Samokal Potrika

রিয়ার কথা শুনে অবাক হয়ে গেল রাহুল। রিয়া দিয়ার ছোট বোন। রাহুলের ওকে ভাল লাগত ঠিকই কিন্তু ও বরাবরই রিয়াকে নিজের হবু শালীর নজরেই দেখত। আজ প্রায় দুবছর যাবত দিয়ার সাথে ওর গভীর প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু ওকে বিয়ে করা তো দুরের কথা, শালীর বেশি কোনদিন ভাবতেই পারেনি। রিয়া আজকালকার স্মার্ট মেয়ে। ওর দিদির মত অতো লম্বা নাহলেও দেখতে শুনতে বেশ ভাল। বয়স এখন মাত্র বাইশ। দিয়ার চেয়ে তিন বছরের ছোট। এবার সবে বিকম পাশ করে স্যাপের একটা কোর্সের ট্রেনিং নিচ্ছে। ভবিষ্যতে চাকরি করবার ইচ্ছা। দিয়ার মত ঘরোয়া স্বভাবের মেয়ে নয় রিয়া। দিয়াতো বিএ পাশ করে আর পড়লই না সংসারের জন্য। আসলে দিয়া আর রিয়ার মা অঞ্জলিদেবীর হাই ব্লাড সুগার আছে। ওদের আর কোন ভাইবোন নেই। বাবার বয়স হয়েছে। আর মাত্র তিন বছর বাদেই রিটায়ার করবেন প্রফুল্লবাবু। সিইএসসিতে ভাল চাকরি করেন ভদ্রলোক। হেদুয়াতে নিজদের পৈত্রিক দোতলা বাড়ি। নিচে দুটো ভাড়াটে আর ওঁরা উপরে থাকেন সপরিবারে। স্ত্রীর চিকিৎসা এবং মেয়েদের পড়াশুনা করিয়ে মানুষ করে বিয়ে দিয়ে দেবেন এই ছিল প্ল্যান। বাধ সাধল দিয়া। বিয়েও করবে একটা শর্তে, তা’হল গ্রাজুয়েসনের বেশি আর পড়বে না মেয়েটা। আসলে ওর মার প্রতি ভীষণ টান। মার এই শরীর খারাপের মধ্যে একা সংসারের সব কাজ করেন। সেটা দিয়ার ভাল লাগেনা। ঠিক করল ও যত দিন পারবে ওর মাকে সাহায্য করবে। রাহুলকে বলল, আরেকটু অপেক্ষাক রতে।

দিয়ার বাবা মা সবাই রাহুলকে বেশ পছন্দ করেন। দিয়ার এক বান্ধবীর দাদা রাহুল। মানিকতলায় নিজেদের বাড়ি। বাবা ছিলেন ডাক্তার। বড় দা থাকেন আমেরিকায়। আর ছোট বোনের বিয়েও হয়েছে কলকাতার এক চাইল্ডস্পেশালিষ্ট ডাক্তারের সাথে। বাড়িতে এখন শুধু রাহুল ওর বিধবা মা। আর এক চল্লিশোর্ধ মানসিক অসুস্থ ছোট কাকা। রাহুল নিজে কম্পুটার নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন সল্টলেকে সেকটর ফাইভে একটা মালটিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। মাস দুয়েক আগেই কোম্পানির কাজে নিউইয়র্ক ঘুরে এসেছে। দুবছর আগে বোনের বিয়েতে দিয়াকে দেখার পর থেকে ওদের প্রেমের শুরু। অঞ্জলি দেবীর ভীষণ ভাবে শরীর খারাপ হয়ে পড়ে ঠিক যখন রাহুল আমেরিকায়। প্রফুল্ল বাবু আর দিয়া ওদের পারিবারিক ডাক্তারের পরামর্শে ওঁকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করালেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। রিয়া তখন ওর ক্লাসে ছিল। ডাক্তার রোগিকে দেখে সমস্ত রকম টেস্ট করিয়ে প্রফুল্ল বাবু ও তার মেয়েকে চেম্বারে বসিয়ে শান্ত ভাবে জানালেন,’আপনার স্ত্রীর দুখানা কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। ওনাকে আমরা ডায়ালাইসিসেরেখে দিচ্ছি, কিন্তু যত  ড়াতাড়ি সম্ভব ওঁর একটা কি ডনি চাই। আমাদের হাসপাতালের ব্যাঙ্কে এই মুহূর্তে কোন কিডনি পাবেন না। আপনি একজন কিডনি ডোনার জোগার করুন ইমিডিয়েটলি।‘

