Samokal Potrika

আমরা পল্লী গ্রামের মানুষ । আমাদের গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষের'ই পেশা কৃষি । আমাদের সংসারও কৃষি পেশার উপর নির্বরশীল ছিল । 
জ্যৈষ্ঠ  মাস প্রায় শেষের দিকে । রবি শশী থেকে শুরু করে গম,ধান,  সব ফসল'ই ঘরে উঠে এসেছে । এখন শুধু একটি ফসল আসতে বাকি ছিল । সেটি হল তেল জাতীয় দানা তিল । তিল ও বাড়িতে এসেছিল । এবং লওয়া (সংরক্ষণ) করাও প্রায় শেষের পথে । শুধু তিলের গাছ গুলি শুকাতে বাকি ছিল । এই তিলের গাছ গুলি গ্রামের মানুষ জ্বালানি হিসেবে ব্যাবহৃত করে থাকে ।
আব্বা সেই তিলের গাছ  গুলিও শুকিয়ে খুব নিপুণ ভাবে মাচার মধ্যে সংরক্ষণ করে দিয়ে গেল । 
এখন থেকে আমরা সহ কৃষি পেশায় নির্বরশীল মানুষ গুলি বেকার ! গ্রামে এখন আর কোন কাজ নেই বললেই চলে । আবার  বছর শেষে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে আমন ধান কাটায় কৃষক ব্যস্ত হয়ে পরবে । আবার নব উদ্দমে কাজ শুরু হবে ধান কাটা দিয়ে । এখন সবাই অলস সময় কাটাবে ।

বলছি এমনই এক জ্যৈষ্ঠ  মাসের কথা  অর্থাৎ ২০১২ সালের ৩০ শে জুনের কথা । সে দিন ছিল বুধবার । মঙ্গলবার রাত থেকেই আব্বা অসুস্থ । অসুস্থ বলতে তেমন অসুস্থ নয় । হাল্কা জ্বর ও বমি হত । এটা আব্বার তেমন কোন জটিল সমস্যা ছিল না । আব্বার মাঝে মাঝে এমন হত । খাবার স্যালাইন ও বমির ট্যাবলেট খেলেই তা দু-এক দিনের মধ্যেই সেরে যেত । কিন্তু ৩০ তারিখের জ্বরটা যে আব্বার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে । তা আমরা কিছুই অনুমান করতে পারিনি । ঐ দিনও আব্বার জ্বর এসেছে । রাত থেকে বমি শুরু হয়েছে । আমি দোকান থেকে পানি শূণ্যতার স্যালাইন ও বমির ট্যাবলেট এনে দিয়েছি । মাঝে মাঝে আব্বার কাছে গিয়েছিলাম কোন কিছু লাগবে কিনা ? লাগলে এনে দেব কিংবা এনে দিতাম । আব্বা কিছুই লাগবে না বলে দিল । শুধু আতব চাউলের জাউ খেতে বলল । আতব চাইলের জাউ এর সাথে দুধ আর চিনি মিশিয়ে শিরনির মতো করে খাওয়া আব্বার দীর্ঘ দিনের অভ্যস ছিল । এবং জ্বর অথবা কোন অসুখ হলেই আব্বা তা খেতে চাইত । আজও আব্বা জাউ খেতে চেয়েছে । আম্মা জাউ রান্না করে দিল  আব্বা খুব আগ্রহ করে জাউ খেল । কিন্তু পেটে রাখতে পারল না । কেননা একটু পর পর তা বমি করে ফেলে দিতো । এভাবেই রাত্র কেটে গিয়ে সকাল হল । কিন্তু আব্বার এই অসুস্থতা একটুও কমেনি  ।  অপরিবর্তিত আছে । আব্বা অনেকটা নিঃস্ব ও দুর্বল হয়ে পরেছে । আব্বা বিছানায় শুয়ে আছে । পিঠের সাথে পেট লেগে আছে । আব্বার এমন অবনতি দেখে আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়া হল । কিন্তু আব্বা কিছুতেই হাসপাতালে যাবে না । তখনো আমরা জানতাম না আব্বার মনে কি আছে ? কি ভেবে আব্বা বলছে যে, হাসপাতালে যাবে না ? আব্বা কি মনে মনে এই ভাবছিল যে, পূর্বের মতো এমনি এমনি সব ঠিক হয়ে যাবে । নাকি আব্বা জেনে গেছে যে, তার পরকালে যাবার সময় এসে গেছে ? সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে চলল, এখন আব্বা হাসপাতাল যেতে রাজি হল । কিন্তু আব্বাকে কে হাসপাতালে নিয়ে যাবে ? 
বড় আপা আমাদের বাড়িতেই ছিল । বড় আপা আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে । আমাদের হোমনা উপজেলা সাস্থ্য কমপেক্সে নয় । কারন ওখানের  চিকিৎসার মান ততটা ভাল নয় । তাপর ওখানে আস্তে আস্তে ধীর গতিতে চিকিৎসা  চলে । এই মুহুর্তে আব্বার যা অবস্থা আব্বার প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা । তাই বড় আপা আব্বাকে নিয়ে গৌরিপুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেল  । 
হাসপাতালে যাবার আগে আব্বা তার পকেট থেকে ২০০ টাকা বের করে আমাকে দিল একটা লুঙ্গি কেনার জন্য ।  ঐ  দিন অর্থাৎ ৩১ শে মে ছিল রোজ বুধবার । আর প্রতি বুধবার'ই বাতাকান্দি বাজারে বসে সাপ্তাহিক জমজমাট হাট বাজার ।  আমাদের গ্রামের মানুষ সহ আশে পাশের দু-চার গ্রাম এমন কি দুই-তিন থানার মানুষ গুলিও এই বাজারে আসে এবং তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার সওদা করে নিয়ে যায় । ঐ বুধবার আমি কেন জানি বাজারে গেলাম না আর আমার লুঙ্গিও কেনা হল না । আর আব্বার দেয়া সেই দুই শত টাকাও আমার কাছে ছিল । 

