Samokal Potrika

এদিকে বাবা ভোলানাথ অনুমতি দিয়েছেন। কৈলাসে যাবার অনুমতি পেয়ে তো রজত খুব খুশী। দেবরাজের দুজন লোক তাকে কৈলাসে ছেড়ে এলো। সেখানে পৌঁছেই রজত দেখলো সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দুজন বসে গঞ্জিকা সেবন করছে। নন্দী আর ভিরিঙ্গিকে চিনতে রজতের ভুল হল না

-   বলছি, তোমরা নিশ্চয়ই নন্দী আর ভিরিঙ্গি?

-   হ্যাঁ, তুমি কে?

-   আমি রজত, তোমাদের অতিথি, সেই সুদূর স্বর্গ থেকে এসেছি একটু বাবা মা-কে দর্শন করবো বলে। তোমরা যদি আমাকে একটু তাঁদের কাছে পৌঁছে দাও তবে খুব ভালো হয়।

-   একটু বসো না আমাদের সাথে, তোমাকে দেখে তো স্বর্গের লোক মনে হচ্ছে না। তুমি আসলে কোথা থেকে আসছো গো?

-   হ্যাঁ ঠিকই ধরেছো, আমি আসলে মর্ত্য থেকে আসছি, কিছুদিন স্বর্গে বেড়াতে এসেছি।

-   বাহ দারুণ তো, এর আগে মর্ত্যের কোনও লোকের সাথে আমাদের দেখা হয় নি, এই প্রথম। তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে। কয়েকটা টান দেবে নাকি?

-   না না, এখন নয়, এখন বাবা মায়ের সাথে দেখা করবো আগে। দু একদিন তো এখানে আছি, তখন না হয় তোমাদের সাথে একটু সুখ দুঃখের কথা কইবো। এখন একটু আমাকে বাবা মায়ের কাছে নিয়ে চলো।

-   আচ্ছা ঠিক আছে। ভিরিঙ্গি, ওকে বাবা মায়ের কাছে একটু দিয়ে আয় তো।

-   হুম, কই গো, চলো আমার সাথে।

ভিরিঙ্গি রজতকে বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে দিল। কিন্তু রজত ভেতরে ঢুকতে কিঞ্চিত ইতস্তত করছিলো, কারণ ভেতরে তখন একটু কোলাহল চলছিলো। রজত বাইরে দাঁড়িয়েই একটু শোনার চেষ্টা করলো-

মা- দেখো দেখো দেখো... ওই নোংরা গায়েই শুয়ে পড়ছে... উফ, তখন থেকে   বলছি একটু চানটা করে এসো, কিছুতেই কথা শোনে না। একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে মোটে ভালো লাগে না। কিছুতেই চান করবে না, গায়ে ছাই ভস্ম মেখে বসে থাকবে।

বাবা- উফ, রোজ এক কথা বোলো না তো, চান করতে আমার ভালো লাগে না। এরকম থাকতেই আমার ভালো লাগে।

মা- তা লাগবে কেন, স্বর্গের অন্যান্য দেবতারা কত ফিটফাট, সেজে গুজে থাকে।  কি সুন্দর লাগে। আর আমার কপালে কি জুটেছে দেখো! কোনও কথা গ্রাহ্য করে না। নিজে যেটা বুঝবে সেটাই। মর্ত্যে বাবা ভোলানাথ বলতে সবাই অজ্ঞান, ধুমধাম করে সবাই পূজো করছে। মেয়েরা ভালো বর পাবার জন্য শিবরাত্রি করছে। মেয়েগুলো তো আর জানে না আমি কাকে নিয়ে ঘর করছি, জানলে কেউ আর শিবরাত্রি করতো না।

-   এরকম সরল ভোলাভালা স্বামী আর কোথাও পাবে না। একটা বাঘছাল হলেই চলে যায়। খাওয়া দাওয়ায় কোনও ঝামেলা নেই। শুধু একটু নেশা ভাং করি, কিন্তু তাতে তো কারুর কোনও সমস্যা হয় না।

-   কতবার বলেছি এখন ওই নেশা ভাং একটু কমাও, শোনো আমার কথা? এক কানে ঢোকাও, এক কান দিয়ে বের করে দাও।

-   এই শোনো না, আজ একটু কড়া হয়ে গেছে, ঘুম ঘুম পাচ্ছে।

-   এই ছাই ভস্ম মেখে তুমি ঘুমোবে?

