Samokal Potrika

খটকা লাগল তো ? লাগারই কথা ! প্রোগ্রাম [programme] নামক ইংরেজি শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত হলেও পোগ্রোম [Pogrom] নামের রাশিয়ান শব্দটি অনেকেই হয়ত এই প্রথম শুনছেন। না, একটুও ভয় পাবেন না। অপরিচিত শব্দ হলেও এটাও একটি কর্মসূচী। অর্থাৎ পোগ্রোমও এক ধরণের প্রোগ্রাম যা আপনার আমার দেশে প্রতিদিনই কম বেশি ঘটে চলেছে। ঠিক ধরেছেন—মানুষ মারার কর্মসূচী –এতদিন ভিডিও ছাড়া হয়েছে, এখন ভিডিও সহ, এরপর লাইভ দেখার জন্যও প্রস্তুত হন।তবে পার্থক্য একটি আছে। যে কোনো নরহত্যা মানেই পোগ্রোম নয়। যে কেউ মারলেই পোগ্রোম নয়। ধর্ম, জাতি [religion, race] ইত্যাদির ভিত্তিতে চিহ্নিত করে যখন হাজার হাজার মানুষকে তাদেরই সঙ্গে বাস করা পাড়া প্রতিবেশী ইচ্ছেমত কুপিয়ে, পিটিয়ে, খুঁচিয়ে, পুড়িয়ে, মাড়িয়ে মেরে ফেলে, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে, তাকেই পোগ্রোম বলা হয়। আগ্রহী পাঠকের জন্য শব্দটি নিয়ে সামান্য আলোচনা করা যেতেই পারে।

কেমব্রিজ অভিধান অনুসারে পোগ্রোম হল--an act of organized cruel behaviour or killing that is done to a large group of people because of their race or religion.

অর্থাৎ একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতি ধর্ম তথা জাতিগত কারণে চরম নৃশংসতা প্রদর্শন। শব্দটি টাইমস ম্যাগাজিনে সম্ভবত ১৯০৩ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে প্রথম ব্যবহৃত হয়। যদিও এই রাশিয়ান শব্দটির জন্ম হয় ১৮৮২ খৃস্টাব্দে বিশেষ একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে। ১৮৮১ খৃস্টাব্দে জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার নেরোদনিয়ে ভোলিয়ে নামক এক বিপ্লবী দলের হাতে নিহত হন। কিন্তু কিভাবে যেন রটে যায় এই হত্যার পেছনে ইহুদিদের হাত। ব্যাস, শুরু হয়ে যায় বর্বর হত্যালীলা। সমগ্র রাশিয়া জুড়ে পথে ঘাটে, অলিতে গলিতে, বাড়িতে বারান্দায় ইহুদি দেখা মাত্র ইঁদুর আরশোলার মত পিষে মারো--- সরকারিভাবেই ২০০টি গণহত্যার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। তার মানে কিন্তু ২০০টি প্রাণ নয়। দুশোটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এই হত্যালীলা চালানো হয়। শিকারের সংখ্যা সব ক্ষেত্রেই একের অনেক বেশি।ঠিক ধরেছেন, ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর আমরা যে শিখ নিধন যজ্ঞ দেখেছিলাম সেটিও আসলে এই পোগ্রোম। রাশিয়ান gromit ক্রিয়াপদটির [ যার অর্থ ধ্বংস অথবা ভয়ংকরভাবে তছনছ করা] আগে ‘po’ prefix ব্যবহার করে এই শব্দটি পাওয়া গেছে। ১৮৮১—১৮৮৩ পর্যন্ত ভয়াবহ ইহুদি হত্যার বাতাবরণে শব্দটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নিশ্চয় বুঝতে পারছেন বর্তমানে এর ব্যাপ্তি বাড়লেও [যেন কোনো ধার্মিক জাতিগত বিদ্বেষজনিত হত্যা] আসলে ইহুদি জনগোষ্ঠীর উপর সংঘবদ্ধ এবং নৃশংস অত্যাচারকেই পোগ্রোম বলা হয়।

কিন্তু কেন ? জার আকেজাণ্ডার নিহত হলেন আর কেউ একজন ইহুদিদের নামে গুজব ছড়িয়ে দিল, আর অমনি ইহুদি নিধন শুরু হয়ে গেল ? কোনো প্রমাণ লাগল না, কেউ দেখল না। নিছক একটা গুজবের এত শক্তি ? হ্যাঁ, গুজবের শক্তির কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানও হার মানে যদি তার একটি উর্বর পশ্চাৎপট তৈরি থাকে এবং তাকে নিয়মিত এবং সুপরিকল্পিতভাবে কায়েমী স্বার্থসিদ্ধির জন্য লালন করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে ইহুদিরাই অদ্যাবধি সবচেয়ে অত্যাচারিত সম্প্রদায়। সমগ্র বিশ্বের সরকারি এবং বেসরকারি নথী তাই বলে। হ্যাঁ আবহমান কাল ধরে ধারাবাহিক নিপীড়ন এবং গণহত্যার শিকার এই জনগোষ্ঠী যে কত রক্তপাত, আর্তনাদ, আর কান্নার সাক্ষী, তার বর্ণনা অসম্ভব। কিন্তু আবার সেই প্রশ্ন –ইহুদিরা কেন ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি গোপন আস্তানায় লুকিয়ে থাকার সময় ইহুদি কিশোরী অ্যান ফ্রাঙ্কের মনেও এই একই প্রশ্ন অনেকবার উঁকি মেরেছিল---Why us ? we must have done something aweful . আমাদেরই কেন বার বার পালাতে হয়, মরতে হয় ? আমরা নিশ্চয় ভয়ংকর কিছু ঘটিয়েছি !

সে আর বলতে ! শুধু কি ভয়ংকর ? ভয়ংকরতম ! আসুন, ২০০০ হাজার বছর পিছিয়ে যাই। আনুমানিক ৩৩ এডি। এপ্রিলের তিন তারিখ, শুক্রবার। অন্য তারিখও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু আপনাকে দেখতেই হবে! কি দেখছেন ?কিছুই না ? কি মুশকিল না দেখলে যে চলবেই না। বেশ আমিই দেখিয়ে দিচ্ছি। ওই দেখুন জেরুজালেম ! আর ওই যে একটু দূরে একটা ফাঁকা জায়গা। ওটা হল বধ্যভূমি—গলগথা। আর ওই যে একটি “গৌরবর্ণ সুপুরুষ দীর্ঘকায় দেবতাপ্রতিম” মানুষ টলমল পায়ে এগিয়ে চলেছেন, কাঁধে বিশালকায় ক্রস—ক্লান্ত, বিধ্বস্ত—উনি হলেন যীশু খ্রিষ্ট, ইংরেজিতে জেসাস ক্রাইস্ট। আর ওই যে ওঁর পেছনে শিস দিতে দিতে বেশ কিছু “কদাকার, নোংরা, শয়তান আর পিশাচের মত” দুপেয়ে হেঁটে আসছে, যারা ভগবান জেসাসকে ব্যঙ্গ করছে, ঢিল ছুঁড়ছে, ইহুদিদের রাজা বলে বিদ্রুপ করছে, ওরা কে বলুন তো ! ওরা ইহুদি। ওরাই মহান যীশুকে হত্যা করেছিল। যাদের চাপে রোম্যান সম্রাট টাইবেরিয়াসের নিযুক্ত জ্ঞানী প্রিফেক্ট তথা বিচারক পন্টিয়াস পাইলেটও হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন। ইহুদি নামের এই উন্মত্ত জল্লাদেরা মহান যীশুকে -----
কিন্তু আধুনিক গবেষণা তো অন্য কথা বলছে। সমস্ত বিষয়টাই নাকি কল্পনা। এমন ঘটনা নাকি নাও ঘটতে পারে। আরে ছাড়ুন তো। বাইবেলে আছে মশাই ।হ্যাঁ নিউ টেস্টামেন্ট। সে কখনও মিথ্যে হতে পারে ? এই ইহুদি জাতটাই হল মহা হারামি। নোংরা, কদাকার। সব এক একটা মূর্তিমান শয়তান।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই যে ২০০০ হাজার বছর আগের এই তথাকথিত হত্যাটির জন্য নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সমগ্র ইহুদি জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়। এবং ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান মাত্রেই [ তিনি রোম্যান ক্যাথোলিক হোন, প্রোটেস্ট্যান্ট হোন, অথবা মার্টিন লুথারপন্থী হোন] এটি বিশ্বাস করেন।একে ইংরেজিতে কি বলা হয় জানেন ? collective responsibilty অর্থাৎ সামুহিক দায়। ইহুদি মাত্রেই তার হাতে যীশুর রক্ত লেগে আছে। ইউরোপে ইহুদি নিধনের জন্য তখন একটি গুজবই যথেষ্ট ছিল।

ভয়ঙ্কর এই জাতিবৈরিতায় ঘৃতাহুতি দিল আরও একটি প্রচার। এমন এক প্রচার যা ধর্মান্ধ খ্রিস্টানেরা একেবারে লুফে নিল।জমি তৈরি থাকলে যা হয়। ঘৃণার জমিতেই তো হত্যার ফসল ফলে। কি সেই প্রচার যা মধ্যযুগীয় ইউরোপের আপামর খৃষ্টান বিশ্বাস করা শুরু করলেন ? ব্লাড লাইবেল ! তা এই Blood libel বস্তুটি কি ? দিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়া হল পাসওভার উৎসবের সময় ম্যাটজো নামক এক ধরণের রুটি বা কেক সেঁকার সময় ইহুদিরা নাকি খ্রিস্টান শিশুদের রক্ত ব্যবহার করে। সেই উদ্দেশ্য তারা বাচ্চাদের বলি দেয়। ওদের ধর্ম গ্রন্থে নাকি তাই লেখা আছে। ব্যাস আর কি চাই !ওদের মত শয়তান এভাবেই তো ওদের দেবতাকে তৃপ্ত করবে। এই পাসওভার ফেস্টিভ্যাল কি জানেন ? ইহুদিরা বিশ্বাস করে এইদিনই অত্যাচারের হাত থাকে মোজেস ওদের মুক্তি দিয়েছিল।

এরপর যা হওয়ার তাই হল। দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল গুজব। আর প্রত্যেক গুজবের জন্য শয়ে শয়ে ইহুদির প্রাণ ! এর মধ্যে আবার গোটা দুই তিন প্রবাদ প্রতিম আকার ধারণ করল। ঢুকে পড়ল সাহিত্যে, গানে, লোককথায়। যেমন উইলিয়াম অফ নরউইচ, লিটল সেইন্ট অফ লিংকন, সাইমন অফ ট্রেন্ট।একটি নির্জন জায়গায় নরউইচনিবাসী উইলিয়ামের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি।যেহেতু ব্যবসায়ীক সূত্রে তার সঙ্গে কিছু ইহুদির যোগাযোগ ছিল, অতএব দুইয়ে দুইয়ে চার করে নেওয়া হল। রোম্যান ক্যাথলিক চার্চ তাকে শহীদ ঘোষণা করে দিল। ফলশ্রুতি হিসেবে প্রাণ গেল অনেক ইহুদির। একইভাবে ঘটল বাকি ঘটনা এবং পরবর্তী গুজব। লিঙ্কনের ছেলেটিকে নিয়েও গান বাঁধা হল। আর সাইমনের দেহ নাকি এক ইহুদি পরিবারের সেলারে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। না, কেউ নিজের চোখে দেখেনি। কিন্তু ওই যে ইহুদি ----
জেরুজালেম স্থিত হিব্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেকব উভাল থেকে শুরু করে অনেকের গবেষণাই এই blood libel এর মিথ্যাকে অনাবৃত করেছে। তবু ওই যে---বিশ্বাসের ভাইরাস !

