Samokal Potrika

‘এস্তাদিও আজতেকা’ (Estadio Azteca) বা অ্যাজতেক স্টেডিয়াম, এই বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল স্টেডিয়ামটি মেক্সিকো সিটির সান্তা উরসুলা শহরতলিতে অবস্থিত। স্থানীয় লোকেদের কাছে এই স্টেডিয়ামটি ‘এল কলোসো দে সান্তা উরসুলা’ নামেও পরিচিত। স্টেডিয়ামটির উদ্বোধন হয় ১৯৬৬ সালের মে মাসে। মেক্সিকো সিটিতে অ্যাজতেক সভ্যতার হেরিটেজের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ স্বরূপ এই স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়েছে ‘Azteca’।   

এই স্টেডিয়ামটি দুটি ক্লাব- ক্রুজ আসুল ও ক্লাব আমেরিকার হোম স্টেডিয়াম ও মেক্সিকো জাতীয় ফুটবল দলের জাতীয় স্টেডিয়ামেরও স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম। সমস্ত রকম আধুনিক সুযোগ সুবিধা সহ এই স্টেডিয়ামের আসন সংখ্যা ৮৭,০০০ (তবে স্টেডিয়ামটি যখন উদ্বোধন হয় তখন আসন সংখ্যা ছিল ১,০৭,৪৯৪)। স্টেডিয়ামটি সমুদ্রতল থেকে ৭২০০ ফিট ওপরে অবস্থান করছে। এই স্টেডিয়ামের ডিজাইন তৈরি করেন দুজন আর্কিটেক্ট- পেদ্রো রামিরেজ ভাস্কেজ ও রাফায়েল মিহারেস আলসেররেকা।

২০১৫ সালে স্টেডিয়ামটি আবার নতুনভাবে সংস্কার করা হয়। ইলেকট্রনিক  বিজ্ঞাপনের বোর্ড লাগানো হয় ও উন্নত মানের আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয় (ফসফরাস প্যানেলের পরিবর্তে প্যানাসনিক LED প্যানেল লাগানো হয়।)   

বিশ্ববিখ্যাত এই স্টেডিয়ামটির জগতজোড়া খ্যাতির বেশ কয়েকটি কারণ আছে। এটিই বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম যেখানে দু বার বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়েছে। এখানেই ১৯৭০ ফিফা ফুটবল ফাইনালে পেলের ব্রাজিল ইতালিকে ৪-১ গোলে পরাজিত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো। তারপর আবার ১৯৮৬ ফিফা ফুটবল ফাইনালে ‘ফুটবলের রাজপুত্র’ মারাদোনার আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো। এই স্টেডিয়ামেই ফুটবলের দুই মহা নক্ষত্র- পেলে ও  দিয়েগো মারাদোনা জীবনে প্রথমবার যথাক্রমে ‘জুলে রিমে’ কাপ ও বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ হাতে তুলে নেন।

শুধু তাই নয়, এই স্টেডিয়ামেই হয়েছিলো ১৯৮৬-র সেই বিখ্যাত কোয়ার্টার ফাইনাল- আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। এই ম্যাচেই করেছিলেন দুটি বিশ্ববিখ্যাত গোল করেছিলেন দিয়েগো মারাদোনা - প্রথমটি ‘ La mano de Dios (Hand of God) গোল’, আর দ্বিতীয়টি ‘El gol del siglo(শতাব্দীর সেরা গোল)’।   

এখানেই শেষ নয়। এই স্টেডিয়ামেই হয়েছিলো ১৯৭০ এর সেমি ফাইনাল ম্যাচ। সেই ম্যাচে এক্সট্রা টাইমে ইতালি পশ্চিম জার্মানিকে ৪-৩ গোলে পরাজিত  করেছিলো। এই ম্যাচটিকেই ‘El partido del siglo (শতাব্দীর সেরা ম্যাচ)’  হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।  এই স্বপ্নের ম্যাচ দুটি মনে হয় বিশ্বের ফুটবল প্রেমীরা কখনও ভুলতে পারবেন না।   

মেক্সিকোর এই বিখ্যাত স্টেডিয়ামেই আবার বিশ্বকাপের আসর বসবে ২০২৬ সালে।    ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশ হল- মেক্সিকো, কানাডা ও ইউনাইটেড স্টেটস।

এই স্টেডিয়ামে ফুটবল ছাড়াও বিভিন্ন মিউজিকাল কনসার্টও হয়েছে অতীতে। এখানে মাইকেল জ্যাকসন, লুইস মিগেল, এলটন জনের মত বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীরাও বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে গেছেন। এখানে রাজনৈতিক অধিবেশনও হয়েছে। এমনকি  এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হয়েছে। এই স্টেডিয়ামে স্বয়ং পোপ দ্বিতীয় পলও ১৯৯৯ সালে এসেছেন।   