-   আমি তো এভাবেই থাকি, আমার অভ্যাস আছে। এভাবেই আমার ঘুমটা ভালো হয়।

-   কতবার বলেছি, রোজ গায়ে একটু স্যান্ডেল উড মেখে চান করবে। প্রত্যেক বছর যখন বাপের বাড়ী যাই দেখি সেখানে কত ভালো ভালো সাবান,  পারফিউম, ডিও... কতবার বলেছি, ওগুলো আমি নিয়ে আসবো, মাঝে মাঝে গায়ে দেবে, সুবাস বেরোবে... কে কার কথা শোনে। আর পান থেকে চুন খসলেই রাগ... উফ এমন রাগী স্বামী নিয়ে ঘর করা যে কি সমস্যা সেটা আমিই জানি। রাগলে একেবারে স্বর্গ মর্ত্য পাতাল কেঁপে উঠবে।

-   গররররর... গররররর... গররররর...

-   উফ কাকে বলছি এসব, কে কার কথা শোনে, আমি বকবক করছি, আর আর উনি ঘুমিয়ে পড়লেন, উফ আর ভালো লাগে না।

এবার কোলাহল একটু থেমেছে। তাহলে এবার ঢুকেই পড়ি-

-   মা, ভেতরে আসতে পারি?

-   কে বাবা?

-   আমি রজত, তোমার মর্ত্যের এক সন্তান।

-   ওহ... মর্ত্য থেকে এসেছো? এসো এসো ভেতরে এসো।

-   দেখি মা একটা প্রণাম করি আগে।

-   ওরে থাক রে, কি ভালো ছেলে। এখানে বস।

-   বাবা ঘুমোচ্ছে?

-   আর বলিস না, বাদ দে ওঁর কথা। যাই হোক মর্ত্যের কি খবর বল। সেই পূজোর আগে তো আর যাওয়া হবে না। তোদের জন্য মাঝে মাঝে মনটা খুব খারাপ লাগে রে। কিন্তু কি করি বল। ওই পুজোর চারটে দিন কোনও রকমে মর্ত্যে কাটিয়ে আসি। ফেরার সময় খুব মন খারাপ লাগে। কিন্তু  কিছু করার নেই রে। কৈলাসে আমি না থাকলে একদম যা তা অবস্থা হয়।  আর ওই দুই শাকরেদ নন্দী আর ভিরিঙ্গি জুটেছে... ওই যে পূজোর চার দিন আমি থাকি না, ব্যাস, তাদের আর পায় কে... বাবাকে সাথে নিয়ে নেশা ভাং করে এদিক ওদিক পড়ে থাকে। যাক গে ওসব কথা ছাড়, মর্ত্যের লোকেরা সব কেমন আছে বল।

-   মা গো মর্ত্যের কথা আর কি বলি তোমায়, তুমি তো চারদিন থেকে চলে আসো, সবাই তখন অন্যরকম মুডে থাকে, তাই কিছু বোঝা যায় না। সমাজের অবস্থা খুব খারাপ মা। চারিদিকে অবক্ষয়। সমাজে সৎ, ভালো মানুষের ঠাই নেই, গুণীর কদর নেই, শিক্ষার মান নেই। শুধু টাকার কদর আছে। সমাজে মহিলাদের সম্মান দিন দিন কমছে, খুন ধর্ষণ বাড়ছে, পরকীয়াও বেড়েছে। মানুষ কেমন যেন তার মানবিক গুণগুলো সব হারিয়ে ফেলছে। খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি মা। তুমি তো মাত্র ওই চারটে দিন মর্ত্যে থাকো, আর কটা দিন থাকলে খুব ভালো হয়। মাঝে  মাঝে আমাদের ওখানে বেড়াতে এলে খুব ভালো লাগতো। তুমিই পারো মা মর্ত্যের দুষ্ট সন্তানদের একটু শাসন করে মানুষ করতে।

-   ওরে পাগল ছেলে, তার কি আর উপায় আছে, ওই চারটে দিন বাপের বাড়ী যাই তাতেই যাবার আগে তোর বাপের তাণ্ডব নৃত্য শুরু হয়, আর হুঙ্কার। এর চেয়ে বেশী দিন বাপের বাড়ী থাকলে আর রক্ষে নেই, স্বর্গ, মর্ত্য পাতাল সব এক করে দেবে। আর মর্ত্যের এ কি অবস্থা শুনলাম তোর থেকে। মর্ত্যের মানুষের এত অধপতন হয়েছে! আমি তো ভাবতেও পারছি না।

-   হ্যাঁ মা, কিছু একটা করো। আচ্ছা আমার দাদা দিদিদের কাউকে দেখছি না তো, গণেশ দা, লক্ষ্মী দি, সরস্বতী দি, কার্ত্তিক দা, এরা সব কোথায়?

