Samokal Potrika

মেঘনা উপজেলার চন্দনপুর ফেরীঘাট থেকে স্পিডবোডে করে ছুটছি বৈদ্যের বাজারের উদ্দেশ্যে । মেঘনা নদীতে মাত্র ১৬ মিনিট স্পিডবোড দৌড়ে আমরা পৌছে গেলাম বৈদ্যের বাজারে । বোট থেকে নেমে আমরা বৈদ্যের বাজার ঘুড়ে দেখলাম । এবং বৈদ্যের বাজার ঘুরে আমাদের  সবচেয়ে বেশী আকৃষ্ট করেছে মাছের বাজার ! মেঘনা নদী থেকে সদ্য ধরে আনা মাছ নিয়ে জেলেরা দাঁড়িয়ে আছে । মেঘনা নদীর ফ্রেশ ও টাটকা মাছ দেখে আমাদের লোভ হয়ে গেল ! কিন্তু আমাদর ভ্রমণের এটাই শেষ গন্তব্য নয় । এখান থেকেই আমাদের মূল ভ্রমণের যাত্রা শুরু ।
তাই মাছ না কিনে রিক্সায় করে ছুটছি ঈশা খাঁর রাজধানী পানাম নগরের দিকে । 
রাস্তার দুপাশের লিচু গাছ ও লিচু বাগান দেখতে দেখতে আমরা পৌছে যায় পানাম নগরীতে । ২০ টাকা টিকিট কেটে পানাম নগরে প্রবেশ করতেই হাতের বাম পাশে চোখে পরল বই এর পৃষ্ঠার মতো দেখতে পাথরের তৈরী বিলবোডে অলংকৃত করে লেখা পানাম নগরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও পনামের বর্ণনা । যার এক পৃষ্ঠায় রয়েছে বাংলায় । এবং অপর পৃষ্ঠায় রয়েছে ইংরেজীতে ।

পানাম নগরের মাঝা মাঝি রয়েছে প্রায় ৬০০ ফুট দীর্ঘ ও ৫ ফুট প্রস্থ একটি সড়ক । এই মূলত  সড়কের দুই ধারেই রয়েছে ছোট বড় প্রায় ৫২ টি ভবন ।  মূল রাস্তার উত্তর দিকে ৩১ টি ভবন এবং দক্ষিণ দিকে ২১ ভবন  । এই ভবন গুলোর মধ্যে রয়েছে কোনটি এক তলা, কোনটি আবার দুই তলা আবার কোনটি বা তিন তলা বিশিষ্ট ।
আমরা মুগ্ধ হয়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে থাকি ।  ১৮০০- ১৯০০ শতকে সোনারগাঁওয়ের উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীদের বাসস্থান ও তাদের ব্যবহৃত প্রাসাদ অথবা অট্টালিকা গুলি । 

সুন্দর সুসজ্জিত ও কারুকার্যময় প্রতিটি ভবনের দেয়ালেই রয়েছে ভিবিন্ন পরিমাপের ইটের সাথে চুন ও সুরকীয় আস্তর দিয়ে ব্যবহৃত ভবন সমুহে রয়েছে মোজাইক, রঙিণ কাঁচ, চিনিটিকরী, ছাদে কাঠের বীমবর্গা, চমৎকার স্টাকো অলংকরণে সমৃদ্ধ দুই পাশে পরিবেষ্টিত পরিখা, ঘাট সহ পুকুর ও অনেকগুলো পুকুর রয়েছে । ভবন সমুহের মাঝে রয়েছে কাশীনাথ ভবন ( ১৩০৫ বঙ্গাব্দে নির্মিত) ও নীহারিকা ভবন এর নামকরণ পাওয়া যায় । 
পানাম নগরের পার্শবর্তী গুরুত্বপুর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে রয়েছে , বড় সর্দারবাড়ি, ছোট সর্দারবাড়ি, পানাম সেতু, গোয়ালদী মসজিদ, গিয়াস উদ্দীন আজম শাহের সমাধি, মঠ, পোদ্দারবাড়ি, টাকশাল, উল্লেখযোগ্য ।

আমরা পানাম নগরের একে একে ৫২ টি ভবন ও পানাম সেতু দেখে ।  রিক্সা করে গেলাম ঐতিহাসিক গোয়ালদী মসজিদে । 
প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো সোনারগাঁ উপজেলার গোয়ালদী গ্রামে অবস্থিত (হুসেন শাহর মসজিদ) অথবা গোয়ালদী মসজিদ ।  ১৫১৯ সালে মোল্লা হিজাবর আকবর খান এ মসজিদ নির্মাণ করেন । সে অনুযায়ী এটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহর (১৪৯৪-১৫১৯) রাজত্বকালে এই মসজিদটি নির্মিত । 
১৯৭৫ সালে প্রত্নতত্ব বিভাগের অধীনে  গোয়ালদী মসজিদটি সংরক্ষিত করা হয় ।

আমরা গোয়ালদী মসজিদ দেখে একই রিক্সায় গেলাম লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের কাছে এবং ৩০ টাকা টিকিট কেটে জাদুঘরের প্রধান ফটক পার হতেই হাতের বাম পাশে চোখে পরল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও চমৎকার ঈশা খাঁর সেই দ্বিতল বাড়িটি । এটি'ই ছিল ঈশা খাঁর একমাত্র ও অন্যতম অন্ধরমহল । 
এর ডান পাশে রয়েছে  শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একটি ভাস্কর্য । এবং রাস্তার একটু সামনে'ই রয়েছে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর । যেখানে  মোট ১১ টি গ্যালারিতে দুর্লভ ঐতিহ্যের নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে । গ্যালারিগুলোতে নিপুণ কাঠ খোদাই করা জিনিস, মুখোশ, নৌকার মডেল, লোকজ বাদ্যযন্ত ও পোড়া মাটির নিদর্শন, জামদানি ও নকশিকাঁথা ইত্যাদি স্থান পেয়েছে ।

যে ভাবে যাবেনঃ- ঢাকার গুলিস্তান থেকে দোয়েল, স্বদেশ, কিংবা বোরাকের, এসি বাসে করে মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা নামতে হবে । 
অথবা বাংলাদেশের কোন প্রান্ত থেকে ঢাকা চট্টগ্রাম সহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের, সোনারগাঁ উপজেলার মোগড়াপাড়া, চৌরাস্তা নেমে যাবেন । তারপর মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা থেকে ব্যাটারী চালিত অটোতে কিংবা রিকশায় করে ১০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়ায় পানাম নগরীতে যেতে পারবেন ।
পানাম নগরিতে প্রবেশেরর টিকিট মূল্য ২০ টাকা । এবং লোক ও কারুশিল্প  জাদুঘরে প্রবেশ টিকিট  জনপ্রতি ৩০ টাকা । প্রতি বুধ ও বৃহস্পতিবার জাদুঘর বন্ধ থাকে।