Samokal Potrika

ধূমধাম করে পার্থ আর বিদিশার বিয়ে হয়ে গেল। আজ বিদিশার ফুলশয্যা। জীবনের একটি বিশেষ দিন। যথারীতি অতিথি আপ্যায়ন, খাওয়া দাওয়া মিটতে বেশ রাত হয়ে গেছে। অবশেষে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসে উপস্থিত- ফুলশয্যার    রাত। বিদিশা লাজে রাঙা নতুন বউয়ের মতই বিছানায় বসে ছিল, পার্থ ঘরে ঢুকতেই সে যেন আরও সঙ্কুচিত হয়ে গেল। যাই হোক দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষন কথাবার্তা হল, বিদিশা মাথাটা নিচু করে বসে ছিল। পার্থ বিদিশাকে হাল্কা করে আলিঙ্গন করে একটি চুম্বন করল, বিদিশা আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। পার্থ যখন শারীরিকভাবে বিদিশাকে কাছে চাইলো, বিদিশা আপত্তি জানালো। ফুলশয্যার রাতে একটা লজ্জা তো থাকেই, সেটা অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেই হয়। তাছাড়া সারাদিন ধকলের পর অনেকেই ক্লান্ত থাকে। তাই পার্থ আর কোনও জোর করল না, খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেটা মেনে নিল। তারা দুজনে শুয়ে পড়লো।   

সম্পর্কটা ভালই ছিল, দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া ভালই। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল। অন্যান্য সম্পর্ক ভালো হলেও, তাদের মধ্যে কোন শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। প্রথম দিকে পার্থ ভাবতো নতুন নতুন হয়তো একটু লজ্জা পাচ্ছে, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে বেশ কয়েক মাস কেটে গেলেও সমস্যার কোনও সমাধান হল না। পার্থ শারীরিক সম্পর্ক করতে চাইলেই বিদিশা প্রবলভাবে তকে বাধা দিত, তাকে দেখেই মনে হত শারীরিক সম্পর্কে তার মধ্যে একটা প্রবল অনিহা আছে, পার্থকে কিছুতেই তার কাছে আসতে দিত না, সেই মুহূর্তে বিদিশা যেন পার্থকে ঘৃণার চোখে দেখত। স্বাভাবিকভাবেই পার্থ মনে মনে খুব রাগ হত। ধীরে ধীরে এটা নিয়ে ওদের মধ্যে একটা দূরত্বও তৈরি হল, মাঝে মাঝে এটা নিয়ে অশান্তিও হত। এর ফলে সম্পর্কে একটা শিথিলতা দেখা দিল। এর ফলে পার্থ কিছুটা মানসিক  অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ল। অফিস সেরে দেরী করে বাড়ী ফিরত, মদ্যপানও শুরু করলো। তার এই সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারতো না। একদিন সে তার খুব কাছের এক বন্ধু বাপ্পাকে সব কথা খুলে বলল। বাপ্পাও তাকে বন্ধুর মতই পরামর্শ দিল-‘ দেখ, ও একটা অন্য পরিবেশ থেকে এসেছে, হয়তো মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগছে, একটু সময় দে, দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।’ পার্থও তার কথা মেনে নিল। এভাবে প্রায় মাস ছয়েক কেটে গেল, কিন্তু সমস্যা মিটল না, পার্থ ডিভোর্সের কথাও ভাবছে এখন। তাই একবার শেষ পরামর্শের জন্য বাপ্পার কাছে গেল।  

বাপ্পা বলল- ‘তোর সমস্যাটা আমি বুঝতে পারছি, স্বাভাবিক একটা বৈবাহিক সম্পর্ক না থাকলে একটা সম্পর্ক ভেঙে যায়, তোর মনের অবস্থাটাও আমি বুঝতে পারছি। তবে তুই কোন বড় সিদ্ধান্ত নেবার আগে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ কর, তিনি হয়তো তোর সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।’

