Samokal Potrika

যমলোকে কেলেঙ্কারি

 এক

অয়ন কিছুতেই মানতে চাইলনা যমরাজের যুক্তি। যতই ওকে বলা হচ্ছে যে ওর সময় শেষ হয়ে গেছে তাই ওকে পরলোকে নিয়ে আসা হয়েছে, ততই অয়ন যমরাজকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। অয়নের বক্তব্য হচ্ছে ওদের কুলপুরোহিত গুরুদেব মহেশ ভট্টাচার্জ মহাশয় অয়নের কুষ্টিতে লিখেছেন যে ওর আয়ু পঞ্চান্ন বছর অবধি। মহেশ ভট্টাচার্জ আজও জীবিত আছেন। বিশ্বাস নাহলে তাকেই জিজ্ঞাসা করা হোক। অয়নের বয়স এখন মাত্র চুয়ান্ন চলছে। তার মানে এখনও প্রায় একবছর ওর বেঁচে থাকবার কথা। তাহলে কেন যমদূত গিয়ে ওকে পৃথিবী থেকে এই যমপুরিতে তুলে এনেছে ? ইয়ার্কি হচ্ছে ? বেসরকারি অফিসের কথায় কথায় কোন অজুহাত দেখিয়ে মায়না কাটার মত ওর একবছর আয়ু কেন কাটা হয়েছে তার জবাব কে দেবে ?

যমরাজ পড়েছেন মহা মুশকিলে। তাহলে কি যমদূত ভুল লোককে মর্ত থেকে তুলে আনল নাকি ? ভাল করে আজকের শিডিউল ওচিটচেক করে দেখলেন, না, এখানে তো অয়ন চক্রবর্তী বলেই লেখা আছে। অয়ন চক্রবর্তী, ৫/৩২ হরিষ চাটুজ্যে লেন, হাতিবাগান, কলকাতা – ৭০০০১৪। এরনাম ঠিকানা সবই তো মিলে যাচ্ছে,তাহলে ? লোকটা পেশায় উকিল বলেই কি তর্ক করার স্বভাবটা যায়নি এখনো ?

যমরাজ গম্ভির স্বরে অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন,”দেখুন অয়ন বাবু। আমার রেকর্ড কিন্তু বলছে আজ আপনারই দিন ছিল এই যমপুরিতে আসবার । আপনার নাম ঠিকানা বয়স সবই মিলে গেছে। সেই কবে আপনাদের এক গুরুদেব কি বলেছেন সেটা ধরে বসে থাকলে তোচলবে না। আপনি একটু বোঝবার চেষ্টা করুন। সাধারণত এখানে পরলোকে মর্তের সরকারি অফিসের মত কাজকর্ম হয়না।“

ব্যাঙ্কশাল কোর্টের দুঁদে উকিল অয়ন চক্রবর্তীর চোখটা হটাত চিক চিক করে উঠল। সরু চোখে যমরাজের দিকে তাকিয়ে সওয়াল করল,”তাহলে আপনি নিজেই স্বীকার করলেন যে কখনো কখনো আপনাদের এখানেও ভুল ভ্রান্তি হয়। সেটা শুধু মর্তেরই একচেটিয়া ব্যপার নয়, কি বলেন স্যর ?”

যমরাজ বেশ বুঝতে পারলেন ওনার কথায় একটা ফাঁক পেয়েই লোকটা চেপে ধরেছে। তাও বাঁধা দেবার চেষ্টা করে বলে উঠলেন,”কই, আমি তো সেকথা বলিনি !”

“ছিঃ ছিঃ স্যর। আপনার মুখে মিথ্যা কথা মানায় না স্যর। এই মাত্র আপনি বলেছেন যে এখানে “সাধারণত” মর্তের সরকারি অফিসের মত ভুল ভ্রান্তি হয়না। তার মানেই হচ্ছে ‘কখনো কখনো’ ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকে। আর তাই যদি হয় আমি শিওর স্যর আপনার যমদূতের কোথাও একটা ভুল হয়েছে। সুতরাং আমার অণুরোধ বা দাবি যাই বলুননা কেন, আমি চাই এটার একটা তদন্ত হোক আগে।“ 

যমরাজ বোধ হয় এরকম পরিস্থিতিতে পড়েননি কোন দিন। এমনিতেই এবার খুব গরম পড়েছে,যমলোকের ওনার অফিসের এ সিটাও খারাপ হয়েপড়েআছে প্রায় দশদিন হল। তার উপর এই লোকটার কথা বার্তায় আরও মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। মাথার প্রায় এক কেজির মত ভারি স্বর্ণ মুকুটখানা খুলে রেখে একটু মাথা চুলকে নিলেন প্রথমে। ভাবতে লাগলেন কি ভাবে ব্যপারটা সামলাবেন এখন।

অয়ন চক্রবর্তী তখনও সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে। মনেমনে ভাবছে দিয়েছি আজ যম ব্যটাকে প্যাঁচে ফেলে। দেখ এবার মজাটা, আমিও ছাড়বার পাত্র নই। আমি হাতিবাগানের ছেলে। অয়নের চিন্তাহলছেলে অমলের কলকাতার সবচেয়ে বড় ল ফারমের চাকরিটা এখনো পাকা হয়নি, ওর নিজের রিটায়ারের আরও চার বছর বাকি, মেয়ে মিনির বিয়ের সম্বন্ধ সবে পাকা হয়েছে মাত্র। আর তেনারা দুম করে এক বছর আগেই তুলে আনলেন ? একবছরের মধ্যে মেয়ের বিয়ে ছেলের চাকরি পাকা সব কিছুহয়ে যেত। আর কোন চিন্তাই ছিলনা।কিন্তু না, সব ভেস্তে গেল এই ওদের ভুলের জন্য।

অনেক চিন্তা করে যমরাজ শেষে ওনার সভায় ডেকে পাঠালেন চিত্রগুপ্তকে। যমদূতকে বলে দিলেন চিত্রগুপ্ত যেন তার সংশ্লিষ্ট খাতা খানা সঙ্গে নিয়ে আসেন। যমরাজ নিজে চোখে একবার ওনার সেই বিখ্যাত খাতাটা দেখতে চান। এখন যমরাজের নিজেরও কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে। এরকম তো হবার কথা না !