গত কয়েক বছর ধরেই আব্বা বাজারে যাবার সময় আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেত । এবং আমাকে বাজার করা শিখাতেন । আমিও খুব আগ্রহের সাথেই আব্বার সাথে বাজারে যেতাম এবং আব্বার কাছ থেকে বাজার করা শিখেছি । আমার  আরো বড় দুই ভাই থাকতে আব্বা কেন আমাকে বাজার করা শিখালেন অথবা কেন আমায় বাজারে নিয়ে যেতেন । কে জানে সেই কথা ? হয়তো তারা ভাল বাজার করতে জানে না । বাজার করার মতো দক্ষতা তাদের মাঝে নেই !  সবাই বাজার করতে জানে না । বাজার করার মধ্যেও এক প্রকার দক্ষতার প্রয়োজন হয় । আর সে দক্ষতা হয়তো আব্বা আমার কাছে খুঁজে পেয়েছিলেন । 
গত এক বছর আব্বা বাজারে যেত না । বাজারের সমস্ত টাকা দিয়ে  আমাকে বাজারে পাঠাত । এবং আমি আমাদের সংসারের সমস্ত বাজার সওদা করে আনতাম । কিন্তু ছোট বেলা থেকেই যে লোকটা বাজার করত এমনকি বাজারে বাজারে থাকত ।

সেই লোকটা হটাৎ করে বাজারে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে কেন ? সেটা আজো জানা হল না । হয়তো আব্বা আমাদের পাঁচ ভাই বোনের জন্য বাজার করতে করতে এখন ক্লান্ত হয়ে পরেছিলেন । তাই হয়তো আব্বা একটু বিশ্রাম  নিচ্ছিলেন ।

আপা আব্বাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছে । আজ সাপ্তাহিক বাজার হওয়ার কারনে রাস্তায় একটু জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে । জ্যামের মধ্য থেকে আব্বা যেন মুহুর্তেই অন্যরকম হয়ে গেল । আপা দোকান থেকে পানির বোতল কিনে আব্বার মাথায় পানি দিল । এভাবে যানজট উপেক্ষা করে গৌরিপুর মুক্তি হসপিটালে নিয়ে গেলেন । 
ডাক্তার সাহেব  হসপিটালে'ই আছে । রুগী দেখছেন । রোগীর লম্বা সিরিয়াল ! এই লম্বা সিরিয়ালের শেষে আব্বাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয় । তবে ইমার্জেন্সি রোগীরের জন্য একটা বিশেষ সুবিধা আছে ।  ডাক্তারের ফ্রী'র সাথে অতিরিক্ত ২০০ টাকা দিলেই সিরিয়াল সবার  আগে চলে আসবে !  
আপা তাই করলেন ডাক্তারের ভিজিট ৩০০ টাকা ও অতিরিক্ত ২০০ টাকা মোট ৫০০ টাকা কাউন্টারে জমা দিয়ে আব্বাকে ডাক্তারের রুমে নিয়ে গেল । 
আপা ডাক্তারের কাছে সব কিছু খুঁলে বলল, ডাক্তার আব্বার দিকে তাকিয়ে আছে । কিছুই বলে না । এর'ই মাঝে আব্বাও ডাক্তারের সাথে কথা বলল, এবং ডাক্তারকে বলল- ডাক্তার আমি কি দই খেতে পারব ? একটা দই খেলে মনে হয় আমার পেটের সমস্ত জ্বালা গুলি দূর হয়ে যাবে । 
ডাক্তার বলল- হ্যাঁ । আপনি অবশ্যই দই খেতে পারবেন । আপনার যা খুসি, যা ইচ্ছা আপনি তাই খেতে পারবেন । 
ডাক্তারের এই সমস্ত কথার অর্থ কি ? তার মানে কি আমার আব্বা আর বেশী দিন বাঁচবে না ? এই জন্যেই ডাক্তার বলে দিয়েছে , আপনার যা ইচ্ছে আপনি তাই খেতে পারবেন । 
আপা বলল- কি হল ডাক্তার কিছু বলছেন না যে ? আব্বার কি হয়েছে ? 
ডাক্তার কিছু না বলে প্রেস্কিপসনের মধ্যে কি যেন লিখে বলল, এখানে আপনার বাবার কোন চিকিৎসা  নেই । আমি ঠিকানা লিখে দিয়েছি আপনার কোন  গার্ডিয়ান থাকলে তাদের ফোন দিয়ে আসতে বলুন । এবং এখানে অ্যাম্বুলেন্স আছে । আপনারা দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে আপনার বাবাকে ঢাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান । এখানে আপনার বাবার কোন  চিকিৎসা নেই । 
ডাক্তারের কথা শুনে আপা হতভম্ব! কি বলবে না বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না ।  ডাক্তার এসব কি বলছে ? কি শোনবো বলে এখানে এসেছি আর কি শুনছি । আপা নিজেকে সামলিয়ে বলল, কেন আমার আব্বার কি হয়েছে ?
হৃদরোগ ! এই বলে ডাক্তার সাহেব অন্য রুগী দেখতে শুরু করল । 
আপা এই মুহুর্তে কি করবে ? আর কি বা করার আছে ? আপা কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে বাড়িতে ফোন  দিল । ছোট আপা ফোন রিসিভ করতেই বড় আপা বলল, তাড়াতাড়ি আম্মাকে বল মামাকে নিয়ে আর কিছু টাকা পয়সা নিয়ে গৌরিপুর  আসতে । আব্বার অবস্থা ভাল না । ডাক্তার বলেছে তাড়াতাড়ি আব্বাকে ঢাকা নিয়ে যেতে ।
ছোট আপাও বড় আপার এসব কথা শুনে হতভম্ব ! কেন আব্বার কি হয়েছে ?
ওপাশ থেকে উত্তর দিল কি হয়েছে না হয়েছে তা কিছুই জানি না । তবে ডাক্তার শুধু এতটুকুই বলেছে তোমার আব্বর হৃদরোগ হয়েছে। এখানে তোমার আব্বার কোন চিকিৎসা নেই । এটা বলেই বড় আপা ফোনটা রেখে দিল । 
ছোট আপা এখান থেকে বার বার ফোন ব্যাক করছে । কিন্তু বড় আপা ফোন তুলছে না । শুধু একবার ফোনটা রিসিভ করে বলল, এত কথা বলতে পারব না   তাড়াতাড়ি আম্মা আর মামাকে বল টাকা নিয়ে আসতে ।

বড় আপার মুখে এসব কথা শুনে বাড়িতে হৈ চৈ ও কান্না কাটি শুরু হয়ে গেল । সবার মাঝেই একটা আতঙ্ক তৈরী হয়ে গেল । হৃদরোগ কি ? হৃদরোগের সাথে আমরা, তেমন পরিচিত নই । আচ্ছা  এই রোগ হলে মানুষ বাঁচে তো ? আমাদের গ্রামের কারো কখনো এই রোগ হয়নি । আচ্ছা আমার আব্বা বাঁচবে তো ? এই নিয়ে আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন অনেক শংসয় অনেক কৌতুহল ! ছোট আপা আর আম্মা  কাঁদতে লাগল ।
আমাদের  গ্রামেই মামার বাড়ি । আব্বার  কথা শুনে মামা ছুটে এলেন । আম্মা কাঁদছেন আর ব্যাগ গুছাচ্ছে । ব্যাগের ভিতর পাতলা কাথা (চাদর) আব্বার জন্য সার্ট লুঙ্গি নিয়ে তৈরী হয়ে গেল । অভাবের সংসার ঘরে তেমন টাকা পয়সা নেই । কিছু টাকা ধার করে মামা বড় ভাই ও আম্মা ছুটছে গৌরিপুর মুক্তি হাসপাতালের দিকে ।

এদিক দিয়ে আব্বাকে হসপিটালের বেডে শুইয়ে  বড় আপা আব্বার জন্য দই কিনতে হসপিটালের বাহিড়ে গেল । এবং যাবার আগে হসপিটালের নার্সকে বারবার করে বলে গেল । নার্স আপনি আমার আব্বাকে একটু দেখবেন । এই বলে এক দৌড়ে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে কনফেকশনারীর দোকানে গিয়ে দই চাইল । কনফেকশনারী দোকানের লোক বলল, দই নেই শেষ হয়ে গেছে । 
আপা অন্য দোকানে গেল । সেখান থেকে দই কিনে আব্বার কাছে এসে বলল,আব্বা দই নিয়ে এসেছি  । আব্বা চোখ মেলে চাইল । আপা দই এর গ্লাস থেকে চামচ দিয়ে একটু একটু দই আব্বার মুখে দিল ।  আব্বা আস্তে আস্তে সমস্ত দইয়ের গ্লাসটাই  খেল । আপা ব্যস্ত হয়ে  একটু পর পর আব্বাকে জিজ্ঞেস করে আব্বা আর কি খাবেন ? 
প্রতিবার উত্তরে'ই আব্বা বলল না । আর কিছুই খাব না ।

এর'ই মাঝে বাড়ি থেকে সবাই হাসপাতালে এসেছে ।  এ্যাম্বুলেন্স এসেছে এক্ষুণি আব্বাকে এ্যাম্বুলেন্সে তোলা হবে । কিন্তু আম্মা কিছুতেই আব্বাকে এ্যাম্বুলেন্সের ভিতর তুলতে দেবে না । 
আম্মার মনে অনেক সংশয় ! এ্যাম্বুলেন্সে ভিতর কোন রোগীকে তোলা হলে নাকি সেই রোগী আর বেশী দিন বাঁচে না ! তাই আম্মা আব্বাকে এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে দেবে না ।  এটা ছিল আম্মার একটা ভুল ধারনা । পরে সবাই বুঝানোর পর আম্মা মেনে নিলেন । এবং মনে অনেক ভয় ও সংশয় নিয়ে আব্বার সাথে এ্যাম্বুলেন্সে উঠছে । 
বড় আপা ও মামাও যাবে আব্বার সাথে । এ্যাম্বুলেন্স ছুটছে ঢাকার উদ্দেশ্যে । বড় ভাই গৌরিপুর থেকে ভরা ক্লান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে ।

