Samokal Potrika

তখন রাইটার্সে দ্বিতীয় দফায় ঢুকেছি। ১৯৬৮--৭০ সাল।আপার ডিভিশন এ্যাসিস্টেন্ট, বেতন ৪৫১ টাকা ৩৫ পয়সা ( বোধহয়)। আট টাকা ৩৫ পয়সা মেডিক্যাল এ্যালাউন্স ধরে।
মাস পয়লা ফিনান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে মাইনে আনতে হত।একটা সরকারি খামে আমার নাম, পদমর্যাদা ও ডিপার্টমেন্ট এবং ক'টি দশটাকা, ক'টি পাঁচ টাকা, ক'টি দু টাকা এবং ক' টি এক টাকার নোট ও খুচরো পয়সা লেখা থাকত।ওপরে আলপিন গাঁথা।
যে অবস্থায় পেতাম বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে তুলে দিতাম।
আমার পাওনা ছিল একটা রেলের মান্থলি বা কোয়ার্টারলি টিকিট ও প্রতিদিন হাতখরচ একটাকা কুড়ি পয়সা হাতখরচ।হাওড়া থেকে ডালহৌসি বাসভাড়া/ ট্রাম ভাড়া দশ পয়সা । যাতায়াতে কুড়ি পয়সা।
তবে ফেরার সময় ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন টাইপিস্টের সঙ্গে হাওড়া হেঁটে ফিরতাম। ওরা তারকেশ্বর লাইনের ট্রেন ধরতেন।
ঘড়ি ধরে বাইশ মিনিট লাগত আমাদের।

