Samokal Potrika

এদিকে চিতু দাদুর থেকে রজত সব নিকট আত্মীয়দের খোঁজ খবর পেয়ে গেছে। রজতের খুব সৌভাগ্য যে তাঁদের সাথে দেখা করার জন্য তাকে আর বেশী এদিক  ওদিক ছোটাছুটি করতে হবে না, ঠাকুমা, পিসি সবাই এক জায়গাতেই আছেন-   ‘শান্তি ভিলা’। রজত ঠিক করলো প্রথমে তাঁদের সাথেই দেখা করবে। একদিন সক্কাল সক্কাল সেখানে গিয়ে হাজির। গিয়েই দেখে ঠাকুমা সেখানে ফুল তুলছেন। ঠাকুমাকে দেখেই তো রজতের খুশী আর ধরে না। গিয়েই ঠাকুমাকে একটা প্রণাম করলো রজত। তবে ঠাকুমা রজতকে চিনতে পারেন নি প্রথমে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ ঠাকুমা যখন মারা যান, তখন রজত খুব ছোট।

-   কি গো ঠাকুমা, চিনতে পারলে না তো?

-   না বাবা, তুমি কে?

-   আমি তোমার নাতি বাবান গো।

-   বাবান! সেই কত ছোট দেখেছিলাম দেখেছিলাম তোকে বাবা, এখন কত্ত বড় হয়ে গেছিস, কি করে চিনবো বল। তা বাড়ীর সব খবর ভালো তো।

-   হ্যাঁ, সব মোটামুটি ভালোই। তবে বাবা তো ক বছর আগে মারা গেলো, মা ভালোই আছে।

 

(ঠাকুমার চোখে জল)

 

-   সমু মারা গেছে? কবে?

-   এই তো ক বছর হল, হঠাৎ শেষ রাত্রে হার্ট অ্যাটাক হল, বেশী সময় দেয় নি গো।

-   আহা, শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো রে, মা ভালো আছে? বিয়ে থা করেছিস বাবা?

-   হ্যাঁ, এই তো কিছুদিন হল বিয়ে করেছি। হ্যাঁ গো, পিসিও তো শুনলাম নাকি এখানেই থাকে। তা পিসি কোথায়, বলতে পারবে?

-   হ্যাঁ, ওই তো, বাগানের বেঞ্চে বসে আছে, যা দেখা করে আয়।

-   ঠিক আছে তুমি ফুল তোলো, আমি দেখা করে আসছি। এতদিন পর তোমাকে দেখে কি যে ভালো লাগছে, তোমাকে বোঝাতে পারবো না।

ঠাকুমা রজতের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে, থুতনিটা ধরে একবার চুমু খেলেন। তারপর রজত একটু পিসির সাথে দেখা করতে গেলো।

-   পিসি, টুকি...

-   কে কে...

-   এদিকে ফিরে একবার দেখো তো।

পিসি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো-

-   আরে বাবান, তুই এখানে?

(বলেই কাঁদতে লাগলেন)

-   এত কম বয়সে তুই এখানে? কি করে মারা গেলি তুই বাবা? ইস, এত কম বয়সে... আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।

-   আরে পিসি আমি মরি নি, দিব্যি বেঁচে আছি। ওই ব্যাটা যমরাজের শাকরেদ আমাকে ভুল করে এখানে নিয়ে এসেছে। অনেকদিন হয়ে গেলো এখানে এসেছি। বাড়ী ফেরার আগে তোমাদের সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে হল। তাই ঠিক করলাম তোমাদের সাথে দেখা করেই বাড়ী ফিরবো।

-   হা হা... তাই বল। এ তো একদম সিনেমার মত হয়ে গেলো রে, ওই যে  কি একটা সিনেমা হয়েছিলো না...

-   আরে ওই তো ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’...

-   হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব মজার সিনেমা... তুই কেমন আছিস বল। বাবা, মা সবাই  কেমন আছে?

-   বাবা তো মারা গেলো গো ক বছর আগে...

-   আহা রে, আমার ভাইটাও মারা গেলো? কি হয়েছিলো?

-   হার্ট অ্যাটাক।

-   ও আচ্ছা, মা ভালো আছে তো রে? মায়ের যত্ন নিস কিন্তু... বিয়ে থা করেছিস?

-   হ্যাঁ এই তো কিছুদিন হল... ছবি দেখবে নাকি? আমার মোবাইলেই আছে...

-   কই দেখি।

-   এই দেখো...

-   বাহ, ভারি মিষ্টি দেখতে, কি নাম রে?

-   রূপসা

-   বাহ, খুব সুন্দর নাম তো। 

-   তোমাদের এত দিন পরে দেখে কি যে ভালো লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। কখনও ভাবি নি মৃত্যুর পরেও তোমাদের আবার দেখতে পাবো। ভাগ্যিস যমরাজের শাকরেদ ভুল করে আমাকে এখানে তুলে এনেছিলো, তাই তোমাদের আবার দেখতে পেলাম।

-   তোকেও যে আবার দেখতে পাবো কখনও ভাবি নি। তোকে কত ছোট দেখেছি, আমার কোলে ঘুরে বেড়াতিস, তবে তুই খুব শান্ত ছিলি।

-   হ্যাঁ গো পিসি কত পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। আর তোমার হাতের ওই বিউলির ডাল আর আলু পোস্ত... সেই স্বাদ আর কারও হাতে পাই না। আর তোমার হাতের বোয়াল মাছ আর শুটকির লাল লাল রসা... উফ, সব মনে পড়ে যাচ্ছে।

-   বাবা, তোর সব মনে আছে?