শুধু কি গোঁড়া, ধর্মান্ধ খ্রিস্টান ? অথবা অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ ? তবে এতটা চিন্তার কথা ছিল না। এই গুজব তথা অন্ধবিশ্বাসকে সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী তো বটেই পরবর্তীকালেও অনেক কবি সাহিত্যিক, নাট্যকার গভীর বিশ্বাস এবং আন্তরিকাতার সঙ্গে মদত দিয়ে গেছেন। তাঁদের শিল্পকর্মও ইহুদি বিদ্বেষে একেবারে টইটম্বুর। [এব্যাপারে আমাদের দেশের “বুদ্ধিজীবীকুল অবশ্য একেবারে বিপরীত। তাঁরা সব কিছু চোখে দেখলেও, নিজেদের আখের গোছানোর জন্য ইসলামী সন্ত্রাসটি দেখেও দেখেন না। এর ফলশ্রুতি যে কি ভয়াবহ হতে পারে আমরা দেখছি, ভবিষ্যতেও দেখতে হবে।] ইংরেজি, ফরাসী, জার্মান সব সাহিত্যেই ছড়িয়ে পড়েছে এই ইহুদি বিদ্বেষ, যা এন্টি সেমিটিজম [antisemitism] নামে পরিচিত। কে নেই এই তালিকায় ? চসার, শেক্সপিয়র, মার্লো, চার্লস ডিকেন্স, ডরোথি রিচার্ডসন, গ্রাহাম গ্রিন, টি এস এলিয়ট, ভার্জিনিয়া উলফ---তালিকাটি দীর্ঘ। এরা সবাই একটি চরিত্রকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এঁকেছেন। স্টিরিওটাইপ যাকে বলে। যেন ইহুদি মাত্রেই স্বার্থপর, লোভী, নির্মম।মানবিকতার লেশ মাত্র নেই। চসারের ক্যান্টারবেরি টেইলস [Canterbury Tales] ইংরেজি সাহিত্যের একটি অমূল্য দলিল। সেখানেও এক রমনী একটি যীশুভক্ত শিশুর গল্প বলছেন। এক ইহুদির বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে নাকি বাইবেলের একটি hymn বা স্তোত্র গাইছিল। তাতেই খেপে গিয়ে ইহুদি গৃহকর্তাটি তাকে হত্যা করে বসল। আর মার্লোর নাটক জিউ অফ মাল্টা [Jew of Malta] যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন বারাবাস নামক ইহুদির চরিত্রটি কত নির্মম, ভয়াবহ। সে প্রথমে সুকৌশলে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত তারপর হত্যা করত। মহাকবি শেক্সপিয়রও এই চরিত্রটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে শাইলক নামক এক তথাকথিত স্টিরিওটাইপ ইহুদি চরিত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর নাটক Merchant of Venice এত জনপ্রিয় হয় যে সমগ্র বিশ্বের পাঠক ভাবতে থাকে ইহুদিরা বুঝি এমনই নির্মম হয় । ছোটবেলায় আমিও এমন ভেবেছিলাম। এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত গোথোল্ড লেসিংস-এর নাথান দি ওয়াইজ বইটিতেই প্রথম ইহুদিদের একটি মানবিক আলোতে দেখানো হয়। পাঠক বুঝতে পারে তাঁরাও মানুষ, আমাদের মত। হ্যাঁ আর একজন মহান সাহিত্যিক স্টিরিওটাইপ অতিক্রম করে একটি অসাধারণ ইহুদি চরিত্র এঁকেছেন। তিনি জেমস জয়েস। ইউলিসিস নামক যুগান্তকারী গ্রন্থটিতে লিওপোল্ড ব্লল্ম নামক ইহুদি চরিত্রটি বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়েই থাকবে।

এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন পোগ্রোম নিছক সাধারণ মানুষের অন্ধবিশ্বাসের ফল নয়, বুদ্ধিজীবীরাও তাঁদের দায় ঝেড়ে ফেলতে পারেন না। তবে যীশু হত্যা আর তথাকথিত Blood libel নয়, ইহুদি বিদ্বেষের আর একটি বড় কারণ [সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণও বটে] হল তাঁদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে ওঠার সমস্যা। যে কোনো পেশাতেই ইহুদিদের সঙ্গে পেরে ওঠা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাঁদের মেধা, বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ইত্যাদির সঙ্গে মোকাবিলা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সত্যিই কষ্টসাধ্য ছিল। তাই সুকৌশলে তাঁদের বিভিন্ন পেশা থেকে বাদ দেওয়া শুরু হল। অনেক পেশা, ব্যবসা তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ করা হল।