মিনিট দশেক বাদেই বৃদ্ধ চিত্রগুপ্ত তার সেই বিখ্যাত লাল খাতা নিয়ে হাজির হলেন। অয়ন লম্বাসাদা দাড়ির চিত্রগুপ্তের দিকে তাকিয়ে রইল।কুঁজো লোকটার কাল্পনিক যে সমস্ত ছবি অয়ন ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর দেখতে। ওনাকে দেখে বেশ শ্রদ্ধা হয় মনে। যমরাজের মত রাবণ মার্কা চেহারা নয়। শুধু একটাই ফারাক, রাবণের দশটা মাথা ছিল আর যমরাজের একটাই মোটা মাথা।

একবার অয়নকে দেখে নিয়ে যমরাজের আদেশে চিত্রগুপ্ত টেবিলের উপর তার লাল খাতাটা খুলে বড় একটা আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়েপাতা উল্টে দেখতে লাগলেন। যমরাজ ও যমদূত দু’জনেই  উৎকণ্ঠিত ভাবে চেয়ে রইলেন চিত্রগুপ্তের দিকে। যমদূত তার হাতের লিস্টটা আরেকবার চেক করে দেখল। ওখানেও অয়ন চক্রবর্তীর নাম, বয়স, ঠিকানা আর আজকের তারিখ 19.03. 2003 ও সময় লেখা আছে। তাহলে ওরা তো কোন ভুল করেনি। এই অয়ন চক্রবর্তী লোকটা পুরোটাই নাটক করছে মনে হয়। যমরাজও যমদূতকে অবাক করে দিয়ে চিত্রগুপ্ত তার মিহিগলায় বলে উঠলেন,”মহাশয়, আমি কি একবার আমার পাঠানো চিটখানা দেখতে পারি? মনে হচ্ছে কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে। আমি আরেকবার একটু চিটখানা দেখে তবেই আমার মতামত দেব। “

যমরাজ চেঁচিয়ে বিরক্তিভরা স্বরে বলে উঠলেন,”আরেকবার দেখবেন মানে? লোকটাকে মর্ত থেকে তুলে আনা হল আপনার দেওয়া চিঠি দেখে আর আপনি বলছেন আরেকবার দেখে বলবেন? কি বলবেন আপনি? আপনি যদি কোন ভুল করে থাকেন তাহলে কি হবে বুঝতে পারছেন? সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাদেবের কাছে আমি কি জবাব দেব? কিযে করেন আপনি কি বলব। বয়সের সাথে সাথে ভীমরতি হচ্ছে, যত্তসব।“ বলেই যমরাজ ইশারায় যমদূতকে চিঠি খানা চিত্রগুপ্তের দিকে এগিয়ে দিতে বললেন। চিত্রগুপ্ত চিঠিখানা যমদূতের হাত থেকে নিয়েই চমকে উঠলেন। কিভাবে যমদূত এতো বড় ভুল করল?

আসলে অয়ন চক্রবর্তীর মৃত্যুর দিন ঠিক করা ছিল1 9.08.2003. যমপুরিতে বহুবার দাবিকরা সত্যেও এখনো পর্যন্ত কোন কমপিউটার বসানো হয়নি। স্বাভাবিক ভাবেই আজও সেই মান্ধাতার আমলের হাতে লেখা চিঠি দিয়ে যমদূত পাঠানোর প্রথা চলে আসছে। কষ্ট কন্ট্রোলের ঠেলায় চিত্রগুপ্তকে আজও কোন সহকারী অবধি দেওয়া হয়নি। বছরের শুরুতে চিত্রগুপ্ত স্বয়ং নিজ হাতে এই সমস্ত চিঠি লিখে রাখেন আর সেই চিঠিগুলি যমদূতের জন্য রাখা ডাকবাক্সে ফেলে রাখেন। যমপুরির বেয়ারা এসে সেটা নিয়ে যায় আর যমদূতকে পৌঁছেদেয়। এই সব চিঠি দেখেই যমদূত ও তার অফিস রোজকার একশনপ্ল্যান বানিয়ে ফেলে।

চিত্রগুপ্তের চমকে ওঠাটা যমরাজের চোখ এড়ায়নি। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,” কি হল, কিছু বুঝতে পারছেন কোথায় গণ্ডগোলটা হয়েছে?”

অয়ন এবার শিওর হয়ে গেল যে ওর ধারনাই ঠিক। গুরুদেব এতো বড় ভুলনিদান কখনই দিতে পারেননা। এই অপদার্থ গুলি স্বর্গপুরির পয়সায় মজা  লুটছে আর যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। ভেবেছে মর্তে আমাদের দেশের সরকার বিরোধী দলের মত কেউ এখানে কোন প্রতিবাদ করেনা বা কোন সিবিআই এনকোয়ারি হয়না বলে যাতা করে এডমিনিসট্রেসন চালাবে আর সব স্ক্যাণ্ডাল চাপা পড়ে যাবে। আজ দেখাচ্ছি মজা তোমাদের। আমিও অয়ন উকিল। কলকাতায় বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খায় আমার নামে।

একটু ভেবে নিয়ে যমরাজকে সত্য কথাটা বলেই ফেললেন চিত্রগুপ্ত। “মহাশয়, আসলে একটা মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে। আপনি দেখলেই বুঝতে পারবেন এই চিটে কি লেখা ছিল। এই খাতায় ভদ্রলোকের মৃত্যু দিন লিখে দেওয়া আছে 19.08.2003, কিন্তু ওনাকে আজ 19.03. 2003 তারিখে, মানে পাঁচ মাস আগেই মর্ত থেকে তুলে আনা হয়েছে এখানে। এটা আমাদেরই ভুল মহাশয়।“ ইচ্ছা করেই যমদূতের ভুল হয়েছে বললেন না। মর্তের কর্পোরেট কোম্পানির বসেদের মত এখানেও কোন বস তার জুনিয়ারের কোন ভুল একবারে স্বীকার করতে চায়না। তাদের প্রেস্টিজে লাগে। জুনিয়রকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে সবাই।