ডাক্তারের কথা শুনে প্রফুল্ল বাবু ও দিয়া আকাশ থেকে পড়ল যেন। ব্যাপারটা যে এতদুর গড়িয়েছে সেটা ওঁরা মোটেই টের পায়নি। লোকাল ডাক্তারের উপর খুব রাগ হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু কি আর করা। প্রফুল্ল বাবু জানেন যে বাইরে থেকে একটা কিডনি কিনতে গেলে লক্ষ লক্ষ টাকার প্রয়োজন। এদিকে দু দুখানা মেয়ে ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে, ওদের তো বিয়ের বয়স পার হতে চলল। অসহায়ের মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বসে রইলেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে। না পারছেন মুখে কিছু বলতে না পারছেন কোন উপায় বেড় করতে। দিয়া কিন্তু অতোটা ঘাবড়ে যায় নি। দিয়া ডাক্তার বাবুর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,’ আচ্ছা ডাক্তার বাবু, আমার একটা কিডনি যদি আমি ডোনেট করি তাহলে আমার মাকে বাঁচাতে পাড়বেন তো ? আমি আমার একটা কিডনি দাণ করবো। আপনি শুধু বলুন যে তাতে আমার মা বাঁচবেন কিনা ?’

ডাক্তার বাবু একটু হেসে বললেন,’দেখ মা, তোমার মা একটা কিডনি পেলেই বেঁচে যাবেন এটুকু আমি শিওর বলতে পারি, কিন্তু তোমাদের হাতে এখনো তিন চারদিন সময় আছে। তোমাকেই যে কিডনি দান করতে হবে তার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। তোমরা বাইরে থেকে চেষ্টা করে দেখ আগে।‘

দিয়ার বাবা, মানে প্রফুল্ল বাবু চমকে উঠলেন দিয়ার প্রস্তাব শুনে। উনি জানেন যে দিয়া ওর মাকে ভীষণ ভালোবাসে, ওর কাছে ওর মা ই সব। কিন্তু তার জন্য এভাবে নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে দিয়া নিজের একটা  কিডনি দান করে দিলে ওর ভবিষ্যতে কোন বড় বিপদ ঘনিয়ে এলে, তখন কি হবে ? মেয়েটার সামনে বিয়ে। ওর হবু বর রাহুলই বা সেটা মেনে নেবে কেন ? ও যদি দেখে বিয়ের আগেই ওর স্ত্রী একটা মাত্র কিডনি নিয়ে ওর সাথে জীবন সুত্র বাঁধতে চলেছে, তাতে ওরও তো অমত থাকতে পারে। প্রফুল্ল বাবু মেয়ের কথার কোন প্রতিবাদ না করে ডাক্তারের কাছ থেকে কলকাতার আরও দুখানা বড় হাসপাতালের কন্সারন ডাক্তার ও দুটো অরগান ডোনেসন সংস্থার ফোন নম্বর নিয়ে বেড়িয়ে এলেন।

বারান্দায় এসে প্রথমেই প্রফুল্ল বাবু মেয়ের হাত চেপে ধরে বললেন, ‘শোন মা। তোর এতো তাড়াতাড়ি উতলা হবার কোন প্রয়োজন নেই। আমি বাকি হাসপাতাল ও এই দুটো সংস্থায় খোঁজ খবর নিয়ে দেখি। ডাক্তার তো বলল আরও তিন চারদিন সময় আছে হাতে। একটু অপেক্ষা কর মা। তোর মার জন্য আমি তোকে কিছুতেই এতবড় একটা রিস্ক নিতে দেবনা। চলতো, এখন তুই আগে বাড়ি চলে যা । আমি এদিকটা দেখছি।‘

কিন্তু দিয়ার মন মানছিল না। ও বাড়িতে ফিরে এলো ঠিকই কিন্তু মনটা খচখচ করতে লাগল। বাবা সব জায়গায় নিজে গিয়ে বা যোগাযোগ করে সেদিন কোন কিডনির সন্ধান পাননি। একটু বেশি রাতে রাহুল ওকে ফোন করে জানতে চায় দিয়ের মা এখন কেমন আছেন। গত রাতেই শুনেছিল ওঁর শরীর খুব খারাপ হয়েছে ও আজ সকালে হাসপাতালে ভর্তি হবার কথা। দিয়া রাহুল কে সব খুলে জানাল যে ওর মার এখন শুধু একটা কিডনি চাই, তাহলেই ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছেন যে মা বেঁচে যাবেন এই যাত্রায়। বাবা সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে একটা কিডনি জোগাড়ের খুব চেষ্টা করছেন।

