Samokal Potrika

পরমানন্দের শিশুপুত্র দুধ পান করিতে না চাহিলে , তাহার মাতা তাহাকে কোলে করিয়া লইয়াগিয়া মঙ্গলা গাভীর সদ্যজাত বাছুরটির প্রতি পুত্রের মনোনিবেশ করাইয়া দুধ পান করাইয়া থাকে । নিত্য এইরূপ করিতে করিতে পরমানন্দের পুত্রের ইহা অভ্যাসে পরিনত হইয়াছে । মাতাকে গোঁদোল হাতে দেখিলেই সে মঙ্গলা গাভীর বাছুরটির প্রতি তর্জনী অঙ্গুলি দ্বারা নির্দেশ করে । ইহা দেখিয়া পরমানন্দ মধ্যে মধ্যে তাহার স্ত্রীর প্রতি রুষ্ট হইয়া বলে , '' এটা ভালো করছো না মন্দিরা ! ওর মনটা অন্য দিকে ঘুরে যাবে !  '' মন্দিরা স্বামীর কথা এক কানে লইয়া অপর কান দিয়া বাহির করিয়া দিয়া আপন সুবিধাটি বুঝিয়া লয় । বাছুরটির নিকট লইয়া গেলে পুত্রকে দুধ পান করাইতে তাহাকে বিশেষ বেগ পাইতে হয় না । উক্ত কারনে ইহা বন্ধ করিতে মন্দিরার বিশেষ আগ্রহ লক্ষিত হয় নাই । 

 

বর্তমানে পরমানন্দের পুত্র গুটি গুটি হাঁটিতে শিখিয়াছে । মন্দিরা , পুত্রকে দুধ পান করাইবার পেতলের গোঁদোলটি সযত্নে আলমারিতে তুলিয়া রাখিয়াছে । দূর হইতে মন্দিরা ' আমার সুমন সোনা ' বলিয়া ডাকিলেই তাহার পুত্র খিল খিল করিয়া হাসিয়া ছুটিয়া আসিতে গিয়া টাল সামলাইতে না পারিয়া আছাড় খাইয়া মাটিতে পড়িয়া গিয়া কাঁদিয়া ওঠে , মন্দিরা ছুটিয়া গিয়া তাহাকে কোলে তুলিয়া মঙ্গলার বাছুরটির নিকট লইয়া গেলে তাহার সমস্ত কান্না থামিয়া যায় । বাছুরটির সহিত তাহার সখ্যতা দেখিয়া মন্দিরাও মধ্যে মধ্যে অভিভূত হইয়া পড়ে । সুমন যখন তাহার কচি কচি অঙ্গুলি দিয়া বাছুরটির মাথায় হাত বুলাইয়া দেয় , তখন সে মাথাটি অবনত করিয়া তাহার আনুগত্য প্রদর্শন করে । মঙ্গলাও নিষ্পলক দৃষ্টিতে ইহা দেখিতে থাকে । কিন্তু একমাত্র পরমানন্দ ইহা সুনজরে দেখিতে পারে না । তাহার মনে একটি আশঙ্কা সর্বদা কাজ করিয়া থাকে , অত্যধিক পশুপ্রীতি ভবিষ্যতে তাহার পুত্রের লেখাপড়ার অন্তরায় হইবে । মন্দিরা যে কিছুতেই ইহা বুঝিবে না তাহা পরমানন্দ বিগত আড়াই বৎসরে সম্যক উপলব্ধি করিয়াছে । কোনো উপায় না দেখিয়া পরমানন্দ, মঙ্গলা গাভীর সহিত তাহার বাছুরটি বিক্রয় করিবার মনস্থ করিল । কোনো কারন বিহীন বিক্রয় করিলে মন্দিরার নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হইবে , ইহা অনুভব করিয়া সে সংসারে একটি কৃত্রিম অভাবের বাতাবরণ সৃষ্টি করিয়া মন্দিরাকে বলিল , '' দেখো এই অভাবের সময় গাই রেখে কি হবে ?  তা ছাড়া এখন তো তেমন দুধও দেয় না । এখন বিক্রি করে দি । খোকার জন্য অল্প দুধ কিনলেই হবে । শুধু শুধু বাড়তি খরচ । পরে বরং হাতে টাকা পয়সা এলে কিনে নেওয়া যাবে । '' মন্দিরা প্রথমে সম্মত না হইলেও সংসারের উপরি খরচ কমাইতে হইবে ভাবিয়া রাজি হইয়া গেল । 