-   সরু তো ভেতরের ঘরে একটু পড়াশুনো করছে, লক্ষ্মী মা একটু ভেতরে কাজকর্ম করছে। আর কাতুর কথা বাদ দে, ও যে সারাদিন কোথায় ঘুরে বেড়ায় আমি নিজেও জানি না রে। আর গনু এই এল বলে।

-   ওই তো নাম করতে করতেই গণেশ দাদা এসে হাজির। ওহ, কি সুন্দর পেটটা তোমার গণেশ দাদা!

-   আহ, ছাড়ো বলছি, আমার পেটে কাতুকুতু দিচ্ছো কেন? হা হা… এই সুড়সুড়ি লাগছে আমার ছাড়ো। মা দেখো না, ও কেমন কাতুকুতু দিচ্ছে আমায়।

-   আরে ও তোর মর্ত্যের একটা ভাই রে। তোর সাথে একটু মজা করছে। মর্ত্যের ছেলেরা একটু দুষ্টু হয়… হা হা… দেখ তো বাবা সরু দিদির পড়াশুনো হল কি না, এখানে একবার ডাক তো।

সরস্বতী দি-কে দেখেই রজত খুব খুশী…

-   চিনতে পারছো দিদি?

-   হ্যাঁ, চেনা লাগছে, কে বল তো তুমি?

-   আরে ওই স্বর্গের বাগানে তোমার সাথে দেখা হল না, আমি রজত গো।

-   ও, হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে, ভালো আছো তো ভাই?

-   হ্যাঁ গো তোমাদের আশীর্বাদে চলে যাচ্ছে।

-   উফ, কে এত চেঁচামেচি করছে? আমার ঘুমটা ভেঙে গেলো।

-   ওঠো ওঠো, এই অসময়ে আর ঘুমোতে হবে না। কে এসেছে চেয়ে দেখো, মর্ত্য থেকে আমার এক ছেলে এসেছে গো, রজত। খুব ভালো ছেলে।

-   নমস্কার বাবা।

-   আশীর্বাদ করি বাবা, হ্যাঁ ইন্দ্র তোমার কথা বলেছে আমাকে। এসে ভালোই করেছো। নন্দী, ভিরিঙ্গিকে বলে দেবো তোমাকে কৈলাসটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে।

-   সে ভালো কথা, কিন্তু তোমার ওই তেঁদড় শাকরেদদের বলে দেবে ও কিন্তু খুব ভালো ছেলে, নেশা ভাং যেন না করায় ওকে।

-   আরে নন্দী, ভিরিঙ্গি খুব ভালো ছেলে, তোমাকে ওসব নিয়ে ভাবতে হবে  না। রজতকে কিছু খেতে দিয়েছো? ওকে কিছু ফলমূল দাও, তোমার হাতের  পরমান্ন, পায়েস করে খাওয়াও ওকে, ওর আহারের ব্যবস্থা কর।

-   ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমার ছেলেকে আমি সব খাওয়াবো।

-   আচ্ছা ঠিক আছে। আমার ডুগডুগিটা দাও তো, আমি একটু বেরবো।

-   ব্যাস, সন্ধ্যে হতে পারলো না, আবার চললেন উনি। আর ভালো লাগে না আমার।

-   বাবা এখন কোথায় যাবে?

-   আর কোথায় যাবে। ওই দুই তেঁদড় শাকরেদ অপেক্ষা করে বসে আছে, আবার কয়েক ছিলিম হবে, কত নিষেধ করি, কে কার কথা শোনে।

-   মা, আমাদের মর্ত্যেও এক কেস। বৌ-দের কথা স্বামীরা গ্রাহ্যই করে না। এক কান দিয়ে ঢোকায় এক কান দিয়ে বের করে দেয়।

-   হবে না কেন, তোমরাও তো বাবা ভোলানাথের ভক্ত। তোমরাও তো তাঁর মতই হবে। না যাই, এবার একটু তোর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করি। অনেক দূর থেকে এসেছিস, নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।

-   হ্যাঁ তা একটু পেয়েছে। তুমি খাবারের ব্যবস্থা কর। আমি ততক্ষন একটু  সরু দির বীণা বাজানো শুনি। কি গো সরু দি শোনাবে তো?