ব্যাংকিং থেকে শুরু করে বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা কে না জানে। তাই কেবল হত্যালীলা নয়, চলল বিতাড়ন। ১৮৮২ সালে পোগ্রোম শব্দটির জন্ম হলেও তার বহু শতাব্দী আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এই অমানবিক ব্যবস্থা। ১২৯০ সালেই ব্রিটেন দেশটিকে ইহুদি শূন্য করে দেওয়া হয়।

চতুর্দশ শতাব্দীতে ব্ল্যাক ডেথ [প্লেগ নামক ভয়াবহ রোগটিকে এই নামেই ডাকা হত] যখন ইউরোপকে তছনছ করে দিচ্ছে, অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, তখন এই মহামারীর জন্য কাকে দায়ী করা হল জানেন ? দূর মশাই। এ তো সহজ প্রশ্ন ! কেন, সেই ইহুদিদের। তাঁরাই নাকি কুয়োতে বিষ মিশিয়ে এই রোগের জন্ম দিয়েছে। ১৩৪৮ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত কত যে ইহুদিকে মরতে হয়েছে। ১৩৪৯ সালে স্ট্রসবোর্গেই দু হাজার ইহুদিকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়। সেদিন ছিল ভ্যালেন্টাইনস ডে, ফেব্রুয়ারী মাস। এভাবেই ফ্রান্সের তুলো, স্পেনের বার্সিলোনা, চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগ, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস----বড় দীর্ঘ এই তালিকা----- হ্যাঁ এসবই সৈন্যবাহিনী নয়, পুলিশও নয়, আপনার আমার মত সাধারণ মানুষের দ্বারা সংগঠিত হত্যালীলা। নারী, শিশু, যুবক, যুবতী, বৃদ্ধ বৃদ্ধা কেউ বাদ যায়নি। তবে সবচেয়ে বড় হত্যালীলা যাকে প্রথম Jew genocide বলা হয়, সেটি ইউক্রেনে ঘটে। সময়কাল ১৬৪৮ থেকে ১৬৫৭ । কশাক সম্প্রদায়ের নির্মম অত্যাচারের বলি হয় এক লক্ষেরও বেশি ইহুদি।

১৮৮২—৮৩ –এর পর আবার ১৯০৩ থেকে রাশিয়াতে পোগ্রোম শুরু হয়ে যায়। দু সহস্রাধিক পোগ্রোমে ইউক্রেন, বেলারুশ ইত্যাদি জায়গায় প্রায় তিন লক্ষ ইহুদি প্রাণ হারান, পাঁচ লক্ষ গৃহহীন। অর্থাৎ প্রতিবেশীর হাতে প্রতিবেশীর মৃত্যু !না এখানেই থামেনি। রাশিয়াতেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পোগ্রোম ঘটানো হয়েছে। আলেকজান্ডার সলঝেনিতসিন তাঁর টু হান্ড্রেড ইয়ার্স টুগেদার বইটিতে এ বিষয়ে বিশদ আলোকপাত করেছেন।যদিও বইটি বিতর্কিত। এটিকে সরিয়ে রেখেও যা পাচ্ছি তাও কম ভয়াবহ নয়। কিয়েভ শহরেই ১৯১৯ সাল নাগাদ প্রায় সত্তর হাজার ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ইউক্রেনের সবচেয়ে জনবহুল শহর ওডেসাতে ইহুদি হত্যাকাণ্ডে তো রেড আর্মি অর্থাৎ কম্যুনিস্ট লাল ফৌজও অংশ নিয়েছিল।
এ তো গেল মধ্যযুগের কথা। মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে উঠে আসা এই সব অন্ধ বিশ্বাসের দাপট আধুনিক মননকেও গ্রাস করে রেখেছিল। শিল্প বিপ্লবের আবির্ভাব তথা বিজ্ঞান মনস্কতার কারণে ইউরোপের অনেক অংশেই এর তীব্রতা কমতে শুরু করেছিল। যদিও পূর্ব ভাগে শিল্প বিপ্লব বিলম্বিত হওয়ার কারণে এই বর্বর বিশ্বাস কম বেশি রয়েই গিয়েছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ লগ্নে এই ইহুদি বিদ্বেষ নতুন মোড়কে দেখা দিল। অর্থাৎ মদটা একই, পাত্রটি কেবল ভিন্ন। যে ইহুদি বিদ্বেষ মূলত বাইবেল তথা ধর্ম কেন্দ্রিক ছিল তাতে “ বিজ্ঞানসম্মত” লেবেল লাগানো শুরু হল। আবির্ভাব হল এক নতুন দর্শনের ---রেসিয়াল এন্টি সেমিটিজম [racial antisemitism] বিজ্ঞানের মোড়কে ভয়াবহ এক ছদ্মবিজ্ঞানের তত্ত্ব নিয়ে আসরে নেমে পড়লেন প্রাশিয়ার জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক হাইনরিখ ভন। white supremacy theory তথা শ্বেতকায় জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি উচ্চারণ করে বসলেন চরম অমানবিক এক অক্ষরমালা---The Jews are our misfortune ! ইতিহাস স্বাক্ষী এই উচ্চারণকেই হিটলার হাতিয়ার করেছিলেন এবং ইহুদি নিধনে নেমে পড়েছিলেন। এছাড়াও ছিলেন জোসেফ আর্থার গোবিনে । তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন ইউরোপিয়ান জাতির সাপক্ষে ইহুদিরা অতি নিকৃষ্ট এক প্রজাতি। ছদ্মবিজ্ঞানের উপাসক এই তাত্ত্বিক আরও জানালেন যে তাদের উৎপত্তির এবং সংস্কৃতি এতই ভিন্ন এবং জঘন্য যে যদি ধর্ম পরিবর্তন করে তারা খ্রিস্টানও হয়ে যায়, তাতেও মুক্তি নেই। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। অর্থাৎ মৃত্যু ছাড়া এদের জন্য আর কিছুই শ্রেয় হতে পারে না। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে উইলহেলম মার নামক এক জার্মান সাংবাদিক একটি প্যামফ্লেট প্রকাশ করেন। সেখানে ইহুদি জাতি তথা সংস্কৃতিকে বোঝানোর জন্য Semitismus শব্দটি Judendum [ইহুদিদের ধর্ম judaism থেকে প্রাপ্ত] এর বিকল্প হিসেবে পাশাপাশি ব্যবহার করেন। এই semitismus এর প্রতিরোধে পাল্টা শব্দ antisemitismus এর জন্ম হয়। অর্থাৎ “বিজ্ঞান সম্মত” ইহুদি বিরোধিতার আবির্ভাব ঘটে। আর এই দর্শনটি হিটলারের এত পছন্দ হয় যে তিনি এটিকে মূলধন করে মনে মনে একটি ইহুদি মুক্ত পৃথিবী বানিয়ে ফেলেন। ইহুদি মারণ যজ্ঞের একটি নামও দিয়ে ফেলেন—Final Solution ! ভাবলেই ---না ভাবা যায় না !

হিটলারের আবির্ভাবের পূর্ব লগ্নে ইউরোপে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল ৯.৫ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় পঁচানব্বই লক্ষ। তিনি নিজের দায়িত্বে ষাট লক্ষ ইহুদিক হত্যা করেছিলেন। গ্যাস চেম্বারের নাম নিশ্চয় শুনেছেন ? সমগ্র ইউরোপ জুড়ে প্রায় ৪২,৫০০ টি কনসেনট্রশন ক্যাম্প গড়ে ওঠে। সেখানেই লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়। সমকামীদের ভাগ্যেও বরাদ্দ হয়েছিল মৃত্যু। এইসব ক্যাম্পের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আর কুখ্যাত ছিল অউসউইচ ! এখানে এত ইহুদিকে মারা হয়েছিল যে তাদের মৃতদেহের ছাইয়ে নিকটবর্তী ভিসচুলা নদীটির স্রোত আটকে যায়। 
কিন্তু এই হোলোকষ্ট [ইহুদি মারণ যজ্ঞ এই নামেই পরিচিত] কি গ্যাস চেম্বার দিয়েই শুরু হয়েছিল ? না, গ্যাস চেম্বারের ধারণা আসে হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের পর। কুখ্যাত এবং কুশলী সেনাপতি রোমেল একাই আফ্রিকা সামলাতে পারবেন এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর ১৯৪১ এর ২২ শে জুন ৩৮ লক্ষ সেনা নিয়ে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন। হিটলারের সঙ্গে স্বেচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে যোগ দেয় রোমানিয়া, ফিনল্যান্ড, ইতালি ইত্যাদি দেশ। ব্যবহৃত হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার ট্যাংক, ২৭০০ যুদ্ধবিমান এবং সাড়ে সাত হাজার সাঁজোয়া গাড়ি/ কামান । এই অভিযানের নাম দেন অপারেশন বারবারোসা। ত্রিমুখী আক্রমন—একই সঙ্গে তিনটি শহরের দিকে নাজি বাহিনী এগিয়ে চলে –লেনিনগ্রাড, মস্কো এবং কিয়েভ। স্তালিন স্বপ্নেও ভাবেননি। আগের রাতেও জার্মানীতে তিনি ওয়াগনের পর ওয়াগন লোহা এবং কয়লা পাঠিয়েছেন। হ্যাঁ দু বছর আগে হওয়া অনাক্রমণ চুক্তির ফলে তখন জার্মানী এবং সোভিয়েত পরস্পরের বন্ধু ! 
প্রথমদিকে স্তালিন কোনো প্রতিরোধই করে উঠতে পারেন নি। চরম অপ্রস্তুত থাকলে যা হয়। গুপ্তচরদের সাবধান বানী ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলে যা হয়। যাক, একসময় বেনজিনা নদী , যা অতিক্রম করতে গিয়ে নেপোলিয়নের বাহিনী পরাজিত হয়েছিল, হিটলারের সেনা তা অনায়াসে পেরিয়ে গেল। এখানে বিশদ আলোচনায় যাচ্ছি না। আমরা এবার পোগ্রোমে ফিরে আসব। 
হিটলারের বাহিনী যখন ইউক্রেনে প্রবেশ করে, স্থানীয় মানুষ তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানায়। সোল্লাশে বলে হিটলার তাদের স্তালিনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছেন। অতএব তিনি লিবারেটর, মুক্তিদাতা। এরপরই শুরু হয়ে গেল ইহুদি নিধন। হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য সেটাই ছিল। প্রথমে ইহুদিদের জড়ো করে জঙ্গল বা কোনো ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে কবর খুঁড়তে বলা হত। তারপর তাঁদের খোঁড়া কবরেই তাঁদের নিক্ষেপ করা হত। কিন্তু এতে অনেক সময় লাগত। তাই তাঁদের দিয়ে গণকবর খনন করা শুরু হল।দুশ, তিনশ মিটার কবর খোঁড়া হয়ে গেলে তাঁদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে গুলি করা হত। এভাবেই হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করা শুরু হয়। একটি ক্ষেত্রে প্রায় ৩৪ হাজার ইহুদিকে একসঙ্গে কবর দেওয়া হয়। গুলি করে মারতেও প্রায় দুদিন সময় লাগে। বুঝতেই পারছেন। সময় একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। অতএব স্থানীয় অধিবাসীদের এই কাজে উৎসাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইহুদি বিদ্বেষের জমি তো প্রস্তুত ছিলই। ব্যাস স্থানীয় লোকজন মহা উল্লাশে হত্যালীলায় মেতে উঠল। সমগ্র ইউক্রেন জুড়ে শুরু হল হাজার হাজার পোগ্রোম। আপনি বোর হচ্ছেন, কিছু ভাল লাগছে না ? খুঁজেই দেখুন না এলাকায় কোন ইহুদি পান কি না ! তারপর শুরু করে দিন ! কোনো চিন্তা নেই। প্রশাসন আপনার সঙ্গে আছে। মদ খেয়ে বেসামাল ? বাহ আসুন ইহুদি মারুন ! ১৯৪১ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত এভাবেই চলল এই হত্যালীলা। প্রকাশ্য রাজপথে শিশুদের চোখ উপড়ে নেওয়া হল, নারীদের উলঙ্গ করে যোনিতে লাঠি ঢুকিয়ে দেওয়া হল, ধর্ষণ করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল।রাশি রাশি ছবিও তোলা হল। শুধু কি ইউক্রেন ?রোমানিয়া থেকে শুরু করে হাঙ্গেরি সর্বত্র শুরু হয়ে গেল এই জল্লাদের উৎসব। গলি থেকে রাজপথ তখন শুধুই ইহুদিদের লাশ ! কারও হাত নেই তো কারও মুণ্ড নেই ! ইতিউতি ছড়িয়ে পড়া অঙ্গ প্রত্যঙ্গ !রাশিয়া দশ লক্ষ ইহুদির লাশ দেখল। কিন্তু এতেও তো শেষ হচ্ছে না শুয়োরগুলো ! সেনাবাহিনী যুদ্ধ করবে না ইহুদি মারবে ! হিমলার এলেন ইউক্রেন সফরে। হিটলারের প্রিয় এবং বিশ্বস্ত সহচর। সব দেখে শুনে ভাবলেন এত ইহুদি ! বাপ রে ! গুলি করে এত লোক মারতে সেনাবাহিনীর সারা জীবন লেগে যাবে। অতএব চালাও গ্যাস চেম্বার !

