Samokal Potrika

ঠকাস করে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল রোশনি— খালি চা, চা আর চা। উফ… একটা লোক রাখো, বুঝলে, তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টা চা বানিয়ে দেবে। 
পবন কথাগুলো শুনতে শুনতে খবরের কাগজটা টেবিলের উপর রেখে কাপটা তুলে নিল। ও কিছুতেই বুঝতে পারে না, চা করায় রোশনির এত অ্যালার্জি কেন। অথচ এক্ষুনি বলো, দুম করে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দেবে, এমন পকোড়া করবে মনে হবে পেট পুরে খাই। আর ওর হাতের আলুর পরোটার তো কোনও জবাবই নেই। অথচ চা-এর সময়!
পবন চা-টা একটু বেশিই খায়। সকালে বিছানা ছাড়ার আগে। তার পর মুখ ধুয়ে। খবরের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে। বাজার করতে যাওয়ার আগে। বাজার থেকে এসে। এ কাজ ও কাজ করার ফাঁকে। স্নান করতে যাবার আগে। আর যে দিন অফিস ছুটি থাকে, সে দিন তো কথাই নেই, ঘন্টায় ঘন্টায়। যত দিন যাচ্ছে চায়ের প্রতি পবনের আসক্তি যেন ততই বাড়ে যাচ্ছে। আসলে পান বিড়ি তো ছোঁয় না, নেশা বলতে ওই একটাই।
আরেকটা নেশা অবশ্য আছে, সেটা হল নাটক। শখেই করে। পাড়ায় একটা দল গড়েছে। নিজেও চেষ্টা করে নাটক লেখার। সেই সুবাদে দু’-চার জন ওর বাড়িতে আসে। কেউ কেউ আবার ঘরের লোকই হয়ে গেছে।
তেমনি একজন শিলাজিৎদা। সে দিন শিলাজিৎদার তাড়া ছিল। দুটো কথা বলেই চলে যাবে। কিন্তু খালি মুখে যেতে দেবে কে?রোশনি? মুহূর্তে এক কাপ চা নিয়ে এসে হাজির।
— ও খাবে না? চায়ের প্লেট হাতে নিতে নিতে প্রশ্ন করল শিলাজিৎদা।
— ওই ত কাপ। এক্ষুনি খেলো। এখনও বোধহয় গলা থেকে নামেনি।
— আরে, দেবে দেবে। তুমি চুমুক মারো না… মাঝখানে ফোড়ন কেটেছিল পবন।
— না, সত্যিই করিনি। পবনের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কথাটা উচ্চারণ করেছিল রোশনি। মুহূর্তে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল পবন। বোকার মতো একবার রোশনির দিকে একবার শিলাজিৎদার দিকে তাকাচ্ছিল।
— ঠিক আছে বৌদি, একটা কাপ নিয়ে আসুন, আমরা ভাগ করে খাই। এত বেলায় আর এতটা চা খাব না।
— না না, থাক। পবন বললেও শেষ পর্যন্ত ভাগাভাগি করেই দু’জনে মিলে ওই চা খেয়েছিল। কথায় কথায় সে দিন শিলাজিৎদার কাছে রোশনি অভিযোগ করেছিল, পবনের এই ঘনঘন চা খাওয়া নিয়ে। — ক’দিক সামলাব বলুন তো। একটা রান্না যে ঠিক মতো করব, তারও উপায় নেই। এই চা…
— বারবার করেন কেন? একেবারে বেশি করে বানিয়ে ফ্লাস্কে রেখে দেবেন। যখন দরকার হবে নিজেই ঢেলে নেবে। আপনার বৌদি তো তাই-ই করেন।
— তাতে লাভ নেই। তখন দেখবেন ঘন্টায় ঘন্টায় চা করে ফ্লাস্কে ভরতে হচ্ছে। এত চা খায়…  নিজের বুঝটাও নিজে বোঝে না। দেখুন কত চুল পেকে গেছে… এমন করে বলল, যেন ঘনঘন চা খাওয়ার জন্যই ওর চুল পেকে যাচ্ছে।
না, শুধু শিলাজিৎদাই নয়, বিভিন্ন সময়ে আরও অনেকেই বলেছে ফ্লাস্কে চা করে রাখার কথা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ফ্লাস্কেও চা করে রাখবে না, আবার কয়েক বার করার পর, ফের চা করতে বললেই তার প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে আছড়ানো-দাপড়ানোয়।
যেমন আজ হয়েছে। পবন মাঝে মাঝে ভাবে, সংসারে যদি একটা বাচ্চাকাচ্চা থাকত, তা হলে হয়তো… কিন্তু কী করা যাবে! দেখতে দেখতে বিয়ের দশ-দশটা বছর কেটে গেল। তখন যদি দুম করে আলাদা না হতাম! ভাবতে ভাবতে পবন চুমুকে চুমুকে চা-টা শেষ করে তড়িঘড়ি ব্যাগটা নিয়ে বাজারের দিকে পা বাড়াল। ঠিক করল, বাজারে যাবার সময় রোশনি যেগুলো আনার কথা ওকে রোজ বারবার করে বলে এবং যথারীতি ও ভুলে যায়, যা নিয়ে কথাও শুনতে হয়, সেগুলো ও আজ আগেভাগেই কিনবে।
সেই মতো ডালের বড়ি, লেটুস পাতা, গ্রাম-গঞ্জ থেকে আসা বউদের কাছে ঘুরে ঘুরে বকফুল আর নুরুল কেনার পর বউয়ের লিখে দেওয়া ফর্দ মিলিয়ে মিলিয়ে ও বাজার শুরু করল।

ব্যাগ উপুড় করার পর রোশনি কি আর চা না করে পারবে! পাখাটা ফুল স্পিডে চালিয়ে হেলান দিয়ে চেয়ারে বসল পবন। এমন সময় রান্নাঘর থেকে কানে এল– আর দিন পেল না... আজই নিয়ে এল একগাদা বকফুল! এতগুলো ভাজাভুজি করেছি, থাকবে? যোগ নেই, জিজ্ঞাসা নেই, দুম করে আনলেই হল? আমার কি? আমি করে দিচ্ছি। খাও, আর মুঠো মুঠো অ্যান্টাসিড খাও।
পবন দেখল আবহাওয়া খারাপ। স্নান করতে চলে গেল।

অফিসের কাজটুকু তুলে দিয়ে ও সোজা চলে যায় রেক্রিয়েশন ক্লাবে। ক্লাব মানে অফিসের মধ্যেই ষোলো বাই আঠারো স্কোয়ার ফিটের একটা ঘর। দেয়াল লাগোয়া দুটো আলমারি। বড় একটা ক্যারামবোর্ড। কেরামবোর্ডটা বিকেলের দিকে ছেলে-ছোকরারা খেললেও, মেঝের উপরে শতরঞ্চি বিছিয়ে প্রায় সারাক্ষণই এক দল বয়স্ক লোক তাস খেলে যায়। যাদের বাড়ি ফেরার কোনও তাড়া নেই, গেলেও হয়, না গেলেও হয়।
তবে এই সময়টা কেউ থাকে না। কারণ, সবাই জানে, এটা পবনের সময়। পবন রোজ এই সময়ই যায়। আজও গেল। চারটে থেকে নাটকের রিহার্সাল। কিন্তু নায়িকার রোলটা যে করছে, সে একদম আনকোরা। নতুন জয়েন করেছে অফিসে। ওর সেকশন উপরে। চার তলায়। ও তিনটের মধ্যে নেমে আসে। না, কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য নয়, সত্যিই ওর পার্টটা ও ঠিকঠাক মতো করতে চায়। যাতে কেউ হাসাহাসি না করে। তাই অন্য কেউ আসার আগেই পবনের কাছে এসে খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো জেনে নেয়।
মাত্র ক’দিনের আলাপেই বেশ খোলামেলা হয়ে গেছে মেয়েটা। একই দৃশ্য নানা ভাবে করার চেষ্টা করছিল সে। আর বারবার জানতে চাইছিল, কোন ভাবে করলে ভাল হয়। কিন্তু ও দিকে একদম মন ছিল না পবনের। মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ মেয়েটাকে বলল, একটা কাজ করো তো, একটা কাগজে আমাকে দুটো লাইন লিখে দাও…
— কী লিখব? বলেই, উঠে গিয়ে দেয়াল আলমারি থেকে তাসের পয়েন্ট লেখার খাতাটা বের করল পবন। ভেতর থেকে একটা পাতা টান মেরে ছিঁড়ে, পাতাটা খাতার ওপরে রেখে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিল। বুক পকেট থেকে বার করে দিল পেন। তার পর বলল, চিঠির আকারে লিখবে, বুঝেছ?
— কী লিখব? মুখ তুলল মেয়েটি।
– লেখো, পবন, পরশু ঠিক তিনটেয়, মনে থাকে যেন। লিখে নীচে নাম আর ডেট দিয়ে দাও।
মেয়েটি লিখতে লিখতে বলল, কী করবেন এটা দিয়ে?
— লেখোই না, পরে বলব।
ঝটপট করে লিখে সেই পাতা-সহ খাতা আর কলমটা পবনের দিকে বাড়িয়ে দিল মেয়েটা, এ বার বলুন। মাথা নাড়াল পবন। আজ নয়, অন্য দিন। বলতে বলতে কাগজটা ভাঁজ করে বুক পকেটে গুঁজে রাখল।

পবনদের বাড়িতে ধোপা আসে রোববার রোববার। রোশনি  তখন হাতড়ে হাতড়ে আলনা ও ওয়ারড্রব থেকে শাড়ি, জামা, প্যান্ট টেনে টেনে নামায়। পকেটে-টকেট দেখে  গুনে গুনে এগিয়ে দেয়।
সে দিন জামার পকেট দেখতে গিয়ে রোশনির হাতে উঠে এল ভাঁজ করা সেই পাতাটা। যেটা অফিসের ওই মেয়েটিকে  দিয়ে পবন লিখিয়েছিল।
একমাত্র রোববার দিনই ওরা একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসে। এবং একনাগাড়ে বকবক করে যায় রোশনি। কিন্তু আজ পবনের কথায় হ্যাঁ, হুঁ, না— উত্তর দেওয়া ছাড়া প্রায় মুখই খুলল না সে।
রাতে বিছানায় উঠেও খুব একটা কথাবার্তা বলল না। পবনও অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল। তার পর পাশ ফিরে একটা হাত টানটান করে রোশনির বুকের উপরে তুলে দিল সে।
— আবার আমার দিকে কেন? ডান হাত দিয়ে পবনের হাতটা সরাতে চাইল রোশনি।
–কী হল?  বুকের উপর রাখা হাতটা দিয়েই রোশনিকে আলতো চেপে ঝাঁকি দিল পবন।
— কিছু না। বলে, উল্টো দিকে পাশ ফিরল রোশনি।
— কিছু না মানে? পবন নিজের দিকে জোর করে ফেরাতে চাইল ওকে।
— যাদের কাছে যাবার তাদের কাছে যাও। নড়েচড়ে শক্ত হল রোশনি।
— হ্যাঁ, সেই জন্যই তো তোমার কাছে এসেছি।
— ছাড়ো, আমি সব বুঝি। ভেবেছ, ডুবে ডুবে জল খাবে, কেউ টের পাবে না, না?
— কি বলছ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
— এখন তো কিছুই বুঝতে পারবে না। কাল তিনটের সময় কোথায় যাচ্ছ?
— কোথায়?
— কোথায়, না? সুশ্রী কে?
— সু… শ্রী…
— এখন তো চিনতে পারবে না। চিঠিটা দেখাব?
— ও… কাল তিনটেয়? তাই বলো… হ্যাঁ, সুশ্রী, আমাদের অফিসের নতুন মেয়েটা গো… আসলে আমি ঘন ঘন চা খাই তো, তাই কাল বলছিল, সোমবার দিন আপনাকে আমি চা খাওয়াবো। দেখি, ক’কাপ খেতে পারেন। তা আমি বললাম– তুমি তো আবার চার তলায়। চা খাওয়ার জন্য অত সিঁড়ি ভাঙতে পারব না। তখন ও বলল, ঠিক আছে, আপনি রিক্রিয়েশন ক্লাবে ঢোকার আগে গাছতলার ওই বিহারিটার দোকানে চলে আসুন না… ঠিক তিনটেয়, আমি থাকব। দরকার হলে আমি একবার ফোন করে মনে করিয়ে দেব। তা আমি বললাম, আমার ফোন তো সারাক্ষণই সাইলেন্ট মু়ডে থাকে। দেখি যদি মনে থাকে… তখন ও বলল, এটুকু মনে থাকবে না? তা হলে রুমালে একটা গিঁট দিয়ে নিন। আচ্ছা দাঁড়ান, আপনাকে একটা চিরকুট লিখে দিই। তা হলে মনে থাকবে তো? বলেই, খসখস করে ওটা লিখে দিল। কী করব? এত আশা করে দিয়েছে। ওর সামনে তো আর ফেলা যায় না, তাই বুক পকেটে রেখে দিয়েছিলাম। আর তুমি ভাবছ…
পবনের দিকে পাশ ফিরল রোশনি।– না। তুমি ওর সঙ্গে চা খেতে যাবে না।
— কেন?
— না, তুমি যাবে না... বলেই, পবনের বুকে মুখ গুঁজল সে।
— আসলে চা-টা তো…
— আমি তোমাকে করে দেব। যখন চাইবে, যত কাপ চাইবে, বলবে, আমি তোমাকে করে দেব। তাও তুমি কালকে তিনটের সময় ওর সঙ্গে চা খেতে যেতে পারবে না।
— ঠিক আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো করে শব্দ দুটো উচ্চারণ করল পবন। তার পর বলল, তুমি যখন বলছ… বলতে বলতে দু’হাতে আঁকড়ে ধরল রোশনিকে। পবন টের পেল, বুকের ওপর একটা দুটো জলের ফোঁটা পড়ল। সঙ্গে ঘন ঘন গরম নিঃশ্বাস। পবনের মনে হল, রোশনি এক্ষুনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে।