Samokal Potrika

''রঙীন চশমা একশো টাকা, সান্তা টুপি একশো টাকা, বেলুন কুড়ি টাকা---নিয়ে যান, নিয়ে যান---বাচ্ছাদের মুখে হাসি ফোটান।ও মেমসাহেব টুপি দেব একটা?চশমা দিই মামনির জন্য?''

''অনেক আছে রে এইসব।আর বড়দিন তো হয়ে গেল।প্রতিবছর এইসব টুপি চশমা কত কিনব আর বল?''

এই কথা বলে গাড়ীর কাঁচটা তুলে দেয় জুলিয়া।আজ ওদের বর্ষশেষের পার্টি।পমকে মায়ের কাছে রেখেই বেরিয়ে আসবে জুলিয়া।রৌনক অফিস থেকে চলে আসবে।

জুলিয়া গাড়ীর কাঁচ দিয়ে দেখল বোনের হাত ধরে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা।চারিদিকে এরকম কত ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা কঠিন জীবনের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।কিন্তু কেউই তো কিছু করতে পারছে না।জুলিয়া একা কি ই বা করতে পারে?


দুতিনদিন আগের ঘটনাটা ওর মনে পড়ে গেল।সেদিন হস্তশিল্প মেলায় গিয়ে একগাদা কেনাকাটা করেছে জুলিয়া।মেয়ে পমের জন্য দড়ির দোলনা,রান্নাঘরের বেতের ঝুড়ি,কাঠের হাতা,খুন্তি বাঁশের সাইড টেবিল আরও কত কি !বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া,মেদিনীপুর,
পুরুলিয়া,বীরভূম থেকে কত শিল্পীরা তাদের হাতের কাজের পসরা সাজিয়ে বসেছে।জুলিয়া আর দেবপ্রিয়া দুজন মিলে অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছিল।এই মেলাগুলোতেই একটু ঠিক করে দর-দাম করতে পারলে বেশ সস্তায় অনেক ভাল-ভাল জিনিস কিনতে পাওয়া যায়।জুলিয়া অতো দরাদরি করতে পারে না।দেবপ্রিয়া আবার এইসব ব্যাপারে এক্সপার্ট।

পোড়ামাটির গয়না,কাঁথাস্টিচের কুর্তি,রৌনকের একটা সুন্দর জ্যাকেট,গায়ের একটা খেসের শাল সব দেবপ্রিয়াই দর করে কিনে দিল সেদিন।মনটা বেশ খুশি-খুশি ছিল ওর।হাতে একগাদা প্যাকেট নিয়ে হিম সিম খাচ্ছিল জুলিয়া।

''ও দিদি! দিদি! দাওনা ব্যাগগুলো। বয়ে দেব?গাড়ীতে তুলে দেব পুরো।বেশী না আমাকে দশটা টাকা দিও।''

একটা বাচ্ছার গলা পেয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে জুলিয়া দেখল একটা ছোট বাচ্ছা মেয়ে শীতে কাঁপতে-কাঁপতে ওর আঁচল টা ধরে টানছে।

''দাওনা দিদি।কাজ করেই তো পয়সা চাইছি।অনেকে বলে কাজ করতে পারিস না?তাই-ইই--।''

সেই বাচ্ছাটার গায়েও তেমন জামাকাপড় নেই।জুলিয়া বলল-

''কি নাম তোর?এই ঠান্ডায় গায়ে সোয়েটার নেই কেন রে?''

বলার পর ওর মনে হল খুবই বোকা- বোকা প্রশ্ন করে ফেলেছে ও।এরা বড় গরীব কোথায় পাবে?অনেকগুলো করে ভাই-বোন হয়তো!

''আমার নাম চাঁপা।একটাই সোয়েটার গো আমার।ভাইটা তো আরও ছোট তাই মা ওকে পরিয়েছে।''বলেছে-

'' এই মেলায় যদি কাজ করে কিছু পয়সা কামাতে পারিস তো একটা সোয়েটার কিনে দেব।''

''তাই আমি সবার ব্যাগ বয়ে-বয়ে সোয়েটার কেনার টাকা জোগাড় করছি।একটু আগে একজন বাবু উই যে অতো ধুরে নিয়ে গেল আমাকে। বলল ব্যাগ গুলো গাড়ী অব্দি নিয়ে গেলে পনেরো টাকা দেবে।কিন্তু গাড়ীতে উঠেই একটা দুটাকা ছুঁড়ে দিয়ে বলল-

'' যা ভাগ্।''

বলে কাঁচ উঠিয়ে হুশ্ করে চলে গেল।''

মনের ভেতরটা জুলিয়ার হু হু করে উঠল।কি করবে জুলিয়া? কজনের দুঃখ দূর করতে পারবে ও?জুলিয়া বলল-

''আচ্ছা আমি তোকে সোয়েটার কিনে দেব।''

''সত্যি ?সত্যি গো দিদি?দেবে সোয়েটার কিনে?তাহলে দাও তোমার ব্যাগগুলো বয়ে দিই।''

হাসিতে-আনন্দে বাচ্ছা মেয়েটার চোখ-মুখ চক চক করে উঠল।

জুলিয়া ভাবল-

'' আমার পমের মতই তো ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্ছাটা।পারতাম কি পমকে একটা সোয়েটার কিনে দেওয়ার বদলে খানিকটা কাজ করিয়ে নিতে?''

''না না তোকে ব্যাগ বইতে হবে না।এমনিই কিনে দেব রে চাঁপা।''

চোখে জল এসে গেল জুলিয়ার।এদিক- ওদিক তাকিয়ে দেবপ্রিয়াকে দেখতে পেলোনা।কোথায় গেল কে জানে!দুচার পা হাঁটতেই জুলিয়া দেখল একটা তিনথাক ঝুড়ি নিয়ে একজন মহিলার সঙ্গে দারুণ দরকষাকষি করতে শুরু করে দিয়েছে সে।

''ঐ তো !ঐ তো! আমার মায়ের দোকান।চাঁপা চেঁচিয়ে বলল।আমার মা ঝুড়ি বুনতে পারে খুব সুন্দর।''

জুলিয়া দেখল ঠান্ডা হিম পড়া শীতে একটা ছেঁড়া তাঁতের কাপড় পরে ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে চাঁপার মা নিপুণ হাতে ঝুড়ি বুনছে, আর তার স্বামী ক্রেতাদের সামলাচ্ছে।দেবপ্রিয়া ততক্ষণে সাড়ে ছশো থেকে ঝুড়ির দাম সাড়ে চারশোয় নামিয়ে একটা বিজয়ীর ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে।এদিকে মলিন মুখে চাঁপার মা বলছে-

'' আজ আমাদের কিছু বিক্রি হয়নি গো দিদি।অসময়ে বৃষ্টি এসে গেল লোক জমেনি আজ মেলায়।এই ঝুড়িটা বিক্রি হলে তবে একটু চা খাব।''

দেবপ্রিয়া বলল-

''তোমরা ওরকমই বল গো।আমি এতদিন মেলায় আসছি, সব জানি।দাও দাও আর একশো টাকা ফেরৎ দাও দেখি।''

একশো টাকা ফেরৎ নিয়ে দেবপ্রিয়া বলল-

'' চল জুলিয়া এবার কিছু খাই। খুব খিদে পেয়েছে।যা জিতলাম না এবার মেলার কেনাকাটাতে, দেখবি অফিসে সবার কেমন তাক লেগে যাবে।''

জুলিয়া বলল-

''তুই এগো আমি যাচ্ছি।''

জুলিয়া ব্যাগ থেকে একশোটা টাকা বার করে চাঁপার মায়ের হাতে দিয়ে বলল-

'' এটা রাখো চা খেয়ো।বাচ্ছা দুটোকে একটু মিষ্টি কিনে দিও।''

কে জিতল?কার কাছে জিতল দেবপ্রিয়া?একজন মানুষ হয়ে আর একজন মানুষকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণগুলো তুলে দিতে পারছে না কেউ।তাদের এই দুরবস্থা কেবল দুচোখ দিয়ে দেখে যাচ্ছে।এ যে মানবতার কত বড় হার!মনুষ্যত্বের কত বড় অপমান! কি করে কাকে বোঝাবে জুলিয়া?ঝাপসা চোখটা মুছে তাকিয়ে দেখে-

চাঁপার মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জুলিয়ার দিকে।হিমশীতল কুয়াশা মাখা আলো আঁধারী অস্ফুট বেদনা বুঝি এখনই কান্না হয়ে শিশির বিন্দুর মত ঝরে পড়বে ওর দুচোখ দিয়ে।অথবা বহু আঘাতে, যন্ত্রণায় সেসব বৃষ্টিবিন্দুর ফোঁটা,শীতল শিশির শুকিয়ে গেছে কবে! কে জানে!এমনই কত চাঁপার মায়ের দুঃখ কথা বোনা হয়েছে বেতের ঝুড়ির ভেতর।হারিয়ে গেছে অন্ধকার অতীতে।মেলার আলোর জৌলুস সত্যি কি চাপা দিতে পারে
এইসব আঁধারকে?

''দিদি আমাকে সোয়েটার দেবে না?''

চাঁপার গলার শব্দে চমকে ওঠে জুলিয়া। একটা খেসের চাদর কিনেছিল নিজের জন্য।সেটা তাড়াতাড়ি প্যাকেট থেকে বার করে চাঁপার গায়ে জড়িয়ে দিল।এরকম কত চাঁপারা কষ্ট পাচ্ছে, কেই বা তার খোঁজ রাখছে।জুলিয়া ভাবল ওদিকের দোকান থেকে একটা সোয়েটার কিনে দেবে চাঁপাকে। 

আজ আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।এদিকে শীতটাও কদিন একটু বেশী পড়েছে।আগামীকাল পয়লা জানুয়ারী।পমের আরও একটা সোয়েটার জ্যাকেট নিয়েছে আজ জুলিয়া ব্যাগে যা ঠান্ডা!আজ আর রাতে বাড়ী ফেরা নেই।বাড়ী ফিরতে-ফিরতে ভোর হয়ে যাবে।সারারাত পার্টি চলবে।কাঁচটা তুলতে-তুলতে জুলিয়া দেখল শীতের উত্তরে হাওয়ায় ছোট ছেলেটা বোনের হাত ধরে ছুটে-ছুটে সিগনালে থেমে থাকা গাড়ীগুলোর কাছে যাচ্ছে আর একটা টুপি কিংবা চশমা নেওয়ার জন্য গাড়ীতে বসা লোকগুলোকে পীড়াপীড়ি করছে।ছেলেটার গায়ে ছেঁড়া ময়লা জামা,ছোট বোনটার গায়ে জামা নেই বললেই চলে।ঠান্ডায় খুব কাঁপছিল ওরা।

বড়দিনের মরশুমে তিলোত্তমা কলকাতা সেজে উঠেছে।প্রদীপের নীচের অন্ধকারের দিকে কে আর তাকিয়ে দেখছে?হঠাৎ একটা দমকা বাতাসের মত একমুঠো মন খারাপ আবার যেন জুলিয়ার মনটাকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলল।কে জানে জুলিয়া হয়তো এই সভ্য সমাজের পক্ষে অচল হয়ে যাচ্ছে আস্তে-আস্তে।

''আহারে!আমার পমের মতই তো ছোট্ট ছেলে-মেয়ে দুটো! এই ঠান্ডায় কত কষ্ট করে ঘুরে-ঘুরে টুপি ,বেলুন বিক্রি করছে! একটা গরম জামা পর্যন্ত নেই গায়ে!বেলুনের ভেতর জ্বলছে আর নিভছে বাহারী আলো।যেন জোনাকির মত সুখের স্বপ্ন জ্বলে উঠেই আবার আঁধারে হারিয়ে যাচ্ছে।স্বপ্নগুলোকে ছোঁয়ার অবিরাম চেষ্টা চলছে কিন্তু কিছুতেই ছোঁওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে কত টাকা আমরা প্রায়ই নষ্ট করি,-----।''

গাড়ীর কাঁচটা নামিয়ে গলা বাড়িয়ে জুলিয়া ডাকল-

''এই শোন্ শোন্ দে তো টুপি,চশমা আর বেলুন।আর এই সোয়েটার আর জ্যাকেটটা পরে নে দুজনে।খুব ঠান্ডা তো আজ!এই নে টুপি আর বেলুনের দাম।''

জুলিয়া ব্যাগে রাখা সোয়েটার আর জ্যাকেটটা বাচ্ছা দুটোকে দিয়ে দিল গাড়ীর কাঁচ দিয়ে হাত বাড়িয়ে।

''কিন্তু আমার কাছে তো এত টাকা ভাঙ্গানো নেই মেমসাহেব।''

বাচ্ছা ছেলেটা বলে ওঠে।

''ও তোকে আর ফেরৎ দিতে হবে না।''

অজান্তেই জুলিয়ার চোখটা জলে ভিজে ওঠে হঠাৎ।ছোটবেলায় তার ছোট ভাইটা একদিন তাকে ছেড়ে চলে গেছিল এমনই এক ঠান্ডা শীতের রাতে।কেন যে তার মুখটা ভেসে উঠল এতদিন পর জুলিয়া জানে না।পমকে আর একটু কোলের কাছে টেনে নিল জুলিয়া!এই অকারণ হতাশা মাঝে-মাঝে জুলিয়াকে বড় উদাসী করে তোলে।কতরকম ভাব বুদবুদের মত ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে যায়।প্রাত্যহিকতায় নিজেদের সুখ-দুঃখের হিসেব নিকেশে হারিয়ে যায় ছোট-ছোট চাঁপা,বেলুনওয়ালা,টুপি-ওয়ালাদের টাটকা জীবনগুলো।মাঝে মাঝে উথলে ওঠা দুঃখ মোড়া একটা চাদর,একটা কম্বল কি এদের সত্যিকারের বেদনাময় হিমশীতল জীবনে উত্তাপ আনতে পারবে? সিগনাল সবুজ হতেই গাড়ীটা ছেড়ে দিল।জুলিয়ার মনে যখন এইসব ভাবনারা সাঁতার দিচ্ছে তখন ছোট ছেলে মেয়ে দুটো ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে তাকিয়ে আছে ওদের চলন্ত গাড়ীটার দিকে।এরকম অপ্রত্যাশিত উপহার ওরা এর আগে কখনও পায়নি।