লক্ষ লক্ষ ইহুদি হিটলার একা মারেন নি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহন ছিল।তারা আপনার আমার মতই সাধারণ মানুষ।হিটলার যা করেছিলেন, তা জেনোসাইড আমি আপনি যা করি তা পোগ্রোম। দুই ক্ষেত্রে একটিই অস্ত্র—ঘৃণা, ঘৃণা এবং ঘৃণা !অন্ধ বিশ্বাস এবং মিথ্যে প্রচার মানুষকে যে কত নিচে নামাতে পারে এই পোগ্রোম তারই প্রমাণ। কেন এই অন্ধত্ব ? কেন এই ঘৃণা ? মানুষের স্বার্থপরতা ? ঈর্ষা ? হে সুপ্রিয় পাঠক, আপনি ভুল ভাবছেন। স্বার্থপরতা বা আত্মকেন্দ্রিকতার তাগিদে মানুষ খুব বেশি মানুষ মারেনি। রাগের মাথায়, সম্পত্তির বিবাদে, ঈর্ষার কারণে পৃথিবীতে কটা প্রাণ গেছে ? তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণ গেছে “মহত্ত্ব এবং আদর্শের” দোহাই দিয়ে। হিটলার হত্যা করেছেন “দেশপ্রেম” এবং একটি “বিশুদ্ধ রক্তের” মানবজাতির প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে, স্তালিন মেরেছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্য রূপায়নের অজুহাতে। উদ্দেশ্য কিন্তু “ মহৎ”। আর যাই হোক ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য এখানে নেই। হিটলার যাদের মেরেছিলেন। স্তালিন যাদের হত্যা করেন তারা কেউই তাঁদের ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। সব হত্যাই “ আদর্শের” আহ্বানে। এমন কোনো আদর্শ যার প্রথম বলি মানুষ তথা মনুষ্যত্ব ! তাই মতবাদের ভাইরাস থেকে সাবধান। সার্বিক মঙ্গল তথা প্রয়োগের কথা বললেও যে কোনো মতবাদ আসলে একটি ব্যক্তির মগজ থেকেই তৈরি হয়। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণটিকে নিয়েই কোনো একটি মতবাদের জন্ম দেন আর আমরা তাকে চিরন্তন এবং অবিনশ্বর ধরে নিয়ে সমস্ত মানব জাতির উপর চাপিয়ে দিই। শুরু হয় হানাহানি, রক্তপাত। আমরা ভালবাসতে ভুলে যাই। 
হে মহান খৃষ্টান, হে রোম্যান ক্যাথোলিক, হে প্রোটেস্ট্যান্ট আর একবার তাকিয়ে দেখুন !ক্রস বয়ে নিয়ে যাওয়া লোকটাকে ওরা ঝুলিয়ে দিয়েছে ---সর্বাঙ্গে রক্ত ! চারদিকে তবু বিদ্রুপের অট্টহাসি ! হ্যাঁ ওরা ইহুদি !কয়েকজন ইহুদি। সমগ্র ইহুদি জাতি নয়। আর ওই যে চরম যন্ত্রণা আর রক্তপাতের মধ্যেও ক্রুসবিদ্ধ লোকটা স্পষ্ট উচ্চারণে কি যেন বলছেন ! ওই যে শুনুন ! বাইবেলেই আছে। 
“হে ঈশ্বর তুমি ওদের ক্ষমা করো। ওরা জানে না ওরা কি করছে।” 
[ Father, forgive them, for they don’t know what they are doing ! –Luke 23:34 ]