Samokal Potrika

দেখে, শুনে, বেছে, বাজিয়ে, প্রচুর পণ নিয়ে পাত্রীটিকে বধূ করে নিয়ে এল ওরা। রূপ ও গুন আছে। ফর্সা, লম্বা। খুব বিখ্যাত কন্যা। পড়ালেখায় অতি উত্তম। ফার্স্ট হত। আবার সায়েন্স নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। এছাড়াও খুব ভালো মেয়ে বলেও নাম যশ আছে। বাবার ফ্যামিলি বনেদী। ধনীও। সব জায়গায় খুব সুনাম!
       বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে সদা সর্বদাই খুব নির্যাতন চালায়। তারা সকলেই একেবারে কুৎসিত দেখতে। কালো, বেঁটেও। লেখাপড়ায়ও বউটির মত ভালো নয়।  ফ্যামিলির বদনাম সব জায়গায়। যেন সুন্দরী নারী হয়ে দোষ করে ফেলেছে সে। লেখাপড়ায়ও ভালো হয়ে যেন কত অপরাধ করে ফেলেছে সে! তার বাবার ফ্যামিলির সম্বন্ধে এতো কুকথা মিছে মিছে মিছে করে বলতো যে সে অবাক হয়ে যেতো! সব কিছু মিলিয়ে তার নিজের জীবনের প্রতি নিজেরই ধিক্কার এসে গেলো। বেঁচে থাকতে ঘৃণা হল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! ...... সে মরেই যাবে।
            তবুও একবার শেষ চেষ্টা করলো সে, রেহাই পাওয়ার জন্য। অনেকের দেওয়া, অনেক বছর ধরে, অত্যাচার সহ্য করে করে করে ...... এবার সে আত্মরক্ষার জন্য চেষ্টা করলো। আর যে বাঁচা সম্ভব হচ্ছে না! অকারণ কষ্ট কেন পাচ্ছে সে?
           সে এবার বলল, ঠিক যেভাবে এতোদিন তারা তাকে বলে এসেছে, তেমনই করে।
         তোমরা সবাই কী বিচ্ছিরী দেখতে। লেখাপড়ায় তো কত খারাপ! সবাই তো আর্টসের স্টুডেন্টস। আর কেউই তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজে পড়ার জন্য চান্সই পাও নি। সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্টসরা  সায়েন্স পড়ে। আর তোমরা আমার ওপর এতো দুব্যবহার কর! সব জায়গায় সবাই তোমাদের নিন্দে করে। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি.......সেই দিন প্রথম সে মুখ খুললো। তার আগে শুধু মুখ বুজে সব সহ্য করেছে। আর এই দিনই ওরা সবাই শেষ করে দিতে চাইলো।
         বরের ফ্যামিলির সবাই খেলাধুলায় একটু আধটু পটু। আর তারা খেলার টীচাররূপে স্কুলে জব করে, তাই সব সময়ই বউটিকে এ নিয়ে যন্ত্রণা দেয়। এবার তার পালা। কেঁচো-কেন্নোও রগড়ানী সহ্য করতে করতে করতে নাগিনী-গোখরানী হয়ে ওঠে একসময়। সে এবার বলল, স্কুলের সবাই আর্টসের ও খেলার টীচারদের নিচু নজরে দেখে।
         প্রথম মুখ খোলার ফল কী হল?
                 এবার সবাইমিলে একত্রে তাকে আচমকা উঁচু স্থান থেকে নিচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেলো। এবার সে আর নিজের কান্না থামাতে পারলো না। অপমান, অসম্মান ও মাথার যন্ত্রণায় সে বিধ্বস্ত। এবার তাকে এই অবস্থায় বাবার বাড়ি রেখে এলো। অন্যদের দিয়ে বাবাকে ডেকে পাঠাল, বিচার হবে তার মেয়ের। সে তাদের মুখে মুখে চোপা করেছে ক্যানো? মেয়েটি বাবার বাড়ী থেকে ভাবলো, আগে স্কুলে শিক্ষক ও শিক্ষিকাগণ তার বাবামাকে সসম্মানে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে তার নামে কত সুখ্যাতি করত। আর আজ সেই তার কী পরিণতি! তারপর প্রতি নিয়ত অনেকজনকে দিয়ে মিথ্যে কথা তার নামে বলে বলে পাঠাত। তারা কেউ শান্তিতে থাকতে পারছে না। সব আত্মীয় স্বজনের বাড়ী গিয়ে গিয়ে মিথ্যে রটনা করছে। সে তখন একমনে চেষ্টা করে একটি উচ্চ পদের সরকারী চাকরী জোগাড় করে নিল। আর তার বাবামাকে বলল, আর কোনোদিন সে শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যাবে না। তার মাবাবা তাকে বোঝালো, স্বামীর সঙ্গে জীবন যাপন করাই উত্তম। এরপর সে আবার স্বামীর সঙ্গে সংসার করলো। কিন্তু আগের থেকেও অনেক বেশি কষ্ট তাকে দেওয়া হয়। তবুও সে তার মাবাবার আদেশ মেনে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিল।