সে সময় আমার আগের অফিসের এক দাদা ( অমিয় চক্রবর্তী) একটি টিউশনি দেন। তিনি আগে পড়াতেন। ল'য়ের ফাইনাল এবং জুডিশিয়াল সার্ভিসেস পরীক্ষার প্রস্তুতি সামলে তিনি আর সময় দিতে পারছিলেন না।
গেলাম তার সঙ্গে, বাড়ির আপত্তি সত্বেও। উত্তর কোলকাতার একটি বনেদি পরিবার। ছেলেটি ক্লাস সিক্সে পড়ে। বাবুজি তার ডাকনাম। বাবুজির বাবা পশ্চিম বঙ্গ সরকারের এক উচ্চপদস্থ অফিসার। মার শখ নানান ধরণের সুখাদ্য বানানো।
আমি হলাম তার টেস্টার।
ভালোই চলছিল। বাবুজির জেঠতুতো এক হোলি চাইল্ডে পড়া দিদি ও বোন মাঝে মাঝে আসত। সম্ভবত আমার বিদ্যাবুদ্ধির দৌড় পরীক্ষা করতে। মাস কয়েক পরে তাদের মা সপ্তাহে বাকি তিনদিন তাদের পড়ানোর আর্জি নিয়ে এলেন।
এতোদিন পাচ্ছিলাম পঞ্চাশ টাকা। আমার বইপত্র কেনা ও সিনেমা দেখার পক্ষে যথেষ্ট। "আর টাকা দরকার নেই" না বলে বললাম -- সময় নেই যে ।
তারা ক্ষুব্ধ হলেন কিন্তু প্রকাশ করলেন না। ভদ্রলোক তো।
‎যাই হোক ওই পরিবারের একটা শাখা বোম্বাইয়ে থাকত। তারা এলেন কোনো কাজে কোলকাতায়।
‎বলতে ভুলেছি ওদের পারিবারিক বড় ব্যবসা এবং একটি ছোটো কারখানা ছিল । বোধহয় সে সম্পর্কিত কোনো কাজ।
‎এই বোম্বাইশাখার একটি সদ্য তরুণী মেয়ে ছিল। ছোটোবেলার পর আর সে কোলকাতা আসেনি । বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজে পলিটিকাল সায়েন্সের প্রথম বর্ষ চলছে তার। নাম ধরা যাক মহিমা।
‎সে এসে একদিন অনুরোধ করল কোলকাতা ঘুরিয়ে দেখানোর। বিপদে পড়লাম, কোলকাতার আমিই বা কতটুকু জানি। তবু রাজি হয়ে গেলাম। একটা রবিবার ও একটা ছুটির দিন গেল। সঙ্গে গোটা পনেরো টাকাও।
‎গাড়িভাড়া ও রেস্টুরেন্টে সামান্য কিছু খাওয়ার খরচ তো তাকে দিতে দেওয়া যায় না!
‎তারপর বললাম, এর চেয়ে গ্রাম আমার বেশি ভালো লাগে।
‎মহিমা লুফে নিল কথাটা, বেশ তো চলো না, একদিন গ্রাম দেখতে নিয়ে চলো।
"‎তুমি" হয়ে গেছি দেখে বুক তিনহাত হয়ে গেল এবং পরমুহূর্তেই মনে পড়ল এবার একটা সিএল গেল। বছরে মাত্র বারোটা -- দুটি জানুয়ারিতেই গেলে বাকি বছর যাবে কি করে!
‎তারপর স্বার্থপর বলে নিজেকেই তেড়ে গালাগাল দিলাম মনে মনে।
‎ ‎মঙ্গলবার দিন পছন্দ হল।
মহিমা সকাল এগারোটায় পনেরো নম্বর বাসের উল্টোডাঙা স্টপেজে এসে দাঁড়াল। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ । আমি ঝাড়া হাত পা । বাসে উঠে সোজা হাওড়া স্টেশন।
মহিমাকে যেন কথায় পেয়েছে। কত কথাই যে বলছে। ওর এতোদিনের চরিত্রের একেবারে বিপরীত।
টিকিট কাটলাম বর্ধমানের। একটা বর্ধমান ( মেন) দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা উঠতেই ছেড়ে দিল। জানালার ধারে সিটও পেয়ে গেলাম।
দু দিকের দৃশ্য, শহর, বস্তি দেখে মহিমা উল্লসিত।বলল,জানো, আমি দু চার বার ট্রেনে লোকাল জার্নি করেছি বোম্বাইয়ে তবে কখনো জানালার ধারে বসার জায়গা পাইনি ।
মুড়ি মশলা থেকে শুরু করে শশা লেবু লজেন্স এমন কি "ভেরিয়াস" নামে তখনকার একটা বাড়িতে তৈরি চানাচুর কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
শ্রীরামপুর, শেওড়াফুলি --- তারকেশ্বর যাওয়ার লাইন, চন্দননগর, চুঁচড়ো, ব্যাণ্ডেল, আদিসপ্তগ্রাম, মগরা ----ত্রিপুণ্যির ঘাট, পান্ডুয়ার দূর থেকে দেখা মিনার --- তার সঙ্গে আমার ধারাভাষ্য মহিমাকে একেবারে চমৎকৃত করেছে।
শ্রীরামপুর --- মাহেশের রথ -- রাধারাণী নামক দশবর্ষের বালিকা ওর মন- প্রাণ -হরণ করে নিয়েছে।

ইতিমধ্যে আমি আমার লেখা দুচারটে স্বরচিত কবিতা শুনিয়েছি। উপন্যাসের খসড়া বলেছি। বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থেকেছে মহিমা।
বলেছে, ইস্ আমি যদি এখানে থাকতাম! ওখানে বাংলা পড়ানো হয় না জানো।আমি বানান করে করে গল্প পড়ি।
ধুক করে সব আশা নিভে গিয়ে কেমন ভিজে দিয়াশলাই হয়ে গেলাম।
ত্যালান্ডুতে প্রচুর স্ত্রীপুরুষবাচ্চা উঠল।একেবারে গ্রামের সবাই। এ ওকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতু ভিতু চোখে এদিক ওদিক দেখছে।
জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওরা পরের স্টেশন বৈঁচি গ্রামে নামবে। কি একটা মেলা হচ্ছে। দেখতে যাচ্ছে।
মহিমা খুব খুশি।
‎----- আমি কখনো গ্রামের মেলা দেখিনি। দেখব।
‎বললাম, চলো। আমরাও নামি তাহলে।
গোঁতাগুঁতি করে নেমে পড়লাম বৈঁচিগ্রাম। ওদের পিছু পিছু জি টি রোড পেরিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হাতনে নামের একটা গ্রাম আছে সামনে। তারপরই মেলা।
হাতনে খুব সম্পন্ন গ্রাম, বনেদি ধনী ও শিক্ষিত লোকের বাস। একটা হাইস্কুল। প্রচুর পাকাবাড়ি। দুয়েকটা চায়ের দোকান।
গ্রামের লোকজন বেশি দেখা গেল না। এই দুপুরে কারাই বা থাকবে।
মেলা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে বসেছে। কোন এক স্থানীয় দেবতার পুজো উপলক্ষে মেলা।কি নেই মেলায়।
নাগরদোলা, ঝান্ডিমুণ্ডি, চাকাগলানো, বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানো থেকে হরেক কিসিমের খাবার জিনিষপত্র , কাঠ ও চিনেমাটির আসবাব এবং দু টো জামাকাপড় ধুতিগামছা বিক্রির দোকান।
মহিমা মুড়ি আলুরচপ খেয়ে ঝালে উসইস করতে করতে টেনে নিয়ে গেল কাচের চুড়িওয়ালির কাছে। তার পাশে পেতলের আংটি, তামার তাবিজ ও মাদুলির পসরা সাজিয়ে একজন। কানখুস্কি কিনল একজন।
মহিমা বার বার চুড়িওয়ালির দিকে দেখছে, তাই বললাম, পরবে নাকি বেলোয়ারি কাচের চুড়ি।
সঙ্গে সঙ্গে রাজি।
হ্যাঁ, আমার খুব শখ।
দুহাতে দু ডজন রঙিন কাচের চুড়ি পরে কাউকে অত আনন্দ পেতে দেখিনি।