রাহুল সব শুনে জিজ্ঞাসা করল,’ কিন্তু তোমার বাবা যদি কোন ডোনার না পান তখন কি করবে ? আমেরিকা হলে না হয় আমিও এখানে চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু ওখানে তোমরা একা কি করবে তাহলে ? আমার ফিরে আসতে তো এখনো প্রায় এক সপ্তাহ লাগবে।‘ রাহুলের গলায় দুশ্চিন্তার ছায়া।

দিয়া এবার ওকে বলেই ফেলল ওর মনের কথা। একটু থেমে থেমে বলল,’দেখ, যদি কোনখান থেকে কোন ভাবে একটা কিডনি জোগাড় না করতে পারা যায়, তাহলে আমি ঠিক করেছি আমার একটা কিডনি মা কে আমি ডোনেট করবো। যে ভাবেই হোক আমি মাকে বাঁচাবই, মরতে দেবনা কিছুতেই।‘ কথাগুলি বলতে গিয়ে  দিয়ার গলার স্বর কেঁপে ওঠে। দুচোখ ভরে ওঠে অন্তঃসলিলার জলে।

ওদিক থেকে রাহুল প্রথমে বাক্রুদ্ধ হয়ে যায় ওর হবু স্ত্রীর কথা শুনে। কি বলছে কি মেয়েটা ? ও কি জানেনা যে একটা মাত্র কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা কতটা রিস্কি ব্যাপার। রাহুল একটু চুপ করে থেকে বলে,’শোন, আমার মনে হয়না সেটা কোন বুদ্ধিমতীর মত কাজ হবে। এতে তোমার মা হয়ত আপাতত বেঁচে যাবেন কিন্তু তোমাদের দুজনেরই একটা রিস্ক সব সময় থেকে যাবে। আরও ভাল মত চেষ্টা কর, বাইরে থেকেই তুমি মার জন্য একটা ডোনার ঠিক পেয়ে যাবে। তুমি এখন কোন সিদ্ধান্ত নেবে না এই ব্যাপারে।‘ কথাটা বলে রাহুল আর বেশি কথা বাড়াল না। ‘এখন রাখছি, কাজ আছে অনেক।‘ বলেই লাইনটা কেটে দিল।

দিয়া রাহুলের গম্ভির গলার স্বর শুনেই বেশ বুঝতে পারে যে রাহুল খুব রেগে গেছে দিয়া ওর একটা কিডনি ওর মাকে দান করবে শুনে। কিন্তু দিয়া এই নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্চ করলনা। ও জানে এখন রাহুলকে কিছু বলতে গেলে আরও রেগে যাবে। চুপ করে ‘ও কে গুড নাইট’ বলে ফোন রেখে দিল। ভাবল কালও যদি বাবা কিছু ব্যবস্থা না করতে পারে তাহলে ও নিজেই ওর একটা কিডনি দান করবে, কারো কথা শুনবে না।

পাঁচ দিন বাদে প্রফুল্ল বাবু খুশি মনে মা ও মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কোন খানে কোন কিডনির ব্যবস্থা করা যায়নি দেখে তৃতীয় দিনই দিয়া ডাক্তারবাবুকে একপ্রকার বাধ্য করে ওর একটা কিডনি অপারেশন করে বাদ দিয়ে ওর মায়ের দেহে ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করবার জন্য। ডাক্তার বাবু দিয়া এখনো অবিবাহিত একজন যুবতি, ওর সামনে পুরো জীবনটাই এখনো পড়ে আছে বলে প্রথমে ওকে ‘না না’ বলে এভয়েড করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দিয়া নাছোড়বান্দার মত ওঁর পিছনে লেগে থাকে। বাধ্য হয়ে সময় কমে আসছে বলে ডাক্তার দিয়ার বাবার অনুমতি নিয়ে ওর একটা কিডনি ওর মায়ের দেহে প্রতিস্থাপিত করে তাকে বাঁচিয়ে তুললেন।

কিন্তু নদীর এক পার গড়ে তো আরেক পার যেমন ভেঙ্গে পড়ে ঠিক সেইভাবেই দিয়া আর রাহুলের সম্পর্কটাও ভেঙ্গে যায়। অপারেশনের আগের দিন রাতে রাহুল স্পষ্ট করে দিয়াকে জানিয়ে দিয়েছিল যে ও মোটেই দিয়ার এই একটা কিডনি ডোনেট করবার সপক্ষে নয়। এই নিয়ে দিয়ার সাথে ফোনেই ওদের অনেকক্ষণ ধরে কথা কাটাকাটি হয়। অবশেষে রাগের মাথায় দিয়া বলে বসে,’ ঠিক আছে ,শোন তাহলে, আমি মাকে আমার একটা কিডনি দেবই। তাতে তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করতে চাও না চাইতে পার। আমি তোমাকে বিয়ে করার জন্য আমার মায়ের জীবনটা খোয়াতে পারব না। ও কে, ভাল থেক। গুড নাইট।‘  ব্যস এটাই ছিল ওদের শেষ কথা।