 যমরাজ চিত্রগুপ্তের হাত থেকে লাল মোটা খাতাটা ও সেই চিটখানা নিজের হাতে নিয়ে টেবিলে রেখে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখেই বুঝতে পাড়লেন এতে চিত্রগুপ্ত ও যমদূত দুজনেই সমান ভাবে দায়ী। গত বছর থেকে স্বর্গপুরিতে ইংরাজি সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বর্গ হোক বা নরক, কোথাও এখন আর দেবনাগরী শব্দ চলেনা । অয়ন চক্রবর্তীর মৃত্যু দিবস 19.08. 2003 ডেট খানা এমন ভাবে লেখা যে হটাত দেখে মনে হচ্ছে ওটা 19.08 না 19.03হবে । মানে ইংরাজির 8 লেখাটা দেখে  3 মনে হচ্ছে কারণ 8 লেখার কিছু অংশ অস্পষ্ট অবস্থায় আছে। তাতেই চশমা চোখে যমদূত ভুল ভেবে বসেছে।

যমরাজ যমদূতের দিকে তাকিয়ে চীৎকার করে বলেলেন,” এই হারামজাদা, এটা কি করেছিস? দেখে যা।“

যমদূত জুনিয়র, তাকে বকাঝকা করা যায়, কিন্তু বৃদ্ধ চিত্রগুপ্ত কে কি করে বকবেন যমরাজ। ওনার পোষ্ট যে যমরাজের থেকেও উঁচুতে। চিত্রগুপ্ত ও যমরাজ দুজনেই ব্রহ্মাদেবকে ডাইরেক্ট রিপোর্ট করেন। আর বয়স ও অভিজ্ঞতায় চিত্রগুপ্ত অনেক সিনিয়র। সুতরাং ঝাড়টা গিয়ে পড়ল যমদূতের উপর।

যমদূত টেবিলের পাশ দিয়ে উঠে মোটা চশমার ফ্রেমটা একটু তুলে ধরে নিজের চোখের ভুলটা দেখে চুপ করে খাতার দিকে তাকিয়ে এক মিনিট ভেবে তার কর্তব্য ঠিক করে নিল। এটা একটা বড় ভুল হয়ে গেছে আর সেটা স্বীকার করলে কমপক্ষে দুই মাসের নরক বাস করতে হবে। সুতরাং ইনিয়ে বিনিয়ে এর দায়টা কাটাতে চেষ্টা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। ঠাণ্ডা কিন্তু বেশ দৃঢ় গলায় বলল,” স্যর, প্রথমত 8লেখাটা দেখতে একদম 3 মনে হচ্ছে। আর তাতেই আমার অফিস থেকে গণ্ডগোলটা হয়েছে। যদিও আমারও ভাল করে চেক করা উচিৎ ছিল। সরি স্যর।“

অয়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল। এবার ওকে এই কেসটায় কে হারায় দেখি। এখানে না মানলে ও স্বর্গের সুপ্রিম কোর্ট মানে ইন্দ্র রাজের কাছে এপীল করবে। কিছুতেই ওকে এই কেস হারলে চলবে না। ঈশ , মর্তে থাকলে এটা একটা ব্রেকিং নিউজ হতে পাড়ত। কিন্তু এই যমপুরীতে বসে এটা কি ভাবে প্রেসের কাছে ফাঁস করবে এটাই ওর মাথায় আসছিল না। তার চেয়ে বড় সমস্যা হল এরা এখন ওকে নিয়ে কি করতে পারে সেটাই দেখার। এই সব কেসে স্বর্গপুরির আইন কি বলে সেটা অয়নের জানা নেই। দেখা যাক।

যমদূত হটলাইন তুলে ওর বস ব্রহ্মা দেবকে সব জানালেন। ওপার থেকে দেখে মনে হল দেবাদিদেব ব্রহ্মা দেব যমরাজকে খুব একচোট ঝাড়লেন কারন উনি বারবার ‘স্যরি স্যার’ ‘স্যরি স্যর’ বলে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। অবশেষে ওপার থেকে কিছু আদেশ দিলেন ব্রহ্মা দেব। আর সেটা শুনে যমরাজের মুখাবয়ব কেমন যেন ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল। বোঝাই গেল ওনাকে একটা গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন ব্রহ্মা দেব। এবার খুব ফেসেছেন যমদুত ব্যাটা। অয়নকে বোধ হয় আর এখানের সুপ্রিম কোর্টে যেতে হবে না। 

দুই –

অয়নকে ভুল করে পাঁচ মাস আগেই নিয়ে আসা হয়েছে দেখে দেবাদিদেব ব্রহ্মা ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন কিছুতেই একজন মানুষ যার এখনও পাঁচ মাস জীবিত থাকার পূর্ণ অধিকার আছে তাকে কিভাবে এখানে ধরে রাখা যায়। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের তিন লোকের উনিই স্রষ্টা। এই আইন কানুন ত্রিদেব তৈরি করেছেন। এই অন্যায় তিনি নিজে করেন কি করে? ওনার অধস্তন অফিসারেরা এতটা ভুল করবে ভাবাই যায়না। আর এই খবর যদি ওনার কলিগ মহাদেব বা নারায়নের কানে যায় তাহলে কি লজ্জা কি লজ্জা।