-   হ্যাঁ, মনে থাকবে না? সেই দিনগুলো কি আর ভোলা যায় বলো। বাড়ী ফিরে তোমাদের গল্প করবো, সবাই তো অবাক হয়ে যাবে শুনে, হা হা।

-   তোকে দেখে যে কি ভালো লাগছে বাবান বলে বোঝাতে পারবো না। হ্যাঁ রে আমার রনি আর বৌমা কেমন আছে? মাঝে মাঝে কথাবার্তা হয়?

-   হ্যাঁ মাঝে ফোনে কথা হয় তো রনি দা আর বৌদির সাথে। রনি দা তো এখন ব্যাঙ্গালোরে পোস্টিং।

-   ও আচ্ছা, ওদের আমার আশীর্বাদ জানাস।

-   হ্যাঁ, নিশ্চয়ই জানাবো। স্বর্গে এসে তোমাদের সাথে দেখা করে গেলাম, এত  বড় একটা ঘটনা ওদের জানাবো না, তুমি ভাবলে কি করে! ঠিক আছে  পিসি আজ উঠবো। তোমাদের সাথে দেখা করে আজ আমার মনটা ভরে গেলো।

-   ঠিক আছে বাবা, আমারও আজ মনটা ভালো হয়ে গেলো রে। তোকেও আমি অনেক আশীর্বাদ করলাম।

পিসি আর ঠাকুমার সাথে দেখা করে রজত খুশী মনে বাড়ী ফিরে এলো। পরের দিন ‘সুহৃদ আলয়ে’ দাদু, জ্যাঠা, মামাদের সাথে দেখা যাবে বলে স্থির করলো। পরের দিন সুহৃদ আলয়ে পৌঁছেই রজত স্কুলের মাস্টার মশাইকে দেখতে পেল- গোলক বাবু, ইংলিশ টিচার। এতদিন পর মাস্টার মশাইকে দেখে রজতের খুব ভালো লাগলো। রজত গোলক বাবুর কাছে গিয়ে প্রণাম করলো।

-   তুমি কে বাবা?

-   আমি রজত স্যার, চিনতে পারলেন না? ৯৮ এর ব্যাচ।

-   ৯৮!... ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে... বাবা, কত বড় হয়ে গেছিস রে, কত  ছোট দেখেছি তোকে, চাকরি বাকরি নিশ্চয়ই করছিস?

-   হ্যাঁ স্যার, একটা চাকরি করছি, মাইনে পত্তর মোটামুটি ভালই।

-   বা, very good. চল ওই বেঞ্চে একটু বসি।

-   আচ্ছা স্যার চলুন, অনেক দিন পর আপনাকে দেখে স্কুলের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে।  

-   হ্যাঁ, তোদের কত ক্লাস নিয়েছি... আচ্ছা, একটা translation কর তো দেখি- সে প্রত্যহ বিকেলে ফুটবল  খেলিত। 

-   Very easy sir…  He used to play football every afternoon.

-   বাহ, Very good. তবে used to-র জায়গায় would ব্যবহার করলে আরও ভালো হবে। আচ্ছা আর একটা বল তো দেখি- ডাক্তার আসিবার পূর্বেই  রোগীটি মারা গেলো।

-   এই প্রশ্নটা খুব ছোট থেকেই আপনি আমাদের করে আসছেন, তাই মুখস্ত হয়ে  গেছে, হা হা... The patient had died before the doctor came.

-   Bravo! তুই তো ইংলিশে এখন অনেক improve করেছিস দেখছি। তোদের উন্নতি দেখলে আমার খুব ভালো লাগে। ঠিক আছে আরও কিছু translation কর তো দেখি। 

-   স্যার, এই স্বর্গে এসেও translation!!!

-   Yes my boy, যত translation করবে তত ইংলিশের ভিত মজবুত হবে। আচ্ছা এটা বল- আমরা বাড়ী থেকে বেরোতে না বেরোতেই বৃষ্টি শুরু হল।

-   এটা একটু শক্ত হয়ে গেলো, sir।

-   আচ্ছা আমি বলে দিচ্ছি- No sooner had we left the house, it began to rain. 

-   আচ্ছা স্যার, thank you. এবার আমি একটি প্রশ্ন করতে পারি? আসলে স্কুলে তো স্যারেদের প্রশ্ন করতে পারতাম না, এটা তো স্বর্গ, তাই আমিও নিশ্চয়ই দু একটা প্রশ্নটা করতে পারি। 

-   তুই দুটো translation ঠিক করেছিস, আমি খুব খুশী হয়েছি, ঠিক আছে  কর।   

-   Thank you, sir. আচ্ছা বলুন তো Which is the longest word in English?

-   হা হা, তুই বল দেখি, তোর কাছ থেকেই শুনি।  

-   pneumonoultramicroscopicsilicovolcanoconiosis

-   বাপ রে, এটা একটা শব্দ? আগে শুনি নি তো কখনও।

-   হ্যাঁ স্যার, এটি একটি ইংরাজি শব্দ, ফুসফুসের একটি রোগের নাম। সিলিকা  কণা থেকে ফুসফুসের এই রোগটি হয়। তবে সচরাচর এই রোগটি দেখা যায় না। 

-   বাহ, তুই তো অনেক কিছু জানিস দেখছি। তোকে দেখে খুব ভালো লাগলো। তোকে অনেক আশীর্বাদ করলাম বাবা।

রজতও স্যারকে প্রণাম করে উঠে পড়লো বেঞ্চ থেকে। এবার বাবা, জ্যাঠাদের সাথে দেখা করার জন্য একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে লাগলো। 

ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মেজো মামার সাথে দেখা হয়ে গেলো-

-   আরে বাবান তুই এখানে, কি করে এলি?