-   এমা, আমার ভাই শুনতে চেয়েছে আর আমি শোনাবো না তা কি কখনও হয়। বস, আমি বীণাটা নিয়ে আসি।

লক্ষ্মী দি এসে একগাল হেসে রজতের হাতে একটা কড়ি দিয়ে গেলো আর বললো- ‘এই কড়িটা খুব যত্ন করে বাড়িতে রেখে দিও ভাই, তোমার আর কোনও কিছুর অভাব থাকবে না।’ রজতও খুশী মনে কড়িটি পকেটে রেখে দিল। তারপর মনোযোগ সহকারে সরস্বতীদির বীণা বাজানো শুনতে লাগলো। দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেলো। বাবাও বাড়ী ফিরে এসেছে। কিন্তু কার্ত্তিক দার সাথে দেখা হল না।  রাতের আহার সেরে রজত শুয়ে পড়লো।

পরের দিন সকালে বাবার সাথে বসে রজত বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলো। বাবা  ভোলানাথ তাকে কৈলাস সম্পর্কে কিছু বিচিত্র গল্প বললেন-

-   জানিস বাবা রজত, তোদের মর্ত্যের লোকজন পৃথিবীর অনেক পর্বত শৃঙ্গ জয় করেছে, কিন্তু এই কৈলাসে এখনও অব্দি কেউ আসতে পারে নি। এটা আমার সাধনার জায়গা। এই কৈলাসের পাদদেশেই আছে দুটি হ্রদ- মানস  সরোবর ও রাক্ষসতাল। মানস ও রাক্ষস এই দুই হ্রদ পাশাপাশি থাকলেও মানসের জল মিষ্টি, কিন্তু রাক্ষসের জল নোনতা। আর এখানে আর একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে জানিস- কোনও সাধারণ মানুষ এখানে সাধারণত আসতে পারে না তার কারণ কেউ এখানে এলে খুব তাড়াতাড়ি বার্ধক্য তাকে গ্রাস করে। কেউ ১২ ঘণ্টার বেশী যদি এখানে কাটায় তাহলে তার চুল ও নখের বাড় দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাই সাধারণ মানুষ এখানে সহজে আসতে পারে না।

-   বাপ রে, খুব আশ্চর্যজনক জায়গা তো এই কৈলাস! এই রে, বাবা আমি তো ১২ ঘণ্টার বেশী এখানে কাটিয়ে ফেললাম, তাহলে আমিও তো বুড়ো হয়ে যাবো, চুল নখ সব হু হু করে বেড়ে যাবে।

-   হা হা হা... ওরে তোর ভয় নেই রে পাগল ছেলে, তুই তো আমার অতিথি, আমি তো তোকে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছি। তাই তোর কিছু হবে না।

-   তাহলে তো বাবা কৈলাস পর্বত খুব রহস্যময় জায়গা।

-   হুম ঠিক বলেছিস, সাধারণ মানুষের এখানে আসার অনুমতি নেই।

-   বাবা, তোমার কাছে অনেক অজানা গল্প জানলাম। খুব ভালো লাগলো।

-   এবার আমার ধ্যানের সময় হল। এবার আমি মানসের ধারে ধ্যানে বসবো। তুই একটু কাছাকাছি হেঁটে আয়। বেরোলেই নন্দী ভিরিঙ্গিদের দেখতে পাবি। যা ওদের সাথে একটু গল্প করে আয়।

রজত বাবার কথা মতই একটু ঘুরতে বেরিয়ে পড়লো। বেরিয়েই ওদের সাথে দেখা হয়ে গেলো।

-   ও তুমি এসেছো, ভালই হল। আমরা মর্ত্যের লোক এই প্রথম দেখলাম।

-   হুম, তাই তো তোমাদের একবার দেখা দিলাম। আমি মর্ত্যের রাজা- মহারাজ রজত চন্দ্র রাজ রাজ্যেশ্বর।

-   ও কি সৌভাগ্য আমাদের। আপনার নামটাও বেশ রাজাদের মতই। বসুন  মহারাজ। এই কে আছিস, মহারাজকে এক ছিলিম গাঁজা দে।

-   আচ্ছা সে সব একটু পরে হবে। এখন বলো তো তোমাদের মধ্যে কে ভালো    মাসাজ করতে পারো। আমার গা, হাতে একটু ব্যাথা হয়েছে। মাথাটাও ধরেছে। একটু মাসাজ করে দিতে হবে।