ব্রহ্মা দেব যমরাজকে বললেন অয়নের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে, কারন নাহলে সেটা অন্যায় হবে। এই খবর জানাজানি হলে একেবারে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। অয়নকে বলতে হবে যে সে এবার মর্তে গিয়ে যেন পাঁচ মাস বাদের সঠিক দিনটার জন্য তৈরি হয়ে থাকে।তবে আগে অয়নের সাথে একটা চুক্তি করে নিতে হবে। ওকে একটাই শর্তে মর্তে পাঠানো হচ্ছে আর সেটা হল স্বর্গের এই কেলেঙ্কারির খবর যেন মর্তে কাকপক্ষীও টের না পায়। আজকাল নিউজ চ্যানেল গুলি যা হয়েছে ,তিল কে তাল করে সারাদিন ধরে ঐ একটা ছোট্ট খবরকেই রগড়ে রগড়ে ব্রেকিং নিউজ বলে চালাতে থাকবে। কোনমতেই যমালয়ের বদনাম করা চলবে না। এই শর্তে অয়ন রাজি থাকলে তবেই ওকে মর্তে ফিরে যাবার বন্দোবস্ত করা হবে। সুতরাং ব্রহ্মার পরামর্শ মত ওকে সব বুঝিয়ে বলে যমরাজ অয়নের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অয়ন এক মুহূর্ত চুপ করে ভাবল, ব্যাপারটা মন্দ হয়না। এমনিতেও আর মাত্র পাঁচ মাস বাদে ওকে এখানে ফিরতেই হবে। তাহলে এবার এই অতিরিক্ত পাঁচ মাসে অয়ন ওর ফেলে আসা কাজগুলি সব সম্পূর্ণ করে আসতে পারবে। ভাল করে ভেবে ইউনিয়ন লিডারদের মালিকের সাথে দর কসাকষির মত করে বলল,”সে নাহয় আপনারা আমাকে মর্তে আবার পাঠাবেন, কিন্তু আপনাদের এই এতো বড় ভুলের কোন ক্ষতিপূরণ দেবেন না সেটা তো হবে না। এই দ্বিতীয়বার ফেরার যেমন আপনার একটা শর্ত আছে সেরকম আমারও একটা শর্ত আছে, নাহলে কিন্তু সব ফাঁস করে দেব আমি।“ 

যমরাজ চমকে উঠে প্রমাদ গুনতে শুরু করলেন। এই বজ্জাত লোকটা তো মহা পাজি। উনি হলেন যমরাজ, ওনাকে ভয় পাওয়া তো দুরের কথা আবার কন্ডিশন লাগাচ্ছে, কতবড় সাহস ব্যাটাচ্ছেলের। ঠিক আছে আগে শুনে নেওয়া যাক তারপর ওকে যা বলবার বলা যাবে খন। শুকনো হাসি দিয়ে নিজের টেনসনটাকে চাপা দিয়ে অবাক হবার ভান করে বললেন,”আপনার আবার কি শর্ত ? বলুন দেখি কি চানআপনি ।“

অয়ন অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির মানুষ। বাবাও ছিলেন হাই কোর্টের উকিল এখন নিজের ছেলেকেও বড় ফার্মে রেখে চোস্ত উকিল বানাচ্ছে। ওর উকিলি বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,”না, এমন কিছু বড় শর্ত নয়। আমাকে একটাই আশীর্বাদ দিন যাতে এখন থেকে আমি যত কেস লড়ব তার কোনটাই হেরে না যাই। সব কেসেই আমি যেন জিততে পারি। আপনি আমাকে এই বর দিন তাহলে আমিও কথা দিচ্ছি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমি স্বর্গের এই কেলেঙ্কারির কথা কাউকেই জানাতে যাবনা। কথা দিলাম।“

যমরাজ মনে হল খুশি হলেন অয়নের কামনা শুনে। এ আর কি এমন শর্ত। মাত্র তো পাঁচ মাস। এই পাঁচ মাসে তুমি যত ইচ্ছা কেস লড়গে আর জিতে পয়সা কামাও, আমাদের তাতে কোন আপত্তি নেই বাবা। বেশ গদ্গদ হয়ে বললেন,”ঠিক আছে। তথাস্তু। কিন্তু খেয়াল থাকে যেন কথাটা। যেদিন আমার এই শর্ত অমান্য করবেন সেইদিনই হবে আপনার জীবনের শেষ দিন। এবার মর্তে গিয়ে যত ইচ্ছা কেস লড়তে থাকুন। এখন থেকে সব কেসেই আপনি জিততে থাকবেন, যান পাঁচ মাস সংসার করে আসুন। আবার দেখা হবে।“ 

যমরাজ চিত্রগুপ্তের দিকে তাকিয়ে বললেন,”আপনি আপনার রেকর্ড আপডেট করে নিন। আর এরপর থেকে যতদিন না যমলোকের অফিসে কম্পিউটার আসছে ততদিন আরও বড় বড় আর পরিষ্কার করে চিট লিখবেন, এই ভুল আর কখনো যেন না হয়। যান, এবার আপনি আসুন।“

“স্যর, আমি এখন কি করবো স্যর ?” হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থাকা যমদুত বলে ওঠে।

“হতভাগা, কি করবো মানে ? যাও একে এক্ষুনি মর্তে দিয়ে এসো গিয়ে। আর এর উপর কড়া নজর রাখ যাতে লোকটা এই কেলঙ্কারির কথা কোন মিডিয়ার কাছে বা আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কারও কাছে  লিক করে না দেয়। আর মাত্র পাঁচ মাস, তারপর আবার সঠিক ডেটে গিয়ে ওকে এখানে নিয়ে আসবে। আবার উল্টো পাল্টা কাজ করে বোস না।  এবার যদি আবার কোন ভুল হয় না তবে আর দুই মাস নয়, বরাবরের মত তোমাকে নরকে পাঠিয়ে ছাড়ব হতচ্ছাড়া।“

এদিকে সেদিন অয়নের স্ত্রী কামিনী ছাড়া অমল আর মিনি বেলা সাড়ে বারোটার সময় লক্ষ করে সেই টিফিনের পর ঘরে গিয়ে থেকে অয়ন ঘুমচ্ছে। এতো করে ডাকলেও বাবা উঠছে না দেখে সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। আজ রবিবার, সাধারণত এই সময় প্রায় এক দেড় ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয় অয়ন। কিন্তু আজ হটাত বাবা কোন সাড়া দিচ্ছে না কেন ?বাবারআবারশরীরখারাপহয়নিতো ? ওদের পাড়ার ডাক্তার জ্যেঠা নলিনী সান্যালকে ডেকে আনে মিনি। ডক্টর সান্যাল এ বাড়ির পুরানো ডাক্তার। অয়নের বাবাকেও উনিই দেখতেন। অয়নের হার্টের সমস্যা ছিল উনি জানতেন। ওষুধ বিশুধ চলছিল। নাড়ি ধরে ও স্টেথো লাগিয়ে জানান দিলেন যে অয়ন আর বেঁচেনেই। সকাল বারোটা কুড়ি নাগাদ হার্ট ফেল করেছে।

