Samokal Potrika

সিবিআই নিয়ে যে প্রহসন চলছে, তা প্রশাসনিক অজ্ঞতারই পরিচয় বহন করে। চিরকাল সিবিআই নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বা সরকার রাজনীতি করে এসেছে। কিন্তু এমন প্রকাশ্য কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি হতে দেখা যায়নি। মিডিয়া বাড়বাড়ন্ত না থাকায় আগে যে ঘটনা অনায়াসে চেপে যাওয়া যেতো, এখন তা সম্ভব নয়। যেকারণে দশ বছর আগেও সিবিআই সম্পর্কে সমাজের একটা আস্থা ও সম্ভ্রমের ছবি ফুটে উঠতো। কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে সিবিআই সম্পর্কে ধারণা ও বিশ্বাস আমুল বদলে গেছে। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ বিচার ব্যবস্থাও সিবি আই নিয়ে বিরক্ত। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে কয়লা দূর্নীতির তদন্তে সরকারের হস্তক্ষেপে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মাননীয় আর এম লোঢা ২০১৩ সালের ৯ মে মন্তব্য করেছিলেন - সিবিআই হল খাঁচায় বন্দী তোতা পাখি, তার অনেক মনিব। প্রভুরা যেমন বুলি শেখাবে সে তেমনই বুলি বলবে। এই মন্তব্যের নেপথ্যে স্বশাসিত সংস্থার উপর সরকারের স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রণ কাজ করেছিল।রাজনৈতিক স্বার্থে স্বশাসিত সংস্থা ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। তার কয়েকটি নমুনা, ইউপিএ সরকার কয়লা কেলেঙ্কারির খসড়া রদবদল করতে সিবিআই এর কাজে হস্তক্ষেপ। বন্ধুদের বাঁচাতে স্বশাসিত সংস্থা ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত নরসিংহ রাও, জয়ললিতা, মায়াবতী, লালুপ্রসাদ, মুলায়ম সিংহ। 2G স্পেক্ট্রাম কেলেঙ্কারিতে সিবি আইয়ের তদন্তের গতি নিয়ে একাধিক বার বিরক্তি প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত নিজে নজরদারি করতেই জালে ওঠে রাঘব বোয়ালরা। সিবি আই প্রধান বি আর লাল অবসর নেওয়ার পর অভিযোগ করেন, ভোপাল গ্যাস দূর্ঘটনার তদন্তে ওয়ারেন আন্ডারসনের প্রত্যার্পনের উদ্যোগে ঢিলে দিতে বলা হয়। ২০০৬ সালের তদন্তে জানা যায় সরকারি প্রভাবে বোফর্স কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ওক্তাভিও কোয়াত্রোচ্চির ব্যাংক একাউন্ট গোপনে খুলে দেয় সিবি আই। পরে ২১ কোটি টাকা হাতিয়ে পালিয়ে যান কোয়াত্রোচ্চি। ১৯৯১ সালে এক কাশ্মীরী জঙ্গির বয়ান কে হাতিয়ার করে লালকৃষ্ণ আদবানি সহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গাওয়ালা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। প্রিয়দর্শীনী মুত্তা মামলায় প্রথমে অভিযুক্ত বেকসুর খালাস পায়। আইপিএস অফিসারের ছেলের বিরুদ্ধে তদন্তে ঢিলেমিতে অভিযোগ ওঠে বিচার ব্যবস্থার উপর রাজনৈতিক প্রভাব। দ্বিতীয় বার তদন্তে সেই অভিযুক্তই দোষী প্রমাণিত হয়। শেখ সোহরাবুদ্দীন ভুয়া সংঘর্ষ মামলায় ততকালীন গুজরাত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে সিবি আই তদন্ত করলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও ততকালীন গুজরাত মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল বিজেপি সিবিআই কে কংগ্রেস ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বলে সমালোচনা করেন। রাজনৈতিক পাশা উল্টে যেতেই স্বশাসিত সংস্থার উপর ক্ষমতা প্রদর্শন ও স্বস্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ বর্তমান বিজেপি সরকারের উপর পড়েছে। সাম্প্রতিক সিবি আই অধিকর্তা অলোক বর্মা ও অস্থায়ী প্রধান রাকেশ আস্থানা নিয়ে যে প্রহসন মঞ্চস্থ হয়েছে তা এক কথাই