Samokal Potrika

মানুষ কৌতূহল পছন্দ করে। কিন্তু নিজে কখনো কৌতূহলেরর বস্তু হতে চায় না। তবুও পরিস্থিতি মানুষকে কোন না কোন করণ বসত কৌতূহলের বস্তুতে রূপান্তরিত করে তুলে। এই মুহূর্তে আমি অনেকের চোখেই কৌতূহলের বস্তু।
তার কারণ আমি এখন বাতাকান্দি বাসষ্টেশন থেকে হেঁটে বাজারের ভিতরের দিকে যাচ্ছি। আমার পরনে হলুদ পাঞ্জাবী। একেবারে কটকটে হলুদ। আমার সাথে হাঁটছে সতের আঠারো বছরের একটি দূরন্ত্ব  কিশোরী। প্রমিত বাংলায় যাকে বলে অষ্টদশী। অষ্টাদশী শব্দটা অদ্ভুত! অষ্টাদশী শব্দটা মনে হয় অষ্টধাতুর অষ্টধারা থেকে তৈরী হয়েছে! এই অষ্টাদশী তরুণীরা অনেকটা দস্যি টাইপের হয়! এই বয়সটায় মেয়েরা অনেক পাগলামী করে, কারো কথা শোনে না। নিজের ইচ্ছে মতো চলে। এরা সবসময়'ই নিজের ইচ্ছেকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। এই বয়সী মেয়েরা প্রবল আবেগ প্রবণ হয়। কারো কারে মতে এই বয়সটা ভুল করার বয়স। এই বয়সটা প্রেম করার বয়স। এই বয়সটা প্রেমে পড়ার বয়স! ভালো মন্দ বুঝার বয়স, শেখার বয়স।

যাই হোক, আমার সাথে হেঁটে চলা মেয়েটির  পরনে  নীল রঙ এর থ্রীপিছ। এই মেয়ে রূপা কিংবা মাজেদা খালা নয়, এমনকি রূপার ছায়াও নয়। সে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কাল্পনিক চরিত্র হিমুর একনিষ্ঠ ভক্ত। শুধু ভক্ত বললে ভুল হবে। সে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের অন্ধ ভক্ত অথবা অন্ধ বিশ্বাসী। অবশ্য অল্প বয়সী মেয়েদের মনে এমন অন্ধ বিশ্বাস কিংবা অন্ধ আবেগ তৈরীর একমাত্র কারণ হল গল্প উপন্যাস। যা হুমায়ুন আহমেদ স্যার এভাবে বলে গিয়েছেন: 'গল্প উপন্যাস হল অল্প বয়সী মেয়েদের মাথা খারাপের মন্ত্র।'
হয়তো গল্প উপন্যাস থেকেই এই মেয়ের মনে এমন ইচ্ছার উৎপত্তি হয়েছে।

তাঁর ধারণা আমি হিমু। আমার মাঝে সে হিমুর একটা প্রতিচ্ছায়া দেখতে পায়। আমি আসলেই কোন হিমু, মিসির আলী কিংবা কোন মহাপুরুষ নই। হিমু শুধুই একজন, হুমায়ূন আহমেদ স্যারের হিমালয় হিমু। আমি হিমু নই। তবে হিমুর ভক্ত বলা যেতে পারে। হয়তো হিমুর সাথে আমারও অনেক মিল। হিমুর মতো আমিও অদ্ভুত ও উদ্ভট! হিমুর চলাফেরার সাথে আমারো অনেক মিল আছে। তার মানে এই নয় আমি হিমু। আমি একজন অতি সামান্য ক্ষুদ্র মানুষ।

হয়তো এর জন্যই এই মেয়ের ইচ্ছে হয়েছে ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’ ভূতে ঢিল মারা কোন এক মধ্য দুপুরে আমার সাথে হাঁটবে। সবুজে ঘেরা, গাছপালায় ভরপুর কোন এক পল্লী গ্রামের মেঠো পথ ধরে। যে পথের এক পাশে থাকবে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। কৃষকের সারি সারি ধান ক্ষেত তার'ই পাশে পরিত্যক্ত ডোবায় ফোটে থাকবে নাম না জানা হাজারো বনো ফুল। পথের আরেক পাশে থাকবে মুয়ূরাক্ষীর মতো একটি শান্ত নদী। যে নদীর জল হবে কাক কালো! জলের শব্দ হবে কলকলানি। আকাশ থাকবে মেঘে ঢাকা ঘন অন্ধবার কিংবা ঝরতে থাকবে টিপটিপ বৃষ্টি। অজানা অচেনা পথে দু-জন পথিক কিংবা হিমু রুপা হেঁটে চলবে। এই মেয়েও রূপা নয়। রূপা শুধুই একজন হিমুর রূপা। এই মেয়ের সাঁজগোজও অতি সাধারণ মেয়ের মতোই। আমি দেখেছি অতি সাধারণের মাঝে'ই অসাধারণ অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে। হয়তো এই মেয়ে কোন সাধারণ মেয়ে নয়। সে অসাধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে।

আমার সাথে এই মেয়ের হাঁটার ইচ্ছেটা গত কয়েক দিন ধরেই। প্রথমতঃ আমি তার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেইনি। কিন্তু না এই মেয়ে নাছোড়বান্দা সে আমার সাথে হাঁটবেই। আমি ভেবে দেখলাম মেয়েটি আমার সাথে হাঁটবে এটা একটা ক্ষুদ্র ইচ্ছা। আমার জন্য এটা ক্ষুদ্র হলেও হয়তো এই ক্ষুদ্র ইচ্ছেটাই তার কাছে আস্তে আস্তে বৃহৎ রূপ ধারণ করে আছে। কিছু কিছু ক্ষুদ্র স্বপ্ন আস্তে আস্তে বৃহৎ স্বপ্নে পরিণত হয় যায়। আবার কিছু কিছু বৃহৎ স্বপ্ন গুলি সময়ের ব্যবধানে ভেঙে চূরে ক্ষুদ্র থেকে অতি সামান্য হয়ে এক সময় নিঃস্ব হয়ে যায়। আমি চাইনি এই মেয়ের একটি ইচ্ছা একটি স্বপ্ন অপূরণতার চাদরে ঢাকা পড়ুক। তাই তাঁর ইচ্ছেকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে তার সাথে হাঁটতে চলেছি।

আজ শ্রাবণের ১৭ তারিখ আকাশে মেঘ থাকার কথা ছিল। কিন্তু না আকাশে আজ কোথাও মেঘের কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু এই মেয়ের তো ইচ্ছে ছিল শ্রাবণের এই রহস্যময় ও রোমাঙ্চকর আকাশে টিপ টিপ বৃষ্টিতে ভিঁজতে আর হাঁটতে। কখনো বা আবার মেঘেদের নাটকীয়তা ভুলে আকাশে ঝলমলে রৌদ্র উদয় হবে। যে রোদের নাম হবে 'মেঘে ভেঁজা রোদ।' সে মেঘে ভেঁজা রোদেও হাঁটতে চেয়েছে। কিন্তু আজ সমস্ত আকাশ জুড়ে মেঘেদের কোন চিহ্ন কিংবা কোন ছায়াও নেই। তাই হয়তো এই মেয়ের সেই আশাটি পূর্ণ হবে না। মানুষের জীবনের সমস্ত আশা কখনো পূর্ণ হয় না। কিছু কিছু আশা কিংবা স্বপ্ন সবসময়'ই অপূর্ণ থেকেই যায়। কিছু অপূর্ণাতার জন্যই হয়তো পূর্ণতা গুলি এত সুন্দর হয়। অপূর্ণতা ছাড়া পূর্ণতা পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। অপূর্ণাতা আছে বলেই পূর্ণতা এত সুন্দর, এত মধুর ও এত আনন্দময়।

আমি এখন যে বাজারে হাঁটছি এই বাজারের  অনেকেই আমার পরিচিত। আমাকে হলুদ পাঞ্জাবী পড়া অবস্তায় দেখে প্রথমে কৌতূহলী হয়ে লোকজন আমার দিকে তাকায়। তারপর তাকায় আমার সাথে হাঁটা কিশোরী মেয়েটির দিকে। লোকদের চোখে মুখে এমন কৌতূহলী  ভাব আর এমন আড় চোখে তাকানোর দৃশ্য দেখে আমি অনেকটা অপ্রস্তুত ও অনেকটা বিব্রত হচ্ছি। তবুও আমার এই বিব্রত হওয়া ভাব কাউকে বুঝতে না দিয়েই আমি স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে চলেছি। বাজারের আরেক প্রান্তে গিয়ে সি এন জিতে উঠলাম মুয়ূরাক্ষী নদীর মতো একটা নদীর সন্ধানে...।