প্রফুল্ল বাবু আগে তার স্ত্রীকে কিছু বলেন নি। বাড়িতে আসবার পরের দিন দিয়ার একটা কিডনি ওঁর স্ত্রীর দেহে স্থাপন করা হয়েছে সেটা জানালেন ওঁকে। দিয়ার মা সব শুনে খুব কষ্ট পেলেন, মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদলেন অনেকক্ষণ। বিশেষ করে এর জন্য দিয়া আর রাহুলের বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে শুনে আরও বেশি কষ্ট পেয়েছেন উনি। দিয়া রাহুলের সাথে আর কোন কথা বলেনি বা ওর ফোনও তোলে নি। এদিকে রিয়া কিন্তু দিদির এই সিদ্ধান্তে খুব একটা খুশি হয়নি। রাহুল ওর কাছে একজন আদর্শ পাত্র। এভাবে বিয়েটা ভেঙ্গে দেওয়াটা ওর ঠিক ভাল লাগে নি।

রাহুল আমেরিকা থেকে ফিরে এসে প্রথম দিনই ছুটে গেছিল প্রফুল্ল বাবুর বাড়িতে। ওখানে গিয়েই শুনতে পায় যে ওঁর স্ত্রীর অপারেশন হয়ে গেছে। দিয়া বাড়িতে ছিল না। বাবার সাথে হাসপাতালে গেছে চেক আপে। ওদিকে রিয়া রাহুলকে বসতে বলে চা খেতে খেতে সব ঘটনা খুলে বলে। ওর বাবা অনেক চেষ্টা করেও কোন কিডনি জোগাড় করতে পারেনি বলে একরকম বাধ্য হয়েই দিদি মাকে ওর কিডনি দিয়ে বাঁচিয়েছে। ওর মা এখন সুস্থ আছেন। দিদি আর বাবা গেছেন হাসপাতালে, দিদি ওর চেক আপ করতেগেছে। রিয়া এবং ওর মা দুজনেই রাহুল কে বসতে অনুরধ করেছিল, কিন্তু রাহুল আর বসেনি। গম্ভির হয়ে চলে যায়, রিয়া ওকে নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। রিয়া রাহুলকে শুধু বলে,’আমি তোমাকে পরে ফোন করব রাহুল দা।‘

রাহুল এসেছিল কিন্তু ওদের জন্য অপেক্ষা করেনি শুনে দিয়া বুঝতে পেরে যায় রাহুল সব জেনে গেছে আর রেগেমেগে চলে গেছে। কিন্তু দিয়া তবুও রাহুলকে ফোন করে ওকে নতুন করে বোঝাবার আর কোন চেষ্টাও করল না। রাহুল যদি ওর অবস্থাটা না বুঝতে চায় আর এই অসময় ওর পাশে না থাকে তাহলে দিয়া আর কি ই বা করতে পারে। থাক রাহুল ওর দেমাক নিয়ে। ভাল হয়েছে একদিক দিয়ে। দিয়া আর কোনদিন বিয়েই করবে না। দিয়া ওর বাবা মার সাথেই ওদের পুত্র সন্তানের মত থেকে যাবে। শুধু রিয়াকে এবার বিয়েটা দিতে হবে।

কিন্তু রিয়া যে মনে মনে রাহুলকে ভালোবাসে সেটা ও কোনদিনই কারো কাছে প্রকাশ করেনি। দুই মাস বাদেই এক দুপুরে রাহুল একটা ফোন পেল রিয়ার কাছ থেকে। রাহুল তখন সবে অফিস থেকে বেড় হবে বলে রেডি হচ্ছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এই সময় হটাত রিয়া ফোন করেছে দেখে রাহুল একটু অবাক হয়। ফোন তুলতেই ওপার থেকে রিয়ার গলা শোনা গেল,’হ্যালো, রাহুলদা ? তুমি এখন কোথায় ?’

রাহুল স্বাভাবিক ভাবেই বলে ওঠে,’ কে রিয়া ? আমি এখন আফিস থেকে বেড় হব বলে রেডি হচ্ছি। কি ব্যাপার, এতদিন পর রাহুলদাকে মনে পড়ল ! তুমি কোথায় এখন ? তোমার ইন্সিটিউটে নাকি বাড়িতে ?’

