Samokal Potrika

নারী শব্দটি মনে এলেই কিছু মহীয়সী নারীর কথা মনে পড়ে। এখন আপনাদের এমন এক মহীয়সী নারীর কথা বলবো যার জন্ম হয়েছিলো ৬ জুলাই, ১৯০৭ ও মৃত্যু হয়েছিলো ১৩ জুলাই ১৯৫৪। বেঁচেছিলেন মাত্র ৪৭ বছর। একজন মেক্সিকান চিত্রশিল্পী। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। আমি ফ্রিদা কালোর কথা বলছি। তিনি বহু  কালজয়ী ছবি এঁকেছেন, এঁকেছেন নিজের ছবিও বিভিন্ন রূপে। তাঁর বেশীর ভাগ ছবিই ছিল self portrait, অর্থাৎ তাঁর নিজের ছবি। ফ্রিদা কালোকে surrealist বা magical realist হিসেবে গণ্য করা হয়।  

তাঁর বাবা ছিলেন জার্মান ও মা মেস্তিজা শ্রেণীর। তাঁর ছোটবেলা ও পরিণত বয়সেও অনেক  দিনই কেটেছে কোয়ওআকানে, তাঁর বাড়ী ‘কাসা আসুলে’(casa azul হল স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ ‘নীল বাড়ী’) যেটি এখন ‘Frida Museum’ হিসেবে পরিচিত।  

এবারে এই হার না মানা মহীয়সী রমণীর জীবনটা একটু দেখে নেওয়া যাক।

ছোটবেলায় তিনি পোলিওতে পঙ্গু হয়ে যান। তারপর ১৮ বছর বয়সে রাস্তায়  তাঁর স্কুল বাস ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং সেই দুর্ঘটনার যন্ত্রণা তিনি  সারা জীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। তাঁর পেলভিস দিয়ে একটি লোহার রড ঢুকে গিয়েছিল পেলভিস দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বুকের বেশ কয়েকটি  পাঁজর, পা ও কলার বোন ভেঙে গিয়েছিল। x-ray তে দেখা গিয়েছিল তাঁর শরীরের ভেতরে আরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এক মাস তাঁকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। তার আগে অব্দি তিনি ছিলেন এক কৃতি ছাত্রী, তাই তাঁর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। তাঁর মা তাঁর হাতে খাতা পেন্সিল তুলে দেন, এত দিন ছবি আঁকা ছিল তাঁর অবসর বিনোদন, কিন্তু এই দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি ছবি  আঁকাকেই তাঁর পেশা ও স্বপ্ন করে নিলেন।

ধীরে ধীরে তাঁর চিত্রকলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী তে তাঁর আঁকা ছবি সমাদৃত হতে লাগলো। পরবর্তীকালে দিয়েগো রিভেরার সাথে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। তিনি ইউনাইটেড স্টেটসেও বেশ কিছু দিন কাটিয়েছেন। রিভেরার সাথে বিচ্ছেদের পর (তবে বছর খানেক পর তাদের সম্পর্ক আবার ঠিক হয়ে যায়) তিনি আবার ‘কাসা আসুলে’ ফিরে আসেন এবং তাঁর বিদেশের  অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাঁর আরও সুন্দর সুন্দর চিত্রকল্প উপহার দিতে থাকেন। তাঁর বিখ্যাত ছবিগুলির মধ্যে The two Fridas, The wounded table ইত্যাদি খুব জনপ্রিয়। ৪০ এর দশকে তিনি মেক্সিকো ও ইউনাইটেড স্টেটসে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি Escuela Nacional de Pintura তে শিক্ষকতাও করেন। 

১৯৫০ এ আবার তাঁকে আবার বহুদিন হাসপাতালে কাটাতে  হয়েছিল। কারণ তাঁর স্পাইনাল কর্ডে আবার একটি অপারেশান হয়েছিল। তখন তাঁকে বেশীরভাগ সময়েই বাড়িতে কাটাতে হত আর তখন তাঁর সঙ্গী ছিল হুইল চেয়ার আর ক্রাচ। তারপর তিনি আবার একটু রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি আবার মেক্সিকান কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে শান্তির ডাক দিয়েছিলেন।

তাঁর জীবন যুদ্ধ এখানেই শেষ নয়। হাঁটু থেকে তাঁর ডান পা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল গ্যাংরিন হবার জন্য। তারপর তিনি মানসিক অবসাদে ডুবে যান, প্রচুর পেন কিলার খেতে হত তাঁকে। শোনা যায় তিনি একবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন।

১২ জুলাই রাতে তাঁর জ্বর খুব বেড়ে যায় এবং সাথে দেহে অসহ্য যন্ত্রণা। পরদিন  সকাল ৬ টায় তাঁর নার্স তাঁকে মৃত অবস্থায় বিছানার ওপর দেখতে পায়।  মৃত্যুর কারণ হিসেবে pulmonary embolism দেখানো হয়। তবে অনেকে এটি আত্মহত্যাও বলে থাকেন, কারণ তাঁর নার্সের কাছে জানা যায় তিনি একসাথে অনেকগুলি পেন কিলার খেয়েছিলেন। ৪৭ বছর বয়সেই এই মহীয়সীর জীবনাবসান হয়।

১৯৫৩ সালে, মানে তাঁর মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে মেক্সিকোতে তাঁর একক প্রদর্শনীও করেছিলেন।

জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক মহীয়সী নারী শুধু নারীদেরই উদ্বুদ্ধ করেন তা  নয়, সমগ্র মানব জাতিকে অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে হয়ে উঠেছিলেন অনন্যা। এই মহীয়সী নারীর জন্য রইলো আমার কুর্নিশ, শ্রদ্ধা ও প্রণাম।