          মঙ্গলার বাছুরটির গায়ের লাল রং দেখিয়া সুমন তাহাকে ' লাল ' বলিয়া ডাকিত । ক্রেতা আসিয়া মঙ্গলার সহিত লালকে লইয়া গেল । পরমানন্দ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল । সুমন ঘরের ভেতর খেলিতেছিল , সে জানিতেও পারিল না যে তাহার প্রিয় ' লাল ' তাহাদের ঘর ছাড়িয়া অন্যের ঘরে চলিয়া গেল । মন্দিরা দেখিল যাইতে যাইতে লাল বারংবার পশ্চাৎ ফিরিয়া চাহিয়া কিছু একটার খোঁজ করিতেছে । তাহার চোখের কোনায় জল আসিয়া পড়িয়াছে । ক্ষণিক পরে মঙ্গলা এবং লালকে দেখিতে না পাইয়া মনিকা ঘরে ঢুকিয়া দেখিল , তাহার পুত্র খেলিতে খেলিতে মাদুরের উপর শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে । মন্দিরা ঘুমন্ত পুত্রের মুখের পানে চাহিয়া একটি দীর্ঘঃশ্বাস ফেলিয়া আপন গৃহকর্মে মগ্ন হইল ।

           ঘুম ভাঙিতেই সুমন উঠিয়া চক্ষুযূগল কচলাইতে কচলাইতে অভ্যাসবশত লালের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়া  দেখিল , লাল এবং মঙ্গলা নাই ; উহাদের বাঁধিবার খুঁটি দুইটি ফাঁকা পড়িয়া রহিয়াছে । সুমন তাহার মাতার নিকট গিয়া মাতার আঁচল ধরিয়া জানিতে চাহিল , ' লাল , লাল । ' মন্দিরা ছলনার আশ্রয় লইয়া পুত্রকে বলিল , '' ওরা বেড়াতে গেছে , কিছুদিন পর ফিরে আসবে । '' মাতার মুখ হইতে উক্ত কথাটি শুনিয়া সুমন ছুটিয়া সেই স্থানে গেল , যেস্থানে দুইটি খুঁটিতে মঙ্গলা ও লাল পাশাপাশি বাঁধা থাকিত  । মন্দিরা ক্ষণিক পরে পুত্রের নিকট আসিয়া দেখিল , লাল যে খুঁটিতে বাঁধা থাকিত সেই খুঁটিটি দুই হাতে ধরিয়া সে কাঁদিতেছে । মন্দিরা আপন দুই চক্ষুর কোনায় অঙ্গুলি দিয়া অশ্রু মুছিল । লালের মা যেদিন তাহাদের ঘরে আসিয়াছিল মন্দিরা সেইদিন শঙ্খ উলু দিয়া তাহাকে বরন করিয়া তাহার নাম রাখিয়াছিল মঙ্গলা ,সেইদিনটি অদ্য মন্দিরার মানসপটে সুস্পষ্ট হইল । সে পুত্রের হাত ধরিয়া আনমনে বলিল , ' সবই মায়া সোনা ! ' মাতার কথার মর্মার্থ অনুধাবন করিতে না পারিয়া সুমন কাঁদিতে কাঁদিতে বারংবার বলিতে লাগিল , ' লাল , লাল !

শুভম