‘না রাহুল দা। আমি এখন তোমাদের পাড়ায়। রং দে বসন্তী ধাবায় বসে। তোমার অফিস কতদূর ? চলে আসনা এখানে। একসাথে কফি খাওয়া যাবে।‘ রিয়া আদুরে গলায় আহ্বান জানায় ওর রাহুল দাকে।

যায়গাটা রাহুলদের অফিস থেকে ওয়াকেবল ডিসটেন্স। দশমিনিট বাদেই রাহুল এসে হাজির হল রং দে বসন্তী ধাবায়। রিয়ার পড়নে সবুজ কুর্তি আর হাল্কা কচি কলাপাতা রঙের প্রিন্টেড লেগিন্স। ফেদার কাট চুল, হাতে একটা দামীমোবাইলফোন। রাহুল নিজেও নীল জিন্সের উপর স্কাই রঙের টি সার্ট পড়া। রিয়াকে ওর পাড়াতেই হটাত এভাবে দেখে রাহুল বেশ অবাক হয়ে গেল। প্রথমে ভাবল ওর দিদিই হয়ত ওকে পাঠিয়েছে একটা প্যাচ আপ করতে। কিন্তু একটু বাদেই রাহুলের ভুল ভেঙ্গে গেল। রিয়া জানাল ওর এক বান্ধবীর সাথে ওর বাড়িতে এসেছিল এখানে। তারপর বাড়ি না ফিরে ভাবে একবার রাহুলের সাথে দেখা করা যাক। প্রাথমিক কথা বার্তা সেরে কফির কাপ হাতে নিয়ে রাহুলকে অবাক করে দিয়ে রিয়া সোজাসুজি রাহুলকে বলে বসে,’ রাহুলদা, তুমি আমাকে বিয়ে করবে ? আমি কিন্তু তোমাকে সত্যি সত্যি ভালবেসে ফেলেছি।‘

রাহুল শুধু অবাকই নয়, চমকে উঠল রিয়ার কথা শুনে। এতদিন ওকে রাহুল একটা অন্য নজরে দেখেছে। রিয়া মেয়েটা বেশ স্মার্ট আর দেখতেও বেশ সুন্দর, মিষ্টিচেহারা। স্যাপের ট্রেনিং শেষ হলেই ও একটা ভাল চাকরি পেয়ে যাবে। জীবনে অনেক উপরে ওঠার ইচ্ছা ওর। দিয়ার মত অতটা শান্ত স্বভাবের না হলেও রিয়া একজন আধুনিক স্মার্ট ও উচ্চাকাঙ্খি মেয়ে। রাহুলের ওকে বেশ ভালই লাগত। মাঝে মাঝেই রিয়ার সাথে বেশ ইয়ার্কি ঠাট্টাও করত রাহুল। কিন্তু সেই মেয়ে যে ওকেই পছন্দ করে বসে আছে কে জানত। সেই জন্যই কি সেদিন বলেছিল ‘আমি তোমাকে ফোন করব রাহুল দা‘ ? রাহুল এতক্ষনে বুঝতে পারে এখানে ওর আসবার আসল কারন। ওর বন্ধুর বাড়িতে আসাটা একটা বাহানা মাত্র।

রাহুল রিয়ার দিদি যেওর ব্যাপারেআর কোন ইন্টারেস্ট দেখায় না সেটা ভাল করেই বুঝে গেছে। দিয়া নিজেই যখন ওর সাথে সম্পর্কটা কেটে দিল তখন রাহুল কয়েকদিন একাগুমহয়ে ছিল। কারো সাথে বেশি কথা বার্তা বলতো না, শুধু অফিস আর বাড়ি। দিয়া যে এভাবে এক কথায় ওর থেকে দুরে চলে যাবে সেটা রাহুল ভাবতেও পারেনি। দিয়ার আত্মসন্মান বা ওর প্রিন্সিপাল যে সবসময় ওর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা রাহুল বেশ ভালই জানত। কিন্তু ওর মায়ের জীবন রক্ষার ব্যাপারে এভাবে যে ও নিজের ক্ষতি করে ফেলবে রাহুল সেটা কিছুতেই মানতে পারেনি। আজ অনেকদিন বাদে হটাত রিয়া নামের মেয়েটা যেন এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে নিয়ে এল ওর শুকনো মরুভূমিতে। রাহুলের বেশ ভাল লাগলেও সঙ্গে সঙ্গে রিয়ার প্রস্তাবে রাজি হল না।

রাহুল রিয়াকে এক সাগর চিন্তায় ফেলে দিয়ে শুধু হেসে বলল,’ তাই নাকি ? আমি তো সেটা জানতাম না যে আমাকে আরও কেউ ভালোবাসে। কিন্তু তুমি তোমার দিদির সাথে আমার সম্পর্ক আজ কেন ভেঙ্গে গেছে সব জেনেও আমাকে বিয়ে করতে চাইছ কেন রিয়া ? তুমি কি বেশি রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছ না ?’