-   সে অনেক কথা... মেজো মামা, তোমাকে দেখে যে কি ভালো লাগছে  বোঝাতে পারবো না। তোমার মৃত্যুর সময় আমি কলকাতার বাইরে ছিলাম, তোমাকে শেষ বারের জন্য আর দেখতে পাই নি, তাই আমার খুব আফসোস ছিল। আজ তোমার সাথে দেখা হয়ে গেলো, ভীষণ আনন্দ হল। তোমার কি মৃত্যুর বয়স হয়েছিল বল! মাত্র ৬৩...

-   হ্যাঁ রে, হার্টের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। নার্সিংহোমে দিয়েও খুব একটা লাভ হয় নি, বরং ক্ষতিই হয়েছে।

-   ক্ষতি কেন মামা?

-   আরে তোরা যে দিনে আমার মৃত্যু দিবস পালন করিস সেটা আমার আসল  মৃত্যু দিন নয়। তার দুদিন আগে আমি যমালয়ে পৌঁছে গেছি। ওরা আমাকে ওই অবস্থায় ২ দিন ভেণ্টিলেশানে রেখে অনেক টাকা আত্মসাৎ করেছে।

-   তাই না! আমারও সন্দেহ হয়েছিলো। তবে এ ব্যাপারে আমি যমরাজকে  ইতিমধ্যে রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছি। উনি যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলেছেন... যাক গে এখানে এখন কেমন আছো?

-   এখানে সবাই খুব ভালো থাকে রে। আমি এতদিন যমালয়েই ছিলাম। এই কিছুদিন হল এখানে এসেছি। এখানে ভীষণ ভালো লাগছে, আর এখানে এসে তোর বাবা, জ্যাঠাদের সাথেও দেখা হয়েছে রে। ওঁরাও এখানেই আছেন। আশেপাশে একটু খুঁজে দেখ, দেখা হয়ে যাবে। তোকে দেখে ভীষণ ভালো লাগছে। অনেক আশীর্বাদ করি বাবা।

রজত মেজমামাকে প্রণাম করে বাবা, জ্যাঠাদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। 

এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো, অনেক মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু বাবা, জ্যাঠাদের কোথাও দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতে একটি ছোট জলাশয় চোখে পড়লো। দেখলো সেখানে একটি বেঞ্চের ওপর বসে তিন জন গল্প করছে। কিন্তু পেছন থেকে দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাই একটু সামনে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলো।

সামনে এসেই রজতের চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো, বেঞ্চে বাবা, জ্যাঠা আর একজন বয়স্ক মানুষ বসে গল্প করছেন।  

-   কেমন আছো বাবা, জ্যাঠা তোমরা?

রজতকে দেখেই ওঁরা চমকে উঠলেন...

- বাবান, তুই এখানে?

- আরে কদিন এখানে বেড়াতে এসেছি, তাই তোমাদের সাথে দেখা করতে এলাম।

- তুই কি বলছিস কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না।

তারপর সব কথা রজত তাঁদের খুলে বলল, ওঁরাও সব শুনে খুব হাসতে লাগলেন। এরপর রজতের বাবা রজতকে জড়িয়ে ধরলেন, বাড়ীর সব খোঁজ খবর নিলেন। তারপর বললেন-

-   কি রে, আমাদের সাথে যিনি বসে আছেন, তাকে চিনতে পারলি?

-   না তো, এনাকে তো আগে দেখি নি...

-   আরে ইনি তোর ঠাকুরদা, তোর জন্মের আগেই মারা গেছেন... তুই চিনবি কি করে!

-   তাই নাকি!!! My grand father! কি সৌভাগ্য আমার, স্বর্গে এসে আমার ঠাকুরদার সাথেও দেখা হয়ে গেলো। হ্যাঁ, বাড়িতে ছবিতে দেখেছি বটে, এবার মুখটার সাথে একটু মিলও খুঁজে পাচ্ছি… বলেই তাঁকে প্রণাম করলো,  সাথে বাবা, জ্যাঠাকেও প্রণাম করলো। সবাই প্রাণ ভরে রজতকে আশীর্বাদ করলো। ঠাকুরদা তো নাতিকে দেখে খুব খুশী, রজতকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন- ‘ আহা, আমার কি সৌভাগ্য... জীবিত অবস্থায় নাতির মুখ না দেখতে পেলেও স্বর্গে এসে নাতির মুখ দেখলাম... এমন সৌভাগ্য আর ক জনের হয়!’   

এই বলে রজতকে গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে খুব আদর করতে লাগলেন। চারজন বসে অনেক গল্প করলো। এতদিন পর একে অপরকে পেয়ে যেন খুশীর  বাঁধ ভেঙে গেলো।   

সবার সাথে দেখা করে রজত খুশী মনে বাড়ী ফিরে এলো। অনুর সাথেও স্বপ্নিল আলয়ে প্রায় নিয়মিতই দেখা করে আসে। এই কয়েকদিন একটু ব্যস্ত  থাকার জন্য অনুর সাথে দেখা করা হয় নি। তাই পরের দিন অনেকক্ষণ সময় অনুর সাথে কাটিয়ে এলো।

সব কাজ মোটামুটি শেষ। আর একটা ছোট কাজ বাকি আছে চিতুদাদুর সাথে,   তাই রজত এবার যমালয়ে গিয়ে হাজির।

-   নমস্কার প্রভু, কেমন আছেন?

-   ভালো, তুমি কেমন আছো বৎস?