 

বর্ষা যখন জীবনজুড়ে

বর্ষার জল ঝরে, সারা জীবনজুড়ে, দুনয়ন থেকে। বিয়ে হল। কলকাতার, ধনী ব্যবসায়ী বাবার, সুন্দরী কন্যা। পাত্র বি কম পাস। বেসরকারী চাকুরীরত। হুগলীর কিন্তু ভাড়া থাকে দুজনে হাওড়ায়। চার বছরে, প্রথমে একটি মেয়ে, বিয়ের এক বছর পরে, ও তার তিন বছর পর আর একটি ছেলে হল। এদের মাঝে হুগলীর, চৈতন্যবাটী, গ্রাম থেকে পড়তে এল ভাই। দাদাবৌদির মাঝে ভাঙ্গন এল। ভাই রয়ে গেল। বউ ও সন্তানরা চলে গেল সেই গ্রামে। এর আগে বউটি কখনও গ্রাম দেখে নি। পরে আর এক ভাই গেল দাদার কাছে থেকে পড়তে, হাওড়ায়। এখানে গ্রামে, শ্বাশুড়ি, শ্বশুর, তিন ননদের নির্যাতনে কাটে বউটির জীবন। এরপর, .......প্রথম মেয়ে, তার তিন বছর পর ছেলে, এরা তো হাওড়ার,  সালকিয়াতে থাকার সময়ই হয়েছিল, এবং তার তিন বছর পর, গ্রামে থাকতে থাকতে আর এক মেয়েরও মা হল, সেই কোলকাতা নগরীর মেয়ে, হুগলীর গাঁয়ের বধূটি। হারিকেনের আলো। ইলেক্ট্রিক ফ্যান নেই। ওঃ কি কষ্ট! হাত পাখায় হাওয়া করে করে, গরমে মেয়েদের ও ছেলেকে রাতে ঘুম পাড়ায়। সারারাত চলে, মায়ের ডানহাত। কয়েক বছর পর তাই সে হাত যন্ত্রনায় ছটপট করতে লাগলো। তবুও টিউব অয়েলে পাম্প করে করে দশ মিনিট হেঁটে রোজ সকালে ও বিকালে, বড় বড়, লোহার দশ বালতি করে জল তোলে, এইই ডান হাত। স্বামী প্রতি শনিবার রাতে আসে আর রবিবার বিকালে চলে যায়, হাওড়ায়। পায়খানা নেই, তাই, পত্নী রাতে খায় না। একা রাতে দূরে মাঠে মল ত্যাগ করতে যাবে কি করে? কেউ তো তাকে সাথে করে নিয়ে যাবে না! সে যেখানে শোয়, সেঘরটি, বেশ অনেকটা দূরে। ও বাড়িতে, বাড়ির অন্য সবাই শোয়। দিনে বউটি সেখানে রান্না করে। সবাইকে খেতে দেয়। আর রাতে দূরে শুতে যায়, বাচ্চাদের নিয়ে। বর্ষায় ছাতা মাথায়। বালতি করে জলও বয়। বাচ্ছাদেরও কাদায় নামায় না। কোলে করে নিয়ে যায়। বিছানায় ছাদ থেকে বর্ষার জল পরে। কড়ি, বর্গার, চুন, সুরকির, চৌক চৌক টালি সেট করা, ছাদ তো। অনেক কালের পুরোনো বাড়ী। জোড়া-তক্তপোষের বিছানার ওপরে, জলে ভেজা থেকে রক্ষা করতে, পিতলের কলসী বসিয়ে রাখে, মা-টি, তাই। এতে জল জমে। তিনটে কলসী রাখতে হয়। তিন জায়গায় জল পরে যে! ....... দুচোখ মায়ের জলে ভরে। এভাবেই, সেই সে মা, তার তিন সন্তানকে বড় করতে থাকলো। .......বাবার বাড়ীতে কখনও ভাবে নি, জানেও নি,  এ সব, বিয়ের আগে। যাই হোক! ...... সন্তানেরা তার সকলেই লেখাপড়াতে খুবই ভালো। মা তাই, আর কষ্টকে মনে করেই না! ......ছেলেটাতো খুবই ভালো পড়ালেখায়! কোলকাতা উনিভার্সিটি থেকে স্কলারশিপ পেয়ে এম কম পাস করল। আই সি ডব্লিউ এ তেও ফার্স্ট হল, হাওড়ার মধ্যে। গ্রাম থেকেই যাওয়া আসা করে, পড়ে। দু কাকার জ্বলন হল। মানসিক অত্যাচার করে করেও যখন পারল না, তখন দাদাকে, অর্থাৎ বাবাকে ছেলের বিরুধ্যে লাগল। তাও ছেলেটি এগিয়ে চলেছে..... হঠাৎ সাইনাস হল। অপারেশন হল। নার্ভের রোগ হল, তাই। কিছু বছর পর, নিজের গ্রামের শোবার ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল। মা-টি অর্ধ পাগলিনী। চির বর্ষা তার দু আঁখিতে...