এই বিশ্ববিখ্যাত স্টেডিয়ামটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মেক্সিকোতে কোনও পর্যটক বেড়াতে গেলে এই স্টেডিয়ামটি সকলেই একবার দর্শন করতে চান। এই স্টেডিয়ামটি সম্পর্কে অনেক রহস্যময় গল্পও প্রচলিত আছে।  

এই স্টেডিয়ামটি তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৬২ সালে। এটি তৈরি করতে প্রায় ৪ বছর লেগে যায়। স্টেডিয়ামটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২৯ মে, ১৯৬৬।

শোনা যায় তাঁরা তাঁদের বিশ্বাস ও প্রাচীন প্রথা মেনেই এই স্টেডিয়ামটি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে এই স্টেডিয়ামটিকে মজবুত ভাবে বানাতে হলে বা ভুমিকম্পের প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে হলে, স্টেডিয়ামের দেওয়ালে রক্তের দাগ থাকা চাই। তাহলেই স্টেডিয়ামটি দীর্ঘদিন অক্ষত থাকবে। এই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করার সময় প্রচুর শ্রমিক নিখোঁজ হয়ে যায় এবং অসংখ্য শ্রমিক মারা যায়। এই  স্টেডিয়ামটি নির্মাণের সময় সেখানে বিভিন্ন গর্তের মধ্যে প্রচুর শ্রমিক পড়ে যায় এবং সেই অবস্থাতেই সেই গর্তগুলো সিমেন্ট ও কংক্রিট দিয়ে বুজিয়ে দেওয়া হয়।

এই স্টেডিয়াম তৈরির সময় বেশ কিছু শ্রমিককে কোনও বিশেষ কাজ পর্যবেক্ষণ বা কোনও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসার জন্য কোনও বিশেষ জায়গায় পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু খুব রহস্যজনকভাবে তারা নিখোঁজ হয়ে যায়, তাদের আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায় নি। শোনা যায়, তারপর থেকেই রাত্রিবেলা এই স্টেডিয়াম থেকে চিৎকার ও কান্নার শব্দ ভেসে আসে, মনে হয় কেউ যেন সাহায্য চাইছে। শুধু তাই নয়, গভীর রাতে কখনও কখনও মনে হয় যেন একদল সমর্থক চিৎকার করে গান গেয়ে তাদের দলকে উৎসাহিত করছে, অথচ সেখানে কিন্তু কোনও ম্যাচ তখন হচ্ছে না।   

শুধু তাই নয়, এই স্টেডিয়ামে রাত্রিবেলা একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়। রাত্রিবেলা যে রক্ষীরা এখানে পাহারায় থাকেন তাদের কাছ থেকে জানা যায় যে রাত্রিবেলা একটি ছোট্ট ছেলে মাঝে মাঝে তাদের কাছে আসে, সে তার বাবা মা-কে খুঁজতে থাকে বা কখনও কোনও সাহায্য চায়। শোনা যায়, কোনও একটি খেলার সময়ে এখানেই কোনও সুড়ঙ্গ পথে জনতার ভিড়ের চাপে একটি শিশু মারা গিয়েছিলো। হয়তো রাত্রিবেলা তার আত্মা এই স্টেডিয়ামের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাদের কাছ থেকে আরও জানা যায় হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই  মাঝে মাঝে সেখানে কেমন যেন একটা দম বন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি হয়।   

আরও শোনা যায় যে এই স্টেডিয়ামটি যেখানে তৈরি হয়েছে, আগে সেখানেই নাকি ছিল অ্যাজতেকদের কবর স্থান। তাই সেখানে স্টেডিয়ামটি তৈরি করতে অনেকেই নিষেধ করেছিলেন এবং সাবধানও করেছিলেন। কিন্তু সেই নির্মাণকারী সংস্থা তাদের কথা শোনে নি। তাই অনেকে মনে করেন যে হয়তো এই কারণেই এই স্টেডিয়ামটি নির্মাণের সময় বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিলো এবং প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছিলেন, যাদের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায় নি।

এরকম বেশ কিছু রহস্যময় গল্প আজও স্থানীয় লোকেদের মুখে শোনা যায়। তবে যাই হোক এই ‘অ্যাজতেক স্টেডিয়াম’ পৃথিবীর সেরা ফুটবল স্টেডিয়ামগুলির মধ্যে একটি এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।