-   ভালোই আছি, এই চিতু দাদুর সাথে ছোট একটা কাজ আছে, ওটা সেরেই ফিরবো।

-   আচ্ছা, ঠিক আছে। চিতু ওর ঘরেই আছে, যাও দেখা করে এসো।

চিতু দাদুর ঘরে প্রবেশ...

-   স্যার, একটু ভেতরে আসতে পারি? (চেঁচিয়ে)

-   হ্যাঁ, এসো বাছা, সব কুশল তো?

-   হ্যাঁ, আপনাদের আশীর্বাদে সব কুশল... বলছি আর একটা ছোট কাজ বাকি ছিল।

-   হ্যাঁ বলো...

-   আপনাকে আমি আগেই বলেছিলাম আমার মৃত্যুর সময় কাল, কারণ সব আমি নির্ধারিত করে দিয়ে যাবো... সেই ব্যাপারেই একটু কথা বলতে এসেছিলাম। (চেঁচিয়ে)

-   হ্যাঁ হ্যাঁ বলো... আমি শুনছি।

-   না না, আপনার কানের ওপর আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই, জাবদা খাতাটা আনুন। ওতেই সব লিপিবদ্ধ করুন।

-   আচ্ছা, ঠিক আছে বাছা, খাতা আমার পাশেই আছে, তুমি বলো।

-   আচ্ছা লিখুন... মোটামুটি ৮০-৮২ বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থ ভাবে বাঁচতে চাই। এখন ৩৫... ধরুন আরও বছর ৪৫ মত বাঁচতে চাই। মানে আমাকে ২০৬৩-৬৪ র আগে আমাকে মারা চলবে না।

-   আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার যেমন ইচ্ছে তেমনই হবে... আর কি ইচ্ছে বলো।

-   হুম, ধন্যবাদ। মোটামুটি সুস্থ রাখতে হবে আমাকে। সুগার, প্রেশার, হার্টের সমস্যা, পেটের সমস্যা, কিডনির সমস্যা এসব হওয়া চলবে না... আমি খুব ভোজন রসিক... যতদিন বাঁচবো ভালমন্দ খেয়েই বাঁচতে চাই।

-   ঠিক আছে বাছা, তাই হবে... আর কি ইচ্ছে বলো।

-   ধন্যবাদ... বড় কোনও অসুখ হবে না যখন, তার মানে সুস্থই থাকবো। তাই কোনও রোগে আমার মৃত্যু হবে না... তাহলে কি করে আমাকে মারবেন কিছু ভেবেছেন?

-   কোনও রোগ হবে না বলছো? তাহলে তো তোমাকে মারাটা তো শক্ত হয়ে গেলো...

-   হুম, শক্ত হলেও আমাকে তো মারতে হবেই... আমি তো আর অমরত্ব চাই নি।

-   তাহলে কি কোনও এক্সিডেন্টে মেরে দেবো?

-   অপঘাত??? না না, এটা আমার পছন্দ নয়।

-   তাহলে হার্ট অ্যাটাক?

-   বাপরে, তাহলে তো বুকে খুব ব্যাথা উঠবে, শ্বাস কষ্ট হবে... বাড়ীর লোকেরা আমাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করবে...না না... এটা বাদ,  চলবে না।

-   তাহলে মস্তিস্কে রক্ত ক্ষরণ?

-   বাপ রে, প্যারালাইসিসের সম্ভাবনা, কখনও বাক শক্তিও হারিয়ে যায়... না, এটাও চলবে না।

-   কিডনি ফেল?

-   উফ... না না... প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে, খুব কষ্ট... আর বললাম তো কোনও রোগে মারা চলবে না।

-   উফ, খুব বিপদে ফেললে তো ছোকরা, যাই বলি তাতেই না... প্রত্যেক মানুষকে তো মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতেই হয়, তোমাকেও সেটা ভোগ করতে হবে।

-   ভোগ করতে হবে বললেই হল? না না, ওসব চলবে না। অন্য লোকেরা তো আর মৃত্যুর আগে যমালয়ে আসার সুযোগ পায় না। আর কেউ কি মৃত্যুর দিন ক্ষণ, কারণ নিয়ে চিত্রগুপ্তের সাথে মুখোমুখি বসে আলোচনা করার সুযোগ পায়, যেটা আমি পাচ্ছি? আপনিই বলুন।

-   হ্যাঁ , সেটা অবশ্য তুমি ঠিক বলেছো।

-   যাক গে, এই মুহূর্তে আর কিছু মাথায় আসছে না। তবে যেগুলো বলে গেলাম সেগুলো মাথায় রাখবেন... ৮০-৮২-র আগে মারবেন না, কোনও রোগ হবে না, মৃত্যুতে কষ্ট হবে না... যেগুলো নিষেধ করে গেলাম, সেগুলোতে মারা চলবে না। শেষ রাতে ঘুমের মধ্যেই পট করে মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন, যাতে আমি কিছু টের না পাই।

-   আচ্ছা ঠিক আছে বাছা... তোমার ইচ্ছে মতই সব হবে, আমি সব নোট করে রাখলাম।

-   অনেক ধন্যবাদ প্রভু, মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। মৃত্যুটা কনফার্ম করে গেলাম, আর কোনও টেনশান নেই আমার। ঠিক আছে স্যার, আর মনে হয় আপনার সাথে দেখা হবে না। আর কয়েক দিনের মধ্যেই মর্ত্যে ফিরবো। মৃত্যুর পর যমালয়ে এলে আবার আপনার সাথে দেখা হবে। আজ তাহলে চলি, নমস্কার।

-   আচ্ছা বাছা, অনেক আশীর্বাদ করলাম। সাবধানে মর্ত্যে ফিরো... পরে আবার দেখা হবে।

-   ধন্যবাদ প্রভু।

যমালয়ের কাজ সেরে রজত বাড়ী ফিরে এলো।

(পরেরদিন রজত দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় গিয়ে হাজির)

-   নমস্কার প্রভু।

-   আরে রজত, এসো এসো সব কুশল তো?

-   হ্যাঁ প্রভু আপনাদের আশীর্বাদে সব কুশল।

-   এই তোমার কথাই ভাবছিলাম। তুমি পিকনিক না কি একটা করবে বলছিলে, সবাই খুব আগ্রহী। আগামী পরশু দিন স্থির করেছি, তোমার কোনও আপত্তি নেই তো?

-   এমা ছিঃ ছিঃ, আমার আবার আপত্তি হবে কেন, আপনারা দেবতা বলে কথা, আপনারা রাজী হয়েছেন এটাই বড় কথা। আচ্ছা বাবা মা আসছেন তো?

-   হ্যাঁ হ্যাঁ, ওঁরাও আসছেন, সবাই মিলে একটা দিন ভালোই উপভোগ করা যাবে, কি বলো? তুমি আজ থেকেই সব আয়জনের ব্যবস্থা করো।

-   হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আচ্ছা এই পিকনিকে কতজন দেবতা থাকছেন? মানে আমাকে সেই হিসেব করেই সব আয়োজন করতে হবে তো।

-   ওই ধরে নাও জনা ১০০ মত হবে।

-   ও তাহলে ঠিক আছে, কোনও সমস্যা হবে না। আমি ঠিক আয়োজন করে নেবো।

-   আর একটি বিশেষ কারণে ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এখানেই আছেন। একটা বিশেষ মিটিং আছে আমাদের। আসলে নরক নিয়ে আমরা একটু উদ্বিগ্ন আছি। স্বয়ং যমরাজও আমাদের সাথে ভিডিও কলে থাকবেন। কারণ ওঁকেই তো এই ব্যাপারগুলো দেখতে হয়।

-   কেন নরকে কিছু সমস্যা হয়েছে বুঝি?

-   হ্যাঁ, নরক ক্রমশ আমাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সারাদিন শুধু  গোলমাল। আগের শাস্তিতে আর কোনও কাজ হচ্ছে না- যেমন কান ধরে ওঠ বোস, নাক খত, কাঁকরের পথ দিয়ে খালি পায়ে দৌঁড়ানো, পিঠে চাবুক, কান মলা, গরম বালির ওপর শুইয়ে রাখা... সব ওদের গা সওয়া হয়ে গেছে, নতুন কিছু ভাবতে হবে।

-   হ্যাঁ নিশ্চয়ই, শাস্তি আরও কঠোর হতে হবে। শুনেছিলাম নরকে নাকি পাপী  মানুষদের গরম তেলের কড়াইতে ফেলা হয়...

-   না না, এসব রিউমার... আসলে আমরা তাদের সংশোধন করার চেষ্টা করি। এখন নরকে সারাদিন চিৎকার চেঁচামেচি, অবরোধ, মারদাঙ্গা লেগেই আছে... মাঝে মাঝে তো তারা সেখানকার রক্ষীদেরও মানছে না... তাই এদের ঠাণ্ডা করার জন্য স্পেশাল বাহিনী তৈরি হচ্ছে, তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছি আমরা। কোনও গোলযোগ দেখলেই সাথে সাথে গ্রেফতার করে গারদে ভরার নির্দেশ দেওয়া হবে। এছাড়া এখন আর হাত দিয়ে আমাদের রক্ষীরা  কান টানবে না, এদের বদমায়েশি এতটাই বেড়েছে আমরা কান টানার একটা অন্যরকম উপায় ভেবেছি...

-   কি রকম উপায় প্রভু?

-   খুব বেশী বদমায়েশি করলে তার কান ফুটো করে সেই ফুটোর মধ্যে দিয়ে একটু মোটা সুতো গলিয়ে দিয়ে সেই সুতো রক্ষীদের হাতে দিয়ে দেওয়া হবে। এ সুতো খুব শক্ত হয়, সহজে ছেড়ে না। তাই বদমায়েশি দেখলেই রক্ষীরা ওই সুতো ধরে টানবে, ওই সুতো ধরেই কান টানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  যত অনিয়ম, বদমায়েশি তত জোরে টান... এভাবে টানতে টানতে কান ছিঁড়েও যেতে পারে, এই ভয়ে আশা করি তারা এবার শান্ত হবে, নরকের  নিয়ম কানুন মেনে চলবে।

-   বাহ, কান টানার পদ্ধতিটা বেশ অভিনব তো, ভালোই ভেবে ভেবে বের করেছেন। আশা করি কিছুটা কাজ হবে।   

-   যাক গে এসব কথা থাক। আমি ওঁদের ডেকে পাঠাই, একটু তাহলে পিকনিকের আলোচনাটা সেরে নেওয়া যাবে।

-   হ্যাঁ তাই ভালো, তাহলে সবাই মিলে মেনুটা ঠিক করে ফেলা যাবে।

পিকনিক নিয়ে একটু আলোচনা করার জন্য রজত এবার ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে একটু আলোচনায় বসেছে। আলোচনার শুরুতেই রজত  সবাইকে প্রণাম করলো, সব দেবতারাও তাকে আশীর্বাদ করলেন… 

