Samokal Potrika

চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম রাজধানীতে। সেখান থেকে বের হয়ে পড়লাম ট্রাফিক জ্যামে। না হলে বহু আগেই স্টেশনে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। যাইহোক, স্টেশনে পৌঁছে জানতে পারলাম একটি ট্রেন এখনও আছে যেটি যাত্রাপথে আমার শহরের স্টেশন ধরবে। রাত বাড়ছে। আমি আর দেরী না করে ট্রেনে উঠে গেলাম। ট্রেন যখন আমার শহরের স্টেশনে এসে পৌঁছল, তখন ঘড়ির কাটায় রাত তিনটা। এই স্টেশনে একমাত্র আমিই নামলাম। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। পথে কোন লোকজন নেই। এই বৃষ্টিতে পথে চলা যায় না। যদিও ব্যাগে ছাতা আছে, কিন্তু বাতাসের যা অবস্থা, নির্ঘাত ছাতা উড়িয়ে নিয়ে যাবে! বৃষ্টি কমার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এলে হেঁটে রওনা হলাম বাড়ির পথে। রাস্তায় যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা আছে। পথ চলতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। কৃত্রিম আলোয় আলোকিত এই মফস্বল শহরের একলা পথে আমি একটি মেয়ে একলা হেঁটে চলছিলাম। ভালোই লাগছিল। হঠাৎ করে একটি লোক এসে আমার সামনে দাঁড়াল। লোকটির পড়নে শুধু একটা ছেঁড়া হাফপ্যান্ট ছাড়া আর কিছু নেই, চোখদুটি টকটকে লাল, মহিষাসুরের মত শারিরীক গঠন, দোদুল্যমান শরীর। সে এসেই খুব বিশ্রী করে হাসল আর তারপর আমার গলার হারটা টান দিয়ে নিয়ে ধীরে সুস্থে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। আমি ক্রমাগত চিৎকার করছিলাম, কিন্তু তাতে কিছু হলো না। কেউ এলো না, কিছুক্ষণ পরে সে অন্ধকার গলির মাঝে মিলিয়ে গেল। হারটি আমার অনেক শখের ছিল। আমার সবথেকে প্রিয় ছোট কাকুর দেয়া উপহার। কাকু আজ পৃথিবীতে নেই, তবুও এই হারটিতে আমি যেন কাকুকে অনুভব করতে পারতাম। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম। বাসায় সবাইকে সব ঘটনা খুলে বলার পর ভেবেছিলাম অনেকগুলো সান্তনার হাত এগিয়ে আসবে। কিন্তু ভুল ভেবেছিলাম, ছোটবেলা থেকে  যাদের সাথে বেড়ে ওঠা তাদের আমি আমার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনেও চিনতে পারিনি। প্রথম যে প্রশ্নটি শুনতে হলো তা করেছিলেন আমার মা। তিনি বললেন, ”মা, শুধু হারটাইতো নিয়েছে, আর কিছু করেনিতো?” আমি  মাথা নেড়ে না বললাম। তারপরও সবাই কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকাতে লাগল। আমার বৌদি বললেন, ”কি দরকার ছিল একটা মেয়ে হয়ে অত রাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটার? যদি তোমার কথা সত্য হয়, তবে তো বলতেই হবে চোরটা অনেক ভালোই ছিল, তোমায় রাতের রাস্তায় একা পেয়েও শুধু হারটা নিয়েই ছেড়ে দিয়েছে!” আমি অবাক হয়ে গেলাম তার কথা শুনে। আমার বৌদি তো অশিক্ষিত নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সে অনার্স মাস্টার্স দুটোই করেছে। সে কি জানে না যে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমি যখন খুশি তখন রাস্তায় হাঁটতে পারি? রাস্তাতো করাই হয়েছে আমার হাঁটা চলার জন্য--সে রাতে হোক বা দিনে। তাহলে রাতে রাস্তায় হাঁটা অপরাধ হবে কেন? আমি স্বাভাবিক একজন মানুষ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে কোন আইন ভঙ্গ না করে আমার ঘরে ফিরছিলাম, আর এমন সময় একটা লোক এসে আমার গলার হারটা কেড়ে নিয়ে চলে গেল! আর উল্টে আমাকেই এখন ইনিয়ে বিনিয়ে অপরাধী বানানো হচ্ছে, আর যে সত্যিই অপরাধ করলো, তার শাস্তি তো দূরস্ত, তাকে দোষী হিসেবেই গণ্য করছে না আমার বৌদি। বরং শুধু হারটা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ায় আমার বৌদি তাকে ’ভালো’ বলতেও দ্বিধা করেনি! অনেক গোলমার হল ঘরে। আমার চারপাশটা পুরো অচেনা লাগছিল। রাতে একটুও ঘুম হলো না।

পরের দিন সূর্য ওঠেনি। টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল। আমি একটু বাইরে বের হতে চেয়েছিলাম। আমাদের বাড়ির গেটের পাশেই একটা চায়ের দোকান আছে। সেখানে পাড়ার কিছু শিক্ষিত বেকার আড্ডা দিচ্ছে। বাড়ির ভেতর থেকেই শুনতে পেলাম তারা খুব রসালো বিষয় নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে আর সেই রসালো আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু আমি। গতকাল রাতের ছিনতাইকারীটা যে কত বড় বোকামি করেছে আর সে জায়গায় তারা থাকলে যে কি করে সুযোগের ’সদ’ব্যবহার করত তা নিয়ে বেশ রসিয়ে আলোচনা চলছে। চায়ের দোকানির বাড়ি আমাদের ঠিক পাশেই। সে নিশ্চয় রাতের বেলা গোলমালের সময় কান পেতে সব শুনেছে আর এখন তার খদ্দেরদের নিয়ে সে বিষয়ে রসালো আলোচনা জমিয়ে তুলেছে। আমি মাথা নিচু করে বাড়ির ভিতরে চলে এলাম। আমার আর আজ বের হওয়া হলো না। মেয়ে হয়ে রাতের রাস্তায় একা চলার অপরাধে আমি এখন বাড়ি নামক কারাগারের চারদেয়ালের বন্দিনী।