নজির বিহীন। যে পরিস্থিতি কে হাতিয়ার করে কংগ্রেস সহ বিরোধী রাজনৈতিক দল সিবি আই কে বিবিআই বা বিজেপি ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বলে সমালোচনা করছে। এমন কি মহাত্মা গান্ধীর দৌহিত্র ও পশ্চিম বঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী সিবিআই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সিবি আই এখন ডিডিটি অর্থাৎ ডিপার্টমেন্ট অব ডার্টি পলিটিক্স। এইচডি দেবগৌড়া ও ইন্দ্রকুমার গুজরাল প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সিবি আই কে ব্যবহার করেছিলেন। কংগ্রেস সমর্থন প্রত্যাহার করে ইন্দ্রকুমার গুজরাল সরকার ফেলে দিয়ে ছিল। এছাড়াও স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার কাজে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে ও বিবাদে জড়াতে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক কালের কিছু ঘটনা এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে আরও পরিস্কার করে দেয়। ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গায় অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা জগদীশ টাইটলার বেকসুর খালাস পেলেও পুনঃতদন্তে জগদীশ টাইটলারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন মামলায় প্রথমে ছাড় পেয়ে যান মায়াবতী ও মুলায়ম সিং যাদব। সরকারের চাপে সময়ের ১২ আগে সিবিআই প্রধানের পদ থেকে রঞ্জিত সিংহকে সরে যেতে হয়। তাজ হেরিটেজ নিয়েও যথেষ্ট চাপ ছিল সিবি আইয়ের উপর। তদন্তের রিপোর্ট মনপছন্দ না হলে সিবি আই ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে টানাপোড়েন চলে। ১৯৯৯ সালে সিবি আই প্রধান ইউ সি মিশ্রের সঙ্গে ততকালীন মুখ্যসচিব ব্রজেশ মিশ্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিলো শুধুমাত্র মায়াবতীকে কেন্দ্র করে। আবার ২০০৪ সালে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় লালকৃষ্ণ আদবানিকে নির্দোষ ঘোষণা করার কারণ লিখিত ভাবে জানাতে হয়েছিল। মোদ্দা কথা স্পর্শকাতর রাজনৈতিক মামলার তদন্তে সিবি আই চিরকাল ক্ষমতাসীন দলকে বা সরকারকে তোষামোদ করেই এসেছে। রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের যেকোনো ঘটনায় সিবি আই তদন্তের দাবি সাধারণ মানুষের কাছে অতি পরিচিত ঘটনা। কিন্তু সিবি আই তদন্ত করলেই যে সব ঘটনার সুবিচার পাওয়া যায় বা গেছে এমন নয়। বরং সিবিআই অধীনে থাকা মামলা ঘাটলে দেখা যাবে সিবিআইয়ের সাফল্যের তুলনায় ব্যর্থতার খতিয়ানই বেশি। রাজ্যের প্রায় ৪০০ মামলার তদন্তে সিবি আই থাকলেও বিগত দু'দশকে তাদের তেমন কোনও সাফল্যই নেই। এমন কি জাতীয় লজ্জা হয়ে ওটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরির কিনারা আজও কিন্তু অধরা। তবু মানুষ সিবিআইয়ের উপর বিশ্বাস রেখেছিল। কিন্তু সংস্থার প্রধান ও দ্বিতীয় প্রধান নিজেদের দূর্নীতি নিয়ে যেভাবে সর্বসমক্ষে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করছে তা মঞ্চ প্রহসনকেও হার মানায়। আগের দিনে মিডিয়া কম থাকায় ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজলভ্য না থাকাই সিবিআইয়ের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের সামনে পড়েনি। আজকের শক্তিশালী বৈদ্যতিন মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত সিবিআইয়ের গোপন মুখোশকে সবার সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং তার স্বশাসন বা অধিকারে রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেইৎ।