Samokal Potrika

হাতের আধপোড়া বিড়িটা  বারান্দার ধারিতে ঘষে নিভিয়ে সুকু বিজ্ঞের মতো বলে , ' কাজটা তুই ভালো করিস নি হ্যাবলা । বউ হলো ঘরের লক্ষ্মী । ' হ্যাবলা অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে থাকে । 

        আজ নেশাটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল । বউটা ভাত দিতে পারে নি । কিন্তু সে তো এমন করে না । রাতুল খুড়োর ঘরে বাসন মেজে এসে আঁচ ধরায় । হ্যাবলা যখন একগলা গিলে দুপুরের রোদ গায়ে মেখে টলতে টলতে এসে বড় পিঁড়িটার উপর বসে , অমনি বউ একটা সানকিতে কয়টা গরম ভাত একটু আলু চখা আর কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা বেড়ে দেয় । আজ তপ্ত পেটে ভাত না পেয়ে হ্যাবলার মাথাটা বিগড়ে যায় । ঘরে ফিরে হাঁক দেয় , ' কই গো আজ ভাত দিচ্ছিস নে ! ' ঘরের ভেতর হতে জবাব আসে , ' দিন দিন তুই গিলে আসবি , কাজ কম্ম নেই,  আমি লারব । ' হ্যাবলার পিত্তি জ্বলে যায় । দরজার গায়ে নামানো বুক হুড়কোটা নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখে বউ একটা কাঁথা ঢাকা নিয়ে শুয়ে আছে । কাঁথাটা এক হ্যাঁচকায় টেনে সরিয়ে হুড়কো কাঠটা তুলে বসিয়ে দেয় বউয়ের পিঠে , বউ দ্বিতীয় ঘা খাওয়ার আগেই উঠে দরজা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ; যেতে যেতে চিৎকার করে বলতে থাকে , ' আমি কি মানুষ নই । এবারে সুখে খা ! আমি চললাম । ' হ্যাবলা চুপ করে বসে পড়ে মেঝেয় । বিকেল গড়িয়ে যায় , নেশাটা আর নেই শুধু মাথাটা একটু ভার ভার লাগছে । হ্যাবলার মনে হয় , বউ তো কখনো অসময়ে কাঁথা ঢাকা নিয়ে শুয়ে থাকে না , তাহলে কি .......।  একবার ভাবে খোঁজ নেবে শ্বশুর ঘরে , কিন্তু অপরাধ বোধ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় । শেষমেশ না পেরে একটা পরামর্শের জন্য হাজির হয় সুকুর ঘরে ।

        সুকুর খান কয়েক উপদেশ গিলে ঘরে ফেরে হ্যাবলা । বারান্দায় বসে তাকিয়ে থাকে আকাশের পানে । শুক্লা অষ্টমীর আধখানা চাঁদ মেখের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় মত্ত থাকে । হ্যাবলার বুকের ভেতর একটা যন্ত্রণা থেমে থেমে চিনচিন করে ওঠে । 

 

সকাল থেকেই মেঘটা ব্যাজার মুখ করে বসে রয়েছে । গত রাত্রে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে । সুকুর বউ কয়েকটা ভেজা কাঠ নিয়ে উনুন জ্বালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে । ভেজা কাঠ থেকে ধোঁয়া উঠছে । সুকু বড় বড় লাল চোখ নিয়ে ফিরে বারান্দায় ধপ করে বসে । বউ জিজ্ঞেস করে , ' কোথায় গিয়েছিলে । ' সুকু কোনো জবাব দেয় না । বউ কাছে এসে বলে , ' কি হলো শুনতে পাচ্ছো না নাকি ? ' সুকু আগের মতোই চুপ করে বসে থাকে । বউয়ের সন্দেহ হয় , সে সুকুর মুখের কাছে নিজের নাকটা নিয়ে যায় । ' এমা তুমি নেশা করে এসেছো ! ঘরে দুটো শুকনো কাঠ নেই আর উনি নেশা ভাঙ করে ঘুরছেন । ' বলেই নাকটা শিটকে নেয় সুকুর বউ । দীর্ঘক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান সহ্য করে সুকুর মাথাটা তেতে ওঠে সে বউয়ের গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয় । বউ গালে হাত বোলাতে বোলাতে কান্নার স্বরে বলে , ' সেদিন তো খুব বলছিলে হ্যাবলাকে । '  সুকু উল্টে বলে , ' বলেছি বলে কি তোর ঘ্যান ঘ্যানানি সহ্য করে থাকতে হবে আমাকে । ' বউ কি বুঝল হন হন করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল । সুকু রাগে চিৎকার করে বলল , ' যা যা আর ফিরে আসিস না । ' 

       দুপুর অনেকটাই গড়িয়ে গেছে । বউয়ের কোনো খোঁজ নেই । সুকুর উপোসী পেটটা বড্ড বেশি জ্বালাচ্ছে । ঘরে রাখা মুড়ির টিনগুলো ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে দেখে সবকটা খালি । সুকু মনে মনে গাল দেয় খ্যাঁদিকে । ও যদি সুকুর কাছে টাকা না চাইত তাহলে আজ সুকুকে নেশা করতে হতো না । বউ থাকতেও সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল কেন  ?  তার কোনো উত্তর খুঁজে পায় না সুকু । আজ সেই সম্পর্কে টাকার চাহিদা মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে , যা সুকুর সাধ্যাতীত । টাকা না পেলে তার বউকে সব বলে দেবে বলে হুমকি দিয়েছে খ্যাঁদি । সেই দুশ্চিন্তা থেকেই সুকু সকাল সকাল গলা ভর্তি করে ফিরেছে । নিজের কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনা এসে ভীড় করে সুকুর মস্তিষ্কের শিরা উপশিরায় । বারবার মনে পড়ে -যাবার সময় বলে যাওয়া বউয়ের কথাগুলো , ' সেদিন তো খুব বলছিলে হ্যাবলাকে । ' 

       অপরকে উপদেশ দেওয়া কথা যে কখন শুধুমাত্র মৌখিক হয়ে যায় অন্তরের রয় না তা সুকু বুঝে উঠতে পারে না । একবার মনে হয় ছুটে যায় হ্যাবলার কাছে , তাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে বলে , ' হ্যাবলা সেদিনের উপদেশগুলো আজ আমার জীবনে মৌখিক হয়ে গেছে । ' কিছুতেই পা সরেনা সুকুর । সে বারান্দায় বসে পড়ে , একটা বিড়ি ধরায় । না ! বিড়ি টানতেও ভালো লাগে না , আধপোড়া বিড়িটা বারান্দার ধারিতে ঘষে নিভিয়ে ফেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সামনের বট গাছটার দিকে । সুকু দেখে গাছের ডালে একজোড়া ব্যঙ্গমা আর ব্যঙ্গমী ডানা ঝাপটে চলেছে ।