Samokal Potrika

শ্যামলী পরিবহণের অগ্রীম টিকিট কাটা ছিল। সদস্য আমরা তিন জন। রাত ১১টায় কুমিল্লার গৌরিপুর থেকে শ্যামলী বাসে উঠে বসলাম। রাস্তা ঘাট ফাঁকা মাত্র তিন ঘন্টায় আমরা পৌছে গেলাম চট্টগ্রাম শহরে। সেখান থেকে সি এন জি ভাড়া করে "শাহ আমানত ব্রীজ" (নতুন ব্রীজ) যাবার পথেই পুলিশ চেকপোস্টে সি এন জি থামলো। আমরা পুলিশের চেকপোস্টের কাজে সাহায্য করলাম। ছোট খাটো পুলিশ অফিসারটার মুখে যথেষ্ট রস বোধ আছে! পুলিশ অফিসারের সাথে কিছুক্ষণ রসিকতা করে গেলাম  নতুন ব্রীজে ( শাহ আমানত ব্রীজে)। 
আমরা সি এন জি থেকে নেমে ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে কর্ণফুলী নদী দেখছি! রাতের কর্ণফুলী নদীকে কখনো দেখা হয়নি। নদী বহুরুপী, নদীর অনেক রুপ আছে! 
আকাশে ভরা পূর্নিমা ছিল। চাঁদের সেই  ফিনিক আলোয় কর্ণফুলী নদীর জল ঝলমলিয়ে উঠে! আমরা দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে কর্ণফুলী নদী দেখছি। শেষ রাতে কর্ণফুলী নদীর হিম মেশানো হাওয়ায় গায়ে কাঁপন ধরে গেল! 
আমরা ফিরে এলাম স্টেশনের দিকে, তারপর ওখান থেকে আবার সি এন জি ভাড়া করে সোজা পৌছে গেলাম আনোয়ারা উপজেলা বটতলী হরযত শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজারে। 
মাজার জিয়ারত করে সি এন জি ভাড়া করে আমরা ছুটছি আমাদের মূল অভিজান পারকী সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে..। 

গাছ পালায় ঘেরা চির সবুজে ভরপুর আনোয়ারা উপজেলার রাস্তা ঘাটসমূহ। এবং রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য গুলিও মন মুগ্ধকর! "শাহ মোহছেন আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের" একটু সামনের রাস্তার দু-পাশের দৃশ্য গুলি অসাধাণ ছিল! আমরা সি এন জি থামিয়ে অনেক গুলি ছবি তুললাম। 
এবং আঁকা বাঁকা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সৈকতের একটু পূর্বে যেতেই জাউবন সহ চট্টগ্রামের ঐতিয্যবাহী সাম্পান চোখে পড়ল। সেই সাথে শোনতে পেলাম সাগরের গর্জন! 
আমাদের সি এন জি গিয়ে থামল, পারকী রিসোর্ট এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে। আমরা কিছুটা পথ হেঁটে চলে গেলাম মূল সমুদ্র সৈকতে। 

একদিকে জাউবন অন্য দিকে বিশাল বঙ্গোপসাগর মাঝ খানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বসে বসে সমুদ্র দেখার চেয়ার ( কিটকট)। সেই সাথে জাউবন ঘেঁসেই গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমান কিছু দোকান পাট সহ হকারদের মিলন মেলা। আগে অবশ্য এসব কিছুই ছিল না। হোটেল মোটেল কিংবা চা বিস্কুট এমনকি খাবার পানির দোকানও ছিল না। 
হাতে গনা যে কয়েকজন পর্যটক এখানে আসত সেন্টার বাজার থেকেই  শুকনো খাবার সহ খাবার পানি নিয়ে আসত। তাছাড়া পারকী সমুদ্র সৈকতের সাথেও পর্যটকদের পরিচয় খুবই কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে এখানের অবস্থা আধুনিক। বর্তমানে এখানে কিছু হোটেল মোটেল সহ বেশ কিছু পিকনিকস্পট গড়ে উঠেছে। 
সেই সাথে গড়ে উঠেছে অনেক দোকান পাট। 

আমি দ্বিতীয় বারের মতো সাগরের জল ছুয়ে দেখলাম। এবং চেয়ারে ( কিটকটে) বসে সাগরের হিম শিতল হাওয়া গায়ে মাখছি, আর সাগরে গর্জন শুনছি। ঐ তো সাগরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড়  লঞ্চ ও স্টিমার গুলি দেখছি। এবং  সেই সাথে দেখা যাচ্ছে জেলেদের বেশ কিছু মাছ ধরার সাম্পান ও ট্রলার। সাগর পারে বসে সাগর দেখতে দেখতে এক সময় বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেল। 

পারকী সমুদ্র সৈকতে এসে আরো যা যা দেখবেনঃ- পারকী সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসলে অবশ্যই হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজার জিয়ারত করে যেতে ভুলবেন না কিন্তু! 
হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) আরব দেশে ৮৮৬ হিজরী ৭২ বাংলা ১৪৬৬ সনে ১২ রবিউল আউয়াল জন্ম গ্রহণ করেন। এবং সুদূর আরব  থেকে ইসলাম প্রচার করতে বাংলাদেশ এসেছেন। চট্টগ্রামের ইসলাম প্রচারের ইতিহাস ও হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়ার জীবনীতে পাওয়া যায় যে, ১৪০০ সতাব্দীর দিকে চট্টগ্রামে যে কয়েকজন অলি অথবা আউলিয়া ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে  চট্টগ্রাম এসেছিলেন। তাদের মধ্যে হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়ার (রাঃ) ও হযরত বদর আউলিয়া (রাঃ) অন্যতম ছিলেন। 

হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া ও হযরত বদর আউলিয়া সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে ছিলেন। 
হযরত বদর আউলিয়া যখন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন তখন হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়াও হযরত বদর আউলিয়ার সাথে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হযরত বদর আউলিয়া শাহ মোহছেন আউলিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞানের অধিকারী ভেবে শাহ মোহছেন আউলিয়াকে তথা ভাগ্নেকে না নিয়েই নৌক যুগে আরব সাগর পারি দিচ্ছিলেন। তখন শাহ মোহছেন আউলিয়া মামার সাথে যেতে না পেরে  এক পাথরের উপর উঠে দাঁড়ালেন। এবং মহান আল্লাহ তাআলার কুদরতে ঐ পাথর শাহ বদর আউলিয়ার নৌকার চেয়েও আরো অনেক বেশী গতিতে আরব সাগরের উপর দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে শাহ বদর আউলিয়া তার ভাগ্নের প্রতি একটু  রাগান্বিত হয়ে একটি তরোয়াল অথবা একটি ছুড়ি নিক্ষেপ করেন। 
কিন্তু হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া মামার নিক্ষেপ করা সেই তরোয়াল হাত দিয়ে ধরে সমুদ্রে ফেলে দিলে তা মহান আল্লাহর কুদরতে  সামুদ্রিক ছুড়ি মাছ হয়ে যায়। যা আজো (ছুড়ি মাছ নামে) চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজারে পাওয়া যায়। ভাগ্নের এমন  আধ্যাত্মিক কেরামতি দেখে শাহ বদর আউলিয়ার রাগ আরো বেড়ে গিয়ে ভাগ্নেকে অভিশাপ দিয়ে বলেন, যা তর মাজার শরীফ সবসময় ভাঙ্গা থাকবে।   
উত্তরে মোহসেন আউলিয়া বললেন, বাংলাদেশে আমার ১৩ টা মাজার হবে। আমি কখন কোন মাজারে অবস্থান করবো তা কেউ বলতে পারবে না। আমার মাজার যদি তোমার অভিশাপে ভেঙ্গে যায়,তাহলে তুমিও জেনে রেখো মামা আমার ১৩টা মাজারের মধ্যে শেষ মাজারে যেদিন ফাঁটল ধরবে সেদিনই এই দুনিয়ায় কিয়ামত ঘটবে। হযরত বদর আউলিয়ার উক্ত অভিশাপের কারনে মোহছেন আউলিয়ার রওজার ছাদ যখনই পাকা করার চেষ্টা করা হয়,তখনই তা ধসে পরে যায়। এজন্য মাজারের ওপর পাঁটের ছাউনি দেয়া হয়। মোহছেন বাবার ১৩ টি মাজারের কথার কারনে চট্টগ্রামে এখনও  কিছু গায়েবি মাজারের উৎপত্তির কথা শোনা যায়। 

তারপর যখন ৯৮৫ হিজরী ৯৭১ বাংলা ৬ আষাঢ় ১৫৬৫ সনে হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) আল্লাহর ডাকে পরপারে চলে যান। 
তখন প্রথম শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজারের ছাদ পাকা করার চেষ্টা করা হয়। এবং তখনই তা ধসে পড়ে যায়। 
এবং এখনো শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজারের ছাদ ছোন  পাট গাছের ছাউনি দিয়ে দেয়া আছে। 
এবং বর্তমানে মাজারের পাশেই সেই কালো পাথরটি গ্লাস বন্দী করে রাখা হয়েছে। যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে শাহ মোহছেন আউলিয়া আরব সাগর পারি দিয়েছিলেন। এবং সেই পাথরটি আজো জীবিত আছে। এবং আজো সেই কালো পাথরটির গা থেকে ঘামের মত পানি বেড় হয়। 
পারকী সমুদ্র সৈকতে আসলে অবশ্যই সেই সব নিদর্শন গুলি দেখে যাবেন । 

যে ভাবে যাবেনঃ- ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী যে কোন বাসে উঠে আনোয়ারা উপজেলার চাতরি (চৌমুহনি) নামক স্থানে নেমে যাবেন। তারপর চৌমুহনি থেকে শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজার পর্যন্ত সি এন জি ভাড়া ২০ টাকা। আর পারকী সমুদ্র সৈকতে ভাড়া ৫০-৬০ টাকা। চৌমুহনি থেকে শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজার ও পারকী সমুদ্র সৈকত একই পথে। তবে মালখান বাজার (সেন্টার বাজার) থেকে রাস্তা ভাগ হয়ে হাতের বাম পাশের রাস্তাটি চলে গেছে শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজারে। আর সোজা রাস্তাটি পারকী সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। 
উল্লেখ্য যে, যেসব বাস গুলি চট্টগ্রামের শাহ আমানত ব্রীজ (নতুন ব্রীজের) উপর দিয়ে যায় সেই বাস গুলিতে উঠবেন । 
নয়ত চট্টগ্রামের শাহ আমানত ব্রীজের কাছ থেকে (নতুন ব্রীজ) থেকে সি এন জি করে চৌমুহনি হয়ে পারকী সমুদ্র সৈকতে যেতে পারবেন। 

যেখানে থাকবেনঃ- পারকী সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসলে আপনি খুব সহজেই থাকতে পারেন, সৈকতের কোল ঘেঁষেই পারকী রিসোর্ট এন্ড রেস্টুরেন্টে। ওখানেই থাকা খাওয়ার সু ব্যাবস্তা আছে। তবে খাবারের দাম একটু বেশী'ই হবে। যে কোন প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন, "পারকী রিসোর্ট এন্ড রেস্টুরেন্টের সাথে মোবাইলঃ  ০১৮৪৪১৭৭৪৬৬ , অথবা  ০১৮৪৪১৭৭৪৬৫ এই নম্বরে।