গ্রামের নামটি, চৈতন্যবাটী, জেলা, হুগলী। বাংলা। ভারত। ছেলেটির নাম, আশিস নন্দী। মায়ের নাম, সবিতা নন্দী। যদি পার, সেখানে গিয়ে দেখে এসো, সেই সে ছেলে ও মায়ের শোবার ঘর। মাও এখন আর নেই। ছেলের কাছেই চলে গেছে, স্বর্গে। ঘরটি কিন্তু ঠিক আগের মতোই আছে। ছেলেটি যে মৃত্যুর আগে মায়ের কষ্ট দূর করার জন্য সারিয়েছিল। এক বছর তাই আর ছাদ থেকে বর্ষার জল, বিছানায় পড়ত না। আর সারানোর এক বছর পরই সেই সে ঘর হল তার, শেষ শোবার ঘর। তার স্কলারশিপের পাওয়া টাকা মায়ের নামে নোমিনি করে, পুত্র রেখে গেছে। মায়ের চক্ষে এক বিন্দুও আর জল নেই। বাবা তো ছেলের মৃত্যুর পর ও চাকরী করত। কারোর বারণ শুনত না। আর মা তো রান্না করে করে গ্রামের সবাইকে নিজের হাতে বাড়ীতে বসিয়ে খাওয়াতো। ছেলের মৃত্যুর সাত বছর পরে, ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল পিতা। ছেলের মৃত্যুর দশ বছর পর মাও ক্যান্সারে মারা গেল। বেঁচে থাকতে ওরা, কত মানুষকে ক্যান্সারের জন্য নিজেদের খরচায় চিকিৎসা করিয়েছে। আর ছেলেটি তো কত ছাত্রকে বিনা খরচায় নিজে নিজের ঘরে বসিয়ে বি কম-এর পড়া পড়িয়েছে। তাদের জীবন গড়ে দিয়েছে। আর সেই সে ঘরেই সে নিজের হাতেই আপন জীবন শেষ করল............আজও সেই সে ঘরটি তার কমার্সের বইয়ে ভরা আছে......