-   বলছি প্রভুরা যখন সবাই আছেন তাহলে একটু আলোচনাটা সেরে নেওয়া যাক। আমার খুব ইচ্ছে আপনাদের সকলকে নিয়ে একটা ছোটখাটো পিকনিক করে তারপর আমি মর্ত্যে ফিরবো।

-   হ্যাঁ হ্যাঁ, বৎস, এ তো উত্তম প্রস্তাব। স্বর্গে এর আগে এসব হয় নি কখনও, আর পিকনিকের আইডিয়াটাও খুব ভালো লেগেছে আমাদের।

-   বাহ, তাহলে তো খুব ভালো। আর মর্ত্যে যখন মানুষ আপনাদের পূজা করে, সেখানে ভোগ দেবার একটা চল আছে, আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন।

-   হ্যাঁ হ্যাঁ, অতি উত্তম খাদ্য, খুব ভক্তি সহকারে মহিলারা ওই ভোগ রান্না করেন।

-   হ্যাঁ, মেনুটা অনেকটা ওই রকমই হবে, তাহলে মেনুটা কি একবার শুনবেন আপনারা?

-   হ্যাঁ বলো বৎস, শুনি একবার।

-   পিকনিকটা সন্ধ্যের পরেই শুরু হবে… শুরুতে একটু কফি ও পনীর পকোরা থাকবে…

-   বাবা এমন নাম তো আগে শুনি কখনও!

-   হা হা, একবার খেলে বারবার খেতে ইচ্ছে করবে।

মহাদেব খুব খুশী হয়ে বললেন- ‘আরে বেটা, তোফা তোফা, তারপর আর কি কি থাকছে চটপট বল, আমি আর থাকতে পারছি না…

-   তারপর কফি টফি খেয়ে আমরা একটু মিউজিকাল চেয়ার খেলব।

ব্রহ্মা বললেন- ‘ ও পিকনিকে আবার খেলাও হবে? কিন্তু এই খেলাটা তো আমরা জানি না।’

-   আরে খুব সহজ খেলা, আমি শিখিয়ে দেবো। আর ওদিকে পরাশর রান্না করতে থাকবে।

শুনেই তো বাবা ভোলানাথকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে… খুশীতে বেশ কয়েকবার ডুগডুগিটা বাজালেন।

বিষ্ণু দেব জিজ্ঞাসা করলেন- ‘তা পিকনিকে কি কি রান্না হবে বৎস?’

 

-   হ্যাঁ, সেটাই এবার বলবো আপনাদের… মুগ ডালের খিচুড়ি, আলুভাজা, লম্বা লম্বা বেগুনী, কষা আলুর দম, পাঁপড় ভাজা, খেজুর আমসত্বের চাটনি, ম্যাঙ্গো রসগোল্লা, আর নরম পাকের সন্দেশ।

(প্রতিটি পদ শুনেই মহাদেব খুশীতে তাঁর ডুগডুগিটা একবার করে বাজাচ্ছিলেন)

পিকনিকের মেনু শুনে তো সব দেবতারাই আপ্লুত, সবাই রজতকে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন। 

দেবরাজ ইন্দ্র বললেন, ‘এসব মর্ত্য থেকে আনার জন্য তো টাকা পয়সা লাগবে।’

-   হ্যাঁ প্রভু।

-   ঠিক আছে চিন্তা করো না, আজ বাড়ী গিয়েই তোমার টেবিলের ওপর একটি থলি দেখতে পাবে, তার মধ্যেই টাকা থাকবে। তুমি এবার বাড়ী গিয়ে সব আয়োজন শুরু করে দাও, আর যা যা লাগবে মর্ত্য থেকে আনানোর ব্যবস্থা করো। আর মিউজিকাল চেয়ারের পর একটু ‘লুঙ্গি ডান্স’টা হবে তো রজত?

-   হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনার যখন ইচ্ছে নিশ্চয়ই হবে প্রভু।

ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর এই ‘লুঙ্গি ডান্স’ শুনে কিঞ্চিত বিস্মিত হলেন-

-   এই লুঙ্গি ডান্স-টা কি দেবরাজ?

-   আরে রজত মর্ত্যের একটা দারুণ নাচ শিখিয়েছে আমাদের, আমাদের অনেক ডান্সার এই নাচটা শিখে নিয়েছে, আমার সভায় তো মাঝে মাঝে এটা হয় এখন।

-   ও তাই নাকি, তাহলে তো দারুণ হবে, পিকনিকে নাচও হবে। তাহলে পরশু  পিকনিকেই আবার সবার সাথে দেখা হবে। এরকম পিকনিক মাঝে মাঝে হলে তো ভালোই হয়, সবাই এক সাথে মিলিত হতে পারি। 

-   হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আমরা সবাই পিকনিকের অপেক্ষায় রইলাম।

রজত মিটিং সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে গেলো। পরাশরের সাথে আলোচনা করে ফর্দ তৈরি হয়ে গেলো। সময় মত সব জিনিস মর্ত্য থেকে এসেও গেলো। অবশেষে পিকনিকের দিন পরাশর ও আরও দু তিন জনকে সাথে নিয়ে রজত সব মাল পত্তর সহ দুপুরের মধ্যে দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় গিয়ে হাজির হল। ততক্ষণে সব  দেবতারাও এসে হাজির। শুধু বাবা মা তখনও পৌঁছান নি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পরাশর রান্নার জোগাড় শুরু করে দিল। কাজকর্ম ঠিক ঠাক হচ্ছে কি না সেটা দেখার জন্য মাঝে মাঝে রজত গিয়ে একটু তদিরকি করে আসছিল। 

সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে, পনীর পোকোড়া ভাজাও শুরু হয়ে গেছে। সব দেবতারা একত্রিত হয়েছেন, বাবা মাও এসে পড়েছেন। চারিদিকে বেশ খুশী খুশী ভাব। বাবা ভোলানাথ সোজা পরাশরের কাছে গিয়ে হাজির-

-   বৎস, এগুলো কি?