কান্নার রোল উঠল বাড়িতে। পাড়ার লোক দৌড়ে এলো, আত্মিয়দের খবর দেওয়া হল, কোর্টের বাবার বন্ধুদের জানানো হল সব। মৃতের বাড়িতে যা হয়, রবিবারের বেলা বাড়বার সাথে সাথে লোকের ভিড় বাড়তে শুরু হয় আর বেলাতিনটার পরে খাটিয়ায় তোলা হয় মরদেহ। ঠিক হয় বেলা সাড়ে তিনটার সময় বেড়িয়ে নিমতলামহাশ্মশান ঘাটে মরদেহ নিয়ে গিয়ে ইলেকট্রিক চুল্লিতে দেওয়া হবে।

বাড়ি থেকে ম্যাটাডরে অয়ন চক্রবর্তীর মরদেহ  নিয়ে অমল ওর কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ও আত্মিয়কে সাথে নিয়ে যখন বেড় হল তখন প্রায় চারটে বাজে। মিনি আর ওর মাকে সামলানো যাচ্ছিলনা। গরমের দুপুর তার উপর রবিবারের ফাঁকা রাস্তা, ওরা নিমতলায় পৌঁছে যায় তাড়াতাড়ি। মরদেহ নামিয়ে মার্কিন কাপড় সরিয়ে বাবার মৃতদেহে সজল নয়নে ঘিয়ের প্রলেপ দেবার সময়েই অমল টের পেল বাবার দেহটা একটু কেঁপে উঠল। কেন জানিনা অমল বেশ জোরে জোরে ভাল করে ঘিয়ের প্রলেপ লাগাতে থাকল বাবার মৃতদেহে।

একটু বাদেই অয়ন চক্রবর্তী চোখ খুললেন। যমদূত এসে অয়নের জীবন ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। পাড়ার সব ছেলেরা , অমল এবং ওর আত্মিয়েরা অবাক বিস্ময়ে দেখল অয়ন তখনও মড়ে যায়নি, ওর দেহে প্রাণ ফিরে এসেছে। অমল বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল আর ওর বন্ধুরা তাড়াতাড়ি মরদেহের ট্রেটা সরিয়ে নিল ইলেকট্রিক চুল্লির মুখের সামনের থেকে যাতে পরবর্তী মরদেহটা রাখতে পারে সেই জায়গায়।

অয়ন ততক্ষনে উঠে বসে দেখছে চারপাশ। বেশ বুঝতে পারল যে ও আবার মর্তে ফিরে এসেছে। ভাগ্য ভাল যে মরদেহটা ইলেকট্রিক চুল্লিতে তখনো ঢোকানো হয়নি, তাহলেই গেছিল আর কি। আসলে পরলোকেও মর্তের কোর্ট গুলির মত  এতো লাল ফিতের বাধন আছে অয়নের জানা ছিল না। প্রথমত যমরাজের পরামর্শে যমদুতের অফিস একটা চুক্তি বানায় ও সেটাকে যমরাজের কাছে পাঠিয়ে সংশোধান করিয়ে এনে টাইপ করে তাতে প্রথমে অয়নের সই করিয়ে নেয় ও পড়ে যমরাজের সই করায়। এই চুক্তিতে ওরা যা শর্ত দিয়েছিল এবং অয়ন যেই শর্ত দিয়েছিল সেগুলি সব লেখা আছে। অয়ন আরও একটু আগেই মর্তে আসতে পারত, কিন্তু কালবৈশাখীর মেঘের ট্র্যাফিক জ্যামে ওদের নিচে আসতে দেড়ি হয়ে গেল।

অয়ন উঠেবসেছেলের মাথায় হাত দিয়ে সুস্থ লোকের মতই বলে ওঠে,” ঠিক আছে বাবু, চল এবার বাড়ি ফেরা যাক। এ যাত্রায় বেঁচে গেছিরে বুঝলি। বাবা, এ যেন নব জন্ম।“ এইটুকু বলেই অয়ন চুপ করে গেল। এর বেশি কিছু বলা যাবেনা। বারণ আছে। যমদুত এখন থেকে ওর উপর সবসময় নজর রাখবে। একটা বেফাস কথা বললেই আবার তুলে নিয়ে চলে যাবে। আর চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে আর ওকে মর্তে পরিবারের কাছে ফিরতে দেবেনা। তার থেকে এই পাঁচ মাস মুখ বুজে থাকাই শ্রেয়।

অয়ন শ্মশান ঘাট থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে শুনে আবার ওর বাড়িতে পাড়ার লোকেদের ভিড় জমে যায়। ডক্টর সান্যাল এসে আবার ওর চেক আপ করে ওষুধ পাল্টে দিয়ে অয়নকে অনেক আশীর্বাদ করে যান। অয়নের স্ত্রী পুত্র কন্যা ও আত্মীয়রা সবাই খুশি হয় অয়নের বেঁচে ওঠার এই অত্যাশ্চর্য ঘটনায়। এমনকি খবর পেয়ে টি ভির চ্যানেল ও খবরের কাগজের লোকেরাও ভিড় জমায় অয়নের কাছ থেকে এই এত বড় ব্রেকিং নিউজের আরও ডিটেল জানতে।

এরপর দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়। মিনির বিয়েও যথাসময়ে ধুমধাম করে হয়ে গেল। এদিকে অমলের বস ওর কাজকর্মে খুব খুশি হয়ে অমলকে ওদের ফার্মে পাকাপাকি ভাবে উকিলের কাজে নিয়োগ করলেন। আর অয়ন, এখন সে যেই কেসে হাত দিচ্ছে, যমরাজের আশীর্বাদে সব কেসে জিতে চলেছে। 

কয়েকদিনের মধ্যেই অয়নের খুব নাম হয়ে গেল। কলকাতার বেশ কয়েকজন পয়সা ওয়ালা লোক কিছু ক্রিটিকাল কেস ওদের ফার্মে অয়নের টেবিলে এনে রাখল। প্রত্যেকটা কেসে অয়ন ফার্মেরহয়েপ্রচুর টাকা চার্জ করল এবং সব কেস জিতেও গেল। জুলাই মাসের শেষ দিকে অয়নের নাওয়া খাওয়ার সময় পর্যন্ত হচ্ছিল না। একের পর এক কেস আসছে আর অয়ন জিতে বেড়িয়ে আসছে। এ যেন লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার। অন্য সব উকিলদের মাথা ঘুরে গেল অয়নের এই সাফল্য দেখে।