বড় ভাই ছোট আপা আমি আর বড় আপার ছেলে আমরা এই চার জন বাড়িতে আছি । 
বড় আপার ছেলে ( ভাগিনা) প্রচুর দুষ্টমি ও পাগলামি করছে । এক সময় তার এসব দুষ্টমি ও পাগলামী ভাল লাগত । কিন্তু এখন এসব কিছুই ভাল লাগছে না । কোন কাজ কর্মেও মন বসছে না । মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘোরপাক করছে । আব্বাকে নিয়ে এখন হসপিটাল পৌছে গিয়েছে তো ? হসপিটালে ভর্তি হয়েছে তো ? ডাক্তার দেখিয়েছে ?  ডাক্তার কি বলেছে ? আব্বা ভাল হবে তো ? এখন আব্বা কেমন আছে ?
এসব দুশ্চিন্তা মাথায় চেপে বসেছে । কিছুই ভাল লাগছে না । শুধু কাঁন্না পাচ্ছে চোখ দিয়ে শুধু অশ্রু ঝরছে । আমরা তিন ভাই বোন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় বসে আছি । শুধু এই ফোনের জন্য । যে ফোনের উপর প্রান্ত থেকে আপা অথবা মামা বলবে , আব্বা ভাল আছে । হসপিটালে ভর্তি হয়েছে । চিকিৎসাও চলছে । ডাক্তার বলেছে আব্বা খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে ।
কিন্তু তা আর হল না । সব কিছু যেন এলো মেলো হয়ে গেল । অবশ্য তখনো কিছুই এলো মেলো হয় নি ! সব এলো এলো আর সর্বনাশ তো হয়েছিল তার ঠিক তিন দিন পরে ।

আমাদের আগ্রহের সেই ফোনটি বেজে উঠল । 
ছোট আপা ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মামা বলল, চিন্তা করো না । আমরা ঠিক মত'ই হসপিটালে এসেছি । তোমার আব্বাকে ভর্তিও করা হয়েছে এখন চিকিৎসা চলছে । 
আপা বলল, ডাক্তার কি বলেছে ? 
ডাক্তার কিছুই বলেনি । শুধু একটা ইসিজি করেছে । তোমার আব্বার প্রেসার একেবারে কমে গেছে । এখন শুধু প্রেসার বাড়ার চিকিৎসা চলছে । 
আব্বা এখন কেমন আছে ?
আগের মতো'ই । বলে মামা ফোন রেখে দিল । 
আমি মাগরিব নামাজ পড়তে গেলাম । নামাজের মধ্যে'ই চোখ দিয়ে ঝর ঝরিয়ে পানি পরতে লাগল । আমি সেই পানি কিছুতেই আটকাতে পারলাম না । নামাজ শেষ করে আল্লাহর দরবারে  প্রার্থনা করলাম । মহান আল্লাহ যেন আমার আব্বাকে তাড়াতাড়ি  সুস্থ করে দেয় । এভাবে বুধবারের রাত্রি চলে গেল । বৃহস্পতিবার সকালে মোঝো খালা আমাদের বাড়িতে এসেছে ।  আমি বাজার করার জন্য বাতাকান্দি বাজারে গেলাম । ওখানে গিয়ে দেখি হযরত খানজাহান আলী (রাঃ) এর মাজার জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে একটি বাস যাচ্ছে । আমি মনে মনে আব্বার সুস্থতার জন্য ঐ দরবারে মান্নত করে ফেললাম । আব্বা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এলে আল্লাহর অলি হযরত খানজাহান  আলী (রাঃ) দরবারে আল্লারওয়াস্তে কিছু দিয়ে আসব ।
আমি বাড়ি ফিরে এসে জানতে পারলাম । আব্বার অবস্থা সেই আগের মতো ই একটুও উন্নতি হয়নি । আমাদের মাঝে কাঁন্নার রোল পড়ে গেল । কে দেবে কাকে সান্ত্বনা ? ছোট আপা মাঝে মাঝে বড় বড় গলা করে কাঁদে । আমাদের গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে ( বিলাপ করা ) আর আমি ছেলে হয়েছি বলে ঐ ভাবে কাঁদতে পারি না । আমি কাঁদেছি গোপনে আর নিরবে নিরবে ।

মেঝো ভাই ঢাকা থাকে । রাতে তাকে জানানো হয়েছে । সকালে মেঝো ভাই হাসপাতালে এসেছে । 
আব্বা এখন আর স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে পারছে না । গলার স্বর মোটা হয়ে নাকের সাথে বেজে যায় । আব্বা এখন আর বেশী কথা বলে না । কেউ কোন প্রশ্ন করলে শুধু তার উত্তরটাই দেয় । এছাড়া আর কোন কথা বলে না । 
আপা  একটু পর পর আব্বাকে জিজ্ঞেস করে  আব্বা আপনার শরীলটা এখন কেমন লাগছে ?
আব্বা বলল, ভাল ।
আপা আবার বলে আব্বা কিছু খাবেন ?
আব্বা জবাব দেয়, না । শুধু একবার বলেছে তরমুজ খেতে ।
আপা মেঝো ভাইকে বলেছে তরমুজ নিয়ে আসতে । মেঝো ভাই একটা তরমুজ নিয়ে এসেছে । ছুরি দিয়ে সেই তরমুজ কেটে আব্বার মুখে দিল । কিন্তু আব্বা আর সেই তরমুজ খেল না । হয়তো তরমুজ খাওয়ার মতো শক্তি আব্বার আর এখন নেই । অনেক আগেই বিধাতা সেই শক্তি কেরে নিয়েছে ।
আব্বা কষ্ট করে একটু তরমুজ খেল । বাকি তরমুজটা পরে আছে টেবিলের উপরে ।

আমাদের মেঝো খালুও ঢাকা থাকে । আব্বা হাসপাতালে আছে খবর শুনে টিফিন ভর্তি ভাত রান্না করে নিয়ে এসেছে । কিন্তু ভাত কেউ খেলো না । এই অবস্থায় কারো গলা গিয়ে ভাত নামবে না । এভাবে সকাল পেরিয়ে দুপুর । তারপর দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল । কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি'ই হচ্ছে না । সময় মত ডাক্তার এসে আব্বাকে দেখছে । স্যালাইন চলছে কিন্তু প্রেসার আর বাড়ছে না ।

এদিক দিয়ে আমরা মাগরিব নামাজের শেষে মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে আব্বার জন্য দোয়ার ব্যবস্থা করা হল । আমাদের উদ্দ্যেশ্য ছিল এই দোয়ার বরকতে যেন আব্বা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায় ।  কিন্তু তা আর হল না । মানুষের হায়াত ফুরিয়ে গেলে কোন দোয়াতেও কাজ হবে না । তাইতো লালন ফকির তার গানে বলে গেলেন,
তুমি দিন থাকিতে দিনের কাজ কেন করলে না
"সময় গেলে সাধন হবে না"
হয়তো এটাই ঠিক সময় গেলে সাধন হবে না । হয়তো আব্বার সময়  ফুরিয়ে গেছে । নয়তো গত তিন-চার দিন আগেও আব্বার হাই প্রেসার ছিল । আর আজ প্রেসার একেবারে লো হয়ে গেল । হয়তো এটাই ছিল আব্বার মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত । আমার মন কিছুতেই মানছে  না । মন ছটফট করতে শুরু করল । ইচ্ছে করছে এক্ষুনি আব্বার কাছে ছুটে যাই ।
বাড়িতে এসে বললাম আমি হাসপাতাল যাব আব্বাকে দেখতে ।
খালা বলল, তুই কি হাসপাতাল চিনিস যাবি যে ?
আমি বললাম, চিনি না তো কি হয়েছে । চিনে নেব  তারপরেও আমি যাব ।
খালা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে যাস । আগামিকাল তর বড় ভাইয়ের সঙ্গে যাস । আমি সকালের অপেক্ষায় রইলাম । আজকের রাত যেন কিছুতেই ফুরাচ্ছে না । একসময় শুক্রবারের রাত্রি পেরিয়ে শনিবার সকাল হল । আমি আর বড় ভাই দুই জন মিলে ঢাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দ্যেশে রওনা হলাম ।

আজ সকাল থেকেই আব্বা শুধু একটি কথাই বলছে , আমাকে বাড়ি নিয়ে যা । আমি বাড়িতে যাব । আপা বলল, হ্যাঁ । আব্বা আমরা বাড়ি চলে যাব তো । আপনি আগে ভাল হয়ে যান । তারপর আমরা বাড়ি চলে যাব । এসব বলে আপা আব্বাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে । তাতেও আব্বা মানছে না । শুধু একটি কথাই বলছে আমাকে বাড়ি নিয়ে যা ।
বড় দুলাভাই বিদেশ থেকে ফোন দিয়ে আব্বার সাথে কথা বলতে চাইল । আপা লাউড স্পিকার অন করে আব্বার কানের কাছে ধরল । দুলাভাই কি বলছে সে দিকে আব্বার কোন মনোযোগ নেই । আব্বা শুধু দুলাভাইকে একটি কথাই বলেছে সেই কথাটি হল , বাজান আমার দুইটা মেয়ে তিনটা ছেলে আর তোমার শাশুড়িকে তোমার হাতে তুলে দিয়ে গেলাম । তুমি তাদের দেখে রেখ । তাদের দুনিয়াতে কেউ নেই । তুমি তাদের দেখে রেখ । তাদেরকে আমি তোমার হাতে তুলে দিয়ে গেলাম"। এইটুকু বলে আব্বা চুপ হয়ে গেল । আম্মা বলল, ও গো তুমি এসব কি বলছ ? তুমি মরে গেলে আমার কি হবে ? তোমার এই ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে আমি কোথায় যাব । তাদের কে দেখবে ?
আব্বা বলল, তুই কোন চিন্তা করিস না । আমার ছেলে মেয়েদের আল্লাহ তায়ালা'ই দেখব । এই টুকু বলে আব্বা আবারো চুপ হয়ে গেল ।
বড় আপা বলল, আব্বা আপনি এসব কি কন ?
আপার সাথেও আব্বা একটি উত্তর দিল , তরা চিন্তা করিস না । তদের আল্লাহ'ই দেখব । তরা পাঁচ ভাই বোন এক সাথে মিলে মিশে থাকিস । আর তর মাকে তরা সবাই দেখে রাখিস  বলে আব্বা আবারো চুপ হয়ে গেল ।

