Samokal Potrika

শঙ্খশুভ্র যখন গতানুগতিকের বাইরে লিখতে বলে ,শব্দটা মাথায় পাক খেতে থাকে । 'গতানুগতিক' অর্থাত সমকালে যা হচ্ছে তার প্রতি আনুগত্য ।
বলা বাহূল্য এই গতানুগতিকের দুটি বিভেদ রয়েছে ।
প্রথমত গতানুগতিক জীবন যাপন , দ্বিতীয়ত গতানুগতিক অক্ষরযাপন ।দুয়ের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর ।যেখানে সমাজবদ্ধ মানুষ গতানুগতিক জীবনে আস্থাশীল সেখানে গ্রহের বাইরে উপগ্রহের মত,কতিপয় মননশীল মানুষ বিচ্ছিন্ন চিন্তনযুক্ত শিল্পচর্চায় নিয়োজিত ।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে গতানুগতিকের বাইরে যাবার চির প্রবণতাও তো গতানুগতিক ধারা ।
চর্যাপদ বা পুরান থেকে সরে গিয়ে বড়ু চন্ডিদাস ভিন্ন অধিক পরিচিত চন্ডিদাসের থেকে ,জয়দেবের গীতগোবিন্দ একক ,অদ্বিতীয় ।এভাবেই গতানুগতিকের বাইরে প্যারিচাঁদ মিত্রের 'হূতোম পেঁচার নকশা 'বাঙলা স্যাটায়ারের উত্পত্তি করেন অন্যদিকে  বঙ্কিম পুরোনো ধারাকে ভেঙে আধুনিক ন়ভেল লেখার ঝুঁকি নেন ।
ব্রাহ্মসমাজের আধ্যাত্মিক নিরাকার স্তুতির গতানুগতিক ধারা ভেঙে স্বর্ণকুমারী দেবী লিখলেন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রথম গদ্যরচনা ।
রবীন্দ্রনাথ তো প্রথম থেকেই প্রথা ভাঙার প্রথাকেই আপন করেছেন ।
এ ব্যাপারে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত র " মেঘনাদবধ কাব্য" ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টি এক যুগান্কারী প্রয়াস ।
       এদের কারো অবদানই জীবতকালে তত স্বীকৃতি পায়নি (বঙ্কিমচন্দ্র বাদে) ।তবু তাঁরা অমরত্ব পেয়েছেন স্রোতের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ।গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে চাননি কৃত্তিবাস কবিরা ও হাংরি আন্দোলনের শরিকেরা সকলেই বেড়োতে চেয়েছেন 
গতানুগতিকের বাইরে ।রোমান্টিক থেকে আধুনিক,পুনরাধুনিক থেকে উত্তরাধুনিক দর্শন এই গতানুগতিকের বাইরে যাবারই প্রচেষ্টা ।
তবে বাস্তব সত্য এই যে সাহিত্যের এসব অন্যধারার নিরীক্ষা সমাজজীবন ও সাধারনের যাপনের গতানুগতিকা কে পরিবর্তন করতে পারেনি ।
ফলে যেটা হলো তা এইসব আন্দোলন ও অন্যধারার সৃষ্টি সাধারনের বোধের বাইরে কেবল আত্মপ্রচার ও পিঠ চাপড়ানিরর পদ্ধতি হয়ে গেছে ।
সাধারণ মানুষ নিউটনের প্রথম সূত্রানুযায়ী আবহমানেই আস্থাশীল ।তাই গতানুগতিকের বাইরে চিন্তা ভাবনাটা শুধু শিল্প সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে ।
ব্যতিক্রম একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।গতানুগতিকের বাইরে যাবার সাহসিকতা কেবল কালো অক্ষরে সীমাবদ্ধ রাখেননি চিন্তনের পরিবর্তন ,সমাজ বদলের কাজটি লেখার ়পৃষ্ঠা থেকে বাধ্য করেছেন সাধারন মানুষের চেতনায় আঘাত করতে ।
   শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দের কবিতা একসময় ব্রাত্য ছিলো ।যত আমরা এগিয়েছি ্বিশ্বায়নের পথে,বাজার সর্বস্ব অর্থনীতির দিকে ততই এসেছে সর্বব্যাপী এক বিচ্ছিন্নতাবোধ ও নৈরাশ্য ।আমরা ততই একাত্ম হতে পারছি জীবনানন্দর কবিতায় ।
উত্তরাধুনিকের পরও আমাদের ফিরতে হয় গতেই ।ছা পোষা মানুষের ভাষা তাদের দুঁখ কষ্ট বেদনা বোধ্র কথ্য ভাষায় যা লেখা হয় তাই মন ছুঁয়ে যায় ।তাই হয়ে যায় চিরায়ত ।
কষ্টকল্পিত দর্শন বা দুর্গম শব্দপ্রয়োগ সাময়িক আত্মখ্যাতি দিতে সক্ষম তা টিঁকে যায়না সময়ের প্রবাহে ।
সাহিত্যের প্রতি মানুষের বিরাগ এ কথা কিছুটা হলেও সত্য । অথচ পরিসংখ্যান বলছে আগের চেয়ে জেলায় গ্রাম শহরে সারা বছর কবিতা উত্সব বেড়েছে ।তাতে মানুষ কি কবিতা সম্পর্কে ভীষণ সচেতন হয়ে পড়ছে ?মনে হয়না ।লক্ষ্য করলে এও দেখা যায় এসব কবিতা উত্সব গুলিতে ঘুরে ফিরে চেনামুখ ,চেনাকথা ,খাওয়া দাওয়া ,ছবি তোলা সার । অর্থাত মূলস্রোতে কিন্তু কবিতা নেই ।
মূলস্রোতে কোন সাহিত্য আছে?আছে লক্ষ্ণীর পাঁচালি,বাংলার ব্রতকথা,সুকুমার রায়,রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ বা কুমোরপাড়ার গরুরগাড়ি ।আরেরটু উচ্চগৃহে বড়োজোড় জীবনানন্দ ,নীরেন্দ্রনাথ,সুনীল বা জয় গোস্বামী ।
প্রশ্ন তবে এই যে তাঁরা এমন কি লিখলেন যা মানুষের মনে গেঁথে গেলো ।তাঁদের কবিতা নিয়ে জেলায় শহরে ক্যামপেন করতে হয়নি ।কনফেরেন্স করতে হয়নি ।কবার মঞ্চে উঠে বক্তব্য রেখেছেন সন্দেহ ।তবু তাঁরা অমরত্ব পেলেন ।
আজকের কবিদের মধ্যেও নিশ্চয় ভবিষ্যতে দাগ রাখবেন একদুজন ।তাই মানুষ আপন করে নেয় তাকেই যা সহজ ভাষায়ও ছন্দে লেখা হয়, যা তাদের জীবনের কথা বলে ।
আজও আমরা বলি "কাটিকুটি কুড়োতে গেলাম একটি কথা শুনে এলাম এই শুনলে কি হয় নির্ধনের ধন হয় অন্ধজনের চক্ষু হয়......" ,চাঁদসদাগরের গল্প , রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা ইত্যাদি ।যা মানুষের মুখে মুখে ছড়ায় তাই চিরায়ত । তাত্বিক বিশ্লেষণ তাই হতে হবে জীবন নির্ভর ।তা গতের অনুগত হয়েও সীমানা ছাড়িয়ে যাবে গরপরতার ।