অয়ন তথাপি যমলোকের ঘটনা কাউকে জানায় নি। এমন কি নিজের স্ত্রী কামিনীকেও না। কারন প্রথমত ওকে চুক্তিতে আটকে রাখা হয়েছে আর দ্বিতিয়ত কেউ এসব কথা বিশ্বাসও করবে না। কিন্তু যতই দিন ঘনিয়ে আসতে লাগল ততই অয়নের চিন্তা বাড়তে লাগল। এবার তো কিছু না করলেই নয়। আর তো মাত্র কয়েকটা দিন। এরপরেই ঐ হারামজাদা যমদুত এসে দাঁড়াবে ওর সামনে।

অনেক চিন্তা করে করে অবশেষে অয়নের মাথায় একটা বদ বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবল শালা এমনিতেও মরতে হবে আর ওমনিতেও মরতে হবে। তাহলে আর হারাবার ভয় কিসের। ওর যা যা কাজ বাকি ছিল সব তো হয়ে গেছে। এবার একবার এই শেষ চেষ্টাটা করে দেখলে ক্ষতি কি ?

হিসাব অনুযায়ী অয়নের উনিশে আগস্ট দেহ রাখবার কথা। অয়ন প্রথমেই শনিবার ১৭ তারিখ সন্ধ্যায় ওর ছেলে অমলকে বলে দিল পরশু সোমবার সকাল নয়টায় ওদের বাড়িতে কয়েকটা টি ভি চানেল ও প্রেসের লোককে  ডাকতে, কারন অয়ন একটা প্রেস কনফারেন্স করতে চায়। অমল বাবার এই হটাত খেয়ালের কোন মানে বুঝতে না পেরে কারনটা জিজ্ঞাসা করল ঠিকই, কিন্তু অয়ন ওকে কিছুই বলল না। রবিবার আঠার তারিখ রাত বারোটার পর নিজের অফিস ঘরের দরজা বন্ধ করে প্রথমেই অয়ন অমলকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। অমল সব শুনে হা হয়ে গেল। এতো রুপকথার গল্পের মত। বাবা কি বলছে কি এসব ?

কিন্তু অয়ন যখন বলল যে ওর আয়ু আর মাত্র বারো ঘণ্টা, কাল 19.08.2003 বারোটা কুড়িতে ওকে দেহ ত্যাগ করতে হবে, তখন অমলের মনে পড়ে যায় ডাক্তার জ্যাঠাও বলেছিল বাবা বেলা বারোটা কুড়িতে মারা গেছিল সেদিন। তার মানে বাবা যেটা বলছে সব সত্যি, আর বাবার মাথায় নিশ্চয়ই কোন দারুণ প্ল্যান এসেছে। বাবার কথায় বিশ্বাস করে এবার বাবার কাছ থেকে পুরো প্ল্যানটা জানতে চাইল অমল। তারপর অনেকক্ষণ বাপবেটায় মিলে গোপন আলোচনা চলে।

সোমবার বেলা নয়টার সময় ওদের বাড়ির বসবার ঘরে বসল প্রেস কনফারেন্স। এদিকে সারারাত জেগে অমল একটা আবেদন তৈরি করে সক্কাল বেলা চলে গেছে ওর অফিসে আর সেখান থেকে সোজা হাইকোর্ট। অয়নের স্ত্রী কামিনী কিছু বুঝতে না পেরে শুধু কাজের মাসিকে দিয়ে সবাইকে চা সিঙ্গারা দেবার কাজে ব্যস্ত। কামিনির সাথে অয়ন সাধারানত কাজকর্মের কোন ব্যপার নিয়েই আলোচনা করেনা।

অয়ন যখন প্রেস মিট শুরু করল তখন ঠিক বেলা সাড়ে নয়টা। উনিশে মার্চ ওর মৃত্যুর পর পরলোকে যাযা ঘটেছিল তার সমস্তটা সাংবাদিকদের খুলে বলল অয়ন। এমনকি এটাও বলল,” জানেন, আর দুঘণ্টা বাদেই আমাকে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে পরলোকে। বেলা বারোটা কুড়িতে যমদুত এসে দাঁড়াবে মাথার উপর, আমাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু চলে যাবার আগে আমি চাই এই দুনিয়ার লোক জানুক যে পরলোকেও কত কেলেঙ্কারি ঘটে এবং যমরাজ বলেই যে নির্ভেজাল হবে তার কোন মানে নেই। ওনার যমলোকেও এই পৃথিবীর অফিস গুলির মত অনেক কেলেঙ্কারি ঘটে। আপনারা কেউ যদি আমার কথা বিশ্বাস না করেন তাহলে বেলা সাড়ে বারোটা অবধি অপেক্ষা করতে পারেন।”

ঘরের মধ্যে একটা বোমা ফাটল যেন। অয়নচক্রবর্তী, এতো বড় উকিল বাড়িতে ডেকে নিশ্চয় মিথ্যা বয়ান দিচ্ছেনা। ঐ প্রেস কনফারেন্সের ঘরে বসেই কয়েকটা চ্যানেল খবরটাকে লাইভ টেলিকাষ্ট করা শুরু করে দিল। সংবাদ পত্র অফিস থেকে ঘনঘন ফোন আসতে লাগল অয়নের সেলে। এদিকে অয়নের স্ত্রী আড়াল থেকে এই কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে ফোন লাগালেন। ছেলে বাড়িতে নেই, মিনিকে বললেন তাড়াতাড়ি ডাক্তার কাকুকে নিয়ে বাড়িতে আসতে।

- তিন–

কলকাতা হাইকোর্ট প্রথমে অমলের স্টে অর্ডারের আবেদন গ্রাহ্য করছিলনা। এটা আবার হয় নাকি? স্বয়ং যমরাজের বিরুদ্ধে কেউ কখনো কেস ঠুকতে পারে নাকি ? লোকটার কি মাথা ফাতা খারাপ হয়ে গেল ? বাবাকেবাঁচাবারজন্যযাখুশিবলছে।কোনমানুষকিতারমড়ারদিনক্ষণআগেথেকেজানতেপারেনাকি? অয়ন চক্রবর্তীর মত এতো বড় উকিল এসব কি বলেছে তার ছেলেকে? আর ছেলেটা সেটাই বিশ্বাস করে একেবারে হাইকোর্টে চলে এসেছে যমরাজের আদেশের উপর স্টে অর্ডারের আবেদন নিয়ে ?

