Samokal Potrika

বিয়ের প্রায় মাসখানেক পর অজয় আজ স্কুলের জন্য রওনা দিল। রূপসীবাংলা সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস বাঁশি বাজিয়ে শালবনী স্টেশনে এসে থামল। ট্রেনের জানালা দিয়ে সদ্যবিবাহিতা এক তরুণীকে দেখে তার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এই তো সেই মেয়ে যাকে আজও পর্যন্ত তার মনের কথা বলা হয়ে ওঠেনি। 

 

চার বছর আগে তেইশ বছরের অজয় তখন সদ্য পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে গড়বেতা হাইস্কুলে নিযুক্ত হয়েছে। মেদিনীপুর থেকে রূপসীবাংলায় চড়ে প্রতিদিন সে স্কুলে যাতায়াত করতো।ট্রেন শালবনীতে এলেই অতীব সুন্দরী সেই কলেজছাত্রী বান্ধবীদের সাথে প্রথম কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়তো।

বেশ কিছুদিন এইভাবে চলার পর হঠাৎ একদিন অজয়ের নজরে এল সেই মেয়েটি যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে ।অজয় ততটা সুদর্শন না হওয়ায় প্রথমে তার বিশ্বাসই হয় নি।কিন্তু দিনের পর দিন সেই অপরূপা অষ্টাদশীর স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে অজয়ের সুবিদিত গম্ভীর ব্যক্তিত্ব ক্রমশ নিমজ্জিত হতে লাগলো। এরপর মেয়েটা ট্রেনে উঠলেই অজয়ের সহকর্মীরা বলতো," অজয়ের কাজল চলে এসেছে,

কবে রোমান্স শুরু হবে?" এদিকে অজয় ও কাজলের পারস্পরিক অন্তরের বাক্যালাপ হতো সুমিষ্ট দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে। বান্ধবীদের মুখে শোনা সেই মেয়েটির নাম শ্রেয়শী। এই কয়েকদিনে অজয় এটাও জানতে পেরেছিল যে শ্রেয়শী অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের লাজুক মেয়ে। কোনওদিন শ্রেয়সী না এলে অজয়ের উৎসুক দৃষ্টি ট্রেনের জানালা দিয়ে সেই শালবনের মধ্যে পৌঁছে যেত।মনে হতো এই বোধহয় স্টেশনের ওইদিক থেকে ও দৌড়ে আসছে ট্রেন ধরার জন্য।

 

এইভাবে দীর্ঘ পাঁচ মাসে দুজনের প্রেম যতটা এগিয়েছে তা শুধু একে অপরের নিষ্পলক মায়াবী দৃষ্টির হাত ধরে। এযাবৎ তারা মনের কথা একে অপরকের কাছে ব্যক্ত করতে পারেনি। আগষ্ট মাসের সেই দিনটা বোধহয় অজয় কখনোই ভুলতে পারবে না। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। গড়বেতা স্টেশনে ট্রেন থামতেই সবাই ছাতা নিয়ে নেমে পড়লো।অটো ধরার জন্য সবাই দৌড় লাগাল। দৌড়াতে থাকা শ্রেয়শী অজয়ের উদ্দেশ্যে বলেই ফেললো," আমার ছাতাটা নাও,তুমিতো ভিজে  যাচ্ছো।কিভাবে স্কুলে যাবে?

অজয়ের বুকের ভেতরে যেন হাজারো অনাবিল খুশির তরঙ্গ ঢেউ খেলে গেল। এই প্রথম শ্রেয়শী তার সাথে কথা বলেছে, তাকে 'তুমি' সম্বোধন করে কথা বলছে,শুধু তাই নয় তাকে নিজের ছাতাটাও দিতে প্রস্তুত ও।ঠিক তখনই শ্রেয়শীর এক বান্ধবী তাকে বললো,"আরে চল্ আজ প্রাকটিক্যাল আছে"। এই বলে তাকে টেনে নিয়ে অটোয় বসিয়ে দিল।

 

তারপর থেকে আর শ্রেয়শীর সাথে তার দেখা হয়নি। ট্রেন শালবনীতে এলেই অজয়ের মন ব্যকুল  হয়ে উঠতো। নিষ্পলক দৃষ্টি জানালা ভেদ করে যেত।কিন্তু শ্রেয়শীর সাথে আর দেখা হলো না। আর আজ যখন দেখাই হলো তখন নববধূ রূপে।

অজয়েরও অবশ্য দেখাশোনা করে সদ্য বিয়ে হয়েছে। তার বিবাহিত পত্নী সুলেখা বেশ সুন্দরী এবং চপলা। কিন্তু শ্রেয়শীর মতো তার দৃষ্টিতে স্নিগ্ধতা না থাকলেও সে ভীষণ স্পষ্টবাদী।তবে অজয়ের মতো উচ্চশিক্ষিত না হওয়ায় অজয়ের মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধা হয়। অজয়ের উচ্চমাত্রার রসিকতা সুলেখা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না।অজয়ের শিক্ষামূলক কোন আলোচনায় সে অংশগ্রহণ করতেও চায় না। এইসব দেখে অজয়ের অন্তরে চাপা আফসোসের সঞ্চার হয়। তার মনে হতে থাকে যদি শ্রেয়শীর সাথে বিয়েটা হতো!

 

কিন্তু অজয়ের সব আফসোসের স্তূপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সুলেখার নিখাদ এবং অকৃত্রিম ভালোবাসার আলিঙ্গনে। অজয়ের এতটুকু কষ্টেও সে সমান কষ্ট পায়।সুলেখার অপার ভালোবাসার বন্ধনে অজয় বাঁধা হয়ে পড়ে।সুলেখা যে তাকে এতটা ভালবাসে তা ভেবে প্রায়শই সে বিস্মিত হয়। একান্ত মনে অজয় নিজেকেই প্রশ্ন করে এটা শুধুই সম্পর্ক না প্রকৃত ভালোবাসা?