-   এ তো পরম সৌভাগ্য আমাদের। মর্ত্যের মহারাজকে আমরা দুজনেই সেবা করবো।

নন্দী, ভিরিঙ্গি দুজনেই রজতের সারা গায়ে, হাতে অনেকক্ষণ ধরে মাসাজ করতে লাগলো। রজতেরও আরামে চোখ বুজে এলো, মনে মনে খুব হাসতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ পর রজত বলল-

-   আহ, খুব ভালো হচ্ছে, তোমরা তো দেখছি দারুণ মাসাজ কর। এবার একজন আমার কপালটা একটু টিপে দাও তো, চুল গুলো আস্তে আস্তে টেনে দাও, মাথায় একটু ভালো করে মাসাজ করে দাও তো দেখি।

-   হ্যাঁ প্রভু দিচ্ছি, আপনি মর্ত্যের মহারাজ বলে কথা।

-   হ্যাঁ, ভালো করে দাও।

আরামে রজতের আবার চোখ বুজে এলো, একটু ঘুমিয়েও পড়লো। প্রায় ঘণ্টা খানেক কেটে গেছে, নন্দী ভিরিঙ্গিও একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হঠাৎ রজতের ঘুমটা ভেঙে গেলো, দেখলো তখনও তারা মাসাজ করে যাচ্ছে।

-   আচ্ছা ঠিক আছে, খুব ভালো মাসাজ করেছো। আর করতে হবে না। এবার উঠতে হবে। যাবার আগে তোমাদের অনেক আশীর্বাদ করলাম।

-   অনেক ধন্যবাদ প্রভু, আবার কবে আসবেন?

-   আমি মর্ত্যের রাজা, অনেক দায় দায়িত্ব। তাই ঘুরে বেড়াবার সময় খুব একটা পাই না। আবার যদি কখনও সময় পাই নিশ্চয়ই আসবো, তোমারা সবাই ভালো থেকো, তোমরা নেশা ভাং চালিয়ে যাও। আমি এখন চলি।

আবার স্বর্গে ফেরার আগে রজত একবার বাবা মা, দাদা, দিদি দের সাথে দেখা করলো। অবশেষে কার্ত্তিক দার সাথেও দেখা হল। তবে কার্ত্তিক দা অন্যদের থেকে  একটু আলাদা। কথাবার্তা খুব বেশী বলে না, সারাক্ষণ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সাজগোজের খুব বহর। আর চুল নিয়ে খুব ব্যস্ত, সারাক্ষণ চুল আঁচড়ে যাচ্ছে। সব সময় একটা হিরো হিরো ভাব।

-   আমার এখানে খুব ভালো লেগেছে গো মা, বাবাও খুব ভালো। বাবার সাথে অনেক গল্পও হয়েছে। পূজোর তো আর বেশী দেরী নেই, তুমি তো আর কয়েক মাস পরেই মর্ত্যে আসছো। তখন তো তোমার সাথে আবার দেখা হবে। তবে তখন তো আর তোমার সাথে কোনও কথা বলা যায় না। তাই এখানে এসে ভালোই হল। মর্ত্যের কারেন্ট সিচুয়েসানটা তোমাকে জানাতে পারলাম। তুমি সেই ভাবেই এবার তৈরি হয়ে এসো মা, যাতে আমরা আবার একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারি।

-   হ্যাঁ রে বাবা, তোর কাছে তো সব শুনলাম। এবার একটা কিছু তো ব্যবস্থা করতেই হবে। চিন্তা করিস না। এবার পুজোয় গিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করে আসবো।

-   আর বাবা তোমাকে বলি, তুমি প্লিজ মা মর্ত্যে যাবার সময় অত রাগারাগি করো না। দেখো ওই চারটে দিন আমরা মাকে পাই। তুমি প্লিজ মায়ের ওপর রাগারাগি করো না।

-   আচ্ছা ঠিক আছে, এবার আর মায়ের যাবার আগে আমি রাগারাগি করবো না, তোর কথা রাখবো... হা হা পাগল ছেলে একটা। শোন, নন্দী ভিরিঙ্গি তোকে স্বর্গে ছেড়ে আসবে। তুই এখান থেকে একা চিনে যেতে পারবি না।

-   আচ্ছা ঠিক আছে। তবে আমি তো আর বেশী দিন স্বর্গে থাকতে পারবো না, এবার মর্ত্যে ফিরতে হবে। মা, বৌ সবাই খুব চিন্তা করছে। তাই যাবার আগে একটা ছোট্ট ইচ্ছা আছে আমার।

-   কি ইচ্ছা রে?

