর উপজেলার "কোম্পানীগঞ্জ" নামক স্থানে অথবা মুরাদনগরে নামতে হবে । তারপর সেখান থেকে রিজার্ভ সি. এন. জি ভাড়া করে ওয়াই সেতু আসতে পারেন । নয়ত কোম্পানীগঞ্জ থেকে মুরাদনগর , তারপর মুরাদনগর থেকে  রামচন্দ্রপুর বাজার থেকে ওয়াই সেতু । এই রোডের যান চলাচলের এক মাত্র বাহন হল সি. এন. জি ভাড়া সে ক্ষেত্রে যথরীতি- ১০ , ৫০ , ও ২০,  টাকা ।
যদি নিজস্ব কার অথবা মাইক্রো থাকে তাহলে খুব সহজে'ই আসতে পারেন ।

তৃতীয় পথটি হল- বাঞ্ছারামপুর থেকে ( ভূরভূরিয়া বাজার ) অথবা ওয়াই সেতু । বাঞ্ছারামপুর থেকে ওয়াই সেতুর দূরত্ত মাত্র ১৮.৫ কিঃ মিঃ ।  সি. এন. জি,  ভাড়া ৫০-৭০ টাকা ।

উল্লেখ্য যে , হোমনার রামকৃষ্ণাপুর বাজার ,  চলোনিয়া বাজার ,  অথবা বাঞ্ছারামপুরের ভূরভূরিয়া বাজারে, আসালেই ওয়াই সেতু আসা হবে  / ওয়াই সেতুর দেখা পেয়ে যাবেন ।