Samokal Potrika

আজ সকালে তাড়াতাড়ি উঠে স্নান করে পুজো করে নিয়েছে তুলি।তুলি খুব ঠাকুর ভক্ত তাই রোজ সকালে স্নান করে পুজো করে সে।আজ দিদির অপারেশন,বিশেষ কিছু নয় গলব্লাডারে স্টোন হয়েছে সেটারই অপারেশন। কিন্তু,সেই নিয়েই গত একমাস ধরে ভুগছে তিতির।গলব্লাডারের ব্যাথা নিয়ে হসপিটালে ভর্তি হলো তারপরেই প্যানক্রিয়াসে এফেক্ট করে সেই নিয়েই আজ একমাস ধরে ভর্তি হসপিটালে তিতির।আজ একসপ্তাহ হলো একটু সুস্থ আছে তাই ডাক্তার আজকে অপারেশনের দিন দিয়েছেন।আজ সেখানেই যাবে তুলি।বাবা,মা বাড়িতেই থাকবেন তিতিরের বাচ্চা ছেলেটা আছে সে দাদু দিদার কাছেই থাকবে।

  - "তুলি কিছু খেয়েনে।আবার অনেকক্ষন খাওয়া হবেনা।দিদিকে দেখছিসতো এই না খেয়ে খেয়ে কি বাঁধালো।
  - না মা আমি বাইরে ঠিক খেয়ে নেবো এখন শুধু একটু চা বিস্কুট খেয়ে চলে যাবো।
  - সে কিরে আর কিছু খাবিনা,কখন অপারেশন শেষ হবে কতক্ষণ লাগবে একটু খেয়ে যেতে পারতিস তো ।দিদি কে দেখিস একটু।বড্ড রাগতো নার্স ডাক্তারদের ওপর এমনি রেগে আবার কিছু বলে না বসে বুঝলি দেখিস অনেকদিন ধরে খুব কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা কবে যে ছাড়বে হসপিটাল থেকে কে জানে?
  - তুমি চিন্তা করো না মা তুমি বিতানকে সামলে রাখো বুঝলে।আমি আসছি।
  - আয় দুগ্গা দুগ্গা....."

  ২

"আজ বৃষ্টিতে ভিজতে ভীষণ ভালো লাগছে,ভীষণ শান্তি লাগছে।আজকে মা বলতে পারবে না "ওরে বৃষ্টিতে ভিজিসনা ঠান্ডা লাগবে"
বাবা বকতে পারবেনা।সুশান্তর মায়ের মুখ ঝামটা নেই।চুলের মুঠি ধরে মারতেও পারবে না।সুশান্তর অপমান নেই।আজ খুব শান্তি লাগছে বৃষ্টিতে ভিজতে।আজ নিজেকে প্রকৃতির কাছে পুরোপুরি ভাবে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে।আজ কোনো বাধা নেই,নিজেকে বৃষ্টির কাছে অর্পন করলাম।"

হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালে ঢুকলো তুলি।দেরি হয়ে গেছে অনেকটা।দিদির  অপারেশন .......
  - "এই সুজিত তুই ওপরে একটু দিদির কাছে যা আমি নিচে রিসেপশনে টাকাটা দিয়ে আসছি তাড়াতাড়ি যা।
  - জামাইবাবুতো আসেননি এখনও তাহলে বন্ড সই করবে  কে ?
  - আসছে আমায় ফোন করেছিল.....বলতে বলতেই ওই তো এসেগেছে।
  - জামাইবাবু,চলো ওপরে যাওয়া যাক।
  - হ্যাঁ, চলো।"

"তিতির রায়ের বাড়ির লোক কে আছেন তাড়াতাড়ি আসুন।"
  - "কি হলো বলতো?"

দৌড়ে ওপরে গেলো তুলি।
'-কি হয়েছে ?তিতির রায়ের বোন আমি ,দিদি কেমন আছে??
সরি,তিতির রায় একটু আগেই এক্সপায়ার করেছেন।
কি বলছেন স্যার?
হ্যাঁ, বেশ কিছুদিন ধরেই উনি কষ্ট পাচ্ছিলেন।আপনারা তো জানেনই ওনার চারিদিকে নল লাগানো ছিল।ওনার সারা শরীর পচতে শুরু করেছিল ভিতরে।বাকিটা নার্স প্লিজ.....
  - দেখুন কাঁদবেন না কাল রাতে উনি নিজের ছেলেকে দেখতে চাইছিলেন খুব সারারাত ঘুমোননি।কাল সন্ধেবেলা আপনারা চলে যাবার পর থেকেই আবার শরীর খারাপ হতে শুরু করে,রাতে খুব কান্নাকাটি করে ছেলে কে দেখবার জন্য কিন্তু আমরা নিরুপায় ছিলাম একটু ধমকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে রেখেছিলাম।আজ সকালে উঠে পরিষ্কার করার পর হঠাৎ.......প্যানক্রিয়াস এফেক্ট করার পর ওনার সারা শরীর ভিতরে পচতে শুরু করেছিল বাকি ডাক্তার জানেন।
  