-   আমি যাবার আগে সব দেবতাদের নিয়ে একটা ছোট গেট টুগেদার করার ইচ্ছে আছে, মানে ওই ছোট খাটো একটা পিকনিক মত।

-   পিকনিক? সেটা কি?

-   সবাই মিলে একটু একসাথে খাওয়া দাওয়া, নাচ, গান, হই হুল্লোড় করা, এই আর কি।

-   বাহ, বেশ মজার তো। ঠিক আছে কবে হবে জানিয়ে দিস, আমি তোর মা কে নিয়ে চলে যাবো।

-   হুররে, বাবা মা দুজনেই রাজী, কি মজা।

-   হা হা, আমার পাগল ছেলেকে দেখো একবার। রজত, তুই খুব ভালো রে। ঠিক আছে বাবা, আর দেরী করিস না, সন্ধ্যের আগেই স্বর্গে পৌঁছাতে হবে। পিকনিকে আবার দেখা হবে।

-   ওহ, আর একটা কাজ বাকি আছে। কয়েকটা ডুলফি আর ট্রিলফি নেবো।

-   সেগুলো আবার কি রে?

-   আরে একা তুললে সেলফি, দুজন হলে ডুলফি আর তিনজন হলে ট্রিলফি। এবার আমি তোমার আর বাবার সাথে কয়েকটা ছবি তুলবো। সেগুলো ফেসবুকে আপলোড করবো। তারপর পূজোর সময় আমাদের যুবক বৃন্দ ক্লাবের পুজোর প্যান্ড্যালে বড় করে এই ছবিগুলো তোমার মূর্তির পাশে টাঙিয়ে রাখবো। সবাই দেখবে যে তোমার সাথে সত্যি সত্যি আমি দেখা করে এসেছি।

-   হা হা, পাগল ছেলের কাণ্ড দেখো।

বাবা ও মায়ের সাথে আলাদা ভাবে, বাবা মায়ের সাথে একসাথে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে ফেললো রজত। তারপর বাবা, মা-কে প্রণাম করে স্বর্গের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। নন্দী ভিরিঙ্গি সন্ধ্যের আগেই রজতকে বাড়িতে পৌঁছে দিল।

-   নন্দী, ভিরিঙ্গি দা, ভেতরে এসো, একটু চা খেয়ে যাও।

-   চা কি প্রভু?

-   ইহা এক প্রকার গরম পানীয় যাহা ধীরে ধীরে পান করিতে হয়। তোমাদের তো আবার তাড়াতাড়ি পান করা অভ্যাস। তাই তাড়াতাড়ি পান করিবার চেষ্টা করিলে ওষ্ঠ ও জিহ্বা পুড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা আছে, তাই ধীরে ধীরে ইহা পান করিতে হইবে। এসো ওই চেয়ার দুটিতে বসো... বাবা পরাশর চার কাপ বেশ কড়া করে চা বানাও তো দেখি।

-   চার কাপ কেন, আপনারা তো তিনজন?

-   তুমিও নিশ্চয়ই বিকেলে চা খাও নি।

-   না তা খাই নি বটে।

-   তাই তোমাকে ধরে চার কাপ বানাতে বললাম।

-   ও আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখুনি বানিয়ে আনছি।

-   আর সাথে কিছু নোনতা বিস্কুট এনো, এনারা মনে হয় নোনতাই পছন্দ করবেন।

চা টা খেয়ে নন্দী, ভিরিঙ্গি খুশী মনে আবার কৈলাসে ফিরে গেলো।

-   পরাশর, দুদিন খুব ধকল গেলো, আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়বো। কাল সকালে যমলোকে যেতে হবে, একটু কাজ আছে। আজ একটু ডিম আর আলুসেদ্ধ দিয়ে ভাত করে ফেলো, একটু ফ্যান রেখো। মাখনও আছে। আজ এটা হলেই চলে যাবে।

-   আজ্ঞে ঠিক আছে কর্তা, আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েন।

তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে রজত শুয়ে পড়লো। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে যমলোকে গিয়ে হাজির।

-   আরে রজত যে। সব কুশল তো। কৈলাসে বাবা মায়ের সাথে দেখা হল?