বড় ভাই এবং আমি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আঙ্গিনায় এসে পৌছালাম  । মামা আমাদের জাতীয় হৃদরোগ ইনষ্টিটিউটের  ভিতরে নিয়ে যেতে এসেছে । ওখানেই আব্বা ভর্তি আছে । কিন্তু আমরা ওখানে যেতে পাররছি না । দারোয়ান আমাদের ভিতরে যেতে দিচ্ছে  না । মামা এত করে দারোয়ানকে বুঝিয়ে বলল তাতেও কেন কাজ হল না ।  এই হাসপাতালের নাকি একটা নিয়ম আছে যে, প্রতিটা রোগীর সাথে একজন করে রোগীর  অভিভাবক যেতে পারবে । এটা আবার কেমন নিয়ম ? একজন মৃত্যুপথযাত্রী যখন কোন হাসপাতালে ভর্তি থাকে তখন তার পরিচিত কাছের দূরের নিকটস্ত আত্মীয় স্বজনেরা আসবে দেখতে এটাই তো স্বাভাবিক । আর এখানে এসেও যদি  রোগীকে এক নজর না দেখতে পারে । রোগীর সাথে কথা না বলতে পারে । তাহলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে ? কে করেছে এসব আইন নিয়ম কানুন ? এই নিময়টা আমার কাছে মোটাও ভাল লাগেনি । অথচ মামা দারোয়ানকে পঞ্চাশ টাকা ঘুষ দিতেই দারোয়ান আমাদের ভিতরে ডুকতে দিল  । আমি বিস্মিত হলাম ! শুনেছি ঢাকা শহরটা নাকি ঘুষের উপর চলে ! আমি এই কথা বিশ্বাস করতাম না । কিন্তু আজ এখানে এসে তা বিশ্বাস হল ।

আমরা হাসপালের ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখি আব্বা হাসপালের বেডে আধমরা অবস্থায় শুয়ে আছে । আমি আব্বার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম । আব্বা বলল, কাঁদিস না । কোন চিন্তা করিস না । তদের ধন সম্পত আল্লাহই দিবে । বড় ভাইকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল' তরা তিন ভাই মিলে মিশে এক সাথে থাকিস । আর তদের মা'কে দেখে রাখিস বলে আব্বা আবারো চুপ হয়ে গেল । আমরা কেঁদেই যাচ্ছি । আব্বার হাতে স্যালাইন লাগানো । স্যালাইন এক ফোটা এক ফোটা করে শরীলের ভিতর যাচ্ছে  তবুও কোন উন্নতি হচ্ছে না ।  ডাক্তার এসে আব্বাকে দেখে গেল । অবস্থা আগের মতোই একটুও উন্নতি হল না । হাসপাতাল জুরে ভয়ে চলছে নিরবতা । এই নিরবতা ভঙ্গ করে কোন কোন রোগী মৃত্যুর জন্য আর্তনাদ করছে । কেউবা আবার আধ মরা হয়ে পরে আছে হাসপাতালের বেডে ।

কেউবা আবার মারাও যাচ্ছে । এই তো মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যেই চোখের সামনে জলজ্যান্ত  দুটি মানুষ মারা গেল । কি ভয়াবহ ও করুন দৃশ্য ! চোখের সামনেই প্রিয় মানুষ গুলি মারা যাচ্ছে আর আত্মীয় স্বজনেরা তা নিরবে দাঁড়িয়ে দেখছে । সত্যিই মৃত্যু অনেক ভয়াবহ ও রহস্যময় ! মানুষ বলে অমুকের অকাল মৃত্যু হয়েছে । আসলে মৃত্যুর কোন কাল অকাল নেই । মৃত্যু সবার জন্য অনিবার্য । কার যে কখন এসে যায় তা কেউ বলতে পারবে না । আর মানুষের জীবন সে তো মোমের আলোর মতো করে জ্বলতে থাকে । হটাৎ একদিন সেই আলো নিবে যায় ।

আমাদের দূর সম্পর্কের এক খালু ঢাকা থাকে । সে এসেছে আব্বাকে দেখতে । আব্বার এই অবস্থা দেখে আম্মাকে বলল , আপা দুলাভাইয়ের অবস্থা বেশী একটা ভাল না । আল্লাহ না করুক, যদি কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে এখান থেকে বেড়িয়ে বাড়ি যেতে অনেক কষ্ট হবে । দুলাভাইকে এখান থেকে বাড়ি নিয়ে হোমনা সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রাখেন । যত দিন হায়াত আছে ততদিন ওখানেই থাকবে । এখানে দুলাভাইয়ের আর কোন চিকিৎসা নেই । 
আমি বললাম, এসব কি বলছেন খালু ? আমরা আব্বাকে এর চেয়ে আরো বড় হাসপাতালে নিয়ে যাব । প্রয়োজনে আমাদের বাড়ি বিক্রি করে ফেলব তবুও আমরা আমাদের আব্বাকে চিকিৎসা করাব । 
খালু বলল, দেখ বাবা , মানুষের হায়াত না থাকলে কি টাকা পয়সা দিয়ে আর চিকিৎসা করিয়ে'ই কি হায়াত বাড়ানো যায় ? 
আমি খালুর প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলাম না । শুধু নিরবে কেঁদে গেলাম । তার মানে কি আমার আব্বা সত্যি সত্যিই মারা যাবে ?