রিয়া এবার টেবিলের উপর রাখা রাহুলের হাতটা চেপে ধরে বলল,’ রাহুল দা।বিস্বাস কর। আমি খুব প্র্যাক্তিকাল, সব জেনে শুনে ও অনেক চিন্তা ভাবনা করেই এই ডিসিশন নিয়েছি। তুমি আমাকে না করোনা প্লিস। আমি জানি দিদি শুনলে হয়ত দুঃখ পাবে। কিন্তু ওর ভাগ্য তো ও নিজেই ঠিক করেছে বল। তাহলে আমি কোন ভুল করলাম ? আমি  কেন আমার মনের মানুষটাকে কষ্ট পেতে দেখেও চুপ করে থাকব ? তুমি আমাকে গ্রহন কর রাহুল দা। আমি সত্যি তোমাকে খুব ভালোবাসি। ‘

রাহুল আসতে করে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে শুধু বলল,’আমাকে একটু ভাববার সময় দাও রিয়া। পরশু ঠিক এই সময় তুমি এখানে আমার জন্য অপেক্ষা কোর। আমি এখন আসি। তুমি বাড়ি চলে যাও। রাত হচ্ছে, দেড়ি কোরনা। তোমাকে অনেক দুর যেতে হবে। চাইলে আমি তোমাকে বাড়ির কাছাকাছি ড্রপ করে দিতে পারি।‘

রাহুলের বাইকে করেই বাড়ির সামনে বড় রাস্তা অবধি লিফট নিলো রিয়া। কিন্তু সারা রাস্তা রাহুল এই ব্যাপারে আর কোন কথাই বলল না। ওর মনের ভিতর তখন ঝড় বয়ে চলেছে। যার সাথে এতদিনের ভালোবাসার সম্পর্ক, আজ তারই ছোট বোন ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে। এটা কি ঠিক হচ্ছে ? এখন রাহুল কি করবে ? ও রিয়াকে বিয়ে করলে কি দিয়ার প্রতি কোন অন্যায় করবে ? গভীর চিন্তা ওকে গ্রাস করল যেন।

কয়েকদিন বাদে রিয়ার বাব মা সবাই প্রথমে রাহুল রিয়াকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে শুনেঅবাক হয়ে যান। আর দিয়া একদম গুম মেরে যায়, কোন ভাল মন্দ মতামত দেয়না। রিয়াই প্রথম জানায় যে ও রাহুলকে বিয়ে করতে চায় এবং রাহুল ওকে বিয়ে করতে রাজিও হয়ে গেছে। নিয়তির এই অদ্ভুত পরিহাসে রিয়ার বাবা মা দুজনেই বড় মেয়ের জন্য কষ্ট পেলেও অসহায়ের মত মেনে নিলেন ছোট মেয়ের এই আবদার। একটা ছোটখাটো পার্টি দিয়ে রিয়া আর রাহুলের বিয়ে হয়ে গেল। যদিও দিয়া এই কঠিন বাস্তবকে মেনে নিয়ে ছোটবোনের স্বামী, ওরই প্রাক্তনকে মেনে নিল এবং হাসি মুখে দুজনকেই আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা জানাল।

দিয়া সারাদিন বাড়িতে বসে না থেকে কাছেই একটা সরকারি মেয়েদের প্রাইমারি স্কুলে টিচারির চাকরি জুটিয়ে নিল। এখন সকাল দশটায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে দিয়া বিকাল সাড়ে চারটের সময় বাড়ি ফেরে। ওর মা ততদিনে অনেক সুস্থ হয়ে উঠেছেন। রিয়াও এদিকে মন দিয়ে সংসার করছে আর চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বছরখানেক বাদেই রিয়া সন্তান সম্ভবা হল এবং আপাতত চাকরির চেষ্টা থেকে বিরতি দিল। রাহুল নিজেও চাইছিল না রিয়া কোন রকমের রিস্ক নিক। ও নিজেই যা মায়না পায় তাতে রিয়া চাকরি না করলে কোন ক্ষতি নেই। তার চেয়ে বরং এখন ভালভাবে আগে মা হোক আর তারপর কয়েক বছর বাদে দেখা যাবে।

রিয়া প্রথম সন্তান প্রসব করবে। ওর শাশুড়ি বাবা মা দিদি সবাই খুব খুশি। সাত মাসের সময় রিয়া চলে এলো ওর বাপের বাড়িতে। রাহুল মেঝে মাঝেই এসে ওকে দেখে খোঁজ খবর নিয়ে যায়। দিয়া বোনকে শ্যামবাজারের এক নার্সিং হোমে কার্ড করিয়ে দিয়েছে। সময় সময় দুই বোন গিয়ে ডাক্তারের কাছে হাজিরা দেয় আর রিয়া ওর চেক আপ করিয়ে নেয়। রাহুলের সাথে ইতিমধ্যে দিয়া অনেকটাই ফ্রি হয়ে গেছে। পুরানো কথা টেনে নিয়ে গিয়ে আর কি লাভ হবে। শত হলেও রাহুল এখন ওদের পরিবারেরই একজন।

রিয়ার শরীরে হাই ব্লাড প্রেসারের রোগ আগেই বাসা বেঁধে ছিল। ডেলিভারির সময় ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও রিয়াকে আর বাঁচাতে পাড়লেন না। রাহুল আর রিয়ার একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান হয়েছিল। কিন্তু রিয়া আর নিজের মেয়ের মুখ দেখে যেতে পারল না। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল রিয়া, পিছনে রেখে গেল ওর স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে। এদিকে দিয়া ওর বাবা মা ওদিকে রাহুল ও রাহুলের মা একদম ভেঙ্গে পড়লেন রিয়া ওদের ছড়ে চলে যাওয়ায়। এতো মিষ্টি মেয়েটা এভাবে ওদের ছেড়ে চলে যাবে কেউ ভাবতেও পারে নি।

রিয়ার সন্তান ডেলিভারি হয়েছে , কিন্তু রিয়া আজনেই। কি হবে ওর বাচ্চাটার, কে নেবে ওর দায়িত্ব ? রাহুল দিশেহারা হয়ে পড়ল। আর একদিন বাদেই নার্সিং হোম থেকে শিশুটাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এরই মধ্যে চোখের জলে ভেসে ও রিয়ার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে। রবিবার সকালে শিশুটির ডেলিভারি হয়েছে ও রিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ওদের ছেড়ে চলে গেছে। ওইদিনই বিকেলে শিশুটিকে হাসপাতালের জিম্মায় রেখে ওরা রিয়ার মরদেহ প্রথমে ওদের বাড়িতে ও তারপর শ্মশানে নিয়ে যায়। রাহুল ভাবে পরদিন সোমবার ওর মেয়েকে নিয়ে যাবে ওর মানিকতলার বাড়িতে। একটা আয়া রেখে দেবে প্রথমে, তারপর দেখা যাবে।   

শ্মশানে দিয়া এবং ওর বাবা সর্বক্ষণ ছিলেন রাহুল ও রাহুলের কয়েকজন বন্ধুর সাথে। রাহুলের মনটা ভীষণ ভেবে ভেঙ্গে পড়েছে। রিয়াকে বিয়ের পর ও ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিল , কিন্তু হটাত এ ভাবে রিয়া ওকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে রাহুল সেটা ভাবতেই পারে নি। শ্মশান থেকে বাড়িতে ফিরে সারারাত ভাল করে ঘুমতে পারল না রাহুল। ঘুরে ফিরে রিয়ার মুখটা চোখের সামনে ভেসে আসছিল কেবল। কেন ভগবান ওর কাছ থেকে ওর বুক খালি করে রিয়াকে নিয়ে চলে গেলেন ও ঐ দুধের শিশুটাকে একা করে দিলেন কে জানে।

পরদিন সোমবার সকাল আটটায় নার্সিং হোমে গিয়ে রাহুলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বারান্দায় ছল ছল চোখে দাঁড়িয়ে আছেন প্রফুল্ল বাবু ,মানে ওর শ্বশুর মশাই আর ভিতরে ওর কন্যাকে বুকে চেপে হাউহাউ করে কেঁদে ভাসাচ্ছে ওঁর বড় মেয়ে দিয়া। দিয়া এতো সকালে এসে তার বোনঝিকে বুকে আঁকড়ে ধরে এভাবে কাঁদছে কেন ? তবে কি ওর মেয়ের কিছু হল ? কোন খারাপ খবর নয়তো ?

রাহুল আর থাকতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে শ্বশুর মশাইকেই জিজ্ঞাসা করল,’ কি হয়েছে বাবা ? আপনারা কখন এসেছেন ? আর দিয়া ঐভাবে কাঁদছে কেন, কি হয়েছে ?’

জামাইকে দেখে প্রফুল্ল বাবু এবার কেঁদে ফেললেন। ভেজা গলায় শুধু বললেন,’ আমি জানিনা। আমি বলতে পারব না। তুমি গিয়ে দিয়াকেই জিজ্ঞাসা কর রাহুল।‘

রাহুল আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। তাড়াতাড়ি কেবিনের ভিতরে প্রবেশ করে দিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল,’কি হয়েছে দিয়া ? তুমি এভাবে কাঁদছ কেন ? আমার মেয়ের কি কিছু হয়েছে ? বল কি হয়েছে ওর ?’

রিয়া এবার মুখ তুলে তাকাল রাহুলের দিকে। শিশুটি নিশ্চিন্তে দিয়ার বুকে মুখ বুজে পড়েছিল। দিয়া মুখ তুলতেই সে এবার চোখ খুলে তাকাল দিয়ার মুখের দিকে আর তারপর তার বাবার দিকে। আর ওকে এইভাবে তাকাতে দেখেই হাফ ছেড়ে বাঁচল রাহুল। দিয়াকে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘ কি হয়েছে, তুমি কাদছিলে কেন ?’ দিয়া একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল রাহুলের দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল মায়াভরা মমতা, সেই দৃষ্টিতে ছিল নারীসুলভ স্নেহ ভালোবাসার বন্যা আর দায়িত্বশীলতার দর্পণ। হতভাগ্য রাহুল ওর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। মুখ নিচু করে মেয়ের মাথায় হাত রাখল।

এবার দিয়া কান্না ভেজা গলায় বলে উঠল,’ তুমি জান, কাল রাতে তোমার মেয়ের খুব জ্বর হয়েছিল। আজ সকালেই আমি নার্সের কাছ থেকে ফোন পেয়েই চলে এসেছি। এই কচি দুধের শিশুটাকে তুমি কোথায় নিয়ে যেতে চাইছ রাহুল? আমি ওকে কিছুতেই ছাড়ব না। এখন থেকে ও আমার মেয়ে। ওর নাম আমি দিয়েছি টিয়া। আমাদের রিয়ার মেয়ে টিয়া। কিন্তু এখন থেকে ও আমার মেয়ে হিসাবেই বড় হবে। আমি ওকে মানুষ করব রাহুল, আমি কিছুতেই ছাড়ব না আমার বোনের স্মৃতিকে। তাতে তুমি আমাকে আবার ভুল বোঝ বা না বোঝ, আমার কিচ্ছু আসে যায় না রাহুল। টিয়া আমার মেয়ে আমার মেয়ে......।‘ বলতে বলতে দিয়া আবার টিয়াকে নিজের সন্তানের মত বুকে চেপে কাঁদতে থাকল।

বিস্ময়ে হতবাক রাহুল, টিয়ার বাবা ও দিয়ার ভগ্নিপতি, ওর বিয়ের পর এই প্রথম দিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল, ’আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও দিয়া। আমি জানিনা কি ভাবে আমি তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাব। সত্যি বলতে কি কাল থেকে আমি এই একটা কথাই কেবল ভাবছিলাম। আমাদের সবাইকে ছেড়ে রিয়া তো চলে গেল, কিন্তু কে ওঁর মেয়ের দায়িত্ব নেবে। তুমি তো জান আমার মার বয়স বাড়ছে। আমি কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না দিয়া। তুমি আমাকে আজ অনেকভারমুক্ত করলে। আজ থেকে আমার মেয়ে টিয়া শুধু তোমার মেয়ে। আমি যদিও ওর বাবা, কিন্তু কোনদিন ওর পিতৃত্ব দাবি করতে আসব না তোমার কাছেকথাদিলাম।‘

পিছনে দাঁড়িয়ে সব শুনলেন প্রফুল্ল বাবু। তার বড় মেয়ে দিয়ার মহানতায় তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। নার্সিং হোমে ঢুকেই শিশুটাকে কোলে তুলে নিয়ে ওর বাবাকে দিয়া জানিয়ে দিয়েছিল যে ও বোনের মেয়েকে এডপট করবে। রাহুল কিছুতেই পারবেনা ঐ অতটুকু বাচ্চার দায়িত্ব নিতে। ও চাইলেও কিছুই করতে পারবে না। তার চেয়ে ভাল ওদের মেয়েকে দিয়া নিজের মেয়ের মত মানুষ করবে। প্রফুল্ল বাবু বড় মেয়ের এই আত্মত্যাগের কথা শুনে কেঁদে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওঁর স্ত্রিকেও দিয়া নতুন জীবন দিয়েছে আর আজ বোনঝিকেও নিজের মায়ের স্নেহে বড় করবার দায়িত্ব নিল। শ্রদ্ধায় ওঁর মাথা নত হয়ে গিয়েছিল। কেবিনে ঢুকে দিয়া আর রাহুলের কথা শুনে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘চল দিয়া এবার আমার নাতনিকে নিয়ে বাড়ি যাওয়া যাক। রাহুল তুমি গিয়ে নার্সিং হোমের অফিস থেকে ওর ডিসচার্জ সার্টিফিকেট নিয়ে এসো।‘