‘এটা তুই মন্দ বলিস নি, তাহলে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেই যাই, দেখা যাক উনি যদি কিছু করতে পারেন।’, পার্থ বলল।

পার্থও একজন ভালো মনরোগ বিশেষজ্ঞের খোঁজ পেয়ে গেল। আর দেরী না করে সেই পার্থ আর বিদিশা সেই মনরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করলো। বিদিশার কউন্সেলিং শুরু হল।

বিদিশার শারীরিক কোনও সমস্যা ছিল না। অনেক প্রশ্নোত্তর পর্বের পর অবশেষে মনের গভীরে সেই জায়গায় প্রবেশ করলেন সেই মনরোগ বিশেষজ্ঞ। সমস্যার কারণও খুঁজে পেয়ে গেলেন-

বছর কুড়ি আগের ঘটনা। বিদিশার বয়স তখন ছয় কি সাত হবে। বিদিশার পরিবারে ছিল তার বাবা, মা এবং এক অবিবাহিত কাকা। যখন বিদিশার বাবা মা বাড়ীতে থাকতো না, কাকা তাকে তার ঘরে ডেকে তাকে আদর করতো, জড়িয়ে ধরত, চুমু খেত, কখনও খারাপভাবে স্পর্শও করতো। বিদিশার সে সব একদম ভালো লাগত না, কাকার ঘর থেকে পালিয়ে যেতে চাইতো, কিন্তু কাকা তাকে জোর করে ধরে রাখত। বিদিশা তার মাকে বহুবার এই ঘটনার কথা বলেছে, কিন্তু তার মা কোনও গুরুত্ব দেন নি। উলটে মেয়েকেই বকতেন কাকার সম্পর্কে এরকম কথা বলার জন্য। সেই কুড়ি বছর আগে কাকার সেই আচরণ  তার শিশু মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, পুরুষ সম্পর্কে তার মনের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল, যেটা সে কুড়ি বছর ধরে মনের কোণে বয়ে এসেছে। তাই পুরুষ দেখলেই তাকে ধর্ষক মনে হয় তার।

তবে ডাক্তারবাবু পার্থকে আস্বস্ত করলেন যে বিদিশার মনের এই ভুল ধারণা ধীরে ধীরে কেটে যাবে এবং তারা আবার স্বাভাবিক বৈবাহিক জীবন ফিরে পাবে। তবে যেহেতু এটা শৈশবের একটা গভীর ক্ষত, এটা থেকে মুক্ত হতে একটু সময় লাগবে, বেশ কয়েকটা সিটিং নিলেই বিদিশার মনের ক্ষত ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাবে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।

সত্যি সত্যিই কয়েকটা সিটিং-এর পর তাদের জীবনে আবার বৈবাহিক ছন্দ ফিরে এল এবং মাস ছয়েক পর ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান ছিল-‘সমদ্র সৈকতে মধুচন্দ্রিমা’। ডাক্তারের পরামর্শ মতই তারা সমুদ্র সৈকতে মধুচন্দ্রিমা যাপনে গেল এবং সুখবর নিয়ে ফিরে এল।

                         আজকের দিনে এরকম বহু শিশু যৌন নির্যাতনের স্বীকার। তাই এ ব্যাপারে প্রত্যেকের সচেতন হওয়া উচিত। মায়েদের উচিত ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে শিশুদের অবগত করা। কারণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের যৌন হেনস্তা নিকট আত্মীয় বা খুব কাছের মানুষদের দ্বারাই হয়েই থাকে। কারণ তারা জানে তাদের কেউ সন্দেহ করবে না। আরও একটা বড় সমস্যা হল আমরা শিশুদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিই না, উল্টে তাকে বকাবকি করি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে কোনও শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন হলে তার মনের সেই ক্ষত  দীর্ঘস্থায়ী ভাবে বাসা বেঁধে থাকতে পারে, যেটা পরবর্তীকালে তার বৈবাহিক জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আপনার শিশুর ওপর এরকম যৌন নির্যাতন হলে, দেরী না করে মনরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।