-   প্রভু, এগুলো পনীর পকোড়া।

-   দেখি দু চারটে দাও তো, টেস্ট করে দেখি।

পনীর পকোড়া মুখে দিয়েই তো বাবা খুব খুশী, খাচ্ছে আর ডুগডুগি বাজাচ্ছে। ডুগডুগির শব্দে অন্য দেবতারাও পাশে এসে হাজির...

-   কি শিবু, এত খুশী কেন?

-   আরে পনীর পকোড়া একবার টেস্ট করে দেখুন, দারুণ স্বাদ। বৎস এঁদের ও দু চারটে করে পকোড়া দাও তো...

সবাই তো পকোড়া খেয়ে আপ্লুত, এদিকে রজতও এসে হাজির...

-   ও আপনারা সবাই এখানে! আমি তো চারিদিকে আপনাদের খুঁজছি। তা পনীর পকোড়া কেমন লাগছে?

-   আহা, কি অপূর্ব স্বাদ, আগে কখনও খাই নি। খেয়ে সত্যি মন ভরে গেলো।

এদিকে কফি ও রেডি হয়ে গেলো, সব দেবতারা খুব আয়েস করে কফি আর  পকোড়া খেলেন। এদিকে রান্নাবান্না চলছে জোর কদমে। রজত এবার  দেবতাদের নিয়ে মিউজিকাল চেয়ারে মেতেছে, সবাই খুব আনন্দ সহকারে খেলাটি খেলছে। কিন্তু বাবাকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রজত একটু আশপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলো। হঠাৎ দেখলো বাবা একটি নির্জন জায়গায় বসে একটু গাঁজা টানছেন...

-   ও বাবা, তুমি এখানে, সবাই তোমাকে খোঁজাখুঁজি করছে।

-   ওরে আমি একটু দম নিচ্ছি।

-   তুমি খেলবে না?

-   না না, ওরা তো খেলছে, আমিও আসছি একটু পর। কিন্তু খেলতে পারবো না। আসলে ওরকম গোল হয়ে ঘুরলে আমার মাথা ঘুরবে। তুই যা, আমি একটু পরেই যাচ্ছি। আর মা কে কিছু বলিস না যেন।

-   আরে না না, বলবো না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো কিন্তু।

-   হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই যা, আমি আসছি।

রজত ফিরে এলো। দেখলো দেবতারা তখনও আনন্দ সহকারে মিউজিকাল চেয়ার খেলে যাচ্ছে। কিন্তু মা কোথায় গেলো?

-   আপনারা মা কে দেখেছেন?

দেবরাজ ইন্দ্র বললেন- ‘হ্যাঁ, উনি রান্নার ওখানে গেছেন পরাশরকে একটু সাহায্য করার জন্য।’

-   ও আচ্ছা, সত্যি সব মায়েরাই এই এক রকম, সব দিকে নজর। আসলে সবাই তো মায়েরই সন্তান। আচ্ছা আমিও একটু দেখে আসি, রান্না কতদূর হল।

-   হ্যাঁ দেখে এসো বৎস।

রজত ওখানে গিয়ে দেখল মা খিচুড়ি রান্না করছেন, পরাশর পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

-   মা, তুমি খিচুড়ি রান্না করছো?

-   হ্যাঁ রে, আমার ইচ্ছে হল আজ খিচুড়িটা আমিই রেঁধে তোদের খাওয়াবো।

-   আহা, কি সৌভাগ্য আমার, তোমার হাতের খিচুড়ি আজ আমি খেতে পাবো, আমি ধন্য মা... কি দারুণ সুবাস বেরোচ্ছে , এমন খিচুড়ির সুবাস আগে  কখনও পাই নি।

-   যা, তোকে আর এখানে থাকতে হবে না, তোরা সবাই ওখানে আনন্দ কর,  আমি ততক্ষনে রান্নাটা সেরে ফেলি।

-   ঠিক আছে মা, ওদিকে মিউজিকাল চেয়ার খুব জমে উঠেছে, আমি একটু ওদিকে যাই।

ওদিকে তখনও মিউজিকাল চেয়ার চলছে, বাবাও এসে গেছেন আর ডুগডুগি বাজাচ্ছেন। অবশেষে মিউজিকাল চেয়ারে জয়ী হলেন ভগবান বিষ্ণু।

রজতকে দেখেই দেবরাজ ইন্দ্র খুব খুশী...

-   রজত, তুমি মর্ত্য থেকে এসে একদম মাতিয়ে দিয়েছো। আজকের দিনটা খুব উপভোগ করছি আমরা... এবার একটু ‘লুঙ্গি ডান্স’টা হয়ে যাক। আমার ডান্সাররাও রেডি। তুমি মিউজিকটা বাজিয়ে দাও...

‘লুঙ্গি ডান্স’ বেজে উঠলো, নাচ শুরু হল... নাচ দেখে সব দেবতারা একদম আপ্লুত... মহাদেবও খুব খুশী মনে হচ্ছে, মনের সুখে ডুগডুগি বাজাচ্ছেন... রজতও ডান্সারদের সাথে একটু পা মেলাতে লাগলো, মনে মনে গান টাও গুনগুন করতে লাগলো...

