Samokal Potrika

এখনো পড়ে যায়, সেই দিন গুলির কথা। আজ থেকে পনেরো-ষোলো বছর আগের কথা। আমরা একটি পল্লী গ্রামে বসবাস করতাম। গ্রামের নাম জগন্নাথকান্দি। এই জগন্নাথকান্দি গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষের'ই প্রধান পেশা ছিল কৃষি। আমার বাবাও কৃষি কাজ করতেন। তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ থেকে সাত বছর হবে। আমাদের গ্রামের পূর্বে বিস্তৃর্ণ মাঠ জুরে শুধু রবি শশী ও ফসলি জমি। গ্রামের মানুষ তখনো বাজারের বোতলজাতক সয়াবিন তেল খেত না। সাবাই ঘানী ভাঙ্গিয়ে তেল খেত।  আর এসব ঘানি ভাঙ্গানোর জন্য তেল জাতীয় দানা যেমন: তিল,শরিষা, পিশি, গর্জন, চাষ করত। এসব ফসল গুলির ফুল সাধারণত জনুয়ারি মাস থেকে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে ফুল ফুলে ভরে থাকে। তাছাড়াও অন্যান্য রবি শশীর ফুল গুলিও ফোটে থাকে। সেই সাথে ফোটে থাকে হাজারো গ্রাম্য ফুল!

একুশে ফেব্রুয়ারি আসার আগের দিন আমাদের জমির সব ফসলি ফুল গুলি পাহারা দিতে হতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা আমাদের জমির ফুল গুলি পাহারা দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। পর দিন জমিতে দিয়ে দেখতাম অনেক গাছের কান্ডে'ই ফুল নেই! রাতে চুরি হয়ে যেত! বিশেষ করে গর্জন ফুল গুলি। এই গর্জন ফুলের রং হলুদ। দেখতে সূর্যমুখী ফুলের মতো। তবে সূর্যমুখী ফুল থেকে অনেকটা ছোট। তাই গ্রামের ছোট বড় সব ছেলে মেয়েদেরই এই ফুলের প্রতি একটু বেশী আকর্ষণ ছিল। এই ফুল দিয়ে তারা মালা গেথে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতো।

বিশ'ই ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকেই বড়রা ফুলের ডালা বানাতে ব্যস্ত হয়ে যেত। তখনো গ্রামে সচারাচর এত ফুল বিক্রি হতো না। যা হতো তাও খুব চড়া দামে বিক্রি হতো। তাই সবাই কিছু গাধা ফুল দিয়ে, বাকি সব গ্রাম্য হরেক রকম ফুল দিয়ে সুন্দর ও নিপুণ ভাবে ফুলের ডালা সাজিয়ে শহীদ মিনারে এসে সকল শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরের প্রথম প্রহরে'ই ঘুম থেকে উঠলেই। মাইকে শোনা যেত, আব্দুল জব্বারের কন্ঠে গাওয়া সেই বিখ্যাত গান গুলি:
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি"।
"সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে, আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণে"।

কারো মাথায় মাইক, কারো মাথায় ব্যাটারি, কারো হাতে মাইক্রোফোন, কারো কারো হাতে ফুল, মালা সহ ফুলের ডালা নিয়ে সবাই এক সাথে লাইন ধরে রওনা হতো আমাদের গ্রামের পাশের শহীদ মিনারটির দিকে।
"মহান একুশে ফেব্রুয়ারি-অমর হোক অমর হোক"। "শহীদ ভাইয়ের রক্ত-বৃথা যেতে দেব না"।
সবার মুখে থাকতো এমন আরো নানান রকম শ্লোগান ও মিছিল।

সবাই খালি পায়ে হেঁটে হাবাতিয়া নদীর তীরে পঞ্চবটি নামক স্থানে,  ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া মোঃ মনিরের সমাধির পাশের শহীদ মিনারটিতে ফুল দিয়ে চলে যেতো মাথাভাঙ্গা ভৈরব উচ্চ বিদ্যালয়ে। যেটিকে আমরা ( আমাদের হাইস্কুল) বলতাম। 
সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা নৃত্য করতো গান গাইতো। একুশে ফেব্রুয়ারির নাটকের অভিনয় করতো। অনুষ্ঠান শেষে আমরা বাড়ি ফিরে আসতাম।

রাতে আমাদের গ্রামে নাটক হতো। বড় ভাই কিংবা বাবার সাথে নাটক দেখতে যেতাম। বড়রা সমস্ত মুখে রং মেখে।  কৃত্রিম দাঁড়ি গোঁফ লাগিয়ে খেলনার পিস্তল হাতে নিয়ে অভিনয় করতো। কয়েকজন ছেলে মেয়েদের জামা কাপর পড়ে মেয়েদের অভিনয় করতো। নাটক দেখতে দেখতে চোখে ঘুম চলে আসতো। আব্বা (বাবা) মিঠাইয়ের মুরালি কিংবা গরম গরম গুলগুলা অথবা বাদাম নিয়ে আসতো। এগুলি খেলে ঘুম চলে যেত।
পরদিন স্কুলে যাবার সময় দেখতাম যারা যারা অভিনয় করেছে তাদের মুখের মেকাপ গুলি।

একুশে ফেব্রুয়ারির সেই সব স্বর্ণালী দিন গুলি কত ভালো লাগতো। কত মজা করতাম। কত আনন্দ হতো। কত উৎসব হতো। একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে কত আয়োজন হতো।

কিন্তু এখন আর সেইসব স্বর্ণালী দিন গুলি ফিরে আসে না। এখনো বছর বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসে। কিন্তু হয় না একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে সেই আয়োজন ও উৎসব গুলি। এখন আর সেই গ্রাম্য কমদামি ফুল দিয়ে কোন ডালা সাজানো হয় না। চুরি হয় না সেই গর্জন ফুল গুলি। কালের পরিবর্তে এখন আর সেই গর্জন ক্ষেত চোখে পড়ে না। গ্রামের পাড়া, মহল্লার, মাইকে আর বাজে না, সেইসব দেশাত্মবোধক গান গুলি। হয়না আর একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে কোন নাটক আর যাত্রাপালা।
বর্তমান এই ডিজিটাল বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই, ছেলে মেয়ে গুলি আর গ্রাম্য ফুল গুলি হাতে নেয় না। দামি দামি দেশী বিদেশী ফুল কিনে প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরকে আদান প্রদান করে। এখন আর কেউ বাংলা গান শুনে না। স্পিকারে হিন্দি, ইংরেজি আর ডিজে গান বাজিয়ে এখানে সেখানে ঘুরতে যায়।

এটাই কী একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব ও তাৎপর্য? এটাই কী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা? এগুলি'ই কী শহীদের রক্তের প্রতিদান??