আব্বাকে বাড়ি নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল । 
কিন্তু এখনো যাওয়া হচ্ছে না । তার কারন আমাদের গ্রামের একজন বড় ডাক্তার এই হাসপাতালেই চাকরী করেন । সে এসে আব্বাকে দেখে যা ডিসিশন দেয় আমরা তাই করব । গতকাল তার সাথে কথাও হয়েছে সে বলেছে আজ সকাল ১০টায় এসে আব্বাকে দেখে যাবে । অথচ এখন দুপুর ১২ টা বাজে তবুও তার আসার কোন খবর নেই । আমরা আমাদের গ্রামের সেই ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বেলা ২টা বেজে গেল । কিন্তু সেই ডাক্তারের আশার কোন নাম'ই নেই । মামা তাকে ফোন দিয়েছিল ।  সেই ডাক্তার বলল, আমি তো এখন একটা মিটিং এ একটু ব্যস্ত আছি । আপনারা আরেকটু অপেক্ষা করুন । আমি মিটিংটা শেষ করে আসছি । কিন্তু একটু পরেও সে আর এলো না । আমরা সেই ডাক্তারের জন্য বিকেল ৩টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আব্বার সিট কেটে রিলিজ করে এ্যাম্বুলেন্সে করে আমরা সবাই মামা, খালু, আম্মা, আপা, আর আমরা তিন ভাই বাড়িতে আসছি । 
এই প্রথম এ্যাম্বুলেন্সে উঠলাম । ঢাকা শহরের যানজট পেরিয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম মহা সড়ক ধরে আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটছে আমাদের এ্যাম্বুলেন্স । 
রোগীর গাড়ি অথবা এ্যাম্বুলেন্সে এক জাতীয় হর্ণ থাকে । যার আওয়াজ শোনা মাত্রই অন্যান্য  বাস গাড়ি গুলি এই গাড়িকে সাইড দিয়ে দেয় । আমাদের এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইবার অবশ্য সেই হর্ণ না বাজিয়ে বন্ধ করেই গাড়ি চালাচ্ছে । তবুও বড় বড় বাস গাড়ি গুলি আমাদের গাড়িকে সাইড দিয়ে দিচ্ছে । এবং বাসের হেল্পার ও যাত্রী গুলি উকি মেরে আগ্রহের সাথে দেখছে এ্যাম্বুলেন্সের ভিতর কি আছে এবং কে যাচ্ছে । ছোট বেলা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে কোন এ্যাম্বুলেন্স গেলে  আমরাও খুব আগ্রহ নিয়ে উকি মেরে দেখতাম এ্যাম্বুলেন্স দিয়ে কে বা কারা যেত ।

আমাদের এ্যাম্বুলেন্স বাতাকান্দি বাজারে এসে থামল । মামা এ্যাম্বুলেন্স থেকে নামল আব্বার কিছু ঔষদ ও মেডিসিন কেনার জন্য । আমরা মামার জন্য অপেক্ষা না করে মামাকে ছাড়াই বাড়ি চলে যাচ্ছি । মামা পরে রিক্সা অথবা সি এন জি করে বাড়ি চলে আসবে ।
আব্বা কি যেন বলছে, আপা আব্বার মুখের কাছে কান লাগিয়ে শুনতে পায় , আব্বা বলছে আমরা কই আছি ? আমাকে এখনো বাড়ি নিয়ে যাস নাই ?
আপা বলল, হ্যাঁ আব্বা । আমরা বাড়ি চলে যাচ্ছি তো । আমরা এখন বাতাকান্দি আছি । আর একটু পরেই আমরা বাড়ি চলে যাব । 
আমাদের এ্যাম্বুলেন্স গ্রামের রাস্তায় আসতেই মানুষ জমে গেল । পাড়ার মানুষ গুলি বলা-বলি করতে লাগল , অমুককে ঢাকা থেকে বাড়ি নিয়ে এসেছে চল দেখে আসি । এক সময় এ্যাম্বুলেন্স আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় এসে থামল ।
এ্যাম্বুলেন্সের চালক খালু ও আরো কয়েক জন মিলে আব্বাকে এ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে আমাদের ঘরের ভিতর নিয়ে আসল । পাড়ার সবাই বলা বলি করতে লাগল আব্বাকে মাটিতে (ঘরের মেজেতে) বিছানা করে শুইয়ে দিতে । 
আমি বললাম, মাটিতে কেন ? খাটের উপর শুইয়ে দেন । কিন্তু আমার কথা কেউ শুনল না । সবাই কি যেন বলে আব্বাকে মাটিতে শুইয়ে দিল । আব্বা ঘরে আসতেই ছোট আপা আব্বাকে জড়িয়ে ধরে হাও মাউ করে কাঁদতে লাগল । এবং বলতে লাগল, আমার আব্বার কি হল ? আমার আব্বা কথা বলছে না কেন ? 
মসজিদ থেকে আসর নামাজ এর আযানের ধ্বণি শোনা যাচ্ছে ।

এই কয়েক  মিনিটের মধ্যেই পাশের বাড়ির ভাবি খালা চাচিরা বলতে শুরু করল এই মুখে পানি দে তাড়াতাড়ি পানি দে । সবাই আব্বার মুখে পানি দিতে শুরু করল । আমি শুনেছি মানুষের মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে নাকি তাদের মুখে পানি দেয়া হয় । 
তার মানে কি আমার আব্বা  এক্ষুণি  মৃত্যুবরণ করবেন ? আমার কাছে সব কিছুই অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে । কোন কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না । সব কিছুই  যেন একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে । 
আব্বার পাশে বসে থাকা মানুষ গুলি কেউ কালিমায় শাহাদাৎ পাঠ করছে । কেউবা আবার আল্লাহকে ডাকছে । হটাৎ আপা বিকট শব্দে কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়েছে । আমি আব্বার কাছে আসতেই দেখি আব্বার হাত পা গুলি নাড়াচাড়া বন্ধ হয়ে গেল ।
এতক্ষণে বোধ হয় আব্বার প্রাণ পাখিটা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল । ক্লান্ত নিথর দেহটা পরে আছে ঘরের মেজেতে । 
সবাই সবার মত করে হাউ মাউ করে কাঁদছে । বাড়িতে যেন কান্নার রোল পড়ে গেল ।  পিতা  হারানোর শোকে সবাই বেহুঁশ হয়ে পরে আছে । এক জন এখানে আরেক জন ওখানে । কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না । সবাই যেন সবার  ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ।  কেও অথবা কারা যেন আমাদের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে । ইতিমধ্যে সবাই এসে পড়েছে । ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলি আব্বার পাশে বসে পবিত্র কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করছে ।
ইতিমধ্যে কবরও খোড়া শেষ হয়ে গেছে । 
গরম পানি আর বড়াই পাতা দিয়ে আব্বাকে শেষ গোসল করানো হল । তারপর গোলাপ জল ও আতর ছিটিয়ে  আব্বাকে কাফনের সাদা কাপর পড়ানো হল । মাগরিব নামাজের পড় আব্বার জানাজার নামজ পড়া হল ।  মুদ্দার খাটে করে আব্বাকে নিয়ে যাচ্ছে গোরস্থানের দিকে ।

আবার শেষ ইচ্ছে ছিল আব্বাকে যেন তার বাবার পাশে । অর্থাৎ আমার দাদার পাশে'ই মাটি দেয়া হয় । 
আব্বার শেষ ইচ্ছে অথবা অসিয়ত অনুযায়ী আমাদের এক টুকরো জমির মধ্যে আব্বার জন্য কবর খোড়া হল । যেখানে শায়িত আছেন আমার দাদাজান । 
আব্বা জন্মের আগের তার বাবাকে হারিয়েছে । জন্মের পর ৫৫ বছরের এই দীর্ঘ জীবনে বাবা বলে কাউকেই ডাকতে পারেনি । আব্বার আপন কোন ভাই অথবা কোন বোনও ছিলনা । আমার দাদার আর কোন সন্তান ছিল না । আব্বা শুধু একাই ছিলেন । আব্বার আপন বলতে আমরা পাঁচ ভাই বোন ও আমার আম্মা ই ছিল । আমরা জন্মের পর থেকেই আব্বার সব দুঃখ কষ্ট দেখেছি । কিন্তু আব্বা তার সেই সব দুঃখ কষ্ট গুলি কারো কাছে বলতে পারেনি । পারেনি দুঃখ গুলি কারো কাছে বলে একটা  দীর্ঘ শ্বাস ফেলতে । তাই হয়তো আব্বা বরাবর'ই আমাদের বলতেন, আমি মারা গেলে আমাকে আমার জমিতেই আমার আব্বার পাশে কবর দিবি । 
হয়তো আব্বার মনে এই রকম ধারনা ছিল যে , জন্মের পর যেই জন্মদাতা পিতাকে দুই চোখে দেখে নাই । মৃত্যুর পর হয়তো তাকে মন ভরে দেখবে ! 
আকাশে অমাবস্যার কুটকুটে অন্ধকার । সেই কুটকুটে অন্ধকারে টর্চ লাইট জালিয়ে নিশ্ঠুরের মতো আমরা সবাই আব্বাকে সারে তিন হাত মাটির নিচে অন্ধকার কবরের মাঝে শুইয়ে দিয়েছি । তারপর আস্তে আস্তে আব্বার কবরের উপর  মাটি দিয়ে দাফনের কাজ সমাপ্ত করে আব্বার জন্য দোয়া করা হল । 
মৃত্যু কত'ই না নিশ্ঠুর ! ছেলের কাছ থেকে তার বাবাকে কেড়ে নেয় । যে বাবা এত আপন ও এত কাছে ছিল । বটও বৃক্ষের মতো সারাক্ষণ আমাদের ছায়া দিয়ে বুকের মধ্যে আগলিয়ে রাখত । সেই বাবাকে আমরা আজ অন্ধকার কবরে ফেলে চলে আসছি । আব্বাকে নিয়ে কত স্মৃতি, কত স্বপ্ন, কত আবেগ, কত ভালবাসা'ই না ছিল । সেই সব স্বপ্ন, আর সেই সব আবেগ গুলি আজ চোখের জলের সাথে ঝরে পড়ছে । মন কিছুতেই মানতে চাইছে না । তবুও বাস্তবকে মেনে নিতে হল ।  সবাই বাড়ি চলে যেতে লাগল । 
আমরা মাত্র কয়েকজন এখনো আব্বার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি । 
হে পিতা ঘুমিয়ে থাক তুমি পরম শান্তিতে
তোমার আপন পিতার পাশে
মাঝে মাঝে আমাদেরকেও দেখা দিও স্বপ্নে !

মামা আব্বার কবরে এক প্যাকেট আগরবাতি ও একটি প্রদিপ জ্বালিয়ে দিল । 
আকাশে চাঁদ বিহিন অন্ধকার এই ধরণীর বুকে হয়তো এই প্রদিপ আব্বার কবরের উপরটা কিছুক্ষণের জন্য আলোকিত করে রাখবে । আর কবরের ভিতরটা মহান আল্লাহ তায়ালা যেন তার পবিত্র নূর দিয়ে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত আলোকিত করে রাখেন