‘এই যে চা নিয়ে এসেছি, অনেক বেলা হল, এবার উঠতে হবে তো নাকি?’-  চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকেই রূপসা একটু অবাক হয়ে গেলো, দেখছে রজত ঘুমের ঘোরে ‘লুঙ্গি ডান্স’ গাইছে আর হাত পা নাড়ছে... 

একটু গায়ে হাত দিয়ে রজতকে ডাকলো- ‘কি গো ঘুমোতে ঘুমোতে গান গাইছো কেন? নাও চা টা খেয়ে নাও’

-   আরে না, একটু নেচে খিদে টা বাড়িয়ে নিচ্ছি, একটু পরেই মায়ের হাতের খিচুড়ি খাবো তো... আজ ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর সবাই এক সাথে খিচুড়ি খাবো, কি মজা।

রূপসা তো রজতের কথা এক বর্ণও কিছু বুঝতে পারছে না...

‘উফ, ঘুমের ঘোরে কি সব ভুল ভাল বকছো?’, বলেই রজত কে আর একবার ধাক্কা দিল। রজত ধরফরিয়ে উঠে পড়লো। চোখ মুছতে মুছতে রূপসাকে দেখেই চমকে উঠলো…

-   তুমি কে? ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর কোথায় গেলেন? গানটা কে বন্ধ করলো?

-   দেখো কাণ্ড, নিজের বউকে চিনতে পারছে না, কি সব বলছো, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

-   আমিও কি কিছু বুঝতে পারছি নাকি… ও হ্যাঁ, তুমি তো রূপসা, আমার মিষ্টি বৌ… তোমাকেও বুঝি ওঁরা ভুল করে তুলে এনেছে এখানে?

-   উফ, কি সব আজেবাজে বকছো বল তো? আমাকে আবার কে তুলে আনবে! একটু চোখে মুখে জল দাও তো… 

-   কিন্তু খিচুড়ি তো মনে হয় এতক্ষণে হয়ে গেছে… জানো আজ মা খিচুড়ি রেঁধেছে, কি ভাগ্য আমার আমি মায়ের হাতের খিচুড়ি খাবো।

-   উফ, মা তো তখন থেকে তোমায় ডাকতে বলছে… কত বেলা হয়ে গেলো বল তো, বাজার যেতে হবে তো…

-   হা হা… আমাকে আর এখন বাজার যেতে হয় না, যমরাজের লোকজন আছে, ওঁরা যখন মর্ত্যে আসে তখন বাজার করে নিয়ে আসে… আর তুমি যখন এসেই পড়েছো খুব ভালো হয়েছে… আজ মা দুর্গার হাতের খিচুড়ি খাওয়াবো তোমাকে… উফ, ক দিন স্বর্গে যে কি ভালো কাটছে তোমাকে বোঝাতে পারবো না… 

-   তুমি এখন স্বর্গে!!! এই সকালে এসব অলুক্ষুনে কথা বলতে আছে? ওঠো তো, মুখ হাতে জল দাও…

হাত ধরে টেনে রূপসা রজতকে বেসিনের সামনে নিয়ে এলো। রজত দু বার চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিল… আয়নায় নিজের মুখটা দেখেই চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেলো…

-   আরে, এ তো আমার বাড়ীর আয়না… তাহলে যমালয়, স্বর্গ, স্বপ্নিল আলয়, চিতু দাদু, পিকনিক…

এসব শুনে তো রূপসা খুব হাসতে লাগলো… ঘড়ি টা দেখো… সাড়ে নটা বাজে, এবার চা টা খেয়ে একটু বাজারে যাও।

-   ও তাহলে আমি মর্ত্যেই আছি, তাই না! তাহলে স্বর্গ থেকে কবে ফিরলাম? আমার তো সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে… এমনকি আমি কৈলাসে গিয়ে বাবা মায়ের সাথেও দেখা করে… তাহলে কি ওগুলো... !!!

-   নাও চা টা খেয়ে নাও…

-   ইস, এ তো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে… একটু গরম করে আনো না প্লিজ। আর মা কে একটু ডেকে দাও...

 

-   কি রে রজত… আজ যে উঠতে অনেক দেরী হয়ে গেলো বাবা, আজ তো আর ভালো মাছ পাবি না।

-   মা গো, কত দিন পর তোমায় দেখলাম, খুব ভালো লাগছে গো। আজ আর মাছ মাংস খাবো না, আজ একটু নিরামিষ খাবো।

-   আচ্ছা কি খাবি বল…

-   মুগ ডালের খিচুড়ি, আলুভাজা, লম্বা লম্বা বেগুনী, কষা আলুর দম, পাঁপড় ভাজা, খেজুর আমসত্বের চাটনি, ম্যাঙ্গো রসগোল্লা, আর নরম পাকের সন্দেশ।

-   বাবা, এত্ত কিছু, এ যে নেমন্তন্ন বাড়ী হয়ে যাবে রে... আমার ছেলের আজ এমন খাবার সখ হল কেন শুনি!

-   সে অনেক কথা মা, ভালো করে আজ এগুলো রান্না কর, জমিয়ে খাবো, তারপর অনেক গল্প আছে গো... একটা ট্যুরে গিয়েছিলাম, সেই ট্যুরের গল্প বলবো জমিয়ে... হা হা হা

-   সবই আছে, তুই শুধু খেজুর, আমসত্ব, ম্যাঙ্গো রসগোল্লা আর নরম পাকের সন্দেশটা নিয়ে আয়।

-   হ্যাঁ ঠিক আছে মা...

 

কই গো, চা হল? একটু বেরবো, একটা ব্যাগ দিও, দেখি আবার ম্যাঙ্গো রসগোল্লা পাই কি না...    

 

 

******* সমাপ্ত *******