  - না না দিদি বিতান ও যে কিছুই জানে না দিদি।আমি মা বাবা কে কি করে মুখ দেখাবো কি বলবো আমি দিদি ওঠ দিদি।জামাইবাবু বলে দুজনেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
ওঠ দিদি ওঠ আমি কি বলবো মা বাবাকে বিতানকে ও যে কিছুই বোঝে না।ওঠ ওঠ....
সাথে তুলির বন্ধু ছিল ,খুব ক্লোজ বন্ধু সে,বাকিদের খবর দিতে শুরু করে বাড়িতে ফোন করে কিছু বলার সাহস তখনও হয়নি কারুর।
  - "ওঠ তুলি বাড়িতে....
  - কি জানাবো বাড়িতে....ধরে রাখা যায় না তুলিকে।"
  সত্যিই তো কি বলবে তুলি বাড়িতে।নিজেকেই সামলাতে পারছেনা তার ওপর মা বাবা বিতান।ও নিজেও তো ছোট দিদির তিরিশ আর তুলির সাতাশ ওই বা কি করবে।

এদিকে ততক্ষনে শরীর থেকে আত্মাটা বেরিয়ে গেছে তিতিরের।আজ তার বৃষ্টিতে ভিজতে সত্যি খুব ভালো লাগছে।আজ যে সে বাঁধন ছাড়া।কেউ কিছু বলার নেই তাকে।বিয়ের পর থেকেই গত পাঁচ বছর ধরে কম অত্যাচার সহ্য করেনি সে।সুশান্তর মা খুব মারধর করতো।সুশান্ত অবশ্য কিছু করতো না কিন্তু কোনোদিন মাকে বাধা দেয়নি।সুশান্তর মা খেতে দিত না দিনের পর দিন,বাচ্চাটা পেটে থাকতেও খেতে দিতনা।অগত্যা,তিতির বাপের বাড়ি চলে আসে।সেখানেও মা বাবা বোন কিছু না বললেও আসে পাশের সবাই ,আত্মীয় স্বজন সবাই তিতিরকে অপমান করতো।বিভিন্ন কটূক্তি করতো।মাঝে মাঝে মায়ের মাথা গরম হয়ে গেলে সেও দু -চার কথা শুনিয়েই দিত তিতির কে।বিয়ের পর শশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে থাকতে হলে কত কিছুর সম্মুক্ষীন যে হতে হয় তা ভালোই বুঝতে পারছিল তিতির।কিন্তু শশুর বাড়িতে থাকলে হয়তো এতদিনে তাকে মেরেই ফেলতো।সুশান্ত সে রকম কিছু না বললেও মাঝে মাঝেই ঝামেলা করতো মাকে নিয়ে,অপমান করতো বাড়ি ফিরে গিয়ে মাকে মানিয়ে চলতে বলতো,নাহলে ডিভোর্সের কথা বলতো।ইদানিং তো সুশান্ত শুধু তিতিরের কাছে আসতো শরীরের জন্য ভালো করে কথা ও বলতো না কথা বললেই অশান্তি।অশান্তি এত চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছিলো যে তিতিরের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।শুধু বিতানের মুখ চেয়ে ডিভোর্স করতে পারছিলনা সে।দিনের পর দিন খাওয়া বন্ধ করতো।তারপরেই এই রোগ।ইঞ্জেকশনে খুব ভয় ছিল অথচ গত একমাস তার সারা শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছিলো সূচ ফুটিয়ে,কষ্ট হতো খুব তার।নিজে উঠে বসার ক্ষমতাও ছিল না।

না ,আজ থেকে আর কিছু নেই সব কিছুর "The end" ।আজ সারা শরীরটা সে বৃষ্টিকে উৎসর্গ করেছে।আজ সব কিছু থেকে তার মুক্তি।আজ বৃষ্টিতে ভিজে তার 'পরম শান্তি' হচ্ছে, এই রকম শান্তি সে আগে পায়নি কোনোদিন।শুধু কষ্ট একটাই একবার যদি বিতানকে দেখতে পেত সে খুব ভালোহত।বিতানের জন্য আশীর্বাদ আর ভালোবাসা দিয়ে বিদায় নিল চিরকালের জন্য তিতির পরম শান্তিতে।আজ তার শান্তির কথা বোধহয় প্রকৃতিও বুঝতে পেরেছে তাই সেও নিজেকে উজাড় করে দিলো তিতিরের কাছে,অনেকদিন ধরে গরমের পর আজ প্রকৃতিতেও নেবে এসেছে পরম শান্তি।