হটাত একজন কর্মচারী পাশ থেকে এসে জজ সাহেব হেমন্ত বাসুর কানেকানে কি বলে গেল। হেমন্ত বাবু একজনকে আদেশ করলেন কোর্ট রুমে রাখা টিভির নিউজ চ্যানেল অন করতে। আর তখনই কলকাতার প্রায় সব নিউজ চ্যানেল অয়ন চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে সরাসরি টেলিকাস্ট করছে অয়নের বিশেষ সাংবাদিক সন্মেলন। জজ সাহেব যতটা শুনতে পেলেন তাতে একেবারে হা হয়ে গেলেন। অমল চক্রবর্তীর আবেদনের পিছনে বেশ সলিড গ্রাউণ্ড আছে। হেমন্ত বাবু আবেদনটা আবার ভাল করে পড়া শুরু করলেন।

যদিও ভারতের আইন ব্যাবস্থা যমরাজ বা কোন দেবদেবীর উপর প্রযোজ্যহ য়না, তবুও উনি তথাকথিত যমরাজের উদ্দেশে তার এই এক তরফা চুক্তিও আদেশের উপর একটা স্টে অর্ডার ইস্যু করে দিলেন। ভাবলেন আমরা যদি আন আইডেনটিফায়েড লোকের বিরুদ্ধে চুরি, খুনবারেপকেস চালাতে পাড়ি তবে যমরাজের বিরুদ্ধে কেন লড়া যাবে না। বেলা বারোটা দশ। অমল সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিল যে মিশন সাকসেসফুল। জজ সাহেব স্টে অর্ডার দিয়েছেন এবং এবার কেসটা আদালতে উঠবে।

অয়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ”দেখুন আমি একজন উকিল মানুষ। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বলছে যে আমি আর কিছুক্ষন বাদে মারা গেলেও আমাকে ওরা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবেনা। আপনারা শুধু ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করুন। দেখুন আমি আবার ফিরে আসব এবং যমরাজ আমাকে আবার মর্তে ফেরাতে বাধ্য হবেন। আমার ছেলেকেও বলা আছে। ও কোর্টের স্টে অর্ডারের কপি নিয়ে বাড়ি আসছে। আপনারা আমার পরিবারকে একটু সামলাবেন ততক্ষন।“

এদিকে মিনি ডক্টর সান্যালকে নিয়ে এসে গেছে। ওর মা আর ডাক্তার বাবু অবাক হয়ে ঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছেন। অমল ফোন করেছেও রাস্তায় আছে, কোর্ট অর্ডার হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছে।

অন্যদিকে টিভি চ্যানেলে সাংবাদিক সন্মেলনের খবর আর কোর্টে ওর বসের বিরুদ্ধে স্টে অর্ডারের খবর পেয়ে যমদূত গিয়ে দাঁড়ায় যমরাজের সামনে। প্রথমে যমরাজ হেসে ওঠেন, ভাবেন যে এসব করে আর কি লাভ হবে অয়নের? আর তো মাত্র কয়েক মিনিট। তারপর তো সব শেষ। কিন্তু তারপরেই হটাত কি মনে হল। উনি হটলাইনে ফোন করলেন ব্রহ্মাদেবকে। ব্রহ্মাতো সব শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। তারপরেই উনি ওনার ল্যাপটপ খুলে দেখলেন সত্যি সত্যি কলকাতা হাইকোর্টের আদেশের একটা ইমেল পবনদেব ওনাকে ফরওয়ার্ড করেছে আর তাতে পরিষ্কারভাবে যমরাজের আদেশের বিরুদ্ধে স্টে অর্ডার দেওয়া আছে।

এদিকে সময় হয়ে যাওয়ায় যমদুত আর দেরি করেনি। এবার যদি আবার ভুল করে তাহলে আর নরক যাওয়া থেকে কেউ ওকে বাঁচাতে পারবেনা। মর্তে এসে লাঠি বারোটা কুড়ি মিনিটে অয়ন চক্রবর্তীর আত্মা নিয়ে রওনা দিলপ রলোকের উদ্দেশে। আর সমস্ত সাংবাদিকরা, মিনি, মিনির মা ও ডাক্তার সান্যাল অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন ওদের চোখের সামনে কথা বলতে বলতে কিভাবে অয়ন চোখবুজে ঘাড় কাঁত করে চেয়ারের একপাশে হেলান দিয়ে পড়ল। ডাক্তার সান্যাল সঙ্গে সঙ্গে দু’য়েকজনের সাহায্যে অয়নের দেহটাকে ঘরে এনে খাটে শুইয়ে দিলেন। ভালকরে সব চেক করে বলে দিলেন যে অয়ন আর ওদের মধ্যে নেই। ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে। শুধু কামিনী কান্না চেপে রাখল। অয়নের জন্য এদিকে একটা বিরাট বড় সারপ্রাইস অপেক্ষা করছিল তখন। অয়ন যমলোকের মহলে ঢুকেই দেখতে পেল সবাই কেমন তটস্থ হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। অয়ন বুঝতে পারল যে মর্তের খবর সব আগেই পৌঁছে গেছে যমরাজের দরবারে। মাথা উঁচু করে যমদুতের পিছন পিছন এসে ঢুকল যমরাজের দরবারে। যমরাজে রসিংহাসনের পাশে আরেকটা সিংহাসনে ইতিমধ্যেই এসে বসে আছেন চিত্রগুপ্ত। আর একদম উপরে আরেকটা বিশাল বড় সিংহাসনে বসে স্বয়ং ব্রহ্মাদেব।

তিনমাথাওয়ালা ব্রহ্মাদেবকে ছবিতে যেমন দেখেছে অয়ন, উনি সত্যিই সেই রকমই সুন্দর পুরুষ। প্রতিটি মাথা শুভ্র কেশে সুশোভিত। লম্বা সাদা দাঁড়ি ঝুলছে আর ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি। অয়ন প্রথমেই সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাদেবকে মাটিতে গড় দিয়ে প্রনাম করল। কি সৌভাগ্য ওর, দেবাদিদেব ব্রহ্মাদেব সামনে বসে আছেন। ভাবাই যায়না। অয়নের যেন মনে হচ্ছে ও একটা মধুর স্বপ্ন দেখছে আজ।