কথায় কথায় রোমান হলিডে থেকে উত্তম- সুচিত্রার চাওয়া পাওয়া, দেবানন্দ- ওয়াহিদার ষোলবা সাল এবং উত্তম - অঞ্জনা ভৌমিকের নায়িকা সংবাদ সব এসে গেল।
বাংলা ছবিগুলো মহিমা এই ক'দিনে কোলকাতায় দেখেছে।
যাহোক মেলা থেকে সন্ধ্যার আগে বেরিয়ে পড়লাম। তারপর ফিরে আসা। মহিমা অনেক চুপচাপ।
সত্যি বলতে কি যাওয়ার সময়কার মহিমা আর ফিরেআসার মহিমা যেন আলাদা।
মাঝে মাঝে চুড়ি সাজানো হাতদুটো দেখছে আর বাইরের দিকে চোখ মেলছে।

পনেরো নম্বর বাসে উঠে মহিমা চুড়িগুলো খুলে ফেলল।
বললাম, খুলছ যে!
------ এখানে এখন চুড়ি পরে বাড়ি ঢুকলে অনেক কথা হবে। বোম্বাই নিয়ে যাবো। ওখানে পরবো।

আমি জানি বাবুজিদের বাড়িতে একধরণের সেকেলে রক্ষণশীলতা রয়েছে। কখনই ওরা খোলামেলা নয়। বহুদিনের যত্ন-পালিত সংস্কার ওরা বয়ে বেরাচ্ছে। বনেদিয়ানা বুঝি একেই বলে।
‎জিজ্ঞাসা করলাম, ওখানে কেউ কিছু বলবে না?
‎ ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠল ওর চোখ।
‎বলল, ওটা আমাদের বাড়ি। বাবা মা আর আমি, আর কেউ সেখানে মাতব্বরি করার নেই।

আমাদের স্টপেজ এসে গিয়েছিল। ওকে নামিয়ে দিয়ে আমি ফিরতি বাসে হাওড়া চললাম। উত্তরপাড়া।

বাবুজিকে সপ্তাহে তিনদিন পড়াতাম। সোম বুধ শুক্র। পরের দিন গেলাম না। অন্য জরুরি কাজ ছিল। শুক্রবার পড়াতে গিয়ে শুনলাম মহিমারা বোম্বাই ফিরে গেছে।
সপ্তাহ দুয়েক পরে একটা অতি ছোট্ট চিঠি পেলাম বাড়ির ঠিকানায়, পার্শেলের মধ্যে একটা পার্কার পেন। চিঠিতে ক'টা আঁকাবাঁকা কথা লেখা :--
"চললাম। দেখা হল না। এই পেন দিয়ে অনেক অনেক লিখো আমি বাংলা শিখে পড়ে নেব। ইতি
মহিমা মিত্র"
* চুড়িগুলো পরে আছি।

না, আমার লেখক বা কবি হওয়া হয় নি।