-   হ্যাঁ প্রভু, ওখানে খুব ভালো লাগলো। বাবা মা কে একদম চাক্ষুস দেখে এলাম, এ আমি কখনও স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি নি। বাবা মায়ের সাথে অনেক কথা বার্তা হল। বাবা, মা খুব স্নেহ পরায়ণ। আমাকে খুব আদর যত্ন করেছেন।

-   বাহ, খুব ভালো কথা। আর তুমি যমলোকে যে সমস্ত নতুন নিয়ম কানুন করে দিয়েছো, চিতু আমাকে সেগুলো দেখিয়েছে। আমরা এই নিয়ে আলোচনাও করেছি। আমার খুব ভালো লেগেছে। আমাদেরই এগুলো আগে ভাবা উচিত ছিল। তোমার বুদ্ধিমত্তার তারিফ করতে হয় বৎস। এখন থেকে ওই নিয়মেই কাজ হবে যমলোকে।

-   অনেক ধন্যবাদ প্রভু, আর তো বেশী দিন এখানে থাকা সম্ভব নয়, অনেক দিন হয়ে গেলো। তাই যাবার আগে আমি একটু আমার খুব কাছের মৃত আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করে যেতে চাই- যেমন আমার ঠাকুরদা, আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন, তারপর আমার বাবা কয়েক বছর হল মারা গেছেন, এছাড়া আমার দাদু, দুই পিসি, কয়েকজন কাকা, জ্যাঠা, মামাদের সাথে একটু দেখা করে যেতে চাই।

-   উরি বাবা, তোমার লিস্টটা বেশ বড়। ঠিক আছে তোমাকে দেখা করার অনুমতি দিলাম। তবে তাঁদের সাথে দেখা করার জন্য তো তোমাকে চিতুর সাথে কথা বলতে হবে। এই ব্যাপারটা তো ও দেখে।

-   হ্যাঁ সে তো জানি। আমি শুধু আপনার কাছে অনুমতি চাইলাম। এবার আমি চিতু দাদুর সাথেই দেখা করবো। আর ছোট খাটো দু একটা কাজ আছে, সে ব্যাপারে চিতু দাদুর সাথেই কথা বলতে হবে। ঠিক আছে, তাহলে একটু এখন চিতু দাদুর ঘরে যাই।

-   হ্যাঁ বৎস। তুমি চিতুর সাথে দেখা করে এসো।

 

 

-   চিতু দাদু ভেতরে আসতে পারি?

(কোনও সাড়া নেই)

ও দাদুর সাথে তো আবার চেঁচিয়ে কথা বলতে হয়…

-   ভেতরে আসতে পারি? (চেঁচিয়ে)

-   কে বাছা?

-   আমি রজত।

-   ও ভেতরে এসো বাছা, সব কুশল তো?

-   হ্যাঁ, আপনাদের আশীর্বাদে সব কুশল, আপনি ভালো আছেন তো?

-   হ্যাঁ বাছা, ভালো।

-   বলছি, কদিন আগে দুজনের খোঁজ নিয়ে রাখতে বলেছিলাম, খোঁজ নিয়েছেন?

-   হ্যাঁ বাছা, খোঁজ নিয়েছি। সেই বাবা ও ছেলে একসাথেই আছে এখন, যদিও এখানে ছোটদের জন্য আলাদা থাকার আছে। কিন্তু প্রচুর বালক, বালিকা তালিকায় আছে, অনলাইনে সব আপডেট চলছে। কনফার্ম হলেই সেই বালক তার নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যাবে। ওরা আপাতত ‘সাময়িকী আবাস(পুং)’-এ  আছে। ‘পুং’-টা খেয়াল রেখো কিন্তু, ওখানে সব বয়সের পুরুষেরাই সাময়িক ভাবে আছে। মহিলাদের জন্যও একটি ‘সাময়িকী আবাস’ আছে। আর যে  মহিলা তার স্বামী ও সন্তানের সাথে দেখা করতে চায় তার ছবি তো তুমি  আগেরদিন আমাকে দিয়ে গিয়েছিলে, তার ছবি দিয়ে একটা এন্ট্রি কুপন আমি করে রেখেছি। ওটা নিয়ে যেও। ওই মহিলাকে নিয়ে তুমি সেখানে চলে যেও,  সেখানে যিনি দায়িত্বে আছেন, আমি তাঁকে সব বলে রেখেছি।

-   বাহ, এই একটা কাজ পারফেক্ট করেছেন দেখছি। দেখি, কাল সম্ভব হলে আমি সেই মহিলাকে নিয়ে ওখান থেকে ঘুরে আসবো। আর আমি আমার কিছু মৃত মৃতা আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে চাই। যম স্যার পারমিশান দিয়ে দিয়েছেন।

-   আচ্ছা ঠিক আছে তাঁদের নাম, ঠিকানা, মৃত্যুর বছর ইত্যাদি আমাকে সব ঠিকঠাক বলতে হবে। তবেই আমি বলতে পারবো তাঁরা এখন কোথায় কি অবস্থায় আছেন।

-   ঠিক আছে লিখুন... কানন বালা রায়, যাদবপুর, কলকাতা, মারা গেছেন ইন দা ইয়ার নাইনটিন এইটটি সেভেন, আমার ঠাকুমা।

নেক্সট, আমার পিসিমা বেলারাণী রক্ষিত, হাওড়া, মারা গেছেন ইন দা ইয়ার টু থাউসেন্ড সেভেন...

এই ভাবে বাবা, ঠাকুরদা, দাদু, কাকা, জ্যাঠা, মামাদের সব ডিটেলস চিতু দাদুকে একে একে বলে গেলো রজত। চিতু দাদুও সব জাবদা খাতায় নোট করে নিলেন।

-   সরি, চিতু দাদু লিস্টটা একটু বড় হয়ে গেলো মনে হয়। আসলে এঁরা প্রত্যেকেই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। শুধু ঠাকুরদাই আমার জন্মের আগে মারা গেছেন। তাই তাঁকেও একবার দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। আসলে স্বর্গে যখন এসেই পড়েছি, একবার তাঁদের সাথে দেখা না করে যেতে ইচ্ছে করছে না। তাই ওঁদের সাথে দেখা করেই মর্ত্যে ফিরবো ভাবছি।

-   ঠিক আছে বাছা। সব রেকর্ড ওই জাবদা খাতাতেই আছে। তখন তো আর এখানে নেটে কাজ শুরু হয় নি। তাই সব তথ্য পেয়ে যাবো। তুমি চিন্তা করো না। তুমি তোমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করেই মর্ত্যে ফিরবে।

-   অনেক ধন্যবাদ প্রভু। আজ তাহলে চলি।

স্বাতীর সাথে তার স্বামী ও ছেলের দেখা করিয়ে দিয়েছে রজত। স্বাতীও তার স্বামী ছেলের সাথে দেখা করে খুব খুশী। এদিকে স্বর্গে অনেকদিন হয়ে গেলো। এবার বাড়ী ফিরতেই হবে। তাই যাবার আগে মৃত আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করা ছাড়াও আর একটা কাজ বাকি আছে রজতের। সব দেবতাদের নিয়ে একটা পিকনিক করার খুব ইচ্ছে। রজত দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় গিয়ে হাজির-

-   প্রভু, অনেকদিন হল আমি স্বর্গে আছি। এবার আমাকে মর্ত্যে ফিরতে হবে।  তবে যাবার আগে একটা ইচ্ছে ছিল আমার।

-   কি ইচ্ছে, বল বৎস।

-   বলছি সব দেবতাদের নিয়ে একটা পিকনিক করার খুব ইচ্ছে আমার।

-   পিকনিক? সেটা কি জিনিস?

-   পিকনিক হল সবাই মিলে রান্নার জোগাড় করা, রান্না করা, তারপর খাওয়া দাওয়া, একটু নাচ, গান, হই হুল্লোড় করে সবাই মিলে একটা দিন কাটানো, এই আর কি।

-   বাহ, বেশ তো, উত্তম প্রস্তাব। আমি অন্যান্য দেবতাদের সাথে কথা বলে তোমাকে জানাবো।

-   অনেক ধন্যবাদ প্রভু, আর মাঝে মাঝে ‘লুঙ্গি ডান্স’ টা হচ্ছে তো?

-   আরে হ্যাঁ, সবাই খুব মনোযোগ সহকারে নাচটা করছে। আমারও বেশ ভালো লাগছে। তাহলে পিকনিক এর দিন নাচটা একবার হবে নাকি?

-   আপনার ইচ্ছে যখন নিশ্চয়ই হবে স্যার। ঠিক আজ তবে চলি। আপনি ডেটটা ঠিক করে আমাকে জানিয়ে দেবেন, কারণ আমাকেই তো সব বাজার দোকান করাতে হবে। আর আমার পরাশর তো আছেই, রান্নাটা ও করবে, আমিও একটু হাত লাগাবো ওর সাথে। খুব মজা হবে।

-   ঠিক আছে, আমি তোমাকে ডেটটা জানিয়ে দেবো।

-   ধন্যবাদ প্রভু, এবার বাড়ী যাই তবে।

-   হ্যাঁ, এখন তুমি তোমার গৃহে ফিরে একটু বিশ্রাম নাও।

 

(ক্রমশ)