কিন্তু যমরাজের মুখ চোখ দেখেই বোঝা গেল উনি বেশ চাপে আছেন। সত্যিই তাই। শতহলেও মর্তের একটা সামান্য মানুষ ওনাকে চ্যালেঞ্জ করেছে ও ওনার আদেশের উপর স্টে অর্ডার পাঠিয়েছে। বাপ যেমন ছেলেও ঠিক সেই রকমই হয়েছে আর কি। যেই যমরাজের নাম শুনলেই মানুষদের হুঁশ উড়ে যাবার কথা তাকে ব্রহ্মাদেবের কাছে কতটা ছোট করে দিয়েছে এই বজ্জাত অয়ন আর তার ছেলে।

অয়নের দিকে তাকিয়ে গম্ভির ভাবে যমরাজ প্রশ্ন করলেন,” আপনার সাথে চুক্তি হয়েছিল যে আপনার মৃত্যু দিবসের ব্যাপারে যে ভুলটা হয়েছিল সেটা আপনি মর্তে ফাঁস করবেন না। কিন্তু তথাপি আপনি  কি করলেন, একটা সাংবাদিক সন্মেলন করে আবার ছেলেকেও কোর্টে পাঠালেন স্টে অর্ডার আনবার জন্য । আপনার কি মনে হয়না যে আপনি আমার দেওয়া শর্ত পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন ? আপনি কিন্তু একটা শাস্তি যোগ্য অপরাধ করে ফেলেছেন......।”

অয়ন দৃঢ়তার সাথে যমরাজের  কথার মাঝে হাত তুলে বাঁধা দিয়ে বলে উঠল, “কিন্তু স্যার, আমি তো কোন অন্যায় করিনি। আমি যেই কথা দিয়েছিলাম সেটা তো রেখেছি স্যর।“

যমরাজ রেগে কাই হয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠলেন,” আপনি কিভাবে মৃত্যুর আগে সব ফাঁস করে দিয়ে এলেন। আপনার সাথে চুক্তি ছিল যে আপনি এসব কিছুই করবেন না। আপনি সেই চুক্তি ভঙ্গ করলেন কি ভাবে ? আর এসব কি হচ্ছে ? আপনাদের মর্তের কোর্ট কি ভাবে পরলোকের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে ? আমরা কি মর্তের বিচার ব্যবস্থার অধিনে পড়ি নাকি ? ইয়ার্কি হচ্ছে ? ”

অয়ন মুচকি হাসল। মনে মনে বলল আজ তোমাকে আরও ঘোল খাইয়ে ছাড়ব। তুমি ব্যাটা ঘুগু দেখেছ ফাঁদ দেখনি। ব্রহ্মা দেবের দিকে তাকিয়ে দেখল উনি মুচকি মুচকি হাসছেন। অয়ন বুঝতে পারল উনি অন্তর্যামী, অয়ন কি ভাবছে আর কি বলতে যাচ্ছে সবই বুঝতে পারছেন। আরেকবার ব্রহ্মা দেবকে হাত জোড় করে প্রনাম করে বলল,” হে দেবাদিদেব, আপনি বলুন আমি কি অন্যায় করেছি। আমি বলেছিলাম ‘মৃত্যুর দিন  পর্যন্ত’ আমি ঐ ত্রুটির কথা কাউকে জানাব না। আর সেই মত কাল পর্যন্ত কাউকে কিছু জানাই নি। আজ সকালে জানিয়েছি কারন আমি জানি আজই আমার শেষ দিন। আমিতো বলিনি যে মৃত্যুর দিনেও কিছু বলবনা। বলেছি,আর সেই কারনেই তো আমি এখন এখানে।“ অয়নের গুগলিতে যমরাজ হটাত যেন একটা ঝটকা খেলেন মনে হল। কি বজ্জাত কি বজ্জাত, বলে কিনা আজ ওর শেষ দিন জেনেই ও আজই সব ফাঁস করে দিয়ে এসেছে। নে কি করবি তোরা কর। এখন মর্তের কোর্টের কেস খা আর তার ঠেলা সামলা। যমরাজের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। এবার উনি বুঝতে পারলেন কেন স্বয়ং ব্রহ্মা দেব নিজে এসেছেন আজ এই লোকটার যুক্তিকে খণ্ডাতে।

যমরাজ মাথার মুকুট নামিয়ে নির্লজ্জের মত বসে মাথা চুলকাতে চুলকাতে ঘুরে তাকালেন ব্রহ্মা দেবের দিকে। ব্রহ্মা দেব প্রথমেই খুব রেগে গিয়ে কটমট করে তাকিয়ে ইশারায় যমরাজকে তার মুকুট পড়ে নিতে বললেন। ভাবলেন অপদার্থটার এতদিনেও বুদ্ধি হলনা। এদিকে মনে মনে উনি অয়নের বুদ্ধির তারিফ না করে পারলেন না। ওর উকিলিযুক্তি একেবারে অকাট্য যুক্তি। কাল পর্যন্ত অয়ন তো কোন অন্যায় করেনি, কাউকে কিছু জানতে দেয়নি। আজ শেষ দিন, আজ জানিয়েছে। আর সেভাবে দেখলে চুক্তি ভঙ্গ করলেও অয়ন ওর প্রাপ্য শাস্তি আজই পেয়ে গেছে।

যমরাজ অয়নের চালে ফেঁসে গেছে দেখে ব্রহ্মা দেব চোখ বুজে যমরাজের মাথায় কিছুটা বুদ্ধি সাপ্লাই করে দিলেন। উনি নিজে তো আর মর্তের এই বুদ্ধিমান মানুষটার সাথে যুক্তি তর্ক করতে পারেন না, সেটা ওনার পক্ষে একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার। সুতরাং উনি যা কিছু করবার যমরাজকে দিয়েই করাবেন। অয়নও সেই আদেশের অমান্য করতে